
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি করোনা কালের উদাহরণ টেনে পেট্রল, ডিজেল, রান্নার গ্যাস, ভোজ্য তেল, রাসায়নিক সার ব্যবহারে দেশবাসীকে সংযমী হতে এবং ছাত্রদের অনলাইনে ক্লাস করতে বলেছেন। সোনা কেনা বন্ধ রাখতে বলেছেন। বলেছেন, এখন বিদেশ সফর করবেন না। বাড়ি থেকে কাজ করুন, তেল বাঁচাতে গণপরিবহণে যাতায়াত করুন। বাঙ্গালোরে এক সরকারি সভায় এই আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এতে বিদেশি মুদ্রার সাশ্রয় হবে এবং যুদ্ধ-সংকটের বিরূপ প্রভাবকেও কমানো যাবে।
এগুলি যে ফাঁকা আওয়াজ নয়, তা কেন্দ্রীয় সরকারের একের পর এক পদক্ষেপেই স্পষ্ট। ১২ মে গভীর রাতে সোনা, রূপো ও দামি ধাতুর উপর আমদানি শুল্ক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করেছে সরকার। ১৩ মে থেকে লিটার প্রতি দুধের দাম ২ টাকা বাড়িয়েছে। চার দফায় পেট্রল ও ডিজেলের দাম লিটার প্রতি ৭ টাকার বেশি বাড়িয়়েছে। খাদ্যপণ্য সহ সমস্ত নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। এর পরে আরও কত দাম বাড়বে, তা নিয়ে আতঙ্কিত মানুষ।
আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ শুরুর আড়াই মাস পরে যুদ্ধের কারণ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রীর মুখে হঠাৎ ‘কৃচ্ছসাধনের’ কথা কেন? প্রধানমন্ত্রীর তো আগেই বোঝা উচিত ছিল এই সংকট আসতে চলেছে। তার জন্য আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল। ভোজ্য তেল বা সার– দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা কমাতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে পারত। নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ প্রধানমন্ত্রী আজ সেই ব্যর্থতার দায় জনগণকে বইতে বাধ্য করছেন।
তেল সংকটের যে কথা প্রধানমন্ত্রী বলছেন তার জন্য কি ভারত সরকারের বৈদেশিক নীতি দায়ী নয়? ২০২২ সালে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপে তেল-গ্যাস রপ্তানিতে রাশিয়ার উপর আমেরিকা নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এই সুযোগে কম দামে ভারত রাশিয়া থেকে প্রচুর পরিমাণে তেল কিনতে থাকে। রাশিয়া থেকে তেল আমদানি অব্যাহত থাকলে আজ ভারতকে এই সংকটের মুখোমুখি হতে হত না। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে বাধ্য করে রাশিয়া থেকে তেল না কিনে আমেরিকা থেকে বেশি দামে কিনতে। মার্কিন বাজারে ভারতীয় ধনকুবেরদের রফতানি ও বিনিয়োগ এবং মার্কিন সহায়তায় আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আদানি, আম্বানি, টাটাদের মতো ধনকুবেরদের বিনিয়োগের স্বার্থ দেখতে গিয়ে ট্রাম্পের কঠোর সব শর্ত মেনে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অন্য দিকে দেশবাসীর উদ্দেশে বলছেন, এই সংকটের সময়ে তাঁদেরই ‘কৃচ্ছসাধন’ করতে হবে।
কোন জনসাধারণকে এ কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী? যে দেশে জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের হাতে মোট সম্পদের মাত্র ৩ শতাংশ রয়েছে। অন্য দিকে ১ শতাংশ ভারতীয়ের হাতে রয়েছে দেশের মোট সম্পদের ৪০ শতাংশ, ধনীতম ১০ শতাংশের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের ৬৫ শতাংশ (ওয়ার্ল্ড ইন-ইকোয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬)। বৈষম্য এতটাই ভয়ঙ্কর। অর্থাৎ সমাজের বৃহত্তর অংশ এমনিতেই গত আট দশক ধরে কৃচ্ছসাধন করে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদেরই উপর নতুন করে আরও কৃচ্ছসাধনের বোঝা চাপাতে চাইছেন!
প্রধানমন্ত্রী স্কুল বন্ধ করে ছাত্রদের অনলাইনে ক্লাস করতে বলেছেন। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিবারগুলির সন্তানদের পক্ষে কি ব্যয়বহুল অনলাইন পদ্ধতিতে শিক্ষা নেওয়া সম্ভব? এ ছাড়া কেন্দ্রীয় সরকারের পি এম পোষণ দফতর খরচ কমানোর জন্য স্কুলগুলিকে মিড-ডে মিলের রান্নায় যতটা সম্ভব কম তেল ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে। মিড-ডে মিলে এমনিতেই প্রাথমিকে ছাত্রপিছু নামমাত্র বরাদ্দ ৬ টাকা ৭৮ পয়সা এবং উচ্চ প্রাথমিকে ১০ টাকা ১৭ পয়সা। এতে পুষ্টিকর খাবার দেওয়া অসম্ভব, সেখানে আরও কম তেলে রান্না করতে বলা কার্যত শিশুদের জন্য সামান্য সেদ্ধ খাবারের ব্যবস্থা করার সামিল। শিক্ষকদের আশঙ্কা, সরকার আদৌ মিড-ডে মিল প্রকল্প চালাতে চায় তো!
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে ভোজ্য তেল কম খরচ করতে বলছেন। প্রধানমন্ত্রী বোধহয় জানেন না, বৃহৎ অংশের মানুষ চড়া দামের জন্য ভোজ্য তেল এমনিতেই কম খরচ করেন। তিনি কি তাঁদের তেল ছাড়াই রান্না করতে বলছেন? প্রধানমন্ত্রী যখন জ্বালানি সংকট রুখতে জনসাধারণকে কৃচ্ছসাধনের কথা বলছেন, তখনই দেখা গেল গুজরাটের সোমনাথ মন্দিরের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিমানবাহিনীর নানা কলাকৌশল। দেশের সেনাবাহিনীর একটি শাখাকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করানো একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে কতটা যৌক্তিক সেই প্রশ্নে না গিয়েও বলা যায়, এই বিপুল সংখ্যক বিমানবহর নিয়ে কৌশলী খেলা দেখাতে তো প্রচুর পরিমাণ জ্বালানি লেগেছে, প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর পারিষদরা তা নিয়ে একটা বাক্যও খরচ করলেন না কেন? পশ্চিমবঙ্গ সহ পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা ভোটে বিপুল খরচ করে শাসক দলগুলির নেতা-মন্ত্রীরা বিমান ও হেলিকপ্টারে যাতায়াত করলেন, দলের রোড-শোগুলিতে গাড়ির বিশাল কনভয় ঘুরল, তখন কি যুদ্ধ বা জ্বালানি সংকটের কথা তাঁদের মনে ছিল না? জ্বালানি ব্যবহারে লাগাম পরানোর দায় কি শুধুই জনসাধারণের?
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে সংযম অভ্যাস করার নিদান দিয়ে বলেছেন, তা হলে বৈদেশিক মুদ্রা দেশেই থাকবে। এমনিতেই ভারতীয় অর্থনীতির মন্দার কারণে বেশিরভাগ বিদেশি কোম্পানি তাদের বিনিয়োগ তুলে নিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছে। এমনকি ভারতীয় পুঁজিপতিরাও দেশে বিনিয়োগ তুলে নিয়ে বিদেশে ছুটছেন। সে কারণেও বিপুল বিদেশি মুদ্রার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের সংযমে বৈদেশিক মুদ্রা দেশে থাকবে, এ কথাও সত্য নয়। আর দেশের আর্থিক পরিস্থিতি কি এতটাই খারাপ আশঙ্কা করছেন প্রধানমন্ত্রী, যে তাঁকে করোনা পরিস্থিতির তুলনা টানতে হচ্ছে?
এই পরিস্থিতির থেকে বেরনোর উপায় সরকারের হাতে ছিল না, এমন নয়। ধনকুবেরদের লুটের সুযোগ না বাড়িয়ে তাদের উপর সম্পদ কর চাপিয়ে জনমুখী নীতির কথা প্রধানমন্ত্রী ভাবতে পারতেন। যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস, সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও চিকিৎসা পরিষেবা, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব ও অন্যান্য গঠনমূলক কাজ নাগরিকদের নাগালের মধ্যে থাকে তেমন ব্যবস্থা সরকার করতে পারত।
এগুলি নিশ্চিত করতে হলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরকারের ব্যয় বাড়ানো প্রয়োজন। সরকার দেশাত্মবোধের জিগির তুলছে। কাদের উদ্দেশ্যে? যে দেশের লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ চরম অর্থকষ্টে ভুগছেন, বেকারিতে বিপর্যস্ত, কোনও রকম সুরক্ষা ছাড়াই যাদের একটা অংশ গিগ অর্থনীতি বা অসংগঠিত ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন তাদের উদ্দেশ্যে। অথচ দরকার ছিল সরকারি নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে অর্থনৈতিক দিক থেকে এগিয়ে ও পিছিয়ে থাকা অংশের মানুষের মধ্যেকার বৈষম্যকে বাড়িয়ে না তুলে তা নিয়ন্ত্রণ করা। শিক্ষাখাতে (শিক্ষা, বিজ্ঞান-গবেষণা, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) ব্যয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা। এর ফলে দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা পেতে পারত, কাটতে পারত কাজের সংকট। তাতে দেশের ও বিশ্বের সংকটে সরকারকে খোলা মনে পরামর্শ দিতে বা সহায়তা করতে পারত জনগণ। জলবায়ু এবং নগরায়ন সমস্যার স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন ছিল। দেশের বহু মানুষ বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগই পান না, তাদের বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে বলা হচ্ছে। এক দিকে শিক্ষা-স্বাস্থ্য সহ কাজের তীব্র সংকট, অন্য দিকে অপরিকল্পিত নগরায়ন, সরকারি পরিবহণের অপ্রতুলতা, বন-জঙ্গল ধ্বংস, বিপর্যস্ত পরিবেশে জীবনযাপন জনসাধারণের পক্ষে এমনিতেই কষ্টকর। এর ওপর ‘কৃচ্ছসাধন’ তাদের জীবনে ‘মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা’ ছাড়া কিছু নয়।