
বিজেপি পরিচালিত রাজ্যগুলিতে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে আক্রমণ, পুলিশি হেনস্থা, গ্রেফতারি চলছে। তাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে, এমনকি অনেককে বর্ডার পার করে বাংলাদেশেও পুশব্যাক করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে এসইউসিআই(সি)-র সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক একটি আলোচনা প্রকাশ করা হল। এই আলোচনাটি অনলাইনে সম্প্রচারিত হয়েছে গত ১৩ আগস্ট।
প্রশ্নঃ বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর এই আক্রমণকে আপনারা কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছেন?
উত্তরঃ গোটা দেশ আজ সমস্যা জর্জরিত। দেশজোড়া দুর্নীতি, বেকারত্ব। মূল্যবৃদ্ধি চরমে। কাজহারা শ্রমিকের মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। দেশ জুড়ে শিক্ষার উপর আক্রমণ হিসাবে নামিয়ে আনা হয়েছে জাতীয় শিক্ষানীতি। অনাহার, অপুষ্টিতে দেশের মানুষের জীবন দুর্বিষহ। দেশের সর্বত্র নারী নির্যাতন, ধর্ষণের ঘটনা ক্রমে বেড়ে চলেছে। এ সবই ভারতবর্ষের ক্ষমতাসীন শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতি। এই অবস্থায় বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর এই আক্রমণ বিজেপি সরকারের একটা সাধারণ পলিসি, যাতে পুঁজিবাদবিরোধী গণআন্দোলন গড়ে না উঠতে পারে, এই সমস্যাগুলি থেকে যাতে জনগণের মনকে অন্য দিকে সরিয়ে দেওয়া যায়। তার জন্য মুসলিমবিরোধী মানসিকতা, উগ্র হিন্দু সেন্টিমেন্ট জাগিয়ে তোলা, প্রাদেশিকতার আগুন জ্বালানো, ভাষাগত বিরোধ তৈরি করা, হিন্দুদের মধ্যে উচ্চবর্ণ-নিম্নবর্ণ বিরোধ বাধানো– এ সব তারা করে। এ সবের পিছনে তাদের উদ্দেশ্য, জনজীবনের জ্বলন্ত সমস্যাগুলি থেকে মানুষের মনকে সরিয়ে, তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে, তার ভিত্তিতে তাদের বিভক্ত করে দেওয়া। কারণ তা হলে তারা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে না, গণআন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে না, শ্রেণিসংগ্রাম গড়ে তুলতে পারবে না। এটা পুঁজিবাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য খুব প্রয়োজন।
যদিও মাঝে মাঝে দেশে আন্দোলন হচ্ছে। বিগত যে কৃষক আন্দোলন, তা প্রায় এক বছরের মতো চলেছিল। রাজ্যে রাজ্যেও আন্দোলন হচ্ছে। এটা পুঁজিবাদের পক্ষে বিপজ্জনক। ফলে এই আন্দোলনগুলিকে ধ্বংস করার জন্যই মুসলিমবিরোধী মানসিকতা, সাম্প্রদায়িকতা ও এই সমস্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতা গড়ে তোলা হচ্ছে। বাংলাদেশি তকমা লাগিয়ে যে কাজটি করা হচ্ছে, তার পিছনে একটি অভিসন্ধি কাজ করছে। তা হল– দেশের মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা। আগে যেমন সংগঠিত দাঙ্গা হত– গুজরাটে হয়েছে, মুম্বাইতে হয়েছে, তারও আগে আরও নানা জায়গায় হয়েছে– এখন কিন্তু এ রকম বড় আকারের দাঙ্গা করছে না। কিন্তু সমস্ত জায়গায় মুসলিমদের উপর আক্রমণ করছে। গোরু পাচার করছে বলে, গোরুর মাংস খাচ্ছে বলে, বা কোনও মুসলিম ছেলে কোনও হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করলে তাকে ভিত্তি করে– যে কোনও একটা অজুহাত খাড়া করে আক্রমণ করছে। যেমন, রামমন্দির। এক সময় ধুয়া তুলেছিল যে, বাবরি মসজিদ তৈরি করা হয়েছে রামের জন্মস্থানে মন্দির ধ্বংস করে। এই অজুহাতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করল। ধ্বংস করে মাটি খুঁড়ে কোনও মন্দিরের চিহ্নমাত্র খুঁজে পেল না। তারপর সুপ্রিম কোর্ট একটা বিচিত্র রায় দিল। প্রমাণ করতে পারল না যে, এখানে রামমন্দিরের অস্তিত্ব ছিল। প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি, যিনি রায়ের খসড়া করেছিলেন, প্রকাশ্যে বলেছিলেন, এই রায়ের জন্য তিনি ভগবানের নির্দেশ পেয়েছেন। সংবিধান নয়, আইন নয়, ভগবানের নির্দেশের ভিত্তিতে রায় দিয়েছেন! আর এখন তো গোটা দেশে চলছে– যেখানে যত মসজিদ আছে, সেখানে হয় শিবের মন্দির ছিল, না হলে কৃষ্ণের, না হলে আর এক দেবতার এবং সেগুলিকে খুঁড়ে ধ্বংস করো। এই সবই হচ্ছে মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে।
আরএসএস-এর ঘোষিত নীতি, হিন্দু রাষ্ট্র করতে হবে। গোলওয়ালকর বলেছিলেন, যারা বিদেশ থেকে এসেছে– মুসলিমদের তাঁরা বিদেশি আখ্যা দিয়েছেন– এ দেশে থাকতে হলে হিন্দু ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে হবে এবং পবিত্র জ্ঞান করতে হবে। হিন্দু ধর্মের গৌরবগাথা বুকে বহন করতে হবে। তা না করলে তাদের কোনও অধিকার থাকবে না, কোনও দাবি থাকবে না, এমনকি নাগরিকত্বের অধিকারও থাকবে না। এ ভাবেই এ দেশে বাস করতে হবে। সেই পরিকল্পনা এরা কার্যকর করছে। একটা থ্রেট উপস্থিত করা। ফলে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে একটা অজুহাত তৈরি করছে।
এতে শুধু মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকই নয়, হিন্দু পরিযায়ী শ্রমিকরাও আক্রান্ত হচ্ছেন। দিল্লি এবং বিভিন্ন স্থানে যেখানে হিন্দু পরিযায়ী শ্রমিকরা আছেন, সেই কলোনিগুলি উচ্ছেদ করে দিচ্ছে। এখানে বিজেপি নেতাদের স্বার্থ, প্রোমোটারদের স্বার্থ এবং অ্যান্টি-সোস্যালদের স্বার্থ যুক্ত হয়ে আছে। এ সব জায়গায় প্রোমোটারি হবে। কলোনিগুলিকে ফাঁকা করতে পারলে তারা বিরাট ব্যবসা করবে।
আসামের গোয়ালপাড়াতেও একই জিনিস করছে। সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই গোয়ালপাড়া, ধুবড়িতে বাংলাভাষী মুসলিমদের বাস। এখন তাদের উচ্ছেদ করতে চাইছে। শুনেছি, আদানির ওখানে একটা প্রকল্প করার পরিকল্পনা আছে। এই জন্য উচ্ছেদ করছে। এটা সংগঠিত ও পরিকল্পিত একটা আক্রমণ।
প্রশ্নঃ বিজেপি নেতা, যিনি ওদের সোস্যাল মিডিয়া দেখেন, সেই অমিত মালব্য দিল্লির এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বলেছেন, বাংলা বলে কোনও ভাষা হয় না। বলেছেন, ‘বাংলাদেশি ভাষা’। এ বিষয়ে আপনার কী অভিমত?
উত্তরঃ এই ধরনের উক্তি অভাবিত। এর পিছনে একটা ষড়যন্ত্র কাজ করছে বলে আমি মনে করি। একটা ছেলেমানুষি যুক্তি খাড়া করেছে। যে হেতু পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় উচ্চারণের পার্থক্য আছে, কিছু কিছু শব্দগত পার্থক্য আছে, দেখতে গেলে ভারতের কোনও রাজ্যের ভাষাই সেখানকার ভাষা নয়। বিহারেও ভোজপুরি আছে, মৈথিলী আছে, আরও নানা ভাষা আছে। ইউপি-তেও আছে, গুজরাটে আছে– কোন রাজ্যে নেই! বর্ডার এলাকায়– এই যেমন ঝাড়খণ্ড-বাংলার বর্ডার– মিশ্র ভাষা আছে সেখানে। ওড়িশার সাথে মিশ্র ভাষা আছে। ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে যাদের সাধারণ জ্ঞান আছে, তারাই জানে। ফলে এতদিন বাদে, ভাষাতত্ত্ববিদরা যা জানতে পারেননি, বুঝতে পারেননি, এই ভদ্রলোক তা আবিষ্কার করেছেন! নিশ্চয় বিজেপি তাঁকে এর জন্য পুরস্কার দিতে পারে, ভারতরত্ন ঘোষণা করতে পারে!
কিন্তু বাংলা তো শুধু একটা ভাষা নয়, ভাষা গড়ে ওঠে চিন্তার বাহন হিসাবে। ভাষা ক্রিয়া করে একে অপরের কাছে মনোভাব ব্যক্ত করার মাধ্যম হিসাবে। যেখানে যে ভাবে যত সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে, চিন্তার বিকাশ ঘটে, জ্ঞানবিজ্ঞানের বিকাশ ঘটে, সেখানে তত ভাষার অগ্রগতি ঘটতে থাকে। যেহেতু ইংরেজ শাসনের প্রথম দিকে কলকাতা ছিল ভারতের রাজধানী এবং এখানেই প্রথম ইংরেজি শিক্ষার প্রসার হয়েছিল, তার ফলে এখানকার সাথে পাশ্চাত্যের সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল, পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানের সাথে পরিচয় ঘটেছিল, তাই ভারতীয় নবজাগরণের সূচনা পশ্চিমবাংলায়। আজ বিজেপির কাছে নবজাগরণের বক্তব্য, ভূমিকা একটা বিরাট অন্তরায়। নবজাগরণ শুরুই হয়েছিল ভারতবর্ষ থেকে ধর্মান্ধতা, ধর্মীয় মনোভাব– বেদ, গীতা, মনুসংহিতা– এগুলির প্রভাব মুক্ত করার লক্ষ্যে। রামমোহন রায় নিজে বলেছেন, সংস্কৃত শিক্ষা ভারতকে কয়েক হাজার বছর অন্ধকারে রেখেছে। তিনি ব্রিটিশ সরকারকে, লর্ড আর্মহার্স্টকে চিঠি লিখে জানাচ্ছেন, সংস্কৃত শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত নয়। তিনি নিজে বেদান্তে বিশ্বাস করতেন। আবার তিনিই বলছেন, বেদান্ত আধুনিক নাগরিক তৈরি করতে পারে না। বিজ্ঞান চর্চা করা দরকার।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, যাঁকে গোটা ভারত শ্রদ্ধার চোখে দেখেছে– রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দও যাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন– সেই বিদ্যাসাগর বলেছেন, বেদান্ত-সাংখ্য ভ্রান্ত দর্শন। ইউরোপ থেকে এমন বই পড়ানো দরকার যাতে মানুষের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। মহারাষ্ট্রে জ্যোতিরাও ফুলে একই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করেছেন।
অন্য দিকে বিজেপি এখন চাইছে, ভারতবর্ষে গীতা, বেদ-বেদান্ত, মনুসংহিতা– এগুলোর ব্যাপক প্রচার হোক, ছাত্রসমাজ ও জনগণের মধ্যে যাতে ধর্মান্ধতা গড়ে ওঠে। ধর্মান্ধতা গড়ে উঠলে কেউ প্রশ্ন করবে না, তর্ক করবে না, বিরুদ্ধতা করবে না। অন্ধের মতো মানবে যে, শোষণ-জুলুম যা কিছু হচ্ছে, এগুলি সবই ঈশ্বরের বিধান, পূর্বজন্মের কর্মফল। এর দ্বারা তারা ফ্যাসিবাদী মানসিকতা গড়ে তুলছে। অন্য দিকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি সমাজে যতটুকু আছে, তাকে ধ্বংস করে ধর্মীয় চিন্তাকে জাগিয়ে তুলছে। কারিগরি বিজ্ঞান তাদের দরকার অস্ত্র তৈরির জন্য, কারখানার মেশিনপত্রের জন্য। আমাদের মহান শিক্ষক কমরেড শিবদাস ঘোষ বহুদিন আগে বলেছেন, ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতিই হচ্ছে, অধ্যাত্মবাদ, ধর্মান্ধতার সাথে কারিগরি বিজ্ঞানের সংমিশ্রণ। তাদের দরকার এই বাংলা, এই রেনেসাঁসের বিরোধিতা করা।
দ্বিতীয়ত, স্বাধীনতা আন্দোলনের যে নেতারা– দেশবন্ধু, সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ এখানকার যাঁরা বরেণ্য সাহিত্যিক– রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, নজরুল, এঁরা প্রত্যেকে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতার বিরোধী ছিলেন। শিক্ষার সাথে ধর্ম যাতে না মিশতে পারে, রাজনীতির সাথে ধর্ম যাতে না থাকে, এঁরা প্রত্যেকে সেটা চেয়েছেন। সুভাষচন্দ্র বলেছেন, রাজনীতির সাথে ধর্মের সম্পর্ক থাকবে না। রাজনীতি চলবে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা। সুভাষচন্দ্র বসু সরাসরি বলেছেন, হিন্দু মহাসভা হিন্দু সেন্টিমেন্ট জাগাচ্ছে, সন্ন্যাসীদের ব্যবহার করছে। এদের দেশের শত্রু বলে গণ্য করা উচিত। এই যে চিন্তা বাংলাভাষাকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, আজ বিজেপি তাকে ফাইট করছে। বাংলাভাষার বিরুদ্ধে জিগির তুলে এর মধ্য দিয়ে যে চিন্তা, রাজনীতি, সংস্কৃতি এসেছিল, তাকে তারা ফাইট করছে একটা দুরভিসন্ধি নিয়ে।
প্রশ্নঃ বিজেপি নেতারা একটা অদ্ভূত যুক্তি আনছেন। তাঁরা বলতে চাইছেন, তাঁরা বাংলাবিরোধী নন, বাংলা ভাষাবিরোধী নন, তাঁরা রোহিঙ্গা এবং মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে। এ কথায় কতটা সত্যতা আছে?
উত্তরঃ অনুপ্রবেশ নিয়ে তারা যে হট্টগোল তুলছে, বিষয়টি তত ব্যাপক নয়। কিন্তু আমি একটা কথা এখানে বলতে চাই, যদি অনুপ্রবেশ বলতে হয়, ভারতের লোকও তো অন্য দেশে অনুপ্রবেশ করছে। গরিব মানুষ কাজের সন্ধানে এক দেশ থেকে আরেক দেশে যায়, যেমন এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে যায়। আবার এক দেশ থেকে আর এক দেশে যায়। আমেরিকা মেক্সিকো সীমান্ত আটকে দিয়েছে যাতে মেক্সিকোর গরিবরা না ঢুকতে পারে। কিছুদিন আগে মার্কিন সরকার কয়েকশো মানুষকে হাত-পা শেকলে বেঁধে প্লেনে এ দেশে ফেরত পাঠাল। এরা তো ভারতীয়! তাদের অফিসিয়াল রেকর্ড ছিল না। এই যে রাশিয়াতে কাজের নাম করে পাঠিয়েছে। এ দেশে একটা ব্যবসা আছে– তারা টাকার বিনিময়ে নিজেরাই ভুয়ো পাসপোর্ট, ভিসা– এ সব করে দেয়। বলে ওখানে গেলে কাজ পাবে। রাশিয়ায় যারা কাজ করতে গিয়েছিল, জানা গেল তাদের যুদ্ধে কাজে লাগাচ্ছিল। অনেকে মারাও গেছে। বিদেশে প্রচুর ভারতীয় কাজ করছে। সৌদি আরব, ওমান, দুবাইতে কাজ করছে। বাংলাদেশের লোক, ভারতবর্ষের লোক কাজ করছে। কাজের সন্ধানে গরিবরা যেখানে একটু ভাল কাজের সুযোগ পায়, সেখানেই যাওয়ার চেষ্টা করে। আইনি পথে হোক– আইনের পথে সুযোগ না থাকলে অন্য ভাবে ঢোকার চেষ্টা করে। কিন্তু একেবারে হাজারে হাজারে লাখে লাখে ঢুকছে– এটা একটা মিথ্যা প্রচার। তা হলে বর্ডার ফোর্স কী করছে?
আরেকটা জিনিস এর মধ্যে কাজ করছে। সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশি-বিরোধী একটা মানসিকতা গড়ে তোলা। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের গণআন্দোলন শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়েছে। কয়েক হাজার মানুষ মারা গেছে গুলি খেয়ে। সেটা তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। যারা আন্দোলন করেছিল, তাদের মুখে রবীন্দ্রনাথ, ডিএল রায়, মোহিনী চৌধুরীর গান– এ দেশের স্বদেশি আন্দোলনের গান, নজরুলগীতি ইত্যাদি ছিল। যদিও আদর্শগতভাবে শক্তিশালী নেতৃত্ব সামনে না থাকার জন্য মৌলবাদীরা এখন তার খানিকটা সুযোগ নিচ্ছে। ভারতের বিজেপি সরকার শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশের সাথে আগে ভারতের যে সম্পর্কটা ছিল, তা এখন তিক্ত।
এ ছাড়া আরও একটা বিপদ বিজেপি ডেকে আনছে, তাদের সুবিধাবাদী স্বার্থের দিকে তাকিয়ে। এই যে বাংলাদেশিরা দেশে ঢুকছে বলে অ্যান্টি-মুসলিম সেন্টিমেন্ট তুলছে, এর সুযোগ নেবে বাংলাদেশের ইসলামিক মৌলবাদীরা। এখানে হিন্দু মৌলবাদীরা যা করছে– এমনিতেই ওখানে হিন্দুদের ওপর মাঝে মাঝে আক্রমণ হচ্ছে, যদিও ওখানকার গণতান্ত্রিক শক্তি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে, লড়ছে। কিন্তু এরা তার সুযোগ নেবে। বাংলাদেশের ইসলামিক মৌলবাদীরা ওখানকার হিন্দুদের বলতে পারে, তোমরা পশ্চিমবঙ্গের লোক– চলে যাও। তাড়ানো শুরু করবে। এই বিপদটা তারা ডেকে আনছে। মানে ভারতের হিন্দু মৌলবাদীরা বাস্তবে বাংলাদেশের ইসলামি মৌলবাদীদের শক্তিশালী করছে।
প্রশ্নঃ এই যে ঘটনাপ্রবাহ চলছে, আমরা দেখতে পাচ্ছি, কিছু দল এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দিচ্ছে। এই বিষয়টাকে আপনি কী ভাবে দেখছেন?
উত্তরঃ এই আন্দোলনের মধ্যে ভোটের স্বার্থে যদি কেউ বাঙালি সেন্টিমেন্ট জাগিয়ে তোলে, আমরা তার বিরোধিতা করি। আমরা ভারতের সমস্ত ভাষারই অগ্রগতি চাই। বাংলা উন্নত ভাষা বলে অন্যান্য ভাষা অনুন্নত থাকুক– এটা আমরা চাই না। সব ভাষাই উন্নত হোক এবং একটা উন্নত ভাষা অন্য ভাষার বিকাশে সাহায্য করে। কিন্তু জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দিতে গেলে কোনও রাজ্যই তা গ্রহণ করে না। যেমন, মহারাষ্ট্রের মতো বিজেপি শাসিত রাজ্য, তারাও তো প্রত্যাখ্যান করেছে। আবার এখানে যদি বাংলাভাষাকে ভিত্তি করে বাঙালি সেন্টিমেন্ট তুলতে থাকে, সেটাও আমরা সমর্থন করব না। আমরা মনে করি, বাংলাভাষী বলে যে আক্রমণটা হচ্ছে, সমস্ত রাজ্যের গরিব মানুষ, শোষিত জনগণেরও এটিকে নিজেদের সমস্যা হিসাবে গণ্য করা উচিত। একই ঘটনা যদি অন্য রাজ্যেও ঘটে, আমরা তার প্রতিবাদের পক্ষে। ফলে যে পুঁজিবাদ এইসব সমস্যা সৃষ্টি করছে, বিভেদ সৃষ্টি করছে, তার বিরুদ্ধে গোটা ভারতবর্ষের জনগণের ঐক্য, কৃষক-শ্রমিকের, মধ্যবিত্তের ঐক্য, গণআন্দোলনের ঐক্য, শ্রেণিসংগ্রামের ঐক্য চাই। এই ঐক্য যেন কোনও কারণে ব্যাহত না হয়।
প্রশ্নঃ এসইউসিআই(সি) কী ভাবে এর বিরুদ্ধতা করছে?
উত্তরঃ এই বক্তব্য গোটা ভারতের জনগণের কাছে নিয়ে যাব আমাদের পত্রপত্রিকার মাধ্যমে, আমাদের বক্তারা বিভিন্ন জায়গায় যে আলাপ-আলোচনা করছেন, সে সবের মাধ্যমে। তার ভিত্তিতেই আমরা জনমত গড়ে তুলব।
বিজেপি সরকারের উদ্দেশ্য শ্রমজীবী মানুষের যে সমস্যা, তা থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়া এবং অনৈক্য সৃষ্টি করা। একটা রাজ্যে প্রাদেশিকতা জাগাতে পারলে আরেকটা রাজ্যেও প্রাদেশিকতা জাগানো যাবে। এটা চেইন এফেক্ট। নির্বাচনের সামনেই এটা আমরা বেশি করে দেখতে পাই। কারণ, এর উদ্দেশ্যই হচ্ছে একে ভোটের স্বার্থে কাজে লাগানো। এ হল ভোটব্যাঙ্ক পলিটিক্স।
প্রশ্নঃ এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে বাসে-ট্রামে-আড্ডায়-চায়ের দোকানে এ সব নিয়ে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। এই অবস্থায় রাজ্যের শ্রমীজীবী মানুষের কী ভূমিকা নেওয়া উচিত, আপনি যদি একটু বলেন।
উত্তরঃ পশ্চিমবঙ্গের জনগণের কাছে আমি এই আবেদনই করব, আপাতদৃষ্টিতে বাংলাভাষা ও বাংলাভাষীদের উপর এই আক্রমণ যা দেখা যাচ্ছে, তার দ্বারা বিভ্রান্ত হবেন না। এখানকার যাঁরা বরেণ্য মনীষী, নবজাগরণের যাঁরা পথিকৃৎ, পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের বীর যোদ্ধারা– এঁরা কেউই নিজেদের বাঙালি হিসাবে ভাবেননি। এঁরা সকলেই ভারতবর্ষের স্বার্থে চিন্তা করে গেছেন। পশ্চিমবঙ্গ একসময় বামপন্থী আন্দোলনের পীঠস্থান ছিল, যেটা সিপিএম-এর ভূমিকার কারণে অনেকখানি নষ্ট হয়েছে। তা সত্ত্বেও অতীতের গৌরবময় ঐতিহ্য স্মরণ করে মানুষ যেন বাঙালি সেন্টিমেন্টের দ্বারা বিভ্রান্ত না হন, যে সেন্টিমেন্ট ভোটের স্বার্থে জাগাবার চেষ্টা করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল। সুতরাং একে ভারতের শ্রেণিসংগ্রাম, গণআন্দোলনের বিপদ হিসাবে গণ্য করতে হবে এবং সে ভাবেই জিনিসটাকে দেখতে হবে। এটা একটা ফ্যাসিস্ট আক্রমণ। বিজেপির হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা এবং উগ্র জাতীয়তাবাদের আক্রমণ। এ ভাবেই বিষয়টিকে গণ্য করতে হবে।
অন্যান্য রাজ্যের জনগণকেও একই দৃষ্টিভঙ্গিতে যাতে তাঁরা দেখেন, সেই ভাবে তাঁদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যেমন একসময় অতীতের দেশনায়করা গোটা ভারতবর্ষকে পথ দেখিয়েছেন, এ ক্ষেত্রেও একই ভাবে তাঁরা পথ দেখাবেন।