সন্দেশখালির দায় সরকার ও শাসকদলের মুখ্যমন্ত্রীকে খোলা চিঠি

বহু টালবাহানার পর সন্দেশখালির তৃণমূল নেতা সেখ শাহজাহানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। যাকে গ্রেফতারের দাবি নিয়ে সারা রাজ্য তোলপাড়, তেমন একজন অভিযুক্তকে ধরতে পুলিশের এত সময় লাগল কেন, সে উত্তর এ রাজ্যের যে কোনও মানুষের জানা। খোদ মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে যাকে ক্লিনচিট দেন, তার টিকি ছুঁতে গেলে সরকারের কোন স্তরের সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার জন্য পুলিশকে বসে থাকতে হয়, তা কারও না বোঝার কথা নয়।

এসইউসিআই(সি)-রপশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক কমরেড চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য ২৭ ফেব্রুয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে পাঠানো চিঠিতে এই কারণেই প্রশ্ন তুলেছেন– কী করে তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র বলে দিতে পারলেন, ‘সাত দিনের মধ্যে শাহজাহান গ্রেপ্তার হবেন’! চিঠিতে তিনি বলেন, রেশন দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি সহ নানা ধরনের দুর্নীতিতে শাসকদলের নেতাদের পুরোপুরি যুক্ত থাকার অভিযোগ যত গভীরতর হচ্ছে, ততই সেই সব দুর্নীতিতে অভিযুক্তের তালিকা দীর্ঘতর হচ্ছে। রেশন দুর্নীতির পাশাপাশি গরিব মানুষের জমি দখল করা, জমি লিজ নিয়ে মাছের ভেড়ি তৈরি করে লিজের টাকা না দেওয়া, জোর করে গ্রামবাসীদের শাসক দলের মিছিলে যেতে বাধ্য করা, এমনকি মহিলাদের উপর চরম নির্যাতনের কাহিনীও ক্রমাগত প্রকাশ্যে আসছে। এতদিন পর্যন্ত দুষ্কৃতীদের ভয়ে সন্ত্রস্ত গ্রামবাসীরা মুখ খুলতে না পারলেও আজ তারা প্রকাশ্যে ক্ষোভে ফেটে পড়ছে। মানবাধিকার সংগঠন সহ বিভিন্ন সংস্থা সন্দেশখালিতে সরেজমিন তদন্তে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের সুপরিকল্পিতভাবে বাধা দিয়েছে। পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা দূরের কথা, উল্টে গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছে, বিক্ষোভ আটকাতে বলপ্রয়োগ করছে। এমনকি সাংবাদিকদেরও বাধা দেওয়া হচ্ছে, গ্রেফতারও করা হচ্ছে।

চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য বলেন, তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে সরকারি ক্ষমতায় আসার পর অতি দ্রুত এই অভিযুক্তদের সম্পদ বেড়েছে এবং তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তাদের দুষ্কর্ম এবং অপরাধমূলক কাজও বেড়েছে। ক্ষমতায় আসার আগে মুখ্যমন্ত্রী সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে পূর্ববর্তী সিপিএম সরকারের আমলের মতোই দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব চলছে। সন্দেশখালির ঘটনা সিপিএম আমলের উত্তর ২৪ পরগণার সুটিয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগণার মৈপীঠ, পশ্চিম মেদিনীপুরের লালগড় ও নেতাই প্রভৃতি এলাকায় সরকারি প্রশ্রয়ে দুষ্কৃতীদের ভয়াবহ সন্ত্রাসের বীভৎসতাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। সরকারের ও শাসক দলের প্রধান হিসাবে মুখ্যমন্ত্রী এর দায়িত্ব কোনওভাবেই অস্বীকার করতে পারেন না।

সন্দেশখালির ঘটনা দেখিয়ে দিল, পুলিশকে কতটা পরিমাণে দলদাসে পরিণত করলে তাদের কর্তব্য এ ভাবে শাসকদল নির্ধারণ করে দেয়! জানা যাচ্ছে রাজ্যের মন্ত্রীরা নাকি এখন সন্দেশখালিতে ঘুরে ঘুরে মানুষের অভিযোগের প্রতিকার করার চেষ্টা করছেন। তাঁরা কারও কাছে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন অন্যায় ভাবে নেওয়া টাকা ফিরিয়ে দেবেন। কারও কাছে বলে আসছেন, কেড়ে নেওয়া জমি ফিরিয়ে দেবেন। পুলিশ গ্রামে ক্যাম্প করছে মহিলাদের অভিযোগ নথিভুক্ত করতে। পুলিশের বড়কর্তারা ছুটছেন অভিযোগ শুনতে। এখন যে নেতারা, মন্ত্রীরা, প্রশাসনিক কর্তারা ছুটে যেতে বাধ্য হলেন, তার জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য এলাকার জনসাধারণ বিশেষত মহিলাদের। তাঁদের বিক্ষোভ ফেটে পড়ার পরেই পুরো বিষয়টা সামনে আসতে পেরেছে।

কিন্তু সেই মহিলাদের আজও ভয়ে মুখ ঢেকে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে হচ্ছে। অথচ যে সব নেতাদের টিভির সাজানো তর্কের আসর থেকে শুরু করে ক্যামেরার সামনে তর্জন গর্জন লম্ফঝম্প করতে দেখা যাচ্ছে তাঁরা এই মহিলাদের দৈনন্দিন লড়াই নিয়ে আদৌ চিন্তিত নন। তাঁদের চিন্তা এই ক্ষোভকে ইভিএম পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখার পথ নিয়ে। আর শাসকদলের চিন্তা, ভোট যেন হাতছাড়া না হয়। অন্য দিকে সংবাদমাধ্যমেই দেখা যাচ্ছে আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা মহিলারাও আশঙ্কায় ভুগছেন– সব থিতিয়ে গেলে অন্য কোনও শাহজাহান, শিবু হাজরা, উত্তম সরদাররা যে দেখা দেবে না, অন্য কোনও ঝাণ্ডার রূপ ধরে তাদের পৃষ্ঠপোষকরা অবতীর্ণ হবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়?

সন্দেশখালির মানুষের অভিজ্ঞতা কিন্তু তাই বলে। ১৯৮০-৯০-এর দশকের সন্দেশখালির খবর যাঁরা রাখেন তাঁরা অক্লেশেই মনে করতে পারেন সেখ শাহজাহান সহ তাঁর বেশিরভাগ সাকরেদের রাজনৈতিক পূর্বাশ্রমকে। এরা সর্বদাই শাসকদলের ‘সম্পদ’ হিসাবে কাজ করে চলে। সরকারি গদিতে বসা দলের সাইনবোর্ডটা পাল্টে গেলেই এরাও রঙ বদলে ফেলে, সারা দেশের মতো সন্দেশখালির সাধারণ মানুষও সে সত্য হাড়ে হাড়ে জানে। কংগ্রেস আমলে শাহজাহানদের পূর্বসূরীরা ছিল কংগ্রেস নেতা ও জোতদার জমিদারদের লেঠেল বাহিনীর মাথা। সিপিএম আমলে তারা গ্রামের আসল নিয়ন্ত্রক, পঞ্চায়েতের কর্তা। তখন থেকেই নদীর বাঁধ কেটে চাষের জমিতে নোনা জল ঢুকিয়ে ভেড়ি বানানোর কারবারের রমরমা শুরু। তাতে টাকাও বেশি, তাই দুষ্কৃতীবাহিনীর লোভও এক্ষেত্রে বেশি।

গোটা সুন্দরবন জুড়েই এই পথে নদী মরেছে, মরেছে চাষজমি, মরেছে পরিবেশ, একই সাথে মরেছে ছোট চাষি, খেতমজুরের দল। ফুলে ফেঁপে উঠেছে দুষ্কৃতীগোষ্ঠী। ভেড়ির দখল রাখতে অবাধে অস্ত্র সরবরাহও করেছে শাসকদলই। এর বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদ হলেই কীভাবে শায়েস্তা করতে হয় তা এই বাহিনী ভালই শিখেছে। কেউ প্রতিবাদ করলেই জমিতে মজুর বন্ধ, পাড়ার টিউবওয়েলে জল নেওয়া পর্যন্ত বন্ধ করার ফরমান তো ছিলই, তার সাথে যুক্ত হয়েছে জমি দখল। দরকারে খুন করতেও এদের আটকায় না। কালে কালে তাদের হাত পৌঁছেছে এলাকার মেয়েদের গায়ে। কখনও মাথা তুলতে চাওয়া পরিবারকে চাপ দিতে, কখনও আরও জঘন্য উদ্দেশ্যে চলেছে নারীর সম্ভ্রমহানি। দারিদ্রের সুযোগে নারী পাচার চক্রের সাথে দুষ্কৃতীদের যোগসাজশও বেড়েছে। শাসকদলের পায়ের তলায় মানুষকে রাখার জন্য চাপ দেওয়ার নানা পথ তারা আবিষ্কার করেছে। এমনকি এলাকার কোনও ছেলে-মেয়ে দূরে কোথাও পড়তে গিয়ে অন্য রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়েছে খবর পেলেই তাদের পরিবারের উপর এই ধরনের অত্যাচার সন্দেশখালিতে কারা করত তা সিপিএম নেতারা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি! তৃণমূল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারে বসে এই বাহিনীকেই নিজের সম্পদে পরিণত করেছে শুধু তাই নয়, তাদের আরও বেপরোয়া হয়ে উঠতে দিয়েছে। যার পরিণতি আজকের সন্দেশখালি।

 এসইউসিআই (সি)-র বসিরহাট সাংগঠনিক জেলা কমিটির সম্পাদক কমরেড অজয় বাইন সহ দলের কর্মীরা সন্দেশখালি থানায় মহিলাদের প্রথম দিনের বিক্ষোভের সময় থেকেই তাঁদের পাশে থেকেছেন। সাথে সাথে তাঁরা এলাকার মানুষের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, এই আন্দোলন যাতে স্বতঃস্ফূর্ততাতেই শেষ না হয়ে যায় এবং আন্দোলনকে যাতে স্বার্থাণ্বেষী ভোটবাজরা ব্যবহার করতে না পারে তার জন্য গণকমিটি গড়ে তোলা দরকার। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলন দেখিয়েছে অত্যাচারী শাসকের মাথা নোয়াতে বাধ্য করতে পারে নিপীড়িত মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তি। সেখানে এই শক্তির স্বরূপ গণকমিটি গড়ে তোলার কাজটি নিজেদের জীবন বাজি রেখে শুরু করেছিল এসইউসিআই(সি)-র স্থানীয় নেতা কর্মীরা। কেন গণকমিটি প্রয়োজন? তা না হলে সাধারণ মানুষের এই আন্দোলনকে আত্মসাৎ করতে পারে ধুরন্ধর রাজনৈতিক দলগুলি। সন্দেশখালিতেও এমনটা ঘটার আশঙ্কা আছে। স্থানীয় মহিলাদের লড়াইকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর জন্য টিভি মিডিয়াতে ভোটবাজ নেতাদের যে দৌড়োদৌড়ি দেখা যাচ্ছে তাতে মানুষের কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যেতে পারে এ আশঙ্কা আছেই। শুরু থেকেই এসইউসিআই(সি) সন্দেশখালির আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে। ৬ মার্চ অন্যান্য দাবির সাথে সন্দেশখালির মানুষকে ন্যায়বিচার দেওয়ার দাবিতে রাজ্য জুড়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছে দল।

দলের পক্ষ থেকে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দাবি জানানো হয়েছে গ্রামবাসীদের থেকে দখল করা জমি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ সহ ফিরিয়ে দিতে হবে। মহিলাদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ শোনার জন্য সমস্ত মহিলা সংগঠন ও সমস্ত রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নিয়ে কমিটি গঠন করতে হবে এবং অভিযোগগুলি নিয়ে মামলা দায়ের করতে হবে।