Breaking News

অঙ্গীকার যাত্রাঃ কোথা থেকে বাংলার কোমল, স্নিগ্ধ মায়েরা, দিদিরা এত শক্তি পেল!

পথ হাঁটছে তারা অক্লান্ত। আকাশ বাতাস আন্দোলিত করে দৃঢ় প্রত্যয়ে তারা পার করছে একের পর এক গ্রাম, শহর, জনপদ। পথ হাঁটছে আমার মা-বোন-দিদি। এক মহান দার্শনিকের কথায়– ‘নারীরা এই সমাজে দু-দু’বার নিপীড়িত’। এই শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে এক জন মানুষের মর্যাদা পেতে, দিন এবং রাত্রের বীভৎসতাকে রুখতে তারাই মরণপণ লড়াইয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ। শত শত দিনের লাঞ্ছনা, যন্ত্রণার বিরুদ্ধে আজ তারা যেন ফেনিল সমুদ্রস্রোতের মতো গর্জন করে আছড়ে পড়ছে তাদের না পাওয়ার, তাদের উপর অত্যাচারের সমস্ত হিসাব বুঝে নিতে। সামনের দিকে এগোতে থাকা শক্ত চোয়াল, দীপ্ত চোখগুলি দেখলে আপনি সবিস্ময়ে প্রশ্ন না করে পারবেন না– কোথা থেকে আমার এই গ্রাম বাংলার কোমল, স্নিগ্ধ মায়েরা, দিদিরা এত শক্তি পেল? নিজের জীবনের লাঞ্ছনা-বঞ্চনার কারণগুলো বৃহৎ সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিচার করে নিতে, নিজের দুঃখকে অন্যের দুঃখের সাথে যুক্ত করতে তারা পারছে। তাই তো এই মিছিলে আসা অচেনা অজানা মুখগুলো একে অন্যের কাছে হয়ে উঠেছে খুব চেনা, খুব কাছের। আসলে লড়াইটা স্নেহ, ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আদান প্রদান হচ্ছে একে অপরের সাথে যা তাদের শক্তি জোগাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। সেই শক্তি অনুভব করছে শহর। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কালো হিজাবে ঢাকা মুখ, কিন্তু চোখ দু’খানি স্থির, উজ্জ্বল। আলুথালু চুলের কিশোরী, উদাসী চোখে মিছিলটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে হঠাৎ সম্বিত ফিরলে তার বন্ধুদের ডেকে আনল মিছিল দেখার জন্য। স্কুল ছুটির পর ঘরে ফেরার পথে ছোট ছেলে-মেয়ের হাতখানি ধরে দাঁড়িয়ে আছে মা– দেখছে মেয়েদের, মায়েদের মিছিল। জীবনযুদ্ধে রোজ ডুবে গিয়ে হয়তো ভেসে উঠছে এই মা-ও। এ মিছিল তাদেরই মিছিল। এ মিছিল অঙ্গীকারের।

 নারীশক্তির জাগরণ

পুরুলিয়াঃ ১১ ডিসেম্বর, সাধারণ আর পাঁচটা দিনের থেকে অন্য রঘুনাথপুর দেখল শহরের আপামর জনগণ। দুপুর আড়াইটে। শহর মুখরিত হয়ে উঠেছিল নারীর মর্যাদা রক্ষার স্লোগানে। কারা দিচ্ছিলেন স্লোগান? রঘুনাথপুর মহকুমার প্রতিটি ব্লকের স্কুল, কলেজ, পঞ্চায়েত, গ্রাম থেকে আসা হাজার হাজার নারী। তাদের হাতে রোকেয়া, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, প্রীতিলতা সহ নানা মনীষীর ছবি সংবলিত পতাকা ও ছবি, কারও হাতে নারীর মর্যাদা রক্ষার দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড। সকলেই পরেছিলেন অঙ্গীকার যাত্রার বিশেষ পোশাক। এ যেন নারী শক্তির এক জাগরণ। মনে পড়ে যাচ্ছিল আর জি করের ঘটনার প্রতিবাদে ঐতিহাসিক ‘মেয়েদের রাত দখল’ কর্মসূচির কথা।

আর জি কর আন্দোলনের আবহে গড়ে ওঠা ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’-র উদ্যোগে এই অঙ্গীকার যাত্রা আহ্বান করা হয়েছিল। ঘোষণা ছিল কোচবিহার, কাকদ্বীপ, ঝাড়গ্রাম ও পুরুলিয়া থেকে অঙ্গীকার যাত্রা শুরু হবে। সেই কর্মসূচির একটি স্থান ছিল রঘুনাথপুর শহর। রঘুনাথপুর শহর জুড়ে মিছিলের পর সেখানেই প্রায় দেড় হাজার মানুষের উপস্থিতিতে একটি প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। রঘুনাথপুর মহকুমার বেশিরভাগ বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করে। সভায় বিশেষ ভাবে লক্ষ করা গেছে শ্রমিক খেটে-খাওয়া অংশের মহিলাদের। পাশে দাঁড়িয়েছেন এলাকাবাসী, বুদ্ধিজীবী মহল ও সাংস্কৃতিক জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা। অধ্যাপক, চিকিৎসক, শিক্ষক, অ্যাডভোকেট সহ দেড় শতাধিক বিশিষ্ট নাগরিককে নিয়ে গঠিত অঙ্গীকার যাত্রা অভ্যর্থনা সমিতি সমস্ত কর্মসূচিটি রূপায়ণে সার্বিক ভূমিকা পালন করে।

 মানুষ দিল এগিয়ে যাওয়ার সাহস

বাঁকুড়াঃ হাঁড়কাপানো শীত উপেক্ষা করে ১১ ডিসেম্বর ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’র ডাকে জেলার নানা প্রান্ত থেকে আসা মহিলারা সমবেত হন মাচানতলা নেতাজি মূর্তির পাদদেশে। পুরুলিয়া থেকে শুরু হওয়া অঙ্গীকার যাত্রা এসে পৌঁছলে অংশগ্রহণকারীদের হাতে পুষ্পস্তবক দিয়ে সম্বর্ধনা জানায় চিকিৎসক সংগঠন মেডিকেল সার্ভিস সেন্টার, শিক্ষক সংগঠন, জন অধিকার সুরক্ষা কমিটি, সিপিডিআরএস, অ্যাবেকা প্রমুখ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। সম্বর্ধনা সভায় বক্তব্য রাখেন চিকিৎসক আন্দোলনের অন্যতম নেতা ডাঃ সজল বিশ্বাস, অধ্যাপক কুন্তল সিনহা, নাট্যশিল্পী নদীয়া ইন্দু বিশ্বাস ও জেলা আহ্বায়ক সুষমা মাহাত। অঙ্গীকার যাত্রীদের সামনের সারিতে রেখে বিভিন্ন বয়সের নানা পেশার তিন শতাধিক মহিলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ পথ পরিক্রমা করেন।

রাস্তার পাশের দোকানদার, হকার, পথচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অঙ্গীকার যাত্রীদের অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় জেলার নানা শিল্পী সংগঠন। স্কুলছাত্রীরা ক্যারাটে প্রদর্শন করে। সপ্তাহ ধরে পথচলার পর ১৬ ডিসেম্বর কলকাতার কলেজ স্কোয়ারে নবজাগরণের মহান পথপ্রদর্শক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পাদদেশে সুবিশাল সমাবেশে অংশ নিয়ে এই জেলার অংশগ্রহণকারীরা জেলায় ফিরে বলেন, আমরা গ্রামের মেয়েরা পথে পথে দেখেছি কত মানুষ আমাদের শুভেচ্ছা সহমর্মিতা জানিয়েছেন। তাঁরা আমাদের আরও এগিয়ে যাওয়ার সাহস দিচ্ছেন।

নতুন এক প্রত্যয় জাগিয়ে দিয়ে গেল

এ যেন আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ, যাতে ঘষা লাগলেই বেরিয়ে পড়ে এক বিশালাকায় দৈত্য। মহিলাদের আহ্বানে নারীর মর্যাদা রক্ষার দাবিতে সপ্তাহব্যাপী ‘অঙ্গীকার যাত্রা’র শেষ দিন ১৬ ডিসেম্বর কলকাতা শহরের বুকে দাঁড়িয়ে ঠিক এমনই একটা অনুভূতি হচ্ছিল। গ্রাম-নগর-মাঠ-প্রান্তর উজাড় করে কাতারে কাতারে মেয়েরা বুক চিতিয়ে হাঁটছে কলকাতার রাস্তায়। অনভ্যস্ত কণ্ঠে মুষ্টিবদ্ধ হাতে চিৎকার করে স্লোগান দিচ্ছে আগে কোনও দিন কোনও মিছিলে না হাঁটা কোনও গৃহবধূ। কে নেই সেখানে! অশীতিপর বৃদ্ধা, দশ মাসের শিশুকোলে তরুণী মা, চা-শ্রমিক, আদিবাসী মহিলা, কলেজের অধ্যাপিকা, ডাক্তার, নার্স– সমাজের বিভিন্ন অংশের মেয়েরা। আসলে প্রদীপের ঘষাটা সামান্য, মহিলাদের আহ্বানটা হয়তো সাধারণ, কিন্তু নারীর মনে দীর্ঘদিন ধরে জমাট বাঁধা ক্ষতটা বেশ গভীর। তার অসহ্য যন্ত্রণায় টনটন করছে নারীর শরীর-মন। চিৎকার করে সে ফেটে পড়তে চাইছে। তার সেই আকুল আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পাহাড় থেকে সাগর– এ রাজ্যের, এ দেশের সর্বত্র। তারই স্রোতধারা ১৬ ডিসেম্বর আছড়ে পড়ল রাজধানীর রাজপথে।

কলকাতার বেলেঘাটা বিল্ডিং মোড় থেকে এসেছিলেন কাকলি গাঙ্গুলী। বললেন, অনেক রাগ ক্ষোভ যন্ত্রণা থেকে মিছিলে এসেছি। জানি এক দিনে কিছু হবে না, তবে একদিন নিশ্চয়ই হবে। তত দিন প্রতিবাদ জারি রাখতে হবে। জয়নগর থেকে এসেছিলেন এক প্রবীণ মহিলা। হাঁটতে বেশ কষ্টই হচ্ছিল তাঁর। জিজ্ঞেস করতে বললেন, ভাল কিছু করতে গেলে একটু কষ্ট তো করতেই হবে। পুরুলিয়ার রঘুনাথপুরের ষাটোর্ধ্ব মীনা বাউড়ি পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে, পরিজনদের অমত সত্তে্বও এসেছেন। ঠিক কোনখানে আঁচড় পড়লে এমন করে সব ফেলে বেরিয়ে পড়তে পারেন একজন মানুষ!

অযোধ্যা পাহাড়ের সামনে নুনিয়া গ্রাম থেকে এসেছিলেন শিবানী মাহাতো। কেন এসেছেন জিজ্ঞাসা করায় নিজের ভাষায় বললেন, মেয়েদের উপর অত্যাচার, ঘরে ঘরে অশান্তি বন্ধ হওয়া দরকার। আমরা আমাদের ও আশেপাশের গ্রামে মদের ভাটিগুলো সব ভেঙে ফেলেছি। সব জায়গায় অমানুষ তৈরির চেষ্টা চলছে। তা বন্ধ করা দরকার, তাই এসেছি কলকাতায়। ৯ ডিসেম্বর অঙ্গীকার যাত্রা শুরুর দিন থেকে পথ হাঁটছেন নদিয়ার এক প্রবীণ নারী। বললেন, ‘পরিশ্রমকে আমাদের পরিশ্রম বলে মনেই হয়নি। উৎসবে মানুষের যে আনন্দ হয় হাঁটতে হাঁটতে আমাদের তেমনই আনন্দ হয়েছে। তবে উৎসবের আনন্দ একদিন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের এ তৃপ্তি কোনও দিন ম্লান হবে না। আমরা জোটবদ্ধ হয়েছি। আমাদের আনন্দ দুঃখ মিলে গেছে। জলপাইগুড়ির তরুণী কমলিকা বলছিলেন, ‘আমরা মেয়েরা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে সাধারণত একজোট হতে পারি না। ‘জাগো নারী, জাগো বহ্নিশিখা’-র আহ্বানে অঙ্গীকার যাত্রায় তা পারলাম। অনুভব করলাম আমরা যত বেরবো তত শক্তিশালী হব।

এক কলেজ-অধ্যাপিকা ১৫ ডিসেম্বর রাতে কলকাতায় এসেছেন মিছিলে অংশগ্রহণ করবেন বলেই। বললেন, ‘এই অভুতপূর্ব জাগরণে আমি আশান্বিত’। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে মু* দৃষ্টিতে মানুষ দেখছেন, ফ্রেমবন্দি করছেন মিছিলকে। এমনকি কতর্ব্যরত পুলিশ-কর্মীদেরও সপ্রশংস দৃষ্টি দেখেছি, কর্তব্যের বাইরে বেরিয়ে ছুবি তুলতে দেখেছি তাঁদেরও। বিভিন্ন মুহূর্তের অসংখ্য অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার তৈরি হয়েছে অঙ্গীকার যাত্রার প্রস্তুতিপর্ব থেকে এ পর্যন্ত।

অঙ্গীকার পদযাত্রা দেখে অভিভূত কৃষiরনগরের এক গৃহবধু পর দিন অঙ্গীকার যাত্রীদের থামিয়ে পুষ্পস্তবক দিয়ে সংবর্ধনা জানিয়েছেন। অঙ্গীকার যাত্রা কড়া নেড়েছে সমাজের সুপ্ত চেতনার দ্বারে। তাই এ প্রাণের টান, তাই এ আবেগের উদ্ভাস। অঙ্গীকার যাত্রার সমাপনী অনুষ্ঠানে বারবার উচ্চারিত হয়েছে এ কথা– এ আসলে সমাপন নয়, অঙ্গীকার যাত্রার শুরু নতুন মাত্রায়। জাগরণের এই পথে নারী ও পুরুষের মিলিত সংগ্রামে আগামী দিনে আসবে এক নতুন ভোর– যে ভোরে নারী, পুরুষ সমান মর্যাদায় এগোবে সমাজ অগ্রগতির প্রয়োজনে। অঙ্গীকার যাত্রা তেমনই এক প্রত্যয় জাগিয়ে দিয়ে গেল।