Breaking News

সংযুক্তির নামে ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ জনস্বার্থের ক্ষতি করবে

কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সম্প্রতি যে মন্তব্য করেছেন তাতে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে বেসরকারিকরণে সরকার সংকল্পবদ্ধ। তাঁর মতে, ‘ব্যাঙ্ক রাষ্ট্রায়ত্তকরণ প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। সেগুলি বেসরকারি হাতে গেলে সমাজের সকলকে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা দিয়ে উন্নয়নে শামিল করা যাবে না, এই ধারণাও ভুল’ (আনন্দবাজার পত্রিকা, ৭/১১/২০২৫)।

এখানে যে প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবে সামনে চলে আসে তা হল, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক যদি প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয় বা তার লক্ষ্য পূরণ করতে না পারে তার দায় তো সরকারকেই নিতে হবে। এটা বস্তুত সরকারেরই অক্ষমতা। এই অক্ষমতা দূর করার ব্যাপারে সরকার কী ব্যবস্থা নিয়েছে সেটাই তো সরকারের প্রথম বিবেচনার বিষয় হওয়া উচিত। তা হলে কি ধনকুবেরদের স্বার্থ রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে সরকার এই সব কথা বলে বেড়াচ্ছে?

অর্থমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর যখন শোনা যায় আবারও ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণের মধ্য দিয়ে ১২টির জায়গায় ৩টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক রাখার দিকে সরকার পা বাড়াচ্ছে, এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে এ যাবত যেখানে প্রত্যক্ষ বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ বা এফডিআই-এর সর্বোচ্চ সীমা ছিল ২০ শতাংশ, তা ৪৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে রেখেছে কেন্দ্রীয় অর্থ দপ্তর, তখন বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে দেশি-বিদেশি পুঁজিপতিদের স্বার্থে তাদের আস্থাভাজন হওয়ার আকাঙক্ষায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে বেসরকারি করার জন্য সরকার মরিয়া।

ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণের মধ্য দিয়ে বেসরকারিকরণের পথ প্রশস্ত করার বিষয়টিকে আড়াল করতে সরকার সংযুক্তিকরণের ইতিবাচক কিছু দিক তুলে ধরেছে, তুলে ধরেছে ‘বিকশিত ভারত’-এর ধারণাকে। তাদের মতে অপেক্ষাকৃত বড় ব্যাঙ্ক অনেক শক্তিশালী এবং অপেক্ষাকৃত কার্যকরী, ভারতের এখন প্রয়োজন বড় বিশ্বমানের ব্যাঙ্ক। এতে ব্যাঙ্কের আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে এবং এটা কর্মচারীদের কোনও ভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। কিন্তু ইতিপূর্বে যে সংযুক্তি হয়েছে, তার ফল কী দেখা যাচ্ছে? ২০১৭ সাল এবং তারপরে ২০১৯ এবং ২০২০ সালে যে সংযুক্তি হল তাতে বহু শাখা বন্ধ হয়েছে, গ্রাহক পরিষেবা বিঘ্নিত হয়েছে। ২০১৭ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে মোট শাখার পরিমাণ যেখানে ছিল ৯০,৮২৬, সংযুক্তির পর ২০২১ সালে তা দাঁড়ায় ৮৩,৭২৫টিতে। অর্থাৎ সংযুক্তির মাধ্যমে এই সময়সীমায় ৭,১০১টি শাখা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে ভারতবর্ষে একটি ব্যাঙ্কের শাখা গড়ে প্রায় ৯,০০০ গ্রাহককে পরিষেবা দিচ্ছে। অথচ চিনে এই সংখ্যা ৩,৫০০-র কাছাকাছি এবং সারা পৃথিবীতে গড়ে ৪,২০০-র কাছাকাছি। ২০১৪ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে কর্মচারীর সংখ্যা যেখানে ছিল ৮.৫৭ লক্ষ, ২০২৩ সালে তা দাঁড়ায় ৬.৯৪ লক্ষে। সংযুক্তিকরণের সুবাদে অনুৎপাদক সম্পদ বা এনপিএ-ও কমেনি, বরং বেড়েছে। সংযুক্তিকরণের পর এসবিআই-তে ১৬ শতাংশ, ব্যাঙ্ক অফ বরোদাতে ২৩ শতাংশ এবং পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কে ৩৫ শতাংশ বেড়েছে এনপিএ। এ থেকেই বোঝা যায় সরকার যে উদ্দেশ্যে ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণ করছে বলে জনগণকে আশ্বস্ত করছে, প্রকৃত চিত্র তা থেকে ভিন্ন।

উল্টো দিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে এ যাবত প্রত্যক্ষ বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা ২০ শতাংশ যা ৪৯ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে রেখেছে কেন্দ্রীয় অর্থ দপ্তর। এটা জাতীয়করণের মূল ধারণার উপর এক চরম আঘাত। এখানে সাধারণ মানুষের প্রকৃত চাহিদার জোগানের পরিবর্তে ব্যক্তিগত মুনাফার প্রতি বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে সাধারণ মানুষের যতটুকু নির্ভরতা ছিল এ তার উপর এক ধমকি। এখানে জন-ভিত্তিক ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা যেখানে কৃষি, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্প (এমএসএমই), সমাজের দুর্বলতর অংশ, গ্রামীণ ক্ষেত্রগুলিতে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল, সেই ক্ষেত্রগুলিকেও এটা ক্ষতিগ্রস্ত করবে যা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক ব্যবস্থার ঘোষিত মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। এরই পথ বেয়ে চাকরির অনিশ্চয়তা, আউটসোর্স, কন্ট্রাকচুয়াল কর্মী নিয়োগ বাড়বে যা ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আত্মনির্ভর ভারতের ধারণা এর ফলে মুখ থুবড়ে পড়বে। বলা বাহুল্য, প্রত্যক্ষ বিদেশি পুঁজি বিনিয়োগ কোনও অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, এটা হল জাতীয় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির বেসরকারিকরণ হলে সেগুলির অবস্থা কী হবে তা অতীতের বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির দিকে তাকালে অনেকটা বোঝা যায়। সেই সময় যখন তখন ব্যাঙ্কগুলিতে লালবাতি জ্বলত। ওই সব ব্যাঙ্কের কর্মচারীরা তাদের কাজ হারাত আর গ্রাহকরা হত সর্বস্বান্ত। ইতিহাস বলছে ১৯১৩ সাল থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত এ দেশে ২,১৩২টি ব্যাঙ্ক ডুবে গিয়েছিল।

বর্তমান বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির দিকে তাকালেও তাদের ভবিষ্যৎ অনেকটা আন্দাজ করা যায়। এইচডিএফসি, আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের মতো বেসরকারি ব্যাঙ্কে কর্মচারীদের কোনও ইউনিয়ন নেই। এখানে ইউনিয়ন করার কোনও অধিকার নেই কর্মচারীদের। সে কারণে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার দরজা বন্ধ। ব্যাঙ্কের ভেতরে হাজার একটা দুর্নীতি, অন্যায় ঘটে চলেছে বিনা বাধায়। গত ৫-৬ বছরে আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কে শো-কজ, চার্জশিট, ডোমেস্টিক এনকোয়ারি, সেল্ফ ডিফেন্সের মতো প্রচলিত আইনগুলিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অন্যায় ভাবে কয়েক হাজার কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। ছাঁটাই করা হয়েছে তাদের, যারা ব্যাঙ্কের অনিয়ম, বেনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনও না কোনও ভাবে সরব হয়েছিলেন। সর্বসমক্ষে যাতে এ সব তথ্য না আসে তাই এ নিয়ে স্বীকৃত ট্রেড ইউনিয়নগুলির সঙ্গেও আলোচনায় বসতে তারা নারাজ। সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নেও তারা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির তুলনায় অনেক পিছিয়ে।

বর্তমানে সারা দেশে ব্যাঙ্ক আমানতের মোট পরিমাণ ২২০ লক্ষ কোটি টাকা। এর সিংহভাগ সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ। এর নিয়ন্ত্রক হতে চাইছে এ দেশের ধনকুবের গোষ্ঠী। ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণ সে কারণেই। এই ধনকুবেরদের মধ্যে তারাও আছে যারা ব্যাঙ্ক থেকে মোটা অঙ্কের টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেনি, সরকারি বদান্যতায় তাদের কারও কারও ঋণ মকুবও হয়ে গিয়েছে। বলা বাহুল্য, এখানে শাসক দলের সংকীর্ণ স্বার্থ জড়িত– এমন অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যারা ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে এ ভাবে দুর্বল করছে তারা ব্যাঙ্কের নিয়ন্ত্রক হলে সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিপন্ন হবে।

দেশি-বিদেশি ধনকুবেরদের মুনাফা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে বেসরকারিকরণের যাবতীয় সরকারি প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সজাগ হতে হবে, ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে ব্যাঙ্ক কর্মচারী এবং গ্রাহকদের। প্রতিবাদে এগিয়ে আসতে হবে সাধারণ মানুষকেও।

ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণে লাভ ধনকুবের গোষ্ঠীগুলিরই

এসইউসিআই(সি)-র সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ ১১ নভেম্বর এক বিবৃতিতে বলেন, অল্প কয়েকটি শক্তিশালী ব্যাঙ্ক গড়ে তোলার অজুহাতে বিজেপি পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার ছোট ব্যাঙ্কগুলিকে বড় ব্যাঙ্কের সঙ্গে যুক্ত করার যে পদক্ষেপ নিয়েছে, আমরা তার তীব্র বিরোধিতা করছি। তলিয়ে দেখলে স্পষ্ট হবে যে, এই ধরনের যুক্ত ব্যাঙ্কগুলির শেয়ার বহুজাতিক সংস্থার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বেসরকারি ব্যাঙ্কের হাতে তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে এগুলিকে বেসরকারিকরণ করাই এর গোপন লক্ষ্য। বলা বাহুল্য, ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের এই পদক্ষেপে একচেটিয়া পুঁজিমালিকদেরই লাভ হবে। তারা কর্মী ছাঁটাই করে, বিভিন্ন রকমের চার্জ বাড়িয়ে, জমা টাকায় সুদের হার কমিয়ে এবং ব্যাঙ্কের গ্রামীণ শাখাগুলি বন্ধ করে দিয়ে গরিব মানুষকে পরিষেবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে সর্বোচ্চ মুনাফা লোটার চেষ্টা চালাবে। এ ছাড়াও ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণ ব্যাঙ্কের পুঁজি ও একচেটিয়া পুঁজির মিলন ঘটিয়ে ধনকুবের গোষ্ঠীগুলিকেই শক্তিশালী করবে।

ভারতের সরকারি ব্যাঙ্ক পরিষেবা ধ্বংস করার এই হীন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সমস্ত ব্যাঙ্ক কর্মচারী, গ্রাহক, শ্রমিক সংগঠন ও সামাজিক সংস্থাগুলিকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ ধ্বনিত করার জন্য আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।