
রবীন্দ্রনাথের ‘দেনা-পাওনা’ গল্পে নিরুপমা তার অসহায় বাবাকে বলেছিল– ‘তোমার মেয়ের কি কোনও মর্যাদা নেই? আমি কি কেবল একটা টাকার থলি, যতক্ষণ টাকা আছে ততক্ষণ আমার দাম। না বাবা, এ টাকা দিয়ে তুমি আমাকে অপমান কোরো না।’ দেশ দশক সংখ্যার হিসাবে এগিয়েছে অনেক, অথচ নিরুপমাদের এই যন্ত্রণা আজও ঘোচেনি।
বাপের বাড়ি নয়ডা থেকে এক রাশ স্বপ্ন নিয়ে শ্বশুরবাড়ি ভোপালে পৌঁছেছিলেন বছর তেত্রিশের ত্বিষা শর্মা। কিন্তু শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যায় সব স্বপ্ন। শুরু হয় পণের জন্য শ্বাশুড়ি ও স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বাঁচার তীব্র আকুতি নিয়ে ‘আমি ফাঁদে আটকে পড়েছি, তোমাদের যেন এ রকম না হয়’– মা-ভাই ও বন্ধুদের বারেবারে বার্তা পাঠিয়েছিলেন ত্বিষা। এর পরেও বাবা-মা মেয়েকে মানিয়ে চলার পরামর্শ দেন। ১২ মে ত্বিষাকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়।
ঘটনাটিকে পুলিশ বলেছে, আত্মহত্যা। ত্বিষার বাপের বাড়ির লোকজন বলছেন খুন! খুন না আত্মহত্যা তা তদন্তসাপেক্ষ। প্রশ্ন হল, ত্বিষার মতো এক জন উচ্চশিক্ষিতা ও আধুনিক মেয়েকে শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারের শিকার হতে হল কেন, কেনই বা অকালে মরতে হল তাঁকে?
শুধু তো ত্বিষা নন! তাঁর মৃত্যুর পরপরই নয়ডার ২৪ বছর বয়সী সদ্যবিবাহিত দীপিকা নগরের রহস্যমৃত্যু হয়েছে। তাঁর পরিবার শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন। ২৮ বছর বয়সী উত্তরপ্রদেশের মনীষা বাঘপতকেও একই রকম ভাবে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে হয়েছে। শ্বশুর বাড়ির চাহিদা অনুযায়ী ২০ লক্ষ টাকা যৌতুক ও দামি মোটরসাইকেল মনীষার বাবা মেটাতে না পারায় মনীষার উপর ভয়াবহ অত্যাচার চলত প্রতিদিন। সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেন তিনি। ত্বিষা, দীপিকা, মনীষার মতো এ দেশের অসংখ্য তরুণী বধূর জীবন প্রতিদিন শেষ হয়ে যাচ্ছে মর্মান্তিক ভাবে মূলত পণের দাবিতে অত্যাচারে। কাউকে খুন করে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করছে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা, কাউকে এমন ভাবে মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে যে সে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হচ্ছে।
এনসিআরবি-র রিপোর্টে দেশে এই ঘটনার ভয়ঙ্কর চেহারাটা সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, এক বছরে পণজনিত হিংসায় মৃত্যু হয়েছে ৬ থেকে ৭ হাজার মহিলার। প্রতিদিন ১৯-২০ জন মহিলা পণপ্রথা জনিত নির্যাতনের শিকার। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থানে এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাও এটা শুধু নথিভুক্ত মহিলাদের সংখ্যা। অনথিভুক্তদের যুক্ত করলে অবস্থা কতটা ভয়াবহ পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে ভেবে শিউরে উঠতে হয়!
পণ নিষিদ্ধ আইন-১৯৬১ রয়েছে। বধূ নির্যাতনের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য আইনের নানা ধারা রয়েছে, রয়েছে অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার নানা কঠোর ধারাও। কিন্তু তা সত্ত্বেও বধূ নির্যাতন, বধূ হত্যার সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে কেন?
এ কথা ঠিকই, আইন থাকলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা হয় না। পুলিশ প্রশাসনকে টাকা খাইয়ে, দুর্নীতিগ্রস্ত শাসক দলের সাহায্য নিয়ে বহু সময়েই হত্যাকারীরা পার পেয়ে যায়। পুলিশ-প্রশাসনকে অবশ্যই কঠোর ও নীতিনিষ্ঠ হতে হবে। কিন্তু তা হলেও কি সমাজ থেকে পণের কারণে বধূহত্যার অভিশাপ দূর হবে?
একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এ শুধু আইন-পুলিশ-প্রশাসনের কঠোরতার বিষয় নয়। এই সমস্যার শিকড় রয়েছে সমাজে মেয়েদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির গভীরে। এই একুশ শতকে দেশের নারী সমাজের একাংশ যাঁরা শিক্ষাদীক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন, দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের উৎকর্ষের প্রমাণ রাখছেন। অথচ এই যুগে দাঁড়িয়ে আজও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী জীবনের চরম পূর্ণতা বলতে সংসার ও সন্তানকেই বোঝেন। গোটা সমাজ জুড়েই এই ধারণা মূলত ছেয়ে রয়েছে যে, মেয়েদের আসল জায়গা শ্বশুরবাড়ির অন্তঃপুর। তাই আজও যত উচ্চশিক্ষিত বা উপার্জনশীলই হোন না কেন, অবিবাহিত মহিলারা সমাজের চোখে শ্রদ্ধার আসনে বসতে পারেন না। একই ভাবে, শ্বশুরবাড়িতে শত অত্যাচার হলেও, এমনকি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী অধিকাংশ মহিলাও সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কথা ভাবতে পারেন না। তাঁদের মা-বাবারাও পরামর্শ দিতে থাকেন মানিয়ে নেওয়ার। ঠিক যে ঘটনাটি ঘটেছে ত্বিষা শর্মার ক্ষেত্রে।
ত্বিষার মর্মান্তিক মৃত্যু প্রসঙ্গে মধ্যপ্রদেশ সরকারের সলিসিটর জেনারেল বলেছেন, ‘মা-বাবার জন্য মৃত মেয়ের চেয়ে বিবাহবিচ্ছিন মেয়ে থাকা অনেক ভাল।’ শুনে অনেকেই সহমত হবেন। কিন্তু তাঁদেরও ভাবতে হবে মেয়ের উপর শত নির্যাতন হচ্ছে জেনেও কোন সমাজ পরিবেশের চাপে ত্বিষার বাবা-মা মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার কথা ভাবতে পারলেন না! বিয়ের পর মেয়ে বাড়ি ফিরে এলে তা শুধু লোকলজ্জারই কারণ হয় না, তা পারিবারিক অশান্তিরও কারণ হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন হল, মেয়েদের পক্ষে চরম অমর্যাদাকর এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ-দৃষ্টিভঙ্গির বদল হবে কী করে? কেন্দ্রীয় সরকার ও অধিকাংশ রাজ্যে আসীন বিজেপি দলটির নেতাদের মুখে মাঝেমাঝেই মহিলাদের সম্পর্কে যে সব অবমাননাকর মন্তব্য শোনা যায়, যে ভাবে এ দলের বিধায়করা ধর্ষকের সমর্থনে মিছিল করেও পার পেয়ে যান, এমনকি ধর্ষণে অভিযুক্তদের রীতিমতো সংবর্ধনা দেওয়া হয়, তাতে এই দলটি ক্ষমতায় থেকে নারীবিদ্বেষী মনোভাবেই আরও আস্কারা দিচ্ছে এবং দেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসতে হবে দেশের সচেতন নারীসমাজ সহ সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে। চেষ্টা করতে হবে, দেশের প্রতিটি উৎপাদন ক্ষেত্রে নারীসমাজ যাতে আরও বিপুল সংখ্যায় অংশ নিতে পারে। সুস্থ সংস্কৃতির পরিসর গড়ে তুলতে হবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। ছোট থেকেই নারীকে মর্যাদার চোখে দেখতে শেখাতে হবে। লড়তে হবে সম কাজে সম মজুরি এবং নারীর সমানাধিকারের দাবিতে– সংসার ও জীবিকা-ক্ষেত্র উভয় জায়গাতেই। সাথে সাথে লক্ষ রাখতে হবে, এ দেশে নারী অধিকার রক্ষায় আজও যেটুকু আইনকানুন ও সুযোগ সুবিধা আছে, তার যথাযথ প্রয়োগ হচ্ছে কি না। এ পথে হেঁটেই একদিন মানুষ হিসাবে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবেন মহিলারা। সমাজ থেকে অদৃশ্য হতে পারবে পণজনিত বধূহত্যার অভিশাপ।