
বিজেপি দলটি কেমন তার অনেকটাই আন্দাজ পাওয়া যাবে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্যে। সম্প্রতি এক প্রকাশ্য সভায় তিনি বিজেপি কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন, বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে যেতে হবে, যাতে তারা সমস্যায় পড়েন। এখানেই তিনি থামেননি। আরও নানাভাবে যাতে মুসলিমদের হয়রান করা যায়, তার পরামর্শও দিয়েছেন। বলেছেন, বাংলাভাষী মুসলিম রিক্সাওয়ালাদের ন্যায্য ভাড়ার চাইতে কম দিতে। আগেও তিনি হুমকি দিয়েছিলেন বাংলাভাষী মুসলিমদের জমি বিক্রি করা যাবে না, বাড়ি ভাড়া দেওয়া যাবে না। শিল্পপতি এবং ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, তারা যেন মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানুষদের কাজে নিয়োগ না করেন। অর্থাৎ, মুসলিমদের ভাতে মারা এবং হেনস্থার নানা হীন পন্থা তিনি ও তাঁর দল নিয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে মুসলিমদের নাম গণহারে বাদ দিতে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা প্রকাশ্যে বলেছেন, হাজার হাজার ৭ নং ফর্ম পূরণ করে অভিযোগ দায়ের করতে। একজন মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে এ ভাবে বলার পরেও বলতে হবে দেশে আইন কিংবা সংবিধান বলে কিছু আছে?
হিমন্ত বাবু মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন সংবিধান মেনে চলার শপথ নিয়েই। যদিও মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাঁর এই হুমকি, তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ঘৃণা ভাষণ, দলীয় কর্মীবাহিনীকে তাদের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করা এবং তাদেরকে চাপে ফেলে দেশ থেকে বিদায় করা ইত্যাদি যে হুঙ্কার তিনি দিয়েছেন, তা শুধু অমানুষ সুলভ নয়, সংবিধান বিরোধী, গণতন্ত্রবিরোধী। শোভনতা, ভদ্রতা এ সব কথা বিজেপি নেতাদের প্রসঙ্গে তুলে লাভ নেই! বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ ভাষণ এবং উস্কানির জন্য আইনতই তিনি অপরাধী। আসামের পুলিশ আইনের শাসনকে মর্যাদা দিলেশাসক বিজেপির দলদাস হয়ে না থাকলে স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করত।
সংবাদে প্রকাশ, আসামের করিমগঞ্জ জেলায় একজন ব্যক্তি একাই ১৩৩ জন ভোটারের নাম কাটার অভিযোগ দাখিল করেছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, উপযুক্ত তদন্ত ছাড়াই কারও অভিযোগের ভিত্তিতে মৃত বলে স্ট্যাম্প দিয়ে নাম বাতিলের হিড়িক। কর্মরত এক বিএলও- কেও মৃত বলে দেখানো হয়েছে। গোয়ালপাড়ায় ১৪২ জনের নামে নোটিশ আসার পর গ্রামবাসীরা ক্ষেপে গিয়ে সভা ডেকে ওই বুথে বিজেপির বিএলএ-র কাছে এর জবাব চান। জনরোষ আঁচ করে লিখিত বিবৃতিতে ওই দুই এজেন্ট স্বীকার করেন, ১৪২ জন ভোটারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা ছিল। বিজেপির মণ্ডল সভাপতি আগেই ফাঁকা ফর্ম-৭ গুলিতে এজেন্টের স্বাক্ষর করিয়ে রেখেছিলেন। এইভাবে জালিয়াতি করে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিজেপি। এই কারচুপি ধরার পরে এক বিএলও-কে শুধু নির্বাচনী পদ থেকে নয়, শিক্ষক পদ থেকে সাসপেন্ড করেছে বিজেপি সরকার। দুষ্কর্ম ধরা পড়ে যাওয়ার পরেও মুখ্যমন্ত্রী ঔদ্ধত্যের সাথে বলেন, ‘সংখ্যালঘু মিঁয়া ভোটারদের কষ্ট দেওয়াই আমার কাজ। যা করেছি বেশ করেছি।’ তিনি মেনেনেন, শুধু বিজেপি কর্মীরাই পাঁচ লক্ষাধিক অভিযোগ জমা দিয়েছে। সমস্ত সংবাদমাধ্যমে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই অপশক্তির ক্ষমতা বৃদ্ধি মানবসমাজের কী বিপদ ডেকে আনতে পারে?
ভোটের স্বার্থে ধর্মীয় মেরুকরণের লক্ষ্যে বিজেপির এই ভয়ানক বিদ্বেষের রাজনীতি তার শক্তির নয়, গভীর সংকটের লক্ষণ। কেন্দ্রের দশ বছর ধরে নরেন্দ্র মোদির শাসন, বিভিন্ন রাজ্যে তাদের ডাবল ইঞ্জিন সরকার, জনজীবনের মৌলিক সমস্যার কোনও সমাধান করতে পারেনি। বরং সঙ্কট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এই অবস্থায় জীবনের সঙ্কট থেকে মানুষের দৃষ্টিকে ঘোরাতে মানুষকে নিজের নাগরিকত্বের দুশ্চিন্তায় উদ্বিগ্ন রাখতে এই হীন পথ নিয়েছে বিজেপি।
এই সাম্প্রদায়িক অপচেষ্টা বন্ধ করতে হলে সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত সম্প্রদায়ের শোষিত মানুষের ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। আন্দোলনের রাজপথেই ধর্ম-বর্ণ-জাত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট হবে তাঁরা প্রত্যেকেই পুঁজিপতি শ্রেণির শোষণ বঞ্চনার শিকার। এই শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রয়োজনীয়তা এবং চেতনাই মানুষকে ঐক্য সূত্রে আবদ্ধ করবে। সত্যিকারের বামপন্থীদেরকেই এই সংগ্রামের উদ্যোগ নিতে হবে। আসামের যে সংখ্যালঘু মানুষরা তীব্র সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী আক্রমণের মুখে, তাঁরা যদি প্রতিক্রিয়া থেকে কোনও সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী পাল্টা শক্তির দ্বারা পরিচালিত হন, সেটা তাঁদের আরও বিপদে ফেলবে। তাই বাড়াতে হবে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তিকে, আন্দোলনের চেতনাকে। এই আন্দোলনের পথেই চেতনার গণতন্ত্রীকরণের মধ্য দিয়ে পশ্চাৎপদ, সাম্প্রদায়িক চিন্তার মোকাবিলা করা যাবে।