Breaking News

জম্মুতে মেডিকেল কলেজ বন্ধ বিদ্বেষের রাজনীতির সর্বনাশা পরিণাম

জীবনে প্রথম মেডিকেল কলেজে ভর্তি, হস্টেলে একত্রে থাকা, প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষের, পাড়া-প্রতিবেশীর চিকিৎসায় সাহায্য, বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানো– আসিফের স্বপ্ন অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়ল হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির বাধায়। শুধু তারই নয়, ভেঙে গেল বেশ কয়েকজন মুসলিম, এমনকি ধর্ম পরিচয়ে হিন্দু ছাত্রছাত্রীর স্বপ্নও। অনুমোদনের মাত্র চার মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ বেআইনি ভাবে আচমকা জম্মুর কাটরায় বৈষ্ণেদেবী মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দিল এনএমসির বকলমে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। রাজ্য তথা দেশের ইতিহাসে একটা ন্যক্কারজনক ও বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে রইল এই ঘটনা।

অথনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা, দুর্গম এলাকার মানুষের কাছে সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং চিকিৎসকরা কতটা অপরিহার্য, তা সকলেই বোঝেন। অথচ কাটরায় শ্রী মাতা বৈষ্ণোদেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল কলেজ বন্ধের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে সরকার জনস্বাস্থ্যের কথা এতটুকু ভাবল না। এনএমসি বলেছে, কলেজে শিক্ষকের অভাব রয়েছে, নেই লাইব্রেরি ও উপযুক্ত ক্লাসঘর। কলেজের অনুমোদন দেওয়ার সময় সরকার কি এ সব জানত না? সেই সব অভাব পূরণ না করে তারা কলেজের অনুমোদন দিয়েছিল কিসের ভিত্তিতে! ফলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এ সব কথা আসলে নিতান্ত অজুহাত।

আসলে কলেজ বন্ধের পিছনে রয়েছে উগ্র মুসলিম-বিদ্বেষ। বিজেপি প্রভাবিত হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি ওই কলেজকে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানের তকমা দেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ দেখায়। তারা জম্মু-কাশ্মীরের লেফটেন্যান্ট গর্ভনরকে স্মারকলিপি দেয়। কারণ তাদের দাবি, বৈষ্ণোদেবী মন্দিরের তীর্থযাত্রীদের অনুদানে এই কলেজ গড়ে উঠেছে। ফলে ওই কলেজে মুসলিম বা অন্য ধর্মাবলম্বী ছাত্ররা পড়াশোনা করতে পারবে না। প্রশ্ন আসবেই, ভর্তি নেওয়া হবে কীসের ভিত্তিতে, ধর্ম না মেধা? আর সরকার ও স্থানীয় প্রশাসন তো এটা জানতই যে, সেখানে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি। ফলে সর্বভারতীয় নিট পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতেই প্রথম বর্ষে ৫০টি সিটে ৪২ জন মুসলিম-ছাত্র ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল। সমস্ত কিছু হয়েছিল আইন মেনেই। তা সত্তে্বও বিনা নোটিশে কলেজটি বন্ধ করে দেওয়া হল সম্পূর্ণ বে-আইনি ভাবে।

কলেজের এডুকেশন ডিরেক্টর কলেজ বন্ধের ঘটনাটিকে দুর্ভাগ্যজনক আখ্যা দিয়েছেন। শিক্ষকরা কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মর্মাহত হয়েছেন। তাঁদের মতামতকেও অগ্রাহ্য করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা বলেছেন, মেডিকেল কলেজ নিয়ে এত রাজনীতি হলে সেই কলেজের প্রয়োজন নেই, ছাত্রদের অন্য কলেজে ভর্তি করে দেওয়া হবে। বিস্মিত হতে হয় যে, এ ছাড়া বিরোধিতা করার আর কোনও জোরালো কথা তিনি খুঁজে পেলেন না! তিনি একবারও বললেন না যে, কলেজ বন্ধ করা যাবে না।

কলেজের এক ছাত্র বলেছে, কলেজ ক্যাম্পাসে আমরা সকলে একত্রে ক্লাস করতাম, কোনও অসুবিধা হত না। বাইরের কিছু মানুষের বিক্ষোভে আমাদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে গেল। স্বাধীনতার সময় থেকে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বহু মানুষের দানে গড়ে উঠেছিল। সেখানে কোনও ধর্ম-বর্ণ দেখা হয়নি। সব ধর্মের ছাত্ররা সেখানে পড়ার সুযোগ পেত। কারণ, তখন শিক্ষার বিস্তারই ছিল লক্ষ্য। আজ নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে শাসক দলগুলি একে অপরের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে ধর্মকে। পরস্পরের মধ্যে বিদ্বেষ-বিষ ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার চূড়ান্ত লঙ্ঘন হচ্ছে এর মাধ্যমে।

জম্মু-কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বাতিলের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ ‘নয়া কাশ্মীর’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এই কি তাদের নয়া কাশ্মীর, যেখানে ছাত্রদের মেধা নয়, ধর্মীয় পরিচয়ই প্রাধান্য পাবে! কঠিন পরিশ্রমের ফল হিসাবে যে ছাত্র-ছাত্রীরা ওই কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল, তারা হয়ত কিছুদিন পর আর কোনও কলেজে ভর্তির সুযোগ পাবে, কিন্তু তারা কি ভুলতে পারবে কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণ শুধুমাত্র ঘৃণ্য সংখ্যালঘু বিদ্বেষ?

বিজেপি-আরএসএসের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বলি তারা। এই দগদগে ক্ষত মুছবে কী দিয়ে? বিজেপি-আরএসএসের এ ভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে, গোটা জাতিকে কলঙ্কিত করা থেকে বিরত করতে পারে শিক্ষাপ্রেমী মানুষের সংঘবদ্ধ আন্দোলন। এদের বাড়বৃদ্ধি জাতির জীবনে এক ভয়ঙ্কর বিপদ হিসাবে দেখা দিয়েছে। এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে গণতন্ত্রপ্রিয় ধর্মনিরপেক্ষ সাধারণ মানুষকেই।