Breaking News

পাঁচ বছরে বিলিয়নেয়ারের সংখ্যা বেড়েছে ৩০০ শতাংশ

ভারতে গত পাঁচ বছরে বেড়েছে শত কোটিপতি বা বিলিওনেয়ারের সংখ্যা। দু-পাঁচ জন নয়, বেড়েছে ৩০০ শতাংশ হারে। ২৭ জুলাই সংসদে এই তথ্য দিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থ প্রতিমন্ত্রী। তিনি আরও জানিয়েছেন, ২০২৫-২৬ (ইনকাম ট্যাক্সের অ্যাসেসমেন্ট ইয়ার) মূল্যায়ন বছরে বিলিওনেয়ারের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৫৭৬, ২০২৪-২৫ এ যা ছিল ৪১৫।

মন্ত্রীর মুখে এই তথ্য শুনে চমকে উঠছেন অনেকেই। ভাবছেন, গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স-২০২৫ এ ১২৩টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান যেখানে ১০২, যে দেশে বেকারত্বের হার ক্রমশ বেড়ে চলেছে, অনাহারে-অর্ধাহারে থাকা মানুষের মৃত্যুর তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে, সেই দেশে ধনকুবেরদের সংখ্যা এত বেড়ে চলেছে কী ভাবে?

বিজেপি সরকার যুক্তি দিচ্ছে, করব্যবস্থার আমূল সংস্কার অর্থাৎ আয়করে ছাড়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে স্টার্ট আপ খোলার ব্যাপারে সরকারি সহায়তা– ইত্যাদি কারণে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে। দেখা যাচ্ছে, শিল্পে উৎসাহ ভাতা হিসেবে ২০২৩-২৪-এ সরকার কর মকুব করেছে ৮৬,৮১০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৬-এ কর মকুবের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে ৯৮,০৯৫ কোটি টাকা। একই সময়ে শিল্পপতিদের উৎসাহ ভাতা হিসাবে প্রত্যক্ষ আয়করে ছাড় দেওয়া হয়েছে ১,৫২,০০৬ কোটি টাকা। পরের বছর দেওয়া হয়েছে ১,৭১,৭৬৩ কোটি টাকা।

কিন্তু দেশের জনসংখ্যার বৃহৎ অংশ সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে? বাস্তবে কর্মসংস্থানের হাল কেমন, বেকারত্বের দশাই বা কী? শ্রমমন্ত্রী বিপুল কর্মসংস্থানের দাবি করলেও জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য বলছে, মে মাসে বেকারত্বের হার ৫.৫ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে, যা গত ১১ মাসে সর্বোচ্চ। এপ্রিলেও বেকারত্বের হার ছক্সমাসের রেকর্ড ভেঙে ৫ শতাংশের উপরে ছিল (আনন্দবাজার পত্রিকা-৫ আগস্ট)। কেন্দ্রীয় সরকারের ছোট-মাঝারি শিল্পমন্ত্রীর বয়ান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪, ’২৪-২৫, ’২৫-২৬ মোট তিন বছরে মাঝারি ছোট শিল্প বন্ধ হয়েছে মোট ১.৩৩ লক্ষ। প্রতি শিল্পে গড়ে ১০ জন কর্মী কাজ হারালে মোট কাজ হারিয়েছেন ১৩ লক্ষ কর্মী। কর্মসংস্থান দূরের কথা, শিল্পে বৃদ্ধির হার কমে যাওয়ায় নতুন নিয়োগ কমছে, কর্মী ছাঁটাই বাড়ছে। সরকারের সাফল্য দেখাতে গিয়ে সংসদে অর্থ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ২০২২ সালে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের বেকারত্বের হার ছিল ৩.৬ শতাংশ, তা ২০২৫-এ হয়েছে ৩.১ শতাংশ। অথচ ২০২২-২৩ সালের কাজের বাজারের সমীক্ষা দেখাচ্ছে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাশ যুবক-যুবতী অর্থাৎ ১৫ বছরের বেশি বয়সীদের বেকারির হার ১৮.৪ শতাংশ, গ্র্যাজুয়েট ২৯.১ শতাংশ, মাস্টার্স ৪০ শতাংশ, এমবিএ ৪৬ শতাংশ, ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েট ৬০-৬৫ শতাংশ। এই সমীক্ষার সাথে মন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যানের ফারাক বিস্তর।

সরকারি রিপোর্টই বলছে, কাজের সন্ধানে শিক্ষিত যুবকরা এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে পরিযায়ী হয়ে যাচ্ছেন। এর সাথে রয়েছে যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়ার বিষয়। ১৫-২৯ বছরের এমন যুবকেরা রয়েছে যারা পড়াশোনাও করেনি, কোনও কাজও করে না। অর্থনীতিতে এদের বলা হয় ‘নিট’ (নট ইন এডুকেশন, এমপ্লয়মেন্ট অর ট্রেনিং)। এদের ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলা আরও সহজ। আশঙ্কার বিষয় হল, ২০১২ সালে ‘নিট’দের সংখ্যা ছিল ৫ কোটি, ২০২০-তে ১০ কোটি ছাড়িয়েছে। এ সব থেকে পরিষ্কার, শিক্ষাব্যবস্থা, কাজের বাজার ও আর্থিক কাঠামো দেশের শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়কে সাহায্য করতে ব্যর্থ হয়েছে।

জনগণের বড় অংশের যখন এমন দুরবস্থা, তখন শত কোটিপতির সংখ্যা বাড়ল কী করে? আসলে গরিবদের ওপর শোষণের খড়গ চাপিয়েই বাড়ে ধনীর সম্পদ। আর তাদের সহায়তা করে শাসক দলগুলি। ফলে বেড়ে চলে ধনকুবেরদের সংখ্যা। পুঁজিবাদী অথনৈতিক ব্যবস্থার নিয়মেই আর্থিক বৈষম্য পাহাড়প্রমাণ হচ্ছে। এক দিকে মুষ্টিমেয় ধনকুবেরদের ধনসম্পদ উপচে পড়ছে, অন্য দিকে দারিদ্রের অতলে তলিয়ে যাচ্ছে সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। তারা বেঁচে থাকার কোনও পথ খুঁজে পাচ্ছে না। এ-বেলা ও-বেলার সংকটগ্রস্ত পুঁজিবাদ সমাজের বৃহত্তর অংশের শ্রমিক-মেহনতি মানুষের ওপর শোষণ তীব্র থেকে তীব্রতর করছে। বাড়ছে ধনী-গরিবের আর্থিক বৈষম্য।

এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সেবাদাস শাসক দলগুলি জনগণের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় বসে। পরে ভোল পাল্টে যে পুঁজিপতি শ্রেণির বদান্যতায় তারা ক্ষমতায় বসেছে তাদের স্বার্থে কাজ করতে শুরু করে। দেশের বৃহত্তর অংশের অর্থাৎ মেহনতি মানুষের দারিদ্র, বেকারত্ব, দুর্দশা নিয়ে তাদের কোনও মাথাব্যথা থাকে না। তাই দারিদ্রপীড়িত দেশের মানুষের সামনে সংসদে দাঁড়িয়ে ধনকুবেরদের সংখ্যা বৃদ্ধির কথা ঘোষণা করতে শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীদের এতটুকু লজ্জাবোধ হয় না।