শ্রদ্ধেয় নেতা রণজিৎ ধর তোমায় আমরা ভুলব না

 

প্রিয় নেতার মরদেহ নিয়ে কেওড়াতলার উদ্দেশে

১৩ জুন, বিকাল চারটের কিছু পরেই ছড়িয়ে পড়ল দুঃসংবাদ– এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)–এর প্রবীণ পলিটব্যুরো সদস্য কমরেড রণজিৎ ধর আর নেই৷ বিকাল ৪টা নাগাদ তাঁর সুদীর্ঘ বিপ্লবী জীবনের অবসান ঘটেছে৷

বর্ষীয়ান কমরেড রণজিৎ ধর বেশ কিছুদিন ধরেই যে গুরুতর অসুস্থ, তা কমরেডদের জানা ছিল৷ শেষদিকে পরপর কয়েকটি মেডিকেল বুলেটিন জানিয়েও দিয়েছিল, যে কোনও মুহূর্তে আসতে পারে এই বিপ্লবী নেতার জীবন অবসানের সংবাদ৷ তবু শেষ সংবাদটা তীব্র আঘাত দিয়ে গেল দলের সমস্ত স্তরের নেতা–কর্মীদের৷   

কমরেড রণজিৎ ধরের সাথে নানা রাজ্যের নেতা–কর্মীদের ছিল এক গভীর আবেগের সম্পর্ক৷ এই তীব্র আঘাত তাঁদের কাঁদিয়েছে৷ চোখের জলে তাঁরা স্মরণ করেছেন এ যুগের মহান মার্কসবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষাকে,  ‘‘রাজনীতি একটা উচ্চ হৃদয়বৃত্তি৷ বিপ্লবী রাজনীতি তো অনেক উচ্চতর হৃদয়বৃত্তি৷ এ যেমন একদিকে কোমল, আবার এই রাজনীতির মধ্যেই রয়েছে কঠোর বাস্তবতা, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা, কঠোর এবং কঠিন কর্তব্যপরায়ণতা৷ শোকের জন্য আমাদের কাজ বসে থাকতে পারে না৷… এই কর্মনিষ্ঠার মধ্যেই রয়েছে বিপ্লবীর সত্যিকারের কোমল হৃদয়ের পরিচয়৷ সমস্ত সমাজের ব্যথা, বেদনা, মূল্যবোধেরও যথার্থ আঁচড় বিপ্লবীদের মধ্যে এমন করে পড়েছে যে, তারা বদ্ধপরিকর হয়েছে তাদের বিপ্লবের কাজকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য৷ তাই কর্মকে বিপ্লবীরা অবহেলা করে না৷ অত্যন্ত প্রিয়জনের মৃত্যু এবং একটা অত্যন্ত ক্ষতির সময়েও, অত্যন্ত হৃদয়াবেগের একটা ব্যাপার ঘটার সময়েও, তারা কর্মক্ষেত্রে তাদের কর্তব্য ভুলে যেতে পারে না’’ (কমরেড সুবোধ ব্যানার্জী স্মরণে)৷

মৃত্যুসংবাদ আসতেই সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা শহর–গ্রাম–গঞ্জের কয়েক হাজার পার্টি অফিসে রক্তপতাকা অর্ধনমিত করা হল৷ রক্তপতাকা অর্ধনমিত হল কলকাতার ৪৮ লেনিন সরণির কেন্দ্রীয় অফিসেও৷ বিভিন্ন পার্টি অফিসে কমরেড রণজিৎ ধরের ছবি স্থাপন করে তাতে শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন কমরেডরা৷ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করল, তিনদিন সারা দেশের পার্টি অফিসগুলিতে অর্ধনমিত থাকবে রক্তপতাকা৷ দূর–দূরান্তের জেলাগুলি থেকে কর্মী সমর্থকরা যাতে শেষযাত্রায় অংশ নিতে পারেন, তার জন্য কমরেড রণজিৎ ধরের মরদেহ ওইদিন সংরক্ষিত রাখা হল কলকাতার ‘পিস ওয়ার্ল্ড’ সংরক্ষণাগারে৷

১৪ জুন, বিকাল তিনটা নাগাদ মরদেহ আসার কথা কেন্দ্রীয় অফিসে৷ একটু বেলা গড়াতেই দেখা গেল পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলা থেকে এবং বিহার ঝাড়খণ্ড থেকেও নেতা–কর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেছেন৷ বিকাল তিনটার বেশ কিছুটা আগেই কেন্দ্রীয় অফিসের সামনের রাস্তায় উপচে পড়া ভিড়৷ এত মানুষ, কিন্তু বিরাজ করছে এক শোকস্তব্ধ নীরবতা৷ অধীর আগ্রহে তাঁদের অপেক্ষা কখন নিয়ে আসা হবে কমরেড রণজিৎ ধরকে৷ তাঁরা অন্তরের গভীর শ্রদ্ধায় অন্তত একটিবার লাল সেলাম করে বিদায় জানাবেন প্রিয় নেতাকে৷

শেষযাত্রায় কমরেড রণজিৎ ধরের মরদেহের পাশে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ

অবশেষে পোঁছাল শববাহী গাড়ি৷ যে দৃপ্ত পদক্ষেপে কমরেড রণজিৎ ধর ৪৮ লেনিন সরণির এই ঐতিহাসিক অফিসে দলের একেবারে প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই ঢুকতেন, তা আর দেখা যাবে না৷ রক্তপতাকায় মোড়া তাঁর দেহ কাঁধে বহন করে উঁচু প্ল্যাটফরমে শুইয়ে দিলেন দলের কর্মীরা৷ উপস্থিত সকলের বুক মথিত করে উঠছে স্লোগান– আমৃত্যু বিপ্লবী কমরেড রণজিৎ ধর লাল সেলাম৷

প্রথমেই দলের সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ তাঁর দীর্ঘ দিনের সংগ্রামী সাথী এবং প্রিয় ‘দাদা’কে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জানালেন৷ বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (মার্কসবাদী)–র সাধারণ সম্পাদক কমরেড মুবিনুল হায়দার চৌধুরীর পক্ষে মাল্যদান করলেন কমরেড ফকরুদ্দিন কবীর আতিক৷ তারপর একে একে পলিটব্যুরো সদস্য কমরেড মানিক মুখার্জী, কমরেড অসিত ভট্টাচার্য, কমরেড শংকর সাহা, কমরেড গোপাল কুণ্ডু, কমরেড সৌমেন বসুর মাল্যদানের পর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যবৃন্দ শ্রদ্ধা জানালেন৷ মাল্যদান করলেন, পলিটব্যুরো ও কেন্দ্রীয় কমিটির প্রাক্তন সদস্য কমরেড কৃষ্ণ চক্রবর্তী৷ মাল্যদান করলেন সিপিআই রাজ্য কমিটির পক্ষে কমরেডস কল্যাণ ব্যানার্জী এবং তপন গাঙ্গুলি, আরএসপি–র সাধারণ সম্পাদক কমরেড ক্ষিতি গোস্বামী ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড মনোজ ভট্টাচার্য, ফরোয়ার্ড ব্লকের রাজ্য সম্পাদক কমরেড নরেন চ্যাটার্জি, সিপিআই(এমএল) লিবারেশনের পক্ষে কমরেড দিবাকর ভট্টাচার্য, এআইসিসিটিইউ–এর রাজ্য কমিটির পক্ষে কমরেড অশোক সেনগুপ্ত৷ মাল্যদান করলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক দিলীপ চক্রবর্তী৷

তীব্র গরম উপেক্ষা করে দলের বিভিন্ন রাজ্য কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রায় প্রতিটি জেলা থেকে আগত কর্মীরা সুশৃঙ্খলভাবে একে একে মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করার পর শুরু হল সর্বহারার মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষ স্মরণে রচিত সঙ্গীত এবং আন্তর্জাতিক সঙ্গীত৷ উপস্থিত কমরেডদের স্লোগানের মধ্য দিয়ে লাল কাপড়ে মোড়া সুসজ্জিত লরিতে তোলা হল কমরেড রণজিৎ ধরের দেহ৷ হাতে হাতে কমরেডরা ধরেছেন ব্যানার তাতে সেই প্রাণবন্ত মানুষটির উজ্জ্বল মুখ৷ দলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা গাড়িতে উঠে বসলেন শায়িত মরদেহের মাথার কাছে৷ অর্ধনমিত রক্তপতাকার সারি সামনে রেখে শুরু হল শেষযাত্রা৷

সহস্রাধিক মানুষের এই শেষযাত্রা এগিয়ে চলল এসপ্ল্যানেড, ভবানীপুর, হাজরা মোড়, রাসবিহারী মোড় হয়ে কেওড়াতলা শ্মশানের দিকে৷ সুশৃঙ্খল শোকমিছিলে ধ্বনিত হচ্ছে সেই দুটি সঙ্গীত, যা কঠিন বন্ধুর পথ চলতে বা তীব্র শোকের সময়েও এদেশের বিপ্লবী কর্মীদের প্রেরণা জোগায়৷ দক্ষিণ কলকাতার কালীঘাট থেকে ভবানীপুর বিস্তীর্ণ জায়গায় একসময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন কমরেড রণজিৎ ধর৷ সেই এলাকার পাশ দিয়েই এগিয়ে চলল মিছিল৷ মিছিল দেখে দাঁড়িয়ে পড়েছেন বহু সাধারণ মানুষ, শ্রদ্ধা জানিয়েছেন৷ উঠে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন রাস্তার পাশের দোকানদার, হকাররাও৷

মিছিল পৌঁছাল কেওড়াতলা শ্মশানে৷ প্রিয় নেতাকে এবার বিদায় জানাতে হবে৷ ব্যথিত মন, চোখে জল নিয়ে আবেগ মথিত কন্ঠে উঠল স্লোগান– আমৃত্যু বিপ্লবী কমরেড রণজিৎ ধর তোমায় আমরা ভুলিনি, ভুলব না৷ কমরেড প্রভাস ঘোষ সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ লাল সেলাম জানালেন তাঁদের দীর্ঘ সংগ্রামের সাথীকে৷ দু’টি সঙ্গীত আবার ধ্বনিত হল গভীর আবেগ আর শোকের আবহে৷ শেষ হল গান৷ গেট খুলে ধীরে ধীরে আগুনের গ্রাসে ঢুকে যাচ্ছে কমরেড রণজিৎ ধরের মরদেহ৷ কান্নায় গলা বুজে আসছে উপস্থিত নেতা–কর্মীদের, তবু জোর গলায় বলে চলেছেন, তোমায় ভুলব না কমরেড, ভুলতে পারি না৷ শেষযাত্রার পর ঘরে ফেরার পথে সকল কমরেডের মনে অনুরণিত হচ্ছিল এই বার্তাই৷

(গণদাবী : ৭১ বর্ষ ৪৫ সংখ্যা)