
৭ জুন মাঝরাতে যাদবপুর স্টেশন সংলগ্ন রেলের জমিতে হকার সহ বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করতে ব়্যাফ ও পুলিশ বাহিনী বুলডোজার নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের বর্বর আক্রমণে আহত হন বহু মানুষ, বামপন্থী নেতা কর্মী, ছাত্র-যুবরা। রক্তাক্ত অবস্থাতেও তাঁরা বিশাল রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে যথাসাধ্য প্রতিরোধ চালিয়ে যান। পুলিশের আক্রমণে আহত হন অল বেঙ্গল হকার ইউনিয়নের রাজ্য সভাপতি ও এস ইউ সি আই (সি) দলের কলকাতা জেলা কমিটির সদস্য কমরেড শান্তি ঘোষ, এআইডিএসও-র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য অফিস সম্পাদক কমরেড সুমন দাস, হকার নেতা রঞ্জন দাস, ছাত্র নেতা বিবেক সিং, কৌস্তুভ চ্যাটার্জী সহ অন্যান্য বামপন্থী দল ও ট্রেড ইউনিয়নের নেতা কর্মী ও বহু মানুষ।
রাজ্যে নতুন সরকারের বয়স মাত্র এক মাস। অথচ ইতিমধ্যেই জীবিকাচ্যুত রাজ্যের কয়েক লক্ষ হকার পরিবার। একদিকে যখন দেশের বনভূমি, পাহাড়, জল, জমি প্রায় বিনা মূল্যে বড় পুঁজির মালিকদের হাতে তুলে দিচ্ছে বিজেপি সরকার, ঠিক তখনই সরকারি সম্পত্তি দখল মুক্ত করার অজুহাতে এ দেশের ফুটপাথকে হকার মুক্ত করছেন তাঁরা। যার পরিণতিতে রাজ্যে ফুটপাথ ও সমস্ত রেল স্টেশনে চলছে বুলডোজার দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান। ইতিমধ্যেই শিয়ালদহ, দমদম, সোনারপুর স্টেশনে হকারদের ওপর রাতের অন্ধকারে বুলডোজার চলেছে। হাজার হাজার গরিব হকারের চোখের জলের কোনও মূল্য না দিয়ে চলেছে তাঁদের বেঁচে থাকার আশ্রয় ছোট ছোট দোকানগুলি গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজ। সেই একই লক্ষ্যে যাদবপুর স্টেশন ও স্টেশন সংলগ্ন এলাকার কয়েক হাজার হকারকে উচ্ছেদের নোটিস জারি করে রেল কর্তৃপক্ষ। ২ জুন চূড়ান্ত সময় দেওয়া হয়েছিল উচ্ছেদের। সেই মতো প্রায় মধ্য রাতে বুলডোজার সহ বিশাল পুলিশ বাহিনী উচ্ছেদের লক্ষ্যে এলেও দল মত নির্বিশেষে হকার ও বামপন্থী দলের কর্মীদের সম্মিলিত প্রতিবাদের সামনে মাথা নত করে বুলডোজার। লড়াইয়ে সহযোগী হয়ে পাশে দাঁড়ান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী ছাত্রছাত্রীরা। রাতের উচ্ছেদকারীরা ফিরে যায়। আবার প্রমাণিত হয় বিপন্ন জনগণের সংগ্রামী চেতনাই অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করে। উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনের এই পর্বে গরিব হকারদের ধারাবাহিক সংগ্রামের গৌরবময় অধ্যায়ে জয়নগর, বারাসাত, মগরাহাটের পর নতুন করে যুক্ত হয় যাদবপুরের নাম। সৃষ্টি হয় সংগ্রামের নতুন প্রেরণা। প্রমাদ গোনে শাসক। পরের দিন সকাল থেকেই শুরু হয় হুমকি, যাত্রী ও হকারদের সংগ্রামী ঐক্যকে বিভাজিত করার ষড়যন্ত্র। বিজেপি বিধায়ক ও তার অনুগামীরা হুমকি দিতে থাকেন আন্দোলন করলে দায়িত্ব নেবে না সরকার। যদিও গরিব হকারদের ওপর বুলডোজার চালানোয় সমর্থন জোগানো ছাড়া আর কোনও দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন বলে জানা নেই।

৭ জুন সন্ধ্যা থেকেই প্রশাসনিক গা-জোয়ারির লৌহ বুনোটে সাজিয়ে তোলা হয় যাদবপুর স্টেশন চত্বরের একাংশ। রাত বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে পুলিশ। নামানো হয় ব়্যাফ। সে যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র। এই দিনও প্রতিরোধ গড়ে তোলে মানুষ। হকার ও শ্রমজীবী মানুষ এবং যাত্রী সাধারণের সাথে গত দিনের মতোই জড়ো হন সারা বাংলা হকার ইউনিয়ন, এআইইউটিইউসি সহ নানা বামপন্থী সংগঠন ও এস ইউ সি আই (সি) কর্মীরা। শুরু হয় প্রতিবাদ সভা। এআইইউটিইউসির পক্ষ থেকে কমরেড শান্তি ঘোষ বলেন, গরিব মানুষ জেতে লড়াইয়ে। লড়াইয়ের অন্য কোনও বিকল্প নেই। তাই গরিব মানুষকে নীতিভিত্তিক সংগ্রামী বামপন্থী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিরোধ গড়তে হবে। রাত একটা থেকে পুলিশের বিশাল বাহিনী স্টেশন সহ প্রায় তিনশো মিটার এলাকা ঘিরে শুরু করে অত্যাচার। চলে লাঠি। গ্রেপ্তার করা হয় বহু নেতা কর্মীকে। রক্তাক্ত করা হয় প্রতিবাদী মানুষদের।

এই ঘটনায় তীব্র ধিক্কার জানিয়ে দলের পক্ষ থেকে সারা রাজ্যে অসংখ্য প্রতিবাদ সভা ও মিছিল হয় ৮ জুন। বাঘাযতীন থেকে যাদবপুর ৮বি পর্যন্ত ধিক্কার মিছিলে নেতৃত্ব দেন দলের রাজ্য সম্পাদক কমরেড চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। কমরেড চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য বলেন, যাঁরা আন্দোলন চান তাঁদের সংগ্রামী বামপন্থার শক্তি এস ইউ সি আই (সি)-কে সমর্থন করতে হবে।
এআইইউটিইউসি-র পক্ষ থেকে ৮ জুন সারা বাংলা প্রতিবাদ দিবস পালিত হয়। সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক অশোক দাস উচ্ছেদ হওয়া হকার ও বস্তিবাসীদের অবিলম্বে পুনর্বাসনের দাবি জানান। তিনি বলেন, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে কোনও অজুহাতে হকার ও বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করা চলবে না।
যাদবপুরে পুলিশি সন্ত্রাসকে হকার উচ্ছেদের নামে মানবিকতার বুকে সরকারি বুলডোজার বলে অভিহিত করে এর তীব্র নিন্দা করেছে শিল্পী সাংস্কৃতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবী মঞ্চ।
