Breaking News

আসামে সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ করে সেই জমি দেওয়া হচ্ছে পুঁজিপতিদের

বুলডোজার রাজনীতিতে আসামের হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার উত্তরপ্রদেশের যোগী আদিত্যনাথকেও ছাপিয়ে গেছে। যোগী আদিত্যনাথ উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতায় আসার পরই যেমনটা দুষ্কৃতীদের দমন করার নামে বুলডোজার চালিয়ে নিরপরাধ, সংখ্যালঘু মানুষের ঘর-বাড়ি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, তার থেকেও একধাপ চড়া বুলডোজার নীতি গ্রহণ করে চলেছে আসাম সরকার। তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিশানা করে ব্যাপক উচ্ছেদ চালাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেছেন, একটা বিশেষ সম্প্রদায়ের হাত থেকে জমি কেড়ে আনতে তার সরকার দিনরাত কাজ করছে। গত ২৪ জুন আবার সাংবাদিকদের সামনে বলেন, একজন নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি যে ভাবে নেশার প্রতি আসক্ত, তেমন তিনিও ওই বিশেষ সম্প্রদায়ের হাত থেকে জমি কেড়ে আনতে আসক্ত। আর ওই কেড়ে আনা জমি অসমীয়াভাষী মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হবে বলে হুঙ্কার দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচিত একটা সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর এমন বিদ্বেষ ভাষণ একদিকে যেমন অত্যন্ত বিপজ্জনক, অন্য দিকে মিথ্যাশ্রয়ীও বটে। কারণ, ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর উচ্ছেদের বুলডোজার চালিয়ে জমি দখলমুক্ত করা হলেও সেই জমি কিন্তু সাধারণ অসমীয়া জনগণের জন্য জোটেনি। দেওয়া হয়েছে বিপুল পুঁজির মালিক রামদেব, বেদান্ত, আদানি-আম্বানিদের।

অন্যান্য পুঁজিবাদী সরকারগুলির মতো আসাম সরকারও রাজ্যের জনসাধারণের জীবনের মৌলিক সমস্যাগুলি যেমন মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ইত্যাদির সুরাহা করতে পারেনি। সে জন্য অত্যন্ত চতুরভাবে উচ্ছেদের দ্বারা বিভাজনবাদী রাজনীতিকে সামনে আনতে চাইছে। ক্ষমতায় বসার কিছুদিন পরই দরং জেলার গরুখুঁটিতে এগ্রি ফার্ম করার কথা বলে কয়েক হাজার একর ভূমিতে উচ্ছেদ চালিয়ে কয়েক হাজার সংখ্যালঘু মানুষকে একেবারে নিঃস্ব করে দেওয়া হয়েছে। আজও এদের মাথা গোঁজার ঠাঁই পর্যন্ত হয়নি। তাঁরা আত্মীয়-স্বজনের আশ্রয়ে অথবা যাযাবরী জীবন যাপন করছেন। তারপর থেকে সরকার স্বদম্ভে একটার পর একটা উচ্ছেদ চালিয়ে যাচ্ছে। উচ্ছেদ চালানো হয়েছে কাজিরাঙা, পাভ বনাঞ্চল (উত্তর লখিমপুর), সত্রকরা (বাঘবর), বুঢ়াচাপরি (শোণিতপুর), ধিং (নগাঁও), হোজাই বনাঞ্চল, মরিগাঁও অঞ্চলের কয়েক হাজার একর ভূমিতে।

ফলে হাজার হাজার গরিব মানুষ আশ্রয় এবং সহায় সম্বল হারিয়ে পথের ভিখারিতে পরিণত হয়েছেন। এই তালিকায় সম্প্রতি সংযোজিত হয়েছে গোয়ালপাড়ার হাসিলাবিল, ধুবুড়ীর বিলাসীপাড়া, নলবাড়ীর বরক্ষেত্রী এবং লখিমপুরের রাংচালি, দেবেরাদলনি। এ ছাড়া উচ্ছেদের আতঙ্কেদিন কাটাচ্ছেন গোয়ালপাড়ার পুরো একটা পঞ্চায়েত, রাখসিনী এবং ধুবুড়ী জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ। এই সমস্ত অঞ্চলেই গরিব মানুষ ৫০/৬০ বছর ধরে বসবাস করছেন। এঁদের ঘরে সরকারের দেওয়া বিদ্যুৎ সংযোগ আছে, আছে রেশন কার্ড, সরকারি স্কুল জল-জীবন স্কিম। অনেকেই সরকারি ঘরও পেয়েছেন। অথচ এদেরই কোথাও বেদখলকারী, কোথাও অবৈধ বাংলাদেশি তকমা দিয়ে কোনও বিকল্প ব্যবস্থা না করেই দেশের সংবিধান, উচ্ছেদ সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের গাইডলাইন এবং মানবাধিকার কমিশনের সমস্ত নীতি নির্দেশকে দু-পায়ে মাড়িয়ে অমানবিক ভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তাও আবার বিনা নোটিসে বা মাত্র একদিনের নোটিসে। সমরসজ্জায় সজ্জিত শয়ে শয়ে পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনীর দ্বারা রীতিমতো ত্রাস সৃষ্টি করে চালানো হয়েছে উচ্ছেদ। এ সব উচ্ছেদকাজ এতটাই অমানবিক, এতটাই হৃদয়বিদারক যে, সেই দৃশ্য চোখে দেখাটাও দুঃস্বপ্ন! চোখের পলকে বুলডোজারের ঘায়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে গরিব মানুষের একটার পর একটা বাড়ি। অসহায় শিশু থেকে বৃদ্ধ -বৃদ্ধা, নারী-পুরুষের কাতর আর্তনাদ! তাঁদের চোখের জল রাষ্ট্র ও সরকারকে একটাই প্রশ্ন করে চলেছে, কী তাঁদের অপরাধ, কেন তাঁরা খোলা আকাশের তলায়? এদের প্রতি সরকারের কি কোনও দায়িত্ব নেই?

যে সরকার, যে রাষ্ট্র অন্যায় ভাবে ওই শিশুদের সবকিছু কেড়ে নিল, ভবিষ্যতে তাদের থেকে কেমন দেশপ্রেম আশা করবেন রাষ্ট্রকর্তারা? স্বাভাবিক ভাবেই এঁদের বুকে প্রতিশোধের আগুন জ্বলবেই। কোনও সভ্য সমাজের পক্ষেই এটা শুভ নয়। রাষ্ট্রকে শাসক শ্রেণির স্বার্থে সাধারণ মানুষের বিরোধী কোনও কাজ করতে গেলে সব সময়ই কোনও না কোনও মিথ্যা গল্প বুনতে হয়। অর্থাৎ মিথ্যা অজুহাত খাড়া করতে হয়। আসামে এই যে হাজার হাজার সহায়-সম্বলহীন মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা হচ্ছে সেখানেও সরকারকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছে। এই হাজার হাজার মানুষ নাকি অবৈধ বাংলাদেশি জবরদখলকারী! অথচ প্রকৃত সত্যটা হচ্ছে, এঁরা ভারতের বৈধ নাগরিক। এঁরা ৫০/৬০/৭০ বছর ধরে এসব এলাকায় বসবাস করে আসছে। এঁদের বেশিরভাগই নদী ভাঙনের শিকার। নদীভাঙন আসামের অত্যন্ত জ্বলন্ত ও দীর্ঘস্থায়ী এক সমস্যা। ১৯৫০ সালের আগে থেকেই প্রতি বছর হাজার হাজার বিঘা ভূমি নদীগর্ভে চলে যায়। বিগত ৭০ বছরে ব্রহ্মপুত্র এবং তার উপনদীগুলির গর্ভে বিলীন হয়েছে ৪ লাখ ২৭ হাজার হেক্টর বা ৪২৭০ বর্গ কিলোমিটার ভূমি যা বর্তমান আসামের মোট জমির ৭.৪ শতাংশ। এর মধ্যে যেমন কৃষিভূমি ছিল, তেমনি ছিল বহু গ্রাম, বসতি, হাটবাজার। বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে প্রায় পনেরোশোর বেশি গ্রামের কোনও অস্তিত্ব নেই। এইসব গ্রামের হাজার হাজার মানুষ তা হলে গেলেন কোথায়? এই মানুষরাই সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে এখানে সেখানে যে যেমন ভাবে পারেন আশ্রয় নিয়েছেন। এঁরা নানা চাষবাসের সাথে সাথে দিনমজুরি, শহরে এসে ঠেলা, রিক্সা চালিয়ে কোনও রকমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী শক্তির চাপে আসামের সব সরকারই এদের অবৈধ বাংলাদেশি সাজিয়ে নির্মম অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন হল, উচ্ছেদ প্রশ্নে বিজেপি সরকার এতটা অমানবিক, এতটা আগ্রাসী কেন? কেনই বা একটা বিশেষ সম্প্রদায়ই শুধু টার্গেট? আসলে বিজেপি সরকার এক ঢিলে দুই পাখি শিকার করতে চাইছে। একটা হচ্ছে, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এই মানুষগুলোকে উচ্ছেদ করে উগ্র প্রাদেশিকতাবাদী শক্তিকে আশ্বস্ত করা এবং এর মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, মুসলিম বিদ্বেষ সৃষ্টি করে সংখ্যাগুরু ভোটের পালে হাওয়া তুলে ২০২৬-এর নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়া। এটা সর্বজনবিদিত যে গত ৫০ বছর ধরে আসামের রাজ্য রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে এবং হচ্ছে তথাকথিত এই বাংলাদেশি ইস্যুতে। কংগ্রেস ৪০ বছর এই ইস্যুকে জিইয়ে রেখেছে। এখন বিজেপি ঘরে ফসল তুলছে। বিজেপি দেখাতে চাইছে, কংগ্রেস ৪০ বছরে যা করেনি, এই তথাকথিত ‘বাংলাদেশি মিঞা’দের কোমর ভেঙে দিয়ে তারা নাকি ভূমিপুত্রদের ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষিত করছে!

অন্য দিকে, উচ্ছেদ করার পর এই হাজার হাজার বিঘা জমি রামদেব, আম্বানি, আদানিকে দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে রাজ্যের বিজেপি সরকার আদানি গোষ্ঠীর সাথে কয়েকটা চুক্তিও করে রেখেছে। কোকরাঝাড়ের পর্বতঝোরায় প্রায় ৩ হাজার বিঘা ভূমিতে আদানি বিদ্যুৎ প্রকল্প করবে। ইতিমধ্যে রামদেব এবং বেদান্ত গোষ্ঠীকে কয়েক হাজার বিঘা জমি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকার ভূমিহীন গরিব মানুষকে মাথা গোঁজার জন্য এক টুকরো ভূমি দিতে পারে না, অথচ মানুষকে মেরেধরে উচ্ছেদ করে জমি উদ্ধার করে সেই জমি পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দিচ্ছে। একমাত্র জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ আন্দোলনই পুঁজিপতিশ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী সরকারের এই অন্যায়কে রুখে দিতে পারে।