Breaking News

বাজেটে জনসাধারণের কোনও আগ্রহ নেই কেন

কেন্দ্রীয় ও রাজ্য বাজেটে মিড-ডে মিল কর্মীদের চূড়ান্ত বঞ্চনার প্রতিবাদে ৬ ফেব্রুয়ারি এআইইউটিইউসি অনুমোদিত মিড-ডে মিল কর্মী ইউনিয়নের ডাকে কলকাতার মৌলালি মোড় অবরোধ করেন এবং বাজেটের প্রতিলিপি পোড়ান কর্মীরা।

সঙ্গত কারণেই বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের এখন আর আগ্রহ প্রায় নেই বললেই চলে। যাঁদের নির্দিষ্ট এবং যথেষ্ট পরিমাণ আয় রয়েছে তাঁদের আগ্রহ থাকে শুধুমাত্র কতটা পরিমাণে আয়কর ছাড় তাঁরা পাচ্ছেন তা নিয়ে। এ বার বাজেটে অবশ্য সেটুকুও নেই।

কিন্তু এই আগ্রহ না থাকার কারণ কী? কারণ, সাধারণ মানুষ নিত্যদিন যে সব সমস্যায় জর্জরিত, বাজেটে তার কোনও সমাধান দূরের কথা, সুরাহার ইঙ্গিতটুকুও খুঁজে পাওয়া যায় না। তা হলে বাজেটে কী থাকে? বাজেট মানে মোটের উপর সরকারের আগামী এক বছরের আয়-ব্যয়ের একটা পরিকল্পনা। কোন কোন খাত থেকে কী কী উপায়ে এবং কী কী হারে আয় হবে বা হতে পারে এবং কোন কোন খাতে কী পরিমাণে ব্যয় করা হবে তারই একটা হিসেব সরকার পেশ করে বাজেটে। তাই যদি হয় তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশবাসী বাজেট সম্পর্কে অনাগ্রহী হবেন কেন?


বছরের পর বছর ধরে পেশ হওয়া বাজেট খুঁটিয়ে লক্ষ করলেই স্পষ্ট হবে, সরকার যে আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা বাজেটে পেশ করে তার মূল লক্ষ্য দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ নন, দেশের পুঁজিপতি শ্রেণি। কী করলে শিল্পপতি-পুঁজিপতিরা আরও ভাল ভাবে ব্যবসা করতে পারবে, কলে-কারখানায় উৎপাদন করতে পারবে, উৎপাদিত পণ্য দেশের বাজারে বিক্রি করে মুনাফা করতে পারবে, বিদেশে রফতানি করতে পারবে, বাজেট কার্যত তারই পরিকল্পনা। তাই গোটা বাজেটে কোথাও জনজীবনের সমস্যা নিয়ে কথা নেই– মূল্যবৃদ্ধি রোধের কথা নেই, বিপুল পরিমাণ বেকার যুবসমাজের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা কী হবে, তার কোনও পরিকল্পনা নেই, শ্রমিকের যথাযথ মজুরি কিংবা শ্রমসময় নিয়ে কথা নেই, কৃষকদের ফসলের ন্যায্য দাম কিংবা চাষের অস্বাভাবিক ব্যয় কমানোর কোনও কথা নেই। বিরাট অংশের দেশবাসীর দারিদ্র মুক্তির কথা নেই। এমনকি দেশের সাধারণ মানুষের শিক্ষা কিংবা চিকিৎসার যে সংকট আজ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে তা মেটানোর কোনও প্রচেষ্টা নেই।

কাজের সংস্থান নেই

কিন্তু দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য যদি ঠিক মতো চলে, কল-কারখানায় যদি উৎপাদনে জোয়ার আসে তবে তো কর্মসংস্থান আপন নিয়মেই হবে, জনজীবনে উন্নয়নও চুঁইয়ে পড়তে থাকবে, তা আলাদা করে বলার কি সত্যিই প্রয়োজন আছে? হ্যাঁ, সরকারের নেতা-মন্ত্রীরা, সরকার অনুগৃহীত অর্থনীতিবিদরা এমন কথাই বলেন বটে! যেমন ব্যবসায়ীরা, কলকারখানার মালিকরা বলেন, তাঁদের সমস্ত আয়োজনের উদ্দেশ্য দেশের বেকারদের কর্মসংস্থান। তা হলে বছরের পর বছর অজস্র বাজেটে শিল্পপতি পুঁজিপতিদের ব্যবসা করার, অবাধে মুনাফা করার সমস্ত সুযোগ দিয়েও কর্মসংস্থানের সুযোগ এক ইঞ্চিও বাড়ল না কেন? কারণ তাঁদের বলা কথাগুলির সঙ্গে বাস্তবের কোনও সম্পর্ক নেই। পুঁজিপতিদের অজস্র রকমের সুযোগ-সুবিধা দিয়েও নতুন বিনিয়োগ, নতুন কলকারখানা বাস্তবে হচ্ছে না। যতটুকু হচ্ছে, তা ক্যাপিটাল ইনটেনসিভ তথা পুঁজিনিবিড়– শ্রমনিবিড় অর্থাৎ কর্মসংস্থান নির্ভর নয়। ফলে নতুন বিনিয়োগ কোথাও হলেও, উৎপাদনের নতুন একটা ক্ষেত্র গড়ে উঠলেও তা সবই প্রযুক্তিনির্ভর। আধুনিক উৎপাদন শিল্প উচ্চ-প্রযুক্তি নির্ভর– কর্মসংস্থান সেখানে নামমাত্র– তা-ও উচ্চ-প্রশিক্ষিতদের জন্য। তার বাইরে বিরাট সংখ্যক বেকারদের তা হলে কর্মসংস্থান ঘটবে কী করে?

অসংগঠিত শ্রমক্ষেত্রে শোষণ সীমাহীন

ফলে বাড়ছে অসংগঠিত শ্রমক্ষেত্রের পরিমাণ। তা নির্মাণ শিল্প হোক বা হোম ডেলিভারি কিংবা গিগ ক্ষেত্র। দেশে এমন অসংগঠিত ক্ষেত্রগুলির আয়তন দ্রুত হারে বাড়লেও বাজেটে এখানে কর্মরতদের নূ্যনতম মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা প্রভৃতি বিষয়ে একটি কথাও বলেননি অর্থমন্ত্রী। এমনকি তাঁদের কাজের নিশ্চয়তাটিও আইনের দ্বারা সুরক্ষিত নয়– সম্পূর্ণ মালিকের মর্জি-নির্ভর। ফলে সমাজের বড় অংশের শ্রমিক-কর্মচারী আজ দেশে সীমাহীন মালিকী শোষণের শিকার– সেই মালিক দেশি হোক বা বিদেশি। একই রকম ভাবে দেশ জুড়ে বিরাট অংশের যুব সমাজ কাজের সন্ধানে এক রাজ্য থেকে আর এক রাজ্যে ছুটছেন। সেখানে এমনকি তাঁরা ভাষাগত, প্রদেশগত বিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন। এই পরিযায়ী শ্রমিকদের সুরক্ষা ও সহায়তা সংক্রান্ত একটি কথাও বাজেটে নেই।

জনকল্যাণ খাতে খরচ ক্রমাগত কমানো হচ্ছে

জনকল্যাণ যে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের অগ্রাধিকার নয়, তা আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠল সামাজিক উন্নয়ন খাতে ব্যাপক বরাদ্দ ছাঁটাইয়ে। সাধারণ মানুষের জীবনের মানোন্নয়ন ঘটানো সরকারের লক্ষ্য হিসাবে না থাকায় ২০২৫-২৬ এ সামাজিক ক্ষেত্রে বাজেটে যত বরাদ্দ হয়েছিল তার বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করাই হয়নি। অথচ এমন নয় যে, দেশের মানুষের বিশুদ্ধ পানীয় জলের প্রয়োজন সরকার মিটিয়ে ফেলেছে। আজও দেশের বিস্তীর্ণ অংশে নলবাহিত পানীয় জল পৌঁছায়নি। বহু মানুষকেই অনেক দূর থেকে পানীয় জল সংগ্রহ করতে হয়। সদ্যই মধ্যপ্রদেশে দূষিত জল খেয়ে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটে গেছে। তা ছাড়া বিশুদ্ধ পানীয় জল সুলভ না হওয়ায় বোতলজাত পানীয় জল কিনে খেতে হওয়ায় সাধারণ মানুষকে এর জন্য ভাল পরিমাণ ব্যয় করতে হয়। সরকারের জনবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিই এর জন্য দায়ী। একই রকম ভাবে পিএম-আবাস, গ্রামোন্নয়ন, সমাজকল্যাণ, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যখাতে এ ভাবেই বিপুল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ ছাঁটাই করা হয়েছে। এ থেকে স্পষ্ট যে, বাজেটে বরাদ্দ বলে অর্থমন্ত্রী যা ঘোষণা করেন বাস্তবের সঙ্গে তার মিল নেই। তা ছাড়া এই বরাদ্দ ছাঁটাই সাধারণ মানুষের জীবন-সংগ্রামকে আরও কঠিন করে তুলবে এবং মানুষের কেনার ক্ষমতাকেও আরও নিচে নামাবে।

বঞ্চনার শিকার স্বাস্থ্যকর্মী সহ স্কিম কর্মীরা

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যে লক্ষ লক্ষ আশাকর্মী ও পৌর স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর নির্ভর করে দাঁড়িয়ে আছে, তাঁরা চূড়ান্ত সরকারি বঞ্চনার শিকার। বাজেটে তাঁদের বঞ্চনা নিরসনে কোনও ব্যবস্থার কথা বলা হয়নি। সরকারের একই মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে মিড ডে মিল কর্মী এবং অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের ক্ষেত্রেও।

পুঁজিপতিদের জন্য দরাজ সরকার

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সবার আগে আমেরিকা’ নীতির কল্যাণে ভারতীয় পণ্যের উপর বিপুল পরিমাণ কর চাপানোয় ভারতীয় পণ্যের মার্কিন রফতানি প্রবল অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এই অবস্থায় অন্যত্র রফতানি বাড়াতে সরকার রফতানি দ্রব্যে প্রয়োজনীয় উপাদান এবং যন্ত্রাংশ আমদানিতে ব্যাপক ছাড় ঘোষণা করেছে। আমদানি-রফতানিকারী বৃহৎ ব্যবসায়ীদের পুঁজি জোগানোর জন্যও বাজেটে বিপুল বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

পুঁজিপতিদের জন্য পরিকাঠামো গড়ে দিতে এ বার পরিকাঠামো নির্মাণ খাতে ব্যয়বরাদ্দ ১১.৪ শতাংশ বাড়িয়ে ১২.২ লক্ষ কোটি টাকা করেছেন অর্থমন্ত্রী। এতে যেমন ঝাঁ চকচকে হাইওয়ে গড়ে তোলা হবে তেমনই হাইস্পিড রেল করিডর গড়ে তোলা হবে। আর তাতে চুঁইয়ে পড়া কিছু কর্মসংস্থানও হবে। যদিও এই নির্মাণ সবই উচ্চ-প্রযুক্তি নির্ভর। তাই কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নগণ্যই।

ঋণ করে ধনীদের ঋণ শোধ করছে সরকার

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে শোধ করে না বৃহৎ পুঁজির মালিকরা। ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ এই শোধ না হওয়া ঋণের বড় অংশ প্রতি বছর তাদের খাতা থেকে মুছে দেয়।

গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি মোট যত ঋণ দিয়েছে, তার মধ্যে অনুৎপাদক সম্পদ বা এনপিএ-তে পরিণত হয়েছে ৬ লক্ষ ১৫ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা। এই বিপুল টাকা ব্যাঙ্ক তাদের হিসাবের খাতা থেকে মুছে দিয়েছে বলে সংসদে গত ৮ ডিসেম্বর এক প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধরি। সরকার ঋণ করে হলেও এই টাকা ব্যাঙ্কগুলিকে ফিরিয়ে দেয়। এক দিকে যেমন যে টাকা পুঁজিপতিরা লোপাট করে তা জনগণের ঘাম-রক্তের বিনিময়ে জমানো টাকা, তেমনই সরকার যে ঋণ করে এই টাকা ব্যাঙ্কগুলিকে ফিরিয়ে দেয় সে টাকাও শোধ হয় নিরন্ন জনতার ঘাড় ভেঙে। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে জমা টাকার পরিমাণ প্রায় ২৩১.৯০ লক্ষ কোটি টাকা যার ৮০ শতাংশেরও বেশি সাধারণ মানুষের।

সরকারকে এ বার খরচ ও রাজস্ব আয়ের ফারাক মেটাতে ১৭ লক্ষ কোটি টাকা ধার করতে হবে। এর মধ্যে ১৪ লক্ষ কোটি টাকাই যাবে মোট ঋণের সুদ গুনতে। আগামী অর্থ বছরে মোট ঋণের পরিমাণ ২১৪ লক্ষ কোটি টাকা ছাপিয়ে যাবে। যা ২০১৪ সালের ঋণের তুলনায় প্রায় চার গুণ।

প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি অর্থনীতির আরও সামরিকীকরণ করতেই

পুঁজিপতি শ্রেণির তীব্র শোষণে দেশের মানুষের কেনার ক্ষমতা যখন তলানিতে পৌঁছে যায়, তখন পুঁজিপতিদের মুনাফা অটুট রাখতে সরকার অর্থনীতির সামরিকীকরণ করে। সামরিক সরঞ্জাম, অস্ত্রশস্ত্র, প্রতিরক্ষা সামগ্রী উৎপাদনের ছাড়পত্র দেওয়া হয় বেসরকারি কোম্পানিগুলিকে। কোম্পানিগুলি উৎপাদিত সামগ্রী যেমন নিজেরা রফতানি করে, তেমনই তার বড় অংশ সরকার নিজে কিনে নেয়। তাই উৎপাদন ক্ষেত্রে অস্ত্র উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলিরই রমরমা। অন্য দিকে প্রায় সমস্ত বড় বড় কোম্পানিই এখন কোনও না কোনও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। বিশ্বের ছোট-বড় সমস্ত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রই আজ অর্থনীতির সামরিকীকরণের পথে ছুটে চলেছে। তাই বিশ্বের কোথাও না কোথাও ছোট হোক, বড় হোক যুদ্ধ লেগেই আছে এবং এমন প্রতিটি যুদ্ধেই কোনও না কোনও ভাবে প্রায় সব রাষ্ট্রই যুক্ত হয়ে পড়ছে। তাই কোথাও শান্তির কোনও প্রচেষ্টা নেই। তা সে ইউক্রেনের যুদ্ধ হোক কিংবা প্যালেস্টাইনের উপর ইজরায়েলের হামলা হোক। যে প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার পক্ষে ভারত চিরকাল দাঁড়িয়েছে, এই যুদ্ধে যে তা পারল না তার কারণ এই যুদ্ধে অস্ত্রব্যবসায়ী ভারতীয় কোম্পানিগুলির স্বার্থ সরাসরি জড়িয়ে রয়েছে। বাস্তবে এই কোম্পানিগুলিই ভারতের বিদেশ নীতি তথা যুদ্ধনীতি যেমন নিয়ন্ত্রণ করছে, তেমনই প্রতিরক্ষা বরাদ্দ তথা বাজেটটিও তাদেরই পরামর্শে প্রস্তুত।

অর্থনীতির এই সামরিকীকরণের নীতির পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে এ বারের বাজেটে। গত বছরের বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতের জন্য ধার্য হয়েছিল মোট ৬.৮১ লক্ষ কোটি টাকা। এ বার ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি বাড়িয়ে করা হল ৭.৮৫ লক্ষ কোটি টাকা। যা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) ১১ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ২.১৯ লক্ষ কোটি টাকা িআধুনিক প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং আধুনিকীকরণের কাজে ব্যয় করা হবে। এর বাইরেও মূল বাজেট থেকে ১.৮৫ লক্ষ কোটি টাকা খরচ করা হবে নতুন সামরিক সরঞ্জাম কেনার জন্য।

যে কোনও পুঁজিবাদী রাষ্ট্র দেশ বলতে বোঝে দেশের পুঁজিপতি শ্রেণি আর সীমান্ত বেষ্টিত এক ভূখণ্ডকে। দেশের সাধারণ মানুষকে নয়। তাই সব সময়ই তারা দেশের মানুষকে অভুক্ত রেখে, শিক্ষাহীন, চিকিৎসাহীন অবস্থায় ফেলে রেখে দেশরক্ষার কথা বলে। আর সেই খাদ্যহীন, শিক্ষাহীন, চিকিৎসাহীন দেশবাসীকে দিয়ে প্রতিরক্ষা খাতে এই বিপুল খরচকে অনুমোদন করিয়ে নিতে চায়। তার জন্য সব সময়ই তারা কিছু কাল্পনিক শত্রু খাড়া করে আর সেই শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার জুজু দেখায়। তাই সরকারের মন্ত্রীরা, সরকারের অনুগত কলমচিরা, সরকারি অর্থে পুষ্ট বিশেষজ্ঞরা এমনকি প্রতিবেশী প্রতিটি দেশকেই শত্রু প্রতিপন্ন করে তুলে ধরে। চিনের সঙ্গে সীমান্ত নিয়ে মতপার্থক্যকে প্রচার করতে থাকে যুদ্ধ কিংবা যুদ্ধের সম্ভাবনা বলে। সবাই জানে পাকিস্তানের যা অর্থনৈতিক কিংবা সামরিক শক্তি তাতে ভারতের মতো সামরিক শক্তিশালী একটি দেশকে আক্রমণ করতে সে সহজে সাহস করবে না। ঠিক তেমনই, বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্র সামরিক দিক থেকে যার শত্রুতা করার মতো কোনও শক্তিই নেই, সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলি তার দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার গল্পও বাতাসে ভাসিয়ে চলেছে। এ সবেরই লক্ষ্য এ দেশের একচেটিয়া পুঁজিপতিদের স্বার্থে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এবং তাদের উৎপাদিত অস্ত্র এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরকারকে গছিয়ে দেওয়া। প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে বর্তমানে ভারতের যে বৈরিতা, তার বেশির ভাগটাই বিজেপি সরকারের কূটনৈতিক ব্যর্থতার কারণে। যে শাসক দল দেশের মানুষকেই ধর্মের ভিত্তিতে, জাতের ভিত্তিতে, ভাষার ভিত্তিতে, প্রদেশের ভিত্তিতে শত-বিভক্ত করে রাখে, তার কাছে দেশরক্ষা বিষয়ে এর থেকে বেশি কিছু আশা করা বৃথা।

বৈষম্য বাড়তেই থাকবে

গোটা বাজেট জুড়ে যখন পুঁজিপতিদের জন্য অজস্র উপঢৌকনের ব্যবস্থা তখন জনগণের জন্য বিভিন্ন খাতে যে সামান্য পরিমাণ ভর্তুকিটুকু দেওয়া হত তাকেও ক্রমাগত কমিয়ে আনছে সরকার। বাজেটে খাদ্য, সার এবং জ্বালানির ভর্তুকি কমানোর কথা জানিয়ে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। গত বারের ৪,২৯,৭৩৫ কোটি থেকে এর পরিমাণ ৪.৪৭ শতাংশ কমিয়ে এ বার করা হয়েছে ৪,১০,৪৯৫ কোটি টাকা।

সেই কবে, ১৯৭৪ সালের এক ভাষণে এ যুগের অন্যতম মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক শিবদাস ঘোষ বলে গিয়েছিলেন, পুঁজিপতি শ্রেণির দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র পুঁজিবাদকে টিকিয়ে রাখবার জন্য, পুঁজিবাদকে সংহত ও শক্তিশালী করবার জন্য, পুঁজিবাদকে তার সংকট থেকে বাঁচাবার জন্য যা যা করা দরকার সেই কাজগুলোই করে থাকে। ফলে আজকের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, জাতীয় পরিস্থিতি, বিশ্ব-পুঁজিবাদী বাজারের সংকটের় মধ্যে বর্তমান বাজেটও যে পুঁজিবাদকেই সংহত হতে, তাকে সংকট থেকে বাঁচতে সাহায্য করার জন্য, এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

স্বাভাবিক ভাবেই বাজেট তথা পুঁজিবাদী এই নীতির ফল হিসাবে আগামী দিনগুলিতে দেশে ধনী-দরিদ্রে বৈষম্য যে গতিতে বাড়ছে তা আরও তীব্র হবে। ধনীদের হাতে আরও বেশি সম্পদ কুক্ষিগত হবে। দরিদ্র আরও বেশি দারিদ্রের মধ্যে তলিয়ে যাবে।

যতক্ষণ না দেশের শ্রমিক কৃষক সাধারণ মানুষ পুঁজিবাদী অর্থনীতির মালিকী ভিত্তিটা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার অধিকারী হচ্ছে এবং এই সরকার পাল্টে পুঁজিবাদীদেরই আর একটা সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়ে নিজেদের শোষণমুক্তি ঘটানোর চিন্তার মধ্যে ভুলটা ধরতে পারছে তত দিন হাজার বাজেটের পরেও মানুষের জীবন-যন্ত্রণাই শুধু বাড়তে থাকবে।