
সম্প্রতি পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন মন্ত্রণালয়ের পর্যায়ক্রমিক শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তা থেকে জানা গেছে দেশে বেকারত্বের হার ৪.৮ শতাংশ এবং আরও অবাক করা তথ্য হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে এই বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেকটাই কম, ৩.৬ শতাংশ। তারপরও উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ রাজ্যের সর্বত্র যুবসাথীর লাইনে মাধ্যমিক থেকে শুরু করে স্নাতক, স্নাতকোত্তর পিএইচডি এমনকি ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী যুবকদের উপচে পড়া ভিড়। বেকারত্বের সরকারি পরিসংখ্যানের সাথে বাস্তবের ছবির যে কোনও মিল নেই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য উভয় সরকারই নিয়ম করে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করে চলেছে যে তাদের সময়ে বেকারত্ব কমেছে। তাই যদি সত্যি হয় তা হলে যুবসাথীর লম্বা লাইনগুলোতে যে বিবর্ণ মুখগুলোর ভিড় দেখা যাচ্ছে, এরা কারা? এরা কি ভিনদেশি নাগরিক? আসলে এরা সকলেই আমাদের সহনাগরিক, এ রাজ্যের শিক্ষিত বেকার, যারা ন্যূনতম গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য একটা চাকরি চায়। কিন্তু সরকার তাদের মুখের উপর ১৫০০ টাকার ভাতা ছুঁড়ে দিয়েছে। তারা ভিড় করেছে শহরের অলিতে গলিতে, বড় রাস্তায়, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায়।
কেউ বলছেন, এই টাকা দিয়ে চাকরির ফর্ম কিনবেন, কেউ বলছেন এই টাকা সংসারের কাজে লাগাবেন। কোথাও পিএইচডি করা যুবক ভাতার ফর্ম তুলতে গিয়ে লজ্জায় মুখ ঢাকছেন। আবার কোথাও বি টেক পাস করেও চাকরি না পাওয়া ছেলের জন্য ভাতার ফর্ম নিতে এসে কেঁদে ফেলছেন মা। ফর্ম নেওয়ার জন্য মহিলা ও যুবকদের মধ্যে হুড়োহুড়িতে কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। দিনভর টিভির পর্দায় আমরা সকলেই এই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করছি। দারিদ্র, বেকারত্বের কী ভয়ঙ্কর ছবি!
দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল ও গ্যাস কোম্পানি, রেল, বিএসএনএল সহ বহু দপ্তরে কোথাও নিয়োগ শূন্যতে নেমেছে, আবার কোথাও নিয়োগ হচ্ছে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। যেটুকু নিয়োগ হচ্ছে, তার একটা বড় অংশ অস্থায়ী চুক্তির ভিত্তিতে। ইতিমধ্যে বিলগ্নিকরণ ও বেসরকারিকরণের মাধ্যমে বহু রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে বেসরকারি মালিকের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের নেশায় সেখানেও চলছে দেদার ছাঁটাই। ইস্পাত, খনি থেকে শুরু করে সিমেন্ট, সারের মতো ভারী শিল্প ক্ষেত্রে নিয়োগ এক রকম নেই বললেই চলে, ছাঁটাই হচ্ছে নিয়ম করে। তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পেও মন্দা, ছাঁটাই লেগে আছে। ফলে ভিড় বাড়ছে অসংগঠিত শিল্প ক্ষেত্রে, বাড়ছে গিগ কর্মীর সংখ্যা, বাড়ছে বেকারদের আত্মহত্যার সংখ্যা। আবার এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে শ্রমিকদের উপর নেমে আসছে দুর্বিষহ শোষণ নিপীড়ন।
আসলে পুঁজিবাদী অর্থনীতি তার নিজের নিয়মেই বেকার তৈরি করে, বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে শ্রমিককে তার ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করে, তৈরি হয় মালিকের পুঁজির পাহাড়। আবার এই সমস্ত কিছুকে কেন্দ্র করে যখন শ্রমিকদের মধ্যে, বেকারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয় তখন সে তার আজ্ঞাবহ সরকারগুলিকে দিয়ে নানা প্রকল্পের কথা ঘোষণা করে, যাতে অসন্তোষ কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়।
দেশের সরকার, রাজ্যের সরকার এই সমস্ত কথা বিলক্ষণ জানে ও বোঝে। তাই কখনও দেশের প্রধানমন্ত্রী সিঙাড়া শিল্পের, কখনও আবার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী চপ শিল্পের মতো স্বনির্ভর কাজের কথা বলে যুবকদের ভোলানোর চেষ্টা করেন, কখনও একশো দিনের কাজের তত্ত্ব আওড়ান, আবার কখনও ভাতার আশ্রয় নেন। কিন্তু বেকার সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য যা করা দরকার তা করার ইচ্ছা কোনও সরকারেরই নেই।
পশ্চিমবঙ্গে সিপিএম-ফ্রন্ট সরকারের শেষের দিকে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে নথিভুক্ত বেকারের সংখ্যা পৌঁছেছিল প্রায় এক কোটিতে। বন্ধ হয়েছিল ছোট-বড় ৫৬ হাজার কল-কারখানা। রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনে বেকারত্বের এই সংখ্যা যে বিপুল পরিমাণে বেড়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজ্যের বিভিন্ন সারকারি দপ্তরে– প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক, গ্রুপ-ডি, গ্রুপ-সি, স্বাস্থ্য দপ্তর, পূর্ত দপ্তর, খাদ্য দপ্তর, বন বিভাগ, পুলিশ বিভাগে কয়েক লক্ষ শূন্য পদ থাকলেও নিয়োগ কার্যত নেই বললেই চলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়োগের নামে ব্যাপক দুর্নীতি। এই যখন বাস্তব পরিস্থিতি তখন এই বিপুল সংখ্যক শূন্যপদ পূরণের জন্য স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে যুবসাথী প্রকল্পের নামে যৎকিঞ্চিৎ ভাতা প্রদান শিক্ষিত বেকারদের সাথে এক ধরনের প্রতারণা, নির্ভেজাল ভোট কৌশল।
(এই লেখাটি গণদাবী ৭৮ বর্ষ ২৯ সংখ্যা ২৭ ফেব্রুয়ারি – ৫ মার্চ ২০২৬ এ প্রকাশিত)