অনেকে বলেন, বৈজ্ঞানিক হিসেবে গবেষণা এবং শিক্ষাদানই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার নেই। আমরা এর উত্তরে বলতে চাই, বিজ্ঞানের প্রতি আমাদের যে ভালোবাসা, তার উৎস মানবিকতা। সেই মানবিকতার গুরুত্বপূর্ণ দিক জীবনের কল্যাণসাধন ও সুস্থতা। আমাদের মানবিকতা বিক্রয়ের পণ্য নয়। আমরা যদি দিনের পর দিন চুপ করে থাকি, সেটা মানুষ হিসাবে নিজেদের দায়িত্বকে ফাঁকি দেওয়া হবে। বুদ্ধিজীবী হিসাবে জ্ঞানজগতকে রক্ষার যে দায় আমাদের ওপর বর্তায়, তাকেও অবমাননা করা হবে। কথাগুলো লিখেছেন অধ্যাপক মধুসূদন রামন এবং অদিতি দুদেজা (৪ সেপ্টেম্বর, স্ক্রোল.ইন প্রকাশিত)। আগস্ট মাসে মুম্বইতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের (International Olympiad of Astronomy and Astrophysics) শেষে যে বিজ্ঞানীরা আগামী বছরের অলিম্পিয়াড থেকে ইজরায়েলকে বহিষ্কার করার দাবি জানিয়ে চিঠি দেন, তাঁদের মধ্যে মধুসূদন এবং অদিতিও ছিলেন, ছিলেন প্রথিতযশা পদার্থবিদ অশোক সেন সহ পাঁচশোর বেশি বিজ্ঞানী।
অলিম্পিয়াডের সভাপতির উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরিত এই দাবিপত্রের বক্তব্য ইজরায়েল রাষ্ট্র বছরের পর বছর গাজা ভূখণ্ডকে অবরুদ্ধ করে নারকীয় আক্রমণ চালাচ্ছে। এ পর্যন্ত ষাট হাজারের বেশি প্যালেস্টাইনের নাগরিক মারা গেছেন, যার একটা বিরাট অংশ শিশু। আহত, অসুস্থ মানুষের জন্য বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা ত্রাণ এবং সাহায্য আটকে দিয়ে, শরণার্থী শিবির-হাসপাতাল-খাদ্যের গাড়ির উপর বোমা ফেলে, একের পর এক স্কুল-কলেজ ধ্বংস করে নজিরবিহীন বর্বরতার পরিচয় দিয়ে চলেছে ইজরায়েল। কোনও মানবাধিকার আইন, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনের পরোয়া তারা করছে না। এই পরিস্থিতিতে জ্যোতির্বিজ্ঞানের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে ইজরায়েলকে বহিষ্কার করা হোক। কিন্তু ইজরায়েলের সাধারণ ছাত্ররা যাতে ব্যক্তি হিসাবে তাদের শিক্ষকের সাথে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে, সেটাও বিজ্ঞানীদের চিঠিতে ছিল। এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে অলিম্পিয়াডের পরিচালক বোর্ড এই দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়। ২০২৬ এর অলিম্পিয়াড থেকে রাষ্ট্র হিসেবে ইজরায়েলকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
প্রতিবাদী বিজ্ঞানীরা স্বভাবতই এই পদক্ষেপকে তাঁদের নৈতিক জয় হিসেবে দেখছেন। অন্য দিকে, শাসক দলের অনুগামী কিছু বিজ্ঞানী তাঁদের নিন্দায় সরব হয়ে, এমনকি শাস্তি দাবি করে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন। সেখানে এই বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে রাজনীতি করা এবং দেশকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলার অভিযোগ এনেছেন তারা। এর উত্তরে মধুসূদন সহ অন্যান্যরা বলেছেন, গাজাবাসীর ওপর পাশবিক নির্যাতনের সামনে ভারতের ধারাবাহিক নিষ্ক্রিয়তা, নিরাসক্ত মনোভাব, পরোক্ষে ইজরায়েলকে সমর্থন জুগিয়ে এসেছে এবং এগুলি দেশ হিসাবে গোটা বিশ্বের সামনে ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। বরং বিজ্ঞানীরা প্রতিবাদ করে এই নীরবতার কলঙ্ক দূর করতে সচেষ্ট হয়েছেন। এই একটি প্রতিবাদে ইজরায়েল পিছু হটবে, এমনটা তাঁরা মনে করছেন না, কিন্তু প্রতিবাদ তারা চালিয়ে যাবেন। দেশের এবং বিদেশের বিজ্ঞানী মহলকেও এই প্রতিবাদে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা যাতে ইজরায়েলের উপর চাপ তৈরি করা যায়। সম্প্রতি আরেকটি দাবিপত্রে গোটা বিশ্বের প্রায় ৪৫০০ বিজ্ঞানী এই ধ্বংসলীলা অবিলম্বে বন্ধ করার আবেদন জানিয়েছেন, যার মধ্যে আছেন ১৪ জন নোবেল পুরস্কারজয়ী। গাজার পরিস্থিতিকে তাঁরা বর্ণনা করেছেন মানুষের তৈরি করা মানবিক বিপর্যয় হিসেবে।
গাজার নিরীহ জনসাধারণের ওপর মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ট ইজরায়েল যে হত্যালীলা চালাচ্ছে, নিন্দার কোনও ভাষাই তার জন্য যথেষ্ট নয়। গোটা বিশ্বের সমস্ত গণতন্ত্রপ্রিয়, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ এঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছেন। এ রকম একটা সংকটের মুহূর্তে ভারতের এবং অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের এই প্রতিবাদ যেমন গভীর আশা জাগায়, তেমনই ইতিহাস থেকে শেখার বার্তাও দিয়ে যায়। অজস্র বিজ্ঞানীর মেধা, প্রতিভা, অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল পারমাণবিক শক্তি একদিন সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার হাতে মারণাস্ত্র হয়ে হিরোশিমা-নাগাসাকির লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষের জীবন নিয়েছিল।
সেই ভয়ানক মারণযজ্ঞের সামনে দাঁড়িয়ে বহু বিজ্ঞানী অসহায়ের মতো অনুভব করেছিলেন, রাষ্টে্রর হাতে তারা পুতুল বনে গেছেন। তাঁদের আবিষ্কার যত মূল্যবানই হোক, তা মানুষের কল্যাণে লাগবে নাকি সমাজ-সভ্যতাকে ধ্বংস করবে, তা ঠিক করার কানাকড়ি ক্ষমতাও বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। আবার আইনস্টাইন, মেরি কুরি, আমাদের দেশে সত্যেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাদ সাহার মতো মহান মানবতাবাদী বিজ্ঞানীরা নিজেদের শুধু গবেষণাগারের চৌহদ্দিতে আটকে রাখেননি, সাধ্যানুযায়ী সম্পৃক্ত থেকেছেন সমাজ-রাজনীতি-ঘটমান বিশ্বের সাথে, প্রতিবাদ জানিয়েছেন, ভূমিকা নিয়েছেন সমাজপ্রগতির পক্ষে।
আজকের সংকটদীর্ণ পৃথিবীও দাঁড়িয়ে বারুদের স্তূপের ওপর। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-অধ্যাপক-বিজ্ঞানী যেই হোন না কেন, তিনি নীরব থেকে যুদ্ধবাজ শাসকের পক্ষ নেবেন, নাকি সংগ্রামী মানুষের প্রতিরোধের পাশে সোচ্চারে দাঁড়াবেন, ঠিক করতে হবে তাঁকেই।