
রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়ে এআইডিএসও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির পক্ষ থেকে ১৪ মে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে একটি দাবিপত্র পাঠানো হয়।
সংগঠনের রাজ্য সম্পাদক বিশ্বজিৎ রায় এবং সভাপতি মণিশঙ্কর পট্টনায়ক দাবিপত্রে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাব্যবস্থা আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। কেন্দ্র ও বিগত রাজ্য সরকারের চালু করা নীতিগুলো বাস্তবে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলেছে। দুর্নীতি, স্বজন-পোষণ, উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাব, শিক্ষক শূন্যতা প্রভৃতি আজ রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থাকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। সরকারি স্কুল বন্ধ হওয়া, বিদ্যালয় স্তরে সেমিস্টার প্রথা প্রবর্তন, চার বছরের ডিগ্রি কোর্স, বিপুল পরিমাণে ফি বৃদ্ধি, লক্ষাধিক শূন্যপদ ও সর্বোপরি শিক্ষার সার্বিক বেসরকারিকরণ প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা স্তর পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তিকে ধ্বংস করে চলেছে। গবেষকরা মুক্তভাবে আজ গবেষণার কাজ করতে পারছেন না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকায় গণতান্ত্রিক পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। পূর্বতন শাসকদলের প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্ন মদতেই এরই সাথে ক্রমশ বেড়েছে শিক্ষাঙ্গনে অরাজকতা, ছাত্রী নিগ্রহ ও অসামাজিক কার্যকলাপের ঘটনা।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি ও অগ্রগতির স্বার্থে এআইডিএসও-র দাবি– স্কুল সহ সমস্ত স্তরে সেমিস্টার প্রথা বাতিল করতে হবে। স্কুলস্তরে পাশ-ফেল প্রথা চালু করতে হবে। সমস্ত স্কুলে নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত কম্পোজিট গ্রান্ট বরাদ্দ করতে হবে। স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। উপযুক্ত আর্থিক বরাদ্দ করতে হবে। শিক্ষার সকল ক্ষেত্রে সমস্ত শূন্যপদে দুর্নীতিমুক্ত ভাবে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগ করতে হবে। যোগ্য শিক্ষকদের সম্মানের সঙ্গে স্কুলে ফেরাতে হবে। সমস্ত বন্ধ হওয়া সরকারি স্কুল খোলার পরিকল্পনা রাজ্য সরকারকে করতে হবে। বেসরকারি স্কুলগুলির লাগামছাড়া ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। স্কুলশিক্ষায় ও উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক সিলেবাস তৈরি করতে হবে। উচ্চশিক্ষায় কারিকুলাম অ্যান্ড ক্রেডিট ফ্রেমওয়ার্ক ও চার বছরের ডিগ্রি কোর্স বাতিল করতে হবে। পূর্বতন রাজ্য সরকারের আমলে অনুমোদনপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির পূর্ণাঙ্গ পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ইতিহাস বিকৃতি ও সিলেবাসে সাম্প্রদায়িক-অবৈজ্ঞানিক চিন্তার অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। একতরফা ও আকস্মিক সিলেবাস পরিবর্তন করা যাবে না। শিক্ষক-ছাত্র-অভিভাবক-শিক্ষাবিদদের মতামত আহ্বান করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানভিত্তিক সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে। উচ্চশিক্ষার প্রাণসত্তা হরণকারী এইচইসিআই (হেকি) বিল প্রত্যাহার করতে হবে। গবেষণার ক্ষেত্রকে সার্বিক ভাবে দুর্নীতি মুক্ত করতে হবে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। এনআরএফ-এর মাধ্যমে গবেষণা ক্ষেত্রের কেন্দ্রিকরণ করা চলবে না। র্যাগিং ও থ্রেট কালচার রুখে দিয়ে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। অবিলম্বে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক ভাবে এ রাজ্যে ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘোষণা করতে হবে। নিট-পিজি জিরো পার্সেন্টাইল পলিসি বাতিল করতে হবে। কারিগরি শিক্ষার পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে সরকারি উদ্যোগে কলেজ গড়ে তুলতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি কলেজগুলির ফি নির্দিষ্ট করতে হবে। পাঠক্রম শেষে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যাম্পাসিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে। আইন প্রতিষ্ঠানগুলিকে চূড়ান্ত সেমিস্টারে ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা করতে হবে। এনরোলমেন্টের জন্য এআইবি পরীক্ষা ফি ও রাজ্য বার কাউন্সিল দ্বারা চার্জ করা ফি-র পরিমাণ ন্যূনতম করতে হবে। এসসি, এসটি, ওবিসি ও আর্থিক-সামাজিকভাবে অনগ্রসর শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ হোস্টেল স্থাপন করতে হবে। চা-বাগান, সুন্দরবন ও জঙ্গলমহলের মতো প্রান্তিক এলাকার ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। সমস্ত স্তরের ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশিপ নিয়মিত এবং দ্বিগুণ হারে প্রদান করতে হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের ফ্রি বাস পাস দিতে হবে। সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমস্ত ধরনের প্রান্তিক ছাত্রছাত্রী নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে। সামগ্রিকভাবে শিক্ষাঙ্গনের গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষা করতে হবে।