Breaking News

মূল্যবৃদ্ধির চাপে পিষ্ট জনগণের উপর গ্যাসের দামবৃদ্ধির বোঝা চাপাল বিজেপি সরকার

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে দলের বিক্ষোভ মেছেদা, পূর্ব মেদিনীপুর

মূল্যবৃদ্ধির চাপে এমনিতেই দিশেহারা দেশের মানুষ। তার উপর নতুন করে রান্নার গ্যাসের দামবৃদ্ধির বোঝা চাপিয়ে দিল কেন্দে্রর বিজেপি সরকার। যুদ্ধের অজুহাতে গ্যাসের দাম সিলিন্ডার পিছু ৬০ টাকা বাড়িয়ে দেওয়া হল। বাণিজ্যিক সিলিন্ডারে বাড়ানো হল ১১৪.৫০ টাকা। গত এপ্রিলেই রান্নার গ্যাসের দাম ৫০ টাকা বাড়িয়েছিল বিজেপি সরকার। অথচ ইরানের উপর মার্কিন-ইজরায়েল হামলা শুরু হওয়ার পর থেকেই সরকারের দিক থেকে আশ্বাসবাণী শোনানো হচ্ছিল, দেশে গ্যাস-তেলের দাম বাড়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। সরকার দাবি করেছিল, দেশে ৩-৪ সপ্তাহের প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস মজুত রয়েছে। তাই যদি সত্যি হয়, তবে সরকার এক সপ্তাহের মধ্যেই দাম বাড়াল কেন?

তা ছাড়া সরকার নাকি সরকারি-বেসরকারি সমস্ত তেল শোধনাগারগুলিকে সর্বোচ্চ মাত্রায় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। উপরন্তু, আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস আসতে শুরু করেছে। তা হলে এ ভাবে অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে গ্যাসের দাম বাড়ানো হল কেন? তবে কি আমেরিকার চাপের কাছে মাথা নিচু করে চড়া দামে গ্যাস আমদানির খরচ সামাল দিতেই এই দামবৃদ্ধি? নাকি যুদ্ধকে অজুহাত করে দেশের একচেটিয়া পুঁজির মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফা লোটার সুযোগ করে দিতেই এই দামবৃদ্ধি? হিসাবে দেখা যাচ্ছে, দেশে গ্যাসের মোট সংযোগ ৩৩.৩ কোটি। এই বিপুল দামবৃদ্ধির ফলে সিলিন্ডার পিছু কোম্পানিগুলি প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায় করবে।

স্বাভাবিক ভাবেই এই মূল্যবৃদ্ধি দেশ জুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবল ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। সর্বত্র প্রশ্ন উঠছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে গত কয়েক বছর ধরে যখন তেল-গ্যাসের দাম এমনকি তলানিতে পৌঁছেছে, তখনও সরকার দেশীয় বাজারে এই সব পণ্যের দাম কমায়নি। তখন সরকার বলেছিল, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও যাতে দেশীয় বাজারে জ্বালানি পণ্যের দাম বাড়াতে না হয় তাই এখন দাম কমানো হচ্ছে না। তা হলে এখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কিছুটা বাড়তেই সঙ্গে সঙ্গে সরকার এত দাম বাড়াল কেন? দীর্ঘ সময় ধরে যে কোম্পানিগুলি আন্তর্জাতিক বাজারে সস্তা দামের সুযোগে বিপুল মুনাফা করে এসেছে তাদের উপর এখন কেন সামান্য বোঝাটুকুও চাপানো হল না? তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রী থেকে বিজেপির ছোট-বড় সব নেতাই উঠতে-বসতে বিশ্বের পঞ্চম শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি ভারত বলে যে গর্ব করেন, বাস্তবে তার কি এতটুকু মূল্যবৃদ্ধির ভার সহ্য করার ক্ষমতাটুকুও নেই? শুধু তাই নয়, কেন্দ্রীয় সরকার গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে বৃহৎ পুঁজিপতিদের ৬ লক্ষ কোটি টাকা ব্যাঙ্কঋণ হিসাবের খাতা থেকে মুছে দিয়েছে। সেই সরকার দেশের মূল্যবৃদ্ধি-বেকারি জর্জরিত সাধারণ মানুষের জন্য সামান্য ভরতুকিটুকু কোষাগার থেকে দেবে না কেন? প্রধানমন্ত্রী থেকে অন্য মন্ত্রী-আমলাদের বিদেশ সফর, অপব্যয়-বিলাসব্যসনের খরচ কমিয়ে জনসাধারণকে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্কট থেকে কিছুটা সুরাহা কেন সরকার দিল না? তা হলে এই সরকার কাদের স্বার্থে চলছে– পুঁজিপতি না জনসাধারণ তা বুঝতে কারও অসুবিধা হয় কি?

হরমুজ প্রণালী দিয়ে ইরান তার বিরোধী দেশগুলির জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় ভারতের তেল-গ্যাসের জাহাজগুলিও আটকে পড়েছে। ইরান ভারতের বহু দিনের মিত্র। ভারতীয় একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থে আমেরিকা এবং ইজরায়েলকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনেই-এর হত্যার নিন্দা জানানো দূরের কথা, শোকপ্রকাশ করতেই ভারত সরকারের লেগে গেল প্রায় এক সপ্তাহ! তা-ও দেশের মানুষের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার নিয়মরক্ষার শোকপ্রকাশ করেছে। আসলে ভারতীয় একচেটিয়া মালিকদের জন্য আমেরিকা-ইজরায়েলের দস্যুবৃত্তির বখরা নিশ্চিত করতে ভারত সরকার মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দিকেই বেশি ঝুঁকে আছে। কারণ, মধ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে সাম্রাজ্যবাদী লুঠ চালানোর জন্য ভারতীয় পুঁজিপতিদের দরকার মার্কিন পুঁজিপতিদের হাত ধরা। ভারত সরকার দেশের জনগণের ভাল-মন্দ থেকে শুরু করে বিশ্বে ভারতের সাথে ঐতিহাসিক ভাবে মিত্র হিসাবে চলা দেশগুলির পাশে দাঁড়ানোর কর্তব্যকে জলাঞ্জলি দিল।

যুদ্ধ আরও কিছু দিন ধরে চললে হয়তো দেখা যাবে সরকার জ্বালানি তেলের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থরক্ষায় অবিচল এই সরকারের জনগণকে দেওয়া কোনও প্রতিশ্রুতিই বিশ্বাসযোগ্য নয়। সে ক্ষেত্রে তেলের দামবৃদ্ধির অজুহাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়বে এবং জনজীবনকে তা আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। কিন্তু যুদ্ধবাজ শাসক ও পুঁজিপতিদের লুঠের ক্ষেত্র ভাগ-বাঁটোয়ারার মাঝে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবন কেন আরও সঙ্কটগ্রস্ত হবে? সে জন্য গ্যাসের বর্ধিত দাম অবিলম্বে প্রত্যাহার, পর্যাপ্ত সরকারি ভরতুকি দিয়ে মূল্যবৃদ্ধির কোপ থেকে জনগণকে বাঁচানোর এবং কোনও অজুহাতেই তেলের দাম না বাড়ানোর দাবিতে দেশের মানুষকে সোচ্চার হতে হবে।