
আসাম-মেঘালয় সীমান্তে গারো পাহাড় জেলার অন্তর্গত চিবিনাং বাজারে মেঘালয় পুলিশের গুলিতে দু’জন ব্যক্তি নিহত এবং কয়েক জন আহত হয়েছেন। এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) দলের আসাম রাজ্য কমিটির সম্পাদক কমরেড চন্দ্রলেখা দাস গত এপ্রিল মাসেই একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, ওয়েস্ট গারো হিল ডিস্ট্রিক্ট অটোনমাস কাউন্সিলের শ্যামনগর কেন্দ্রের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্যে গত ৯ মার্চ ফুলবাড়ির প্রাক্তন বিধায়ক যখন মনোনয়নপত্র দাখিল করতে তুরাতে যান, তখন কয়েক জন গারো যুবক তাঁকে এবং তার সমর্থকদের মারধর করে। তারপর সেখান থেকে তিনি এবং তার সমর্থকরা ফিরে গিয়ে চিবিনাং বাজারে একটি সভা করেন। গুজব রটে যায় যে মুসলিমরা আক্রমণ করে গির্জা ভেঙে ফেলেছে। এই উড়ো খবর প্রচারের পর গারো উগ্রপন্থী এবং কিছু গারো যুবক হাতে অস্ত্র নিয়ে চিবিনাং বাজারে গিয়ে পুলিশের সামনে দোকান, বাড়ি-ঘর ইত্যাদি জ্বালিয়ে দেয়। পুলিশ কোনও বাধা দেয়নি। তখনই সেই অঞ্চলের যুবকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং তারা দলবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামলে গারো পাহাড় জেলার পুলিশ গুলি চালিয়ে দু’জনকে হত্যা করে এবং বহু লোক আহত হয়। আক্রমণকারীদের কোনও রকম বাধা না দিয়ে এবং প্রতিবাদকারীদের গুলি করে হত্যা করার ঘটনায় সাধারণ মানুষ স্তম্ভিত হয়ে যায়। পরে আদেশ জারি করে প্রস্তাবিত স্বায়ত্বশাসিত জেলা পরিষদ নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়।
উল্লেখ্য যে, পশ্চিম গারো পাহাড় জেলার শ্যামনগর ও বালারভিটা কেন্দ্র দুটি অসংরক্ষিত ছিল। যদিও এইবার জেলা পরিষদে কেবলমাত্র গারো সম্প্রদায়ের মানুষেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন বলে নির্দেশ জারি করেছিল। অথচ এই কেন্দ্র দুটির যথাক্রমে ৮০ শতাংশ, ৭০ শতাংশ মানুষ অ-গারো সম্প্রদায়ের। এই ঘটনা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং এ ব্যাপারে বিজেপি-আরএসএস এর সক্রিয় ভূমিকা আছে বলে অঞ্চলের মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস। কারণ চিবিনাং বাজার ও অন্যান্য পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আগুন লাগানোর আগে হিন্দু মানুষের ঘর ও দোকানগুলোতে গেরুয়া পতাকা দিয়ে চিহ্নিত করা এবং গারো সম্প্রদায়ের ঘরে ‘আচিক’ বলে লিখে রেখে আক্রমণ থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। কেবল তাই নয়, গত ১২ মার্চ মেঘালয়ের বিজেপি দলের সভাপতি মেঘালয়ের রাজ্যপালকে একটি স্মারকপত্র দিয়ে দাবি করেন যে গারো হিল অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিলের একটি বিশেষ অধিবেশন ডেকে তাতে কোনও অ-জনজাতি লোক কোনও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না বলে এক প্রস্তাব পাশ করতে হবে। আসামে বিজেপি পরিচালিত সরকারের গারো সম্প্রদায়ের ডেপুটি স্পিকারও দাবি করেছিলেন, গারো পাহাড়ের সমতল অঞ্চলে থাকা মুসলিমরা বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী, তাই তাঁদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার বা ভূমির (মাটি) অধিকার দেওয়ার দরকার নেই। এটা উল্লেখ্য যে, গারো পাহাড় জেলার সমতল অঞ্চল দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই উত্তরের অংশ গৌরীপুরের জমিদারের অধীন এবং দক্ষিণাংশ কড়াইবাড়ির জমিদারের অধীন ছিল। তখন থেকেই এই অঞ্চলসমূহ অ-জনজাতি, প্রধানত মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল ছিল। মেঘালয় রাজ্য সৃষ্টি হওয়ার পর এই অঞ্চল আসামের সঙ্গে রাখার জন্যে দাবি উত্থাপন হয়েছিল। তখন মেঘালয়ের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী তাদেরকে বহু সুযোগ-সুবিধা প্রদান, সকল প্রকার গণতান্ত্রিক অধিকার, ভূমির অধিকার সহ সকল অধিকার সুরক্ষিত করা হবে এবং দশটির মতো বিধানসভা কেন্দ্র ও স্বায়িত্বশাসিত জেলা পরিষদে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের শান্ত করেছিল। পরবর্তী সময়ে ১০টা থেকে ৫টা কেন্দ্র অ-জনজাতিদের জন্য নির্ধারণ করার প্রতিবাদ করার ফলে মহেন্দ্রগঞ্জের অজনজাতি বিধায়ককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।
চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক বিজেপি মেঘালয়ের গারো যুবকদের একাংশকে প্ররোচিত করে যুগ যুগ ধরে সমতল অঞ্চলে বসবাস করে আসা মুসলিমদের গণতান্ত্রিক এবং নাগরিক অধিকারসমূহ কেড়ে নেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এর ফলে সমগ্র অঞ্চলে এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি গারো, রাভা, বড়ো, মুসলিম সহ সকল সম্প্রদায়ের শোষিত সাধারণ মানুষের স্বার্থ এক এবং অভিন্ন। পুঁজিপতি শ্রেণি ও তাদের স্বার্থরক্ষাকারী দলগুলো গরিব-মেহনতি সাধারণ মানুষ যাতে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে তার জন্যে ‘ভাগ কর এবং শাসন কর’ (ডিভাইড অ্যান্ড রুল) নীতিতে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের অনৈক্যর চিন্তা ঢুকিয়ে দেওয়ার ফলেই এই ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে।
এ কথা মনে রাখতে হবে যে, সাম্প্রদায়িকতার প্রতিষেধক সাম্প্রদায়িকতা নয়। সাম্প্রদায়িকতার প্রতিষেধক হচ্ছে গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ গড়ে তোলা। আমরা সরকারের কাছে এই কথাগুলো ভেবে দেখতে বলছি যে, সাধারণ মানুষের জীবন এবং সম্পত্তি রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন উপায় থাকা সত্ত্বেও শান্তি বজায় রাখার চেষ্টা না করে নির্বিচারে গুলি চালনার নীতি স্থায়ী শান্তি সম্প্রীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টি করে। প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলি চালনার আমরা তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং দাবি করছি যে, নিহত ও আহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান, আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা, গৃহহারাদের যথাযথভাবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ও সাম্প্রদায়িক শান্তি সম্প্রীতি রক্ষার জন্যে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক। এই নিরপরাধ জনসাধারণের জীবন ও সম্পত্তি ধ্বংস করার অপরাধে লিপ্ত দুষ্কৃতীদের শনাক্ত করে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। সেইসাথে আমরা জাতি-ধর্ম-ভাষা-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনসাধারণকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে শান্তি সম্প্রীতি রক্ষা করতে সর্বতোভাবে চেষ্টা করার জন্যে আহ্বান জানাচ্ছি।