Breaking News

ভোটারদের ঘাড়ে নাগরিকত্ব প্রমাণের দায় বিহারে, ঘুরপথে এন আর সি-র চেষ্টা বিজেপি সরকারের

ফাইল ফটো

মাত্র ২৫ দিনের মধ্যে বিহারের প্রায় ৮ কোটি ভোটারের বিশেষ এবং নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সেরে ফেলার মতো একটি অবাস্তব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। যে কমিশনের প্রধান ক’দিন আগেই গর্ব করে বলেছেন, ‘এটা নতুন নির্বাচন কমিশন’। স্মরণে আসে সাম্প্রতিক কালে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিজেপির একেবারে ছোটখাটো নেতাদের ‘এটা নতুন ভারত’ এই লব্জটি। দুই লেব্জের গভীর মিল। বর্তমান সময়ে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের প্রক্রিয়াটাই সরকারের কুক্ষিগত হয়েছে। ফলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা সামগ্রিকভাবেই আজ প্রশ্নের মুখে। তার ওপর বিজেপির ভাষাতেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের এই উক্তি সেই প্রশ্নকেই আরও জোরদার করে। এই পরিস্থিতিতে বিহারে ভোটের মাত্র দুই তিন মাস আগে এমন নিবিড় সংশোধন নিয়ে প্রশ্ন না উঠে পারে না।

 কেন প্রশ্ন উঠছে? বিহারে নির্বাচন কমিশন বলেছে ভোটার তালিকায় নাম থাকতে গেলে ১৯৮৭-র আগে জন্মানো ভোটারদের জন্মস্থানের ও জন্ম তারিখের প্রমাণপত্র, ১৯৮৭ থেকে ২০০৪-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত জন্ম হলে নিজের ছাড়াও বাবা অথবা মায়ের জন্মের স্থান ও তারিখের প্রমাণপত্র আর তার পরে যারা জন্মেছে তাদের জন্য নিজের এই প্রমাণপত্রের সাথে বাবা মা উভয়েরই জন্মের একই ধরনের প্রমাণ লাগবে। এ ক্ষেত্রে আধারকার্ড, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, ১০০ দিনের কাজের জবকার্ড, রেশন কার্ড, সরকারি ব্যাঙ্কের পাশবই ইত্যাদি সহজলভ্য কোনও নথিই গ্রহণযোগ্য নয়। একমাত্র ১১টি নথি যা নির্বাচন কমিশন বলে দিয়েছে তা দিতে পারলে ভোটার তালিকায় নাম থাকবে, না হলে বাতিল। ইতিমধ্যেই এই বিশেষ সংশোধনীর ফর্ম নিয়ে বুথ লেভেল অফিসাররা বাড়ি যেতে শুরু করতেই বিহারের গ্রামে-গঞ্জে প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়েছে। বিশেষত দলিত, আদিবাসী, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরাট অংশের নাম এর ফলে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ দরিদ্র মানুষ, পরিযায়ী শ্রমিক ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর পক্ষে এই নথিগুলি দেওয়া কার্যত অসম্ভব। তাঁরা যে সরকারি অফিস বা কোর্টে দৌড়ে কাগজ জোগাড় করবেন সে সময়ও নেই। ভোটদানের মতো একটা প্রাথমিক নাগরিক অধিকার নিয়েও বিরাট সংখ্যক মানুষকে অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করানোই কি তা হলে উদ্দেশ্য!

প্রবল প্রতিবাদের সামনে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশন আপাতত শুধু ফর্ম জমা দিলেও তা জমা নিয়ে নিতে বলেছে বিএলওদের। কিন্তু পরেও এইসব নথি দিতে না পারলে কী হবে তা নিয়ে কিছু বলেনি। বিহারে বিজেপির গদি এমনিতেই এখন নড়বড়ে। তাদের জোট সরকারের বিরুদ্ধে জনমানসে ক্ষোভ ব্যাপক। গদি বাঁচাতে এখন তারা বিহারে ‘ব্যাপক অনুপ্রবেশ’ ও ‘ভোটার তালিকা বিদেশিতে ভরে যাওয়া’র মতো মনগড়া অভিযোগ তুলে হইচই তুলছে। অভিযোগ উঠছে, এই কারণেই কেন্দ্রীয় শাসক দলের বকলমে নির্বাচন কমিশন এখন ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাড়াহুড়ো করে বিরাট সংখ্যক মানুষের নাম ছোটখাটো অজুহাতেও বাদ দিতে। কারণ, বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বেশ বড় অংশকে ভোটার তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলতে পারলে বিজেপির অভিযোগকে মান্যতা দেওয়া যাবে। অন্যদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট বিজেপির বিরুদ্ধে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, ফলে তাদের সংখ্যা কমাতে পারলে আসন্ন নির্বাচনে বিজেপির গদি রক্ষার একটা চেষ্টা করা যাবে। একই সাথে বিজেপি জানে হিন্দু সম্প্রদায়েরও গরিব মানুষ নথি দিতে না পেরে দিশাহারা হয়ে শাসকদলের দরজাতেই ছুটবে, তাতে শাসক দলের সাথে থাকলে বাঁচিয়ে দেওয়ার টোপ দিয়ে তাদের ভোট কেনা যাবে। বিজেপি জোটের গদি রক্ষার তাগিদে এই ছকেই মানুষের নাগরিকত্বের মতো বিষয় ধরে টান দিতে চেয়েছে বিজেপি।

শুধু বিহারে নয় সারা ভারতেই এই ধরনের বিশেষ সংশোধনের পরিকল্পনা আছে নির্বাচন কমিশনের। এর সাহায্যে ঘুরপথে এনআরসি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাই চলছে বলে সারা ভারত জুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠছে। দেশের মানুষের নাগরিকত্ব প্রমাণের দায়টা এতদিন ছিল সরকারের। কারা নাগরিক আর কারা নাগরিক নয় তার সমস্ত কাগজ সরকারের কাছেই আছে। এখন সে দায় চাপানো হচ্ছে সাধারণ নাগরিকের ওপর! তারা কোথায় এত কাগজ পাবে? এমনকি বিগত তিনটি লোকসভা নির্বাচনে যাদের ভোট পেয়ে নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রীর সিংহাসন পেয়েছেন, তাঁদেরও নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রমাণের দায়টা তাঁদের ঘাড়েই চাপিয়ে দেওয়া হল। মনে রাখা দরকার এই বিজেপি সরকারই ২০২১-এর বকেয়া জনগণনা আজও করে উঠতে পারেনি। তারা এখন এত তাড়াতাড়ি সারা দেশে নাগরিকত্বের প্রমাণ সহ ভোটার তালিকা করে ফেলবে? সুপ্রিম কোর্টের সামনেও এডিআর-এর মতো সংগঠন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে– এর ফলে সংখ্যালঘু, আদিবাসী, চিরাচরিত বনবাসী, পরিযায়ী শ্রমিক সহ প্রায় ৩ কোটি মানুষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাবেন। পরিযায়ী শ্রমিকরা বছরের দীর্ঘ সময় নিজের ভিটেমাটি থেকে দূরে থাকেন। বিএলওরা তাঁদের খোঁজ পাবেন না। সরকার বলে দিয়েছে অনলাইনে ফরম পূরণ করে দিতে। এই দেশের দরিদ্র মানুষের কতজন অনলাইন ব্যবস্থা ব্যবহার করে এই কাজ করতে পারবেন? ফলে তাঁদের পড়তে হবে দালালের খপ্পরে। এ ছাড়াও বিজেপির অ্যাজেন্ডা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন বলছে– পরিযায়ী শ্রমিকরা যে এলাকায় কাজে যাবেন সেই এলাকারই ভোটার হবেন। এখন এমনিতেই রাজ্যে রাজ্যে বাংলাভাষী বিশেষত ধম¹য় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শ্রমিকদের বাংলাদেশী বলে দাগিয়ে দেওয়ার হিড়িক তুলছে বিজেপি। এরপর তাঁদের ওই রাজ্যে বসে নাগরিকত্ব প্রমাণ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। অন্যদের ক্ষেত্রেও ভিন রাজ্যে শাসকদলের সাথে না থাকলে কাজ রক্ষাই হয়ে পড়বে অসম্ভব, ফলে তাঁরা শাসকদলের হাতে কার্যত বন্দি হবেন।

আধার কার্ড নিয়ে বিজেপি সরকার এতদিন হইচই করেছে। এখন ব্যাঙ্ক থেকে রেশন দোকান এমনকি হাসপাতাল বা শ্মশানেও আধার কার্ডই ভরসা। এমনকি সুপ্রিম কোর্টে দাঁড়িয়ে সবেতে আধার যোগের পক্ষে বিজেপি সরকার জোরালো সওয়াল করেছে। আধারকেই তারা ‘ইউনিক আইডি’ বলেছিল। সেই আধার কার্ড ভোটে পরিচয় প্রমাণে অকেজো? গরিব মানুষের হাতে সবচেয়ে বেশি থাকে জবকার্ড, তাও বাতিল? সরকারের যুক্তি আধার কার্ড, জবকার্ড নিয়ে দুন¹তি হয়, কিছু ক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে অবৈধদের আধার পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে। তাই আধারকে গ্রহণ করা যাবে না। আধার নিয়ে দুর্নীতি হলে, তার দায় কার? সাধারণ নাগরিকের, নাকি সরকারের? পুরনো ভোটারদের সচিত্র এপিক কেন প্রমাণ হিসাবে গ্রাহ্য হবে না? নির্বাচন কমিশন তো সব যাচাই করেই তা দিয়েছে। সেখানে গাফিলতির দায় তো সাধারণ ভোটারের হতে পারে না। কমিশন এবং সরকারের অপদার্থতার দায় নাগরিকের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে কেন?

কেন নির্বাচন কমিশনের বকলমে বিজেপি সরকার এই পরিকল্পনা নিল? তারা এখন দেশ জুড়ে একটা আতঙ্কের পরিবেশ চাইছে। সাধারণ মানুষ আজ বিজেপি সরকারের অপশাসনে চাকরি, শিক্ষা, অধিকারের দাবিতে ক্ষোভে ফেটে পড়তে চাইছে। তাদের ধোঁকা দিতে বিজেপি সরকারের পরিকল্পনা মানুষের সমস্যার সম্পূর্ণ দায়টা চাপিয়ে দেওয়া ‘অনুপ্রবেশকারী’দের ওপর। কিন্তু বাস্তবে এত অনুপ্রবেশকারী তারা পাবে কোথায়? তাই ভিনরাজ্যের মানুষ, সমস্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, অন্য রাজ্যে প্রবাসী বাংলাভাষী জনগণ তাদের সকলের বিরুদ্ধে নানা রাজ্যে একটা অবিশ্বাসের বাতাবরণ ছড়িয়ে দিয়ে তাদের ‘অনুপ্রবেশ’ তত্ত্বকে সঠিক প্রমাণ করতে চাইছে। পশ্চিমবঙ্গে যে কোনও সংখ্যালঘুকেই বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া তাদের মতলব। এতে খেটে খাওয়া মানুষ তার বহু প্রতিবেশীকে শত্রু ভেবে নিয়ে তার বিরুদ্ধে লড়বে। ঠিক এই কারণেই এনআরসি চালুর অপচেষ্টা সারা দেশে করেছে বিজেপি সরকার। দেশজোড়া প্রতিবাদের সামনে তারা পিছিয়ে গেলেও আবার পিছনের দরজা দিয়ে তা চালুর চেষ্টা এই পথেই শুরু করা হচ্ছে বলে মানুষের আশঙ্কা। আসামে এনআরসি নিয়ে কী সাংঘাতিক সাম্প্রদায়িক ও বৈরিতার বাতাবরণ বিজেপি তৈরি করেছে সে অভিজ্ঞতা মানুষের আছে। বিজেপির আশা, এই কাজটা করতে পারলে শাসকদল হিসেবে তারা পুঁজিপতি শ্রেণির সেবাদাসের ভূমিকাটা ঠিক ঠিক পালন করতে পারবে। পুঁজিপতি শ্রেণি অবাধে তার শোষণের রাজত্ব চালিয়ে যেতে পারবে। বিজেপির ওপর তাদের আশীর্বাদও বজায় থাকবে। অনুপ্রবেশকারীদের ধরা এবং সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করার দায়টা যে কেন্দ্রীয় সরকারের, সেই বিষয়টাই গুলিয়ে দিয়ে এক অংশের নাগরিককে অপর অংশকে সন্দেহের চোখে দেখাতে অভ্যস্ত করে তোলা হবে। এই কারণেই ভোটার তালিকায় নাম তোলার মতো একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে এত জটিল করে তুলছে নির্বাচন কমিশন। অথচ নির্বাচন কমিশন বলতে পারেনি মহারাষ্টে্র নির্দিষ্ট কয়েকটি কেন্দ্রে কী করে ঠিক গত বিধানসভা ভোটের আগে ব্যাপক সংখ্যায় ভোটার বেড়ে গেল? বলতে পারেনি কোন জাদুতে গত লোকসভা নির্বাচনে কিছু কেন্দ্রে ভোট শেষ হয়ে যাওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা বাদে হঠাৎ ভোটদাতার সংখ্যা বিপুল হারে বেড়ে যেতে পারল? বিহারে তড়িঘড়ি এই বিশেষ সংশোধনীর নির্দেশের বিরুদ্ধে রাজ্যের প্রধান নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে এস ইউ সি আই (সি) দাবি করেছে, ভোট দেওয়া সমস্ত নাগরিকের অধিকার। তা নিশ্চিত করার দায় নির্বাচন কমিশন ও সরকারকেই নিতে হবে এবং এই বিশেষ অভিযান অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।