Breaking News

পাঠকের মতামতঃ এক দেশ এক ব্যায়াম!

যোগব্যায়ামের উপকারিতা বা অপকারিতা নিয়ে এই বক্তব্য নয়। যোগব্যায়ামের আমরা বিরোধীও নই। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোনও বিষয় কি রাষ্ট্র বা সরকার বাধ্যতামূলক ভাবে সরকারি কর্মচারী কিংবা সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দিতে পারে? সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ সরকার সরকারি কর্মী ও ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগব্যায়াম বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই ধরনের পদক্ষেপে স্বাভাবিক ভাবেই ব্যক্তি-স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে সমাজজীবনে নানা প্রশ্ন উঠছে।

প্রথমত, গণতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তির স্বাধীনতা একটি মৌলিক বিষয়। একজন মানুষ কী ধরনের শরীরচর্চা করবেন, আদৌ করবেন কি না, তা তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ, সিদ্ধান্ত এবং সর্বোপরি ডাক্তারি পরামর্শের উপর নির্ভর করে। কেউ হাঁটতে ভালোবাসেন, কেউ দৌড়ন, কেউ খেলাধুলা করেন, কেউ জিমে যান, আবার কেউ যোগব্যায়াম করেন। সুস্থ থাকার পথ একটিই নয়, মানুষের পছন্দ ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী তা ভিন্ন হতে পারে। রাষ্ট্রের কাজ মানুষকে স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন করা, কোনও নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া নয়।

দ্বিতীয়ত, আমাদের সমাজ বৈচিত্র্যময়। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও জীবনধারার মানুষ পাশাপাশি বসবাস করেন। অনেকেই যোগব্যায়ামকে নিছক স্বাস্থ্যচর্চা হিসেবে দেখেন। কিন্তু কিছু মানুষের কাছে এর কিছু উপাদান ধর্মীয় বা নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই কোনও নির্দিষ্ট অনুশীলনকে বাধ্যতামূলক না করে স্বেচ্ছা-অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়াই অধিকতর যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য পথ।

তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য যোগব্যায়ামই একমাত্র উপায় নয়। পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, খেলাধুলার সুযোগ, দূষণমুক্ত পরিবেশ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং মানসিক আনন্দ– এ সবই একটি সুস্থ জীবনের অপরিহার্য উপাদান। সরকার যদি সত্যিই জনস্বাস্থে্যর উন্নয়নে আগ্রহী হয়, তা হলে সব মানুষের জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার, বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহ করা উচিত, হাসপাতালের পরিকাঠামোর উন্নয়ন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি, সুলভ স্বাস্থ্যপরিষেবা নিশ্চিত করা, আনন্দময় জীবন যাপনের অনুকূল সমাজ গঠনে ভূমিকা পালন এবং পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলির উপর আরও বেশি করে তাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে সরকারি অবহেলা লক্ষণীয়। আমরা চাই মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন হোক এবং নিজের ইচ্ছা, প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী যোগব্যায়াম সহ বিভিন্ন ধরনের শরীরচর্চায় অংশগ্রহণ করুক।

সুস্থ শরীর-মন গড়ার পথ হল এ সম্পর্কিত সচেতনতা, যা উৎসাহ প্রদান, অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং মানুষের স্বাধীন পছন্দের ভিত্তিতে তৈরি হতে পারে। স্বাস্থ্যচর্চা তখনই সফল হয়, যখন তা স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে গড়ে ওঠে– এক দিনের বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে নয়।

নবনী চক্রবর্তী, পুরুলিয়া