Breaking News

নেতাদের তরজা, ১০০ দিনের কাজটুকুও হাতছাড়া পশ্চিমবঙ্গে

দক্ষিণ ২৪ পরগণার আরতি মণ্ডল ৫৫ বছর বয়সে কাজের খোঁজে তামিলনাড়ুর উদ্দেশে ট্রেনে চেপে বসলেন। স্বামী অসুস্থ, পরিবারের হাল ধরতে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করার জন্য ভিনরাজ্যে পাড়ি দিলেন স্বজন-প্রতিবেশীদের ছেড়ে। বাড়ি ছেড়ে এতদূর কেন? উত্তর এল, এখানে কাজ কই? আগে যদিও ১০০ দিনের কাজে কিছু টাকা পেতাম, এখন তাও নেই। কী করে চলবে সংসার, ভাত-ই বা জুটবে কী করে? আরতি দেবীর মতো অবস্থা রাজ্যের বহু মানুষেরই। হাইকোর্ট সব জবকার্ডধারীকে ১০০ দিনের কাজ দেওয়ার কথা বললেও আরতির মতো বহু জন হন্যে হয়ে কাজ খুঁজছেন।

বেকার জীবনে ১০০ দিনের কাজ কিছুটা হলেও আশার আলো, হতদরিদ্র পরিবারে কয়েক দিনের ভাতের সংস্থান। গ্রাম-শহরের বহু সংসারে কিছুটা হলেও সুরাহা দেয় এই প্রকল্প। ২০০৫-এর ‘মহাত্মা গান্ধী ন্যাশনাল রুরাল এমপ্লয়মেন্ট গ্যারান্টি অ্যাক্ট’ (এমনারেগা) আইনে ১০০ দিনের কাজ পাওয়া প্রত্যেক আবেদনকারীর অধিকার। এটা কেন্দ্রীয় প্রকল্প হলেও জব কার্ডের মাধ্যমে রাজ্য সরকার এই কাজ বণ্টন করে। কিন্তু গত তিন বছর এই প্রকল্পে কাজ দেওয়া বন্ধ পশ্চিমবঙ্গে। এই প্রকল্পে দু’ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতিতে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতারা। টাকা নয়ছয়ের কারণ দেখিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ রেখেছে এ রাজ্যে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই হঠকারী সিদ্ধান্তে সমস্যায় পড়েছেন এ রাজ্যের গরিব মানুষ। দুর্নীতি আটকানো দরকার। কিন্তু দুর্নীতির অজুহাতে প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া তো গরিব মানুষগুলিকে অনাহারের দিকে ঠেলে দেওয়া। রাজ্য সরকার কেন্দ্র সরকারকে দোষারোপ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে। প্রকল্পকে দুর্নীতিমুক্ত করার কোনও চেষ্টা নেই তাদের। দুই সরকারের টানাপোড়েনে গরিব মানুষগুলি কাজ হারাচ্ছে।

সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্ট এই অচলাবস্থায় হস্তক্ষেপ করে ১ আগস্ট থেকে প্রকল্প আবার শুরু করার নির্দেশ দিয়েছে। ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধিতে জেরবার গ্রামীণ মজুররা আরও কত গরিব হয়েছে, কী হারে পরিযায়ী শ্রমিক বেড়ে চলেছে, বেকারির তালিকা কত লম্বা হয়েছে, দারিদ্র ও অপুষ্টি কত বেড়েছে, তার খবর তো এই শাসক দলগুলির কারওরই রাখার দরকার পড়ে না! ২০২৫-এর ১ এপ্রিল থেকে এই প্রকল্পে দৈনিক মজুরি ৩৪৯ টাকা থেকে অনেক টালবাহানার পর নামমাত্র বেড়ে হয়েছে ৩৭০ টাকা। তা-ও বছরে মাত্র ১০০ দিন কাজ। বাকি ২৬৫ দিন এই মানুষগুলির কোনও নির্দিষ্ট কাজ নেই, আয়ও নেই। ফলে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন প্রান্তিক মানুষেরা।

বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিও পিছিয়ে নেই দুর্নীতিতে। উত্তরপ্রদেশে ২০২২-২৩-এ এই প্রকল্পে ৭.৪৩ লক্ষ ভুয়ো জব কার্ড বাতিল হয়েছে। ওই রাজ্যের সম্বলে বহু মৃত ব্যক্তির জব কার্ড দেখিয়ে টাকা তোলা হয়েছে। এমনই এক ঘটনা প্রসঙ্গে সঞ্জীব কুমার নামে এক ব্যক্তি বলেন, তাঁর ঠাকুরদা ২০২০ সালে মারা যাওয়ার পরেও তার নামে টাকা তোলা হত। কিছুদিন আগে সরকারি আধিকারিকরা অনুসন্ধানে আসতেই বিষয়টি জানা গেছে। এমনকি উত্তরপ্রদেশে মুলায়ম সিং যাদব ইন্টার কলেজের প্রিন্সিপাল ঋষিপাল সিংয়ের নামেও জবকার্ড রয়েছে এবং তাতে টাকা তোলার অভিযোগ এসেছে।

সম্প্রতি বিজেপি শাসিত গুজরাটে আদিবাসী অধ্যুষিত দাহোদ এলাকায় এই প্রকল্পে ৭১ কোটি টাকার দুর্নীতিতে পঞ্চায়েত মন্ত্রী বাচ্চু খাবড়ের এক ছেলে গ্রেপ্তার হয়েছে। আর এক ছেলে সহ আরও অনেকেই অভিযুক্ত। এই ঘটনা গরিব মানুষের প্রকল্প নিয়ে বিজেপি নেতাদের পরিকল্পনামাফিক ডাকাতি ছাড়া আর কিছু নয়। এই দুর্নীতির তদন্ত হওয়া দরকার। পঞ্চায়েত মন্ত্রীকে অপসারণের দাবি উঠলেও বিজেপি নেতৃত্ব চুপ।

উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাটে ১০০ দিনের প্রকল্পে দুর্নীতিতে বিজেপি নেতারা জড়িয়ে পড়ায় পশ্চিমবঙ্গে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাদের যেন ধড়ে প্রাণ এসেছে। তারা যুক্তি করছেন, আমরা দুর্নীতি করলেই দোষ! বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে দুর্নীতি হলে যদি প্রকল্পের বরাদ্দ বন্ধ হয়, তা হলে উত্তরপ্রদেশ, গুজরাটেও তো দুর্নীতি হয়েছে। সেখানে বরাদ্দ বন্ধ হচ্ছে না কেন, সেখানে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার বলে? পারস্পরিক অভিযোগের তির ছোড়াছুড়ি চলছে। কিন্তু তাতে না বন্ধ হচ্ছে দুর্নীতি, না চালু হচ্ছে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রকল্প।

জবকার্ডের মাধ্যমে দিন গুজরান করেন যারা, তারা কীভাবে বেঁচে থাকবেন, তা নিয়ে এতটুকু মাথাব্যথা নেই বিজেপি বা তৃণমূল সরকারের। বিজেপি নেতারা যতই ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’-এর কথা বলুন, এই মানুষগুলির জন্য এতটুকু দরদবোধ থাকলে গত কয়েক বছরে এই প্রকল্পের বরাদ্দ ক্রমাগত কমিয়েই যেতেন না। অসহনীয় এই মূল্যবৃদ্ধির বাজারে যখন প্রয়োজন ছিল বরাদ্দ আরও বাড়ানো, তখন একদিকে বরাদ্দ কমিয়ে, অন্য দিকে জবকার্ডে দুর্নীতির অভিযোগে প্রকল্প বন্ধ করে দিয়ে আসলে সাধারণ মানুষকে ‘হাতে না মেরে ভাতে মারার’ই কৌশল নিচ্ছেন তারা। আর দুর্নীতি দেখে চোখ বুজে থাকা তৃণমূল কংগ্রেস নেতারা ভোটের আগে সস্তা চমকে রাজ্যের মানুষকে ভোলাতে এই প্রকল্পের পাওনা-বরাদ্দ নিয়ে মায়াকান্না কাঁদছে!