Breaking News

সমাজের অর্ধেক আকাশের মুক্তি আজও বহু দূর

ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ সিনেমার শেষে সর্বংসহা বটগাছের মতো দৃঢ় মেয়েটি, নীতা যার নাম, যার জীবনের সার্থকতা যেন সকলের জন্য নিজেকে একটু একটু করে নিভিয়ে ফেলার মধ্যেই, দাদার সামনে নিজের শেষ বাঁধনটুকু আলগা করে ফেলে ডুকরে কেঁদে উঠেছিল– ‘‘দাদা আমি বাঁচতে চাই’’। সেলুলয়েডের সেই অমর দৃশ্যায়নের পর ৮৫ বছর ধরে ভারতবর্ষে এই বিতর্ক চলছেই যে নীতারা কি বাঁচল? এ দেশ কি নীতাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারল? টিভির পর্দা থেকে সংসদে নারী সুরক্ষা ও স্বাধীনতা বহুচর্চিত বিষয়। সাম্যের ভোরের অভিযাত্রীরা সূর্যের আলোর প্রথম রেখাটুকু থেকে এখনও কত দূরে? প্রশ্ন অনেক।

বৈষম্যের অর্থনীতি ও সুরক্ষার অভাব

পরিসংখ্যান বলছে, মেয়েদের একটা অংশ আগের তুলনায় অনেকটাই স্বাবলম্বী হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে যোগদান বেড়েছে। ২০২২ সালে দেশের কর্মক্ষম মহিলাদের ৩৩.৯ শতাংশ কর্মরত ছিলেন। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে। গ্রাম্য মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ৩৭.৫ শতাংশ থেকে ৪৫.৯ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে। এই পরিসংখ্যান আশাপ্রদ হলেও কর্মক্ষেত্রের পরিস্থিতি একেবারেই আলাদা। ২০১৯ সালে মহারাষ্ট্রের বিদ জেলায় এ যাবৎ ৩০ হাজার মহিলা শ্রমিক অপারেশন করিয়ে জরায়ু কেটে বাদ দিয়েছেন– এমন একটি রিপোর্ট মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে পেশ করা হয়। জানা যায়, মাসের সাত দিন পিরিয়ড চললে তাঁরা কাজ করতে পারেন না, তাই এমন সিদ্ধান্ত। অভাবের সংসারে গ্রাসাচ্ছাদন ভিন্ন বাকি সবকিছু এমনকি স্বাস্থ্য, মানবাধিকার নেহাতই বিলাসিতা। নীতি আয়োগের রিপোর্ট বলছে, প্রতি ১০০০ ছেলের বিপরীতে মাত্র ৯২৯ মেয়ে জন্মায়। বেসরকারি ক্ষেত্রে গ্রামে একজন পুরুষ শ্রমিক দিনে ৪৩৫ টাকা পান। মহিলারা পান মাত্র ৩০৫ টাকা। ফারাক প্রায় ৩০ শতাংশ। শহরাঞ্চলে পুরুষরা পান দিনে ৫৫২ টাকা মজুরি। সেখানে মহিলারা পান মাত্র ৩৬৩ টাকা। মহিলারা দিনে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা মজুরিবিহীন শ্রম করেন। ২০২৫ সালে পাওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী, শহরের তরুণ ও তরুণীদের মধ্যে বেকারত্বের হার যথাক্রমে ১৮.৯ শতাংশ এবং ১১.৮ শতাংশ। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা ২০১৯-‘২১ অনুযায়ী, ভারতে ১৮-৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ নারী জীবনে অন্তত একবার স্বামীর দ্বারা শারীরিক, মানসিক বা যৌন হিংসার শিকার হয়েছেন। ভারতে কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা রোধে আইন রয়েছে। বাস্তবে দেখা যায়, বহু প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি নেই। অভিযোগ করলে চাকরি হারানোর ভয় থাকে। বিশেষত অসংগঠিত ক্ষেত্রে সুরক্ষা প্রায় অনুপস্থিত।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক বিড়ম্বনা

দেশ জুড়ে আজাদি কা অমৃত মহোৎসব বা বিশ্ববাংলার চোখ ধাঁধানো আতিশয্যে নারী নিরাপত্তা রীতিমতো শেষের সারিতে চলে গেছে। দেশের হৃৎপিণ্ডে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে চলা নির্ভয়া থেকে অভয়া, কাঠুয়া থেকে হাথরাস হত্যাকাণ্ড আদতেই হিমশৈলের চূড়ামাত্র। ২০২২ সালে ভারতে ৩১,৬৭৭টি ধর্ষণের মামলা নথিভুক্ত হয়েছিল। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ৮৭টি ধর্ষণ। প্রতি ঘণ্টায় ৪টি ধর্ষণ। অপরিচিত রাস্তার আততায়ীদের থেকে কোনও দিক থেকেই পিছিয়ে নেই মেয়েদের পরিচিত মানুষজনেরা। এই জাতীয় ঘটনায় প্রায়শই একটা কুতর্ক ওঠে। সরকার পক্ষের লোকজন বলার চেষ্টা করেন, প্রশাসন কি সবসময় পাহারা দেবে? মেয়েরা সাবধান হবে না কেন? নির্যাতনের দায় নির্যাতিতার উপরেই চাপিয়ে দিয়ে সামাজিক রাজনৈতিক দায় থেকে মুক্ত হওয়ার এ এক নির্লজ্জ প্রচেষ্টা। যাকে প্রায় ধূলিসাৎ করে দিয়ে জাতীয় পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ২০২২ সালে ধর্ষণ মামলায় শাস্তির হার ছিল প্রায় ২৫-২৮ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি ৪টি মামলার মধ্যে প্রায় ৩টিতে দোষীদের শাস্তি হয়নি। ২০২২ সালে প্রায় ৭৪ শতাংশ মামলায় অভিযুক্ত খালাস হয়ে গেছে। যার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অভিযুক্তের প্রভাবশালী যোগ। উত্তরপ্রদেশের বিজেপি বিধায়ক কুলদীপ সেঙ্গারের তত্ত্বাবধানে নির্যাতিতা এবং তার পরিবারের উপরে বীভৎস আক্রমণ আমরা ভুলে যাইনি। যেমন ভুলে যাইনি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ধর্ষণের অভিযুক্তরা ছাড়া পেলে তাদের রীতিমতো সংবর্ধনা দিয়ে মিছিল করার কুৎসিত দৃষ্টান্তগুলি। ধর্ষণের ঘটনার পরে পশ্চিমবঙ্গের ভূতপূর্ব তৃণমূল সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর ‘ছোট ঘটনা’, ‘কেন ওখানে গিয়েছিল’?– ইত্যাদি মন্তব্য থেকে সম্প্রতি অভয়া কাণ্ডে প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের বাঁচানোর মরিয়া প্রচেষ্টা, আন্দোলনকারীদের উপরে নেওয়া প্রতিশোধ, দলীয় রাজনীতির গোলকধাঁধায় কলকাতা পুলিশ-সিবিআই কেউই এখনও ন্যায়বিচার দেয়নি– এও জনমানসে কাঁটার মত বিঁধে রয়েছে।

মুক্তি কোন পথে?

নারী স্বাধীনতা কোনও দয়ার দান নয়। এটি একটি নাগরিক অধিকার। সমাজের মনন না পাল্টালে নারী কখনওই স্বাধীন হতে পারে না। কোনও আইন, কোনও কড়া শাস্তি, কোনও সংরক্ষণ, কোনও ভাতার রাজত্ব নিশ্চিত করতে পারে না আমাদের সহনাগরিক মেয়েরা বাড়ি বা রাস্তা বা কর্মস্থলে সুরক্ষায়, সম অধিকারে, সম মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হবেন কি না। তা অনেকটাই নিশ্চিত করতে পারে একমাত্র সামাজিক আন্দোলন। একের পর এক আন্দোলনের ধাক্কায় এই ঘুণধরা সমাজের চৈতন্য জাগে। জীবনে মূল্যবোধ আসে। পুরুষের বিবেক উদয় হয়। সরকার-প্রশাসন নড়াচড়া করতে বাধ্য হয়। সুরক্ষিত হয় নারী। উনিশের শতকের শেষ দিকে ফ্রান্সের সাফ্রাজেটে শুরু হওয়া নারীমুক্তি আন্দোলন নারীর ভোটাধিকার ছিনিয়ে আনতে পেরেছিল পথে নেমে আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে। আজকের অভয়া আন্দোলনও যতটা অধিকার ছিনিয়ে আনতে পেরেছে তাও আন্দোলনের রেশ ধরেই, শুধু সেমিনারের আলোচনা দিয়ে নয়, নারী স্বাধীনতার নামে চরমতম ব্যক্তিবাদ, ভোগবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে নয়। বরং সামাজিক আন্দোলনের সাথে জুড়ে থেকে বর্তমান সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মধ্যেই রয়েছে নারীমুক্তির প্রকৃত দিশা। ক্ষমতাশ্রয়ী রাজনীতি যত দিন না মূল্যবোধের রাজনীতিতে পরিণত হচ্ছে, তত দিন সাম্যের ভোর অলীক স্বপ্নমাত্র। এই সমাজের ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ এমন সব মানুষ তৈরি করছে, যারা আলোর নিচে দাঁড়িয়েও অন্ধকারকে প্রশ্রয় দিয়ে চলেছে। সেই সব বাঁধন মুক্ত হয়ে একজন নারী একদিন ক্ষুদ্রতার গণ্ডি পেরিয়ে এ বিশ্বের সার্বজনীন হয়ে বলতে পেরেছিলেন, ‘তোমাদের গলিকে আর আমি ভয় করি নে। আমার সমুখে আজ নীল সমুদ্র, আমার মাথার উপরে আষাঢ়ের মেঘপুঞ্জ’। রবীন্দ্রনাথের ‘স্ত্রীর পত্রে’ আমরা তাকে মৃণাল, এক সম্ভ্রান্ত বাড়ির মেজবউ বলে চিনেছি।