
সমাজমাধ্যমে দেখলাম কসবা আইন কলেজের ভিতরে ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা প্রসঙ্গে দলীয় জনসভায় দাঁড়িয়ে সিপিএম-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক এবং পলিটবুরো সদস্য মাননীয় সেলিম সাহেব উপস্থিত শ্রোতাদের প্রশ্ন করছেন, তদন্তকারী পুলিশ অফিসারকে কীসের বাচ্চা বলা হবে? শ্রোতারা সোৎসাহে কদর্য গালিতে উল্লেখিত প্রাণীটির নাম করছেন। সেলিম সাহেব উৎসাহে আরও দু-বার প্রশ্নটি করেছেন এবং শ্রোতারা একই উত্তর দিয়েছেন। তাঁদের দলের প্রচারের আলোকে থাকা যুব নেত্রী, তথা কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তৃণমূলের মুখপাত্রের নাম করে ‘বরাহনন্দন’ শব্দটির চলিত প্রয়োগে তাঁকে সম্বোধন করেছেন। এর আগে তাঁদের দল ক্ষমতায় থাকাকালীন দলের এক বর্ষীয়ান সাংসদ তদানীন্তন বিরোধী নেত্রীর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখেছিলেন তাঁর কোন ‘খরিদ্দার’ আন্দোলন চালাবার এত টাকা দিচ্ছে?
এ কথা ঠিক আজকের ভারতে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অধিকাংশের রুচি-সংস্কৃতির মান যে তলানিতে নেমেছে তাতে হয়ত এই কুকথার স্রোতে অনেকেই অবাক হবেন না। কিন্তু একটি মার্ক্সবাদী বলে দাবি করা দলের নেতাদের এই আচরণ বিশেষভাবে ব্যথা দেয় এই কারণে যে, মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের আদর্শ হচ্ছে এ যুগের সর্বোন্নত আদর্শ। উন্নত চিন্তা, উন্নত আদর্শ, উন্নত দর্শন তো উন্নত সংস্কৃতি উন্নত নৈতিকতাবোধ উন্নত আচার আচরণের ভিত্তিভূমি। ‘যে কোনও বড় আদর্শের মর্মবস্তু নিহিত থাকে তার উন্নত রুচি-সংস্কৃতির মধ্যে’– মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক শিবদাস ঘোষের এই কথাটিকে কোনও মার্ক্সবাদী অস্বীকার করতে পারেন না। মার্ক্সবাদী আদর্শে যথার্থই দীক্ষিত কেউ তীব্র ক্ষোভ এবং প্রতিবাদ ধ্বনিত করার সময়েও অশ্লীল শব্দ দূরের কথা, কোনও নিম্নরুচির শব্দও প্রয়োগ করতে পারেন না। অথচ সিপিএম দলের উচ্চ নেতৃত্বও নির্দ্বিধায় আসর মাত করতে অশ্লীল শব্দকেই হাতিয়ার করছেন। তাঁদের দলের নেতা-কর্মীরাও এই আচরণকেই রাজনীতির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করছেন। বিজেপি, তৃণমূল, কংগ্রেস ইত্যাদি দলের সাথে তথাকথিত এই বামপন্থীদের ঝান্ডার রং ছাড়া অন্য পার্থক্য থাকছে কোথায়?
বিপদটা এই যে, সিপিএমকেই বাজারের প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম একমাত্র বাম এবং কমিউনিস্ট হিসাবে তুলে ধরে। যেন তাদের দলের ভোট সংখ্যা বাড়া কিংবা কমাতেই বাম-সংস্কৃতি-রাজনীতির এগনো পিছানো নির্ভর করে। ফলে জনমানসে তাদের এই অভব্য, অশালীন আচরণই ‘কমিউনিস্ট সংস্কৃতি’ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। যার দৌলতে বাজারি সংবাদমাধ্যম দক্ষিণপন্থী, সাম্প্রদায়িক ক্ষমতালোভী রাজনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে বামপন্থাকে এক পংক্তিতে বসিয়ে দিতে পারে। এ ভাবে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যায় ‘সবাই সমান’, ভোটের জন্য সকলেই যেমন খুশি আচরণ করতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে বামপন্থার। আশা করি নেতারা না বুঝলেও বামপন্থার প্রতি আকর্ষণ আছে সিপিএমের যে কর্মী-সমর্থকদের তারা কথাটা বোঝার চেষ্টা করবেন।
সুবর্ণ গুপ্ত, কলকাতা ৩১
এই লেখাটি গণদাবী ৭৭ বর্ষ ৪৭ সংখ্যা ৪ – ১০ জুলাই ২০২৫ এ প্রকাশিত