
তা হলে শুধু ভক্ত হিন্দুদের ভোট টানাই নয়, রামলালাকে সামনে রেখে দেদার লুঠ চালানোটাও ছিল সংঘ পরিবারের অন্যতম লক্ষ্য! অযোধ্যার রামমন্দিরে ভক্তদের দান করা কোটি কোটি টাকা প্রণামী সহ সোনা, রুপো, হিরে, জহরতের মতো মূল্যবান সামগ্রী লুঠের ঘটনা হঠাৎ সামনে এসে যাওয়ায় এই সত্য এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। অনুদান লুঠের এই বিরাট কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পরেও উত্তরপ্রদেশের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ প্রথম দিকে বেশ কিছুদিন মুখ খোলেননি, ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে চেপে দিতে চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীও যথারীতি নীরব ছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে দেশ জুড়ে শোরগোলের তীব্রতা বাড়তে থাকায় উত্তরপ্রদেশ সরকার হঠাৎ সক্রিয় হয়ে রামজন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন চুনোপুঁটিকে গ্রেফতার করে। প্রথমে তিন সদস্যের বিশেষ অনুসন্ধানকারী দল (সিট) গঠন করে, পরে এফআইআর-ও দায়ের করতে বাধ্য হয়। এখন প্রধানমন্ত্রীও সরব হয়ে রামমন্দিরের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথা বলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, যে রামমন্দির রাজনীতিকে পুঁজি করে বিজেপি-রাজনীতির উত্থান ও আবর্তন, অযোধ্যার সেই রামলালা মন্দিরে বছরের পর বছর ধরে চলা দেদার লুঠের কথা উত্তরপ্রদেশের বিজেপি প্রশাসন এবং সেই সূত্র ধরে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের কর্তারা এত দিন জানতেন না– এ কথা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য?
রামমন্দিরে চুরির কথা প্রথম সামনে আসে ৭ জুন। এর পর মন্দিরের যাবতীয় সম্পদের দায়িত্বে থাকা রামমন্দির তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্ট-এর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠতে থাকে। সামনে আসতে থাকে বিপুল সম্পদ নয়ছয়ের নানা ঘটনা। ট্রাস্টে কর্মরত আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ঘনিষ্ঠ বেশ কিছু কর্মীর হঠাৎ বিপুল ধনী হয়ে পড়ার কথাও রাজ্যের মানুষের আলোচনায় উঠে আসে। প্রবল চাপে পড়ে উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সরকার একটি সিট গঠন করে। শেষে অভিযোগ ওঠার ১৮ দিন পরে ট্রাস্ট নিজেই এফআইআর দায়ের করতে বাধ্য হয়। কিন্তু তাতে ট্রাস্টের সম্পাদক, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সহ সভাপতি চম্পত রাই সহ অন্য কর্তাদের নাম বাদ দিয়ে সাধারণ কয়েকজন কর্মচারীর ঘাড়েই দোষ চাপানোর চেষ্টা হয়। জনা আষ্টেক গ্রেফতারও হয়। পরে ট্রাস্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যাওয়ায় চম্পত রাইকে সম্পাদক পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য করা হয়।
আর কয়েক মাস পরেই উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচন। এই অবস্থায় রামমন্দির লুঠের ঘটনায় লজ্জাজনক ভাবে বিজেপির মুখ পুড়ে যাওয়ায় আদিত্যনাথ সরকার সিট তৈরি করতে বাধ্য হয়েছে। যদিও এই অভিযোগও উঠছে যে, এই বিপুল দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত আরএসএস-বিজেপি-ভিএইচপি-র মাথাদের বাঁচাতে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর তৈরি করা সিট ইতিমধ্যেই কলকাঠি নেড়ে রেখেছে। কিছু সাধারণ কর্মচারীকে গ্রেফতার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক বিজেপির পক্ষ থেকে। এখন জানা যাচ্ছে, কয়েক মাস আগে মন্দির কর্তৃপক্ষ চুরির কথা জেনে কয়েকজনের বাড়িতে নিজেরাই তল্লাশি চালিয়ে কিছু সম্পদ উদ্ধার করেছিল। কিন্তু পুলিশে কোনও অভিযোগ দায়ের করেনি। এ থেকেই কর্তৃপক্ষের চুরি চাপা দেওয়ার চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে যায়।
অযোধ্যার রামমন্দিরের ইতিহাস সকলের জানা। পাঁচশো বছরের পুরনো বাবরি মসজিদের তলায় রয়েছে রামলালার জন্মস্থান মন্দির, মসজিদ ধ্বংস করে পুনরুদ্ধার করতে হবে সেই মন্দির– এই দাবিতে গত শতকের শেষের দিকে দেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঢেউ তোলে বিজেপি-আরএসএস। মন্দির রাজনীতি নিয়ে হিন্দুত্ববাদীদের বিভেদের রাজনীতি তুঙ্গে উঠলে ১৯৯২-এর ৬ ডিসেম্বর বিপুল সংখ্যক ‘করসেবক’কে জড়ো করে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ। দেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবল হাওয়া ওঠে। অসংখ্য দাঙ্গায় বিপন্ন হয় সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা। সেই হাওয়ায় ভর করে ভারতীয় রাজনীতির আঙিনায় নিজের শক্তি বাড়িয়ে নেয় বিজেপি। যদিও অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের নিচে রামমন্দিরের অস্তিত্বের বিষয়টি অতি মাত্রায় বিতর্কিত। মন্দিরের অস্তিত্বের পুরাতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক কোনও সত্যতা প্রমাণিত হয়নি। বাবরি মসজিদ-রামমন্দির মামলায় রায় দিতে গিয়ে ২০১৯-এ সুপ্রিম কোর্টও স্বীকার করে, মসজিদ তৈরি করতে গিয়ে মন্দির ধ্বংসের কোনও পুরাতাত্ত্বিক প্রমাণ নেই। তা সত্ত্বেও ‘হিন্দু ভাবাবেগ’-কে স্বীকৃতি দিতে সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণের অনুমতি দেয়।
এরপর প্রবল উৎসাহে দেশ ও বিদেশের ‘রামভক্ত’ মানুষের বিপুল অনুদানে তৈরি হতে থাকে অযোধ্যার রামমন্দির। আসন্ন লোকসভা ভোটে ফয়দা লুটতে নির্মাণ সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই, এমনকি হিন্দুদের ধর্মীয় প্রধান শঙ্করাচার্যদের নিষেধ অগ্রাহ্য করে তড়িঘড়ি ২০২৪-এর ২২ জানুয়ারি বিপুল জাঁকজমক সহকারে রামমন্দির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। রামলালা মূর্তির প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানের মুখ্য যজমান সাজেন তিনি। সেই অনুষ্ঠান দেশ জুড়ে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এত দিনে মুসলমানদের পরাধীনতার হাত থেকে হিন্দুরা স্বাধীন হলেন। স্বভাবতই ধর্মীয় ভাবাবেগে ভেসে গিয়ে দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ ভোট দেয় বিজেপিকে। জনপ্রিয়তায় প্রবল ভাটা সত্ত্বেও এইভাবে কেন্দ্রের গদি সামলান নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু রামমন্দিরের বিপুল লুঠের ঘটনায় স্পষ্ট যে, হিন্দুদের স্বাধীনতার কথা বলে মোদিজি আসলে বিজেপি-আরএসএস-ভিএইচপি নেতাদের লুঠের স্বাধীনতার রাস্তাই খুলে দিয়েছিলেন। কারণ, গত আড়াই বছরেরও বেশি সময় ধরে অযোধ্যার এই লুঠের রাজত্বের খবর রাজ্যের সাধারণ মানুষের জানা থাকলেও উত্তরপ্রদেশের ডবল ইঞ্জিন বিজেপি সরকারের পুলিশ-প্রশাসনের কাছে, কিংবা মুখ্য যজমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বা তাঁর ‘দক্ষ’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে ছিল না, তা হতে পারে না। রামমন্দির-লুঠের ঘটনা সামনে আসার পরেও মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথ যে ভাবে তাকে ষড়যন্ত্র বলে দাগিয়ে দিয়ে আসন্ন বিধানসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে রাজ্যের অর্থনীতি সহ নানা ক্ষেত্রে রামমন্দিরের গুরুত্বের কথা সভায় সভায় প্রচার করেছেন, প্রথমেই এফআইআর না করে অর্থহীন ভাবে সিট তৈরি করেছেন, তাতে স্পষ্ট, চুরি-দুর্নীতি বন্ধ করা নয়, সে সব ধামাচাপা দেওয়াই তাঁর আসল উদ্দেশ্য। দল এবং উত্তরপ্রদেশের দলীয় সরকারের সূত্রে বহু আগেই এই কেলেঙ্কারির খবর মোদিজির কানে নিশ্চিত ভাবে পৌঁছেছে। তা সত্ত্বেও তাঁর এই দীর্ঘ নীরবতা কি এই ইঙ্গিতই দিচ্ছে যে, এই বিপুল টাকা এমএলএ-এমপি কেনাবেচার কাজে লাগাতেই বিজেপি নেতারা ব্যস্ত ছিলেন? দেশজুড়ে এ প্রশ্ন আজ সামনে এসে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, শুধু ২০২৪-এর জানুয়ারির পর থেকে নয়, যখন থেকে রামমন্দির নির্মাণ রাজনীতি শুরু হয়েছে, তখন থেকেই প্রণামী থেকে শুরু করে অযোধ্যায় জমি কেনাবেচা সহ নানা বিষয়ে নানা দুর্নীতির অভিযোগ বার বার উঠে এসেছে। যদিও এ পর্যন্ত কোনওটিরই সঠিক তদন্ত বা বিচার হয়নি। তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেশবাসীর প্রশ্ন– যে রামমন্দির নির্মাণকে পুঁজি করে বিপুল সংখ্যক ধর্মবিশ্বাসী মানুষের ভাবাবেগকে আপনি ভোটের বাক্সে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন, আজ সেই মন্দিরেই এমন লজ্জাজনক পুকুর-চুরির দায়িত্ব আপনি কি অস্বীকার করতে পারেন? নির্বিবাদে এত দিন ধরে এই লুঠ চলল, তবু আপনি চুপ করে থাকলেন কেন, এই প্রশ্নের জবাব তো আপনাকেই দিতে হবে।
ভক্তদের দান লুঠের় এই বিরাট ষড়যন্ত্র থেকে স্পষ্ট, যে পচা-গলা দুর্নীতিগ্রস্ত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থাটি আমাদের দেশে আজ কায়েম রয়েছে, সেই ব্যবস্থার সেবা করবে, তাকে টিকে থাকতে সাহায্য করবে যে রাজনৈতিক দল, সেই দল ও তার নেতারা দুর্নীতিগ্রস্ত হতে বাধ্য। তাই বিজেপি-আরএসএস-ভিএইচপি মুখে ধর্মের যত বড় বড় কথা বলুক, যতই ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিক– ধর্মীয় মূল্যবোধের যে তলানিটুকু আজও প্রকৃত ধর্মবিশ্বাসী মানুুষের মধ্যে রয়ে গেছে, তার ছিটেফোঁটাও আর তাদের মধ্যে নেই। আজ দেশের ধর্মবিশ্বাসী প্রতারিত জনগণ সহ সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকেই এগিয়ে এসে যত শীগগির সম্ভব, ধর্মের নামে জুয়াচুরির এই কর্মকাণ্ডকে ধ্বংস করতে হবে। ধর্মীয় ভাবাবেগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি-আরএসএস-এর এই নোংরা প্রতারণার মুখোশ টেনে ছিঁড়ে দিতে হবে।