
হিরোসিমা-নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা ফেলে লক্ষাধিক মানুষকে নিমেষে হত্যা করেছিল কারা? সারা বিশ্বের যে কোনও মানুষই উত্তরটা জানেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ২ কোটি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাড়ে ৮ কোটি মানুষের হত্যাকারী কারা? কারা ইরাকে ধ্বংসলীলা চালিয়েছে? ভিয়েতনামে বেআইনি দখলদারি এবং ৩০ লক্ষ মানুষের নৃশংস হত্যাকাণ্ড, কম্বোডিয়া-লাওসে প্রায় ৪ লক্ষ মানুষকে হত্যা, ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ খুন, কোরিয়ায় অন্যায় যুদ্ধে ৩০ লক্ষ হত্যার জন্য দায়ী কারা? কারা গাজা ভূখণ্ডে সদ্য এক লক্ষের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে? কারা বছরের পর বছর সিরিয়া সহ মধ্যপ্রাচ্যে একটানা হত্যাকাণ্ড চালিয়ে গেছে? কারা ইউক্রেনে যুদ্ধ চালাচ্ছে? এর কোনওটির উত্তর অজানা নয়। এই সমস্ত যুদ্ধ মিলিয়ে যে বেশ কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে তার কোনওটির জন্যই কি কমিউনিস্টরা দায়ী? বিশ্বের মানুষ জানে– না। ইতিহাসের কোনও যুদ্ধ-গণহত্যার জন্যই কোনও সমাজতান্ত্রিক দেশের শাসক কিংবা কমিউনিস্টদের হাত নেই। প্রত্যেকটির জন্য দায়ী সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী শাসকরা। অথচ, সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের বর্তমান পাণ্ডা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলে দিলেন কমিউনিস্টরা নাকি ১০০ মিলিয়ন (১০ কোটি) মানুষকে হত্যা করেছে! এই অভিযোগ তুলেই তিনি ডাক দিয়েছিলেন আমেরিকা জুড়ে ২ থেকে ৮ নভেম্বর ‘অ্যান্টি কমিউনিজম উইক’ কমিউনিজম বিরোধী সপ্তাহ পালনের।
ট্রাম্প সাহেবের সমস্যা হল, তাঁর সমর্থিত প্রার্থীকে হারিয়ে সম্প্রতি নিউইয়র্কের মেয়র পদে জোহরান মামদানি নির্বাচিত হয়েছেন। ট্রাম্প সাহেব তাঁকে ‘কমিউনিস্ট’ বলে আখ্যা দিয়ে ভেবেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের প্রচারিত কমিউনিস্ট বিরোধী জিগির মানুষকে ভয় পাইয়ে দেবে। কিন্তু দেখা গেল ট্রাম্প যত মামদানিকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ এমনকি ‘কমিউনিস্ট’ বলেছেন, তত নিউইয়র্কের সাধারণ মানুষের মধ্যে মামদানির সমর্থন বেড়ে গেছে। এ কারণেই ক্ষিপ্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১ নভেম্বর সরকারি বিবৃতি জারি করে বলেছেন, ‘এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে কমিউনিজম মানুষের জন্য এনেছে শুধু ধ্বংস। যেখানেই এর বিস্তার ঘটেছে বিরোধিতাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে, বিশ্বাসকে শাস্তি দিয়েছে, রাষ্টে্রর শক্তির সামনে হাঁটুগেড়ে বসে স্বাধীনতাকে জলাঞ্জলি দিতে বাধ্য করেছে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। এর কাহিনি লেখা হয়েছে রক্ত এবং দুঃখের অক্ষরে। কমিউনিজম হল দাসত্বের আর এক নাম।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ৩৪ বছর ধরে গণতন্ত্রের জয়জয়কার চলছে’। বলেছেন, ‘সামাজিক ন্যায়’ এবং ‘গণতান্ত্রিক সমাজবাদের’ জামা গায়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ জারি রাখার জন্য পুরনো মিথ্যাকে আবার সামনে আনা হচ্ছে।
ট্রাম্প সাহেবরা মানুষকে বড় বেশি বোকা এবং স্মৃতিহীন ভাবেন। এই দুনিয়াতে ধ্বংসের কারিগরদের কীর্তির যে তালিকা নিবন্ধের শুরুতেই দেওয়া হয়েছে তা ট্রাম্প থেকে শুরু করে পুঁজিবাদী দুনিয়ার কোনও কর্তার সাধ্য নেই অস্বীকার করার। যদিও বারে বারে দুর্ভিক্ষ-মহামারি থেকে শুরু করে গৃহযুদ্ধে নিহত মানুষের কবর দেখিয়ে তারা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ তুলেছে, আর প্রতি বারেই তা মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। আর, কারা বিরোধী কণ্ঠস্বরকে গলা টিপে মেরেছে, রাষ্ট্রের শক্তির সামনে নতজানু হতে মানুষকে বাধ্য করেছে? কমিউনিস্টরা? আগেকার বুর্জোয়া শাসকরা হলে তবু বলা যেত একটু পড়াশোনা করে দেখুন। ট্রাম্প-মোদিদের ‘পোস্টট্রুথ’ জমানায় ও সবের বালাই শাসকদের নেই। না হলে বলা যেত, ইতিহাস না হয় নাই পড়লেন, ওই আমেরিকার মাটিতেই লেখা হাওয়ার্ড ফাস্টের উপন্যাস ‘সাইলাস টিম্বারম্যান’টা অন্তত ট্রাম্প সাহেব একবার পাতা উল্টে দেখে নিন। কমিউনিজমের ভূত খুঁজতে কী নির্মম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস একজন আদর্শবাদী অধ্যাপকের ওপর নামিয়ে এনেছিল মার্কিন শাসকরা, তার জীবন্ত চিত্র দেখতে পাবেন। জানা নেই ট্রাম্প সাহেব জানেন কি না, চার্লি চ্যাপলিনকে কেন আমেরিকা থেকে বহিষ্কৃত হতে হয়েছিল। তিনি কি পল রবসন, জোন বয়েজ, পিট সিগারদের নাম জানেন? জানলে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন, এই শিল্পীদের রাষ্টে্রর কাছে নতজানু করবার জন্য আমেরিকার তথাকথিত ‘গণতান্ত্রিক’ শাসকরা কী ভাবে হেনস্থা করেছে। আরও দেখতে পেতেন এই শিল্পীরা সকলেই ছিলেন সমাজতন্তে্রর সমর্থক। তাঁরা ভিয়েতনামে মার্কিন গণহত্যার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের প্রশংসা করেছেন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক এবং বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা। ট্রাম্প সাহেবরা কি জানেন–রমাঁ রলাঁ, বার্ট্রান্ড রাসেল, অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুভাষচন্দ্র বসু, সান ইয়াত সেন, মেঘনাদ সাহা এমন আরও অনেকেই যথার্থ মানব প্রগতি ও মানুষের বিবেক-মনুষ্যত্বের উন্নততর মান অর্জনের রাস্তা এই ব্যবস্থাতেই খুলবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন। আজকের সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের কাছে এই সমস্ত নাম যেমন ভয়ের, তেমনই ভয়ের এই মনীষীদের আকাঙিক্ষত শোষণহীন সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। সোভিয়েত সমাজতন্তে্র জনগণের জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ, তাদের নাগরিকদের সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার, সমস্ত দিক থেকে অগ্রগতি, শিক্ষা-সংস্কৃতির বিস্তার দুনিয়ার সমস্ত মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষকে আকর্ষণ না করে পারেনি। এটা চিরকালই শোষকদের কাছে আতঙ্কের।
ট্র্যাজেডি হল, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী রাষ্টে্রর প্রধান ডোনাল্ড ট্রাম্প কমিউনিজমের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে গিয়ে যে সব কথা বলেছেন সেগুলি তাঁর দেশের জনগণের বড় অংশ ট্রাম্প সাহেবদের বিরুদ্ধেই বলে থাকে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় জমানায় মার্কিন প্রশাসন লক্ষ লক্ষ মানুষের বেঁচে থাকার সম্বল ‘ফুড কুপন’ বন্ধ করে দিচ্ছে। বেশ কিছু দিন ধরে আমেরিকায় আর্থিক বৈষম্য সমস্ত রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেছে। করোনা অতিমারিতে কয়েক লক্ষ নাগরিক চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন। একেবারে নিচের তলার মার্কিন জনগণের গড় আয় শোচনীয় ভাবে কমেছে। মূল্যবৃদ্ধি ও বেকারির বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে বিক্ষোভ চলছে। এই হল ট্রাম্পের বিবৃতিতে কথিত ‘ঈশ্বর প্রদত্ত অধিকার’ রক্ষার নমুনা। ‘স্বাধীনতা এবং মানবিক সম্মানবোধে’র যে কথা ট্রাম্প লিখেছেন– তার নমুনা ভারতবাসী দেখেছে হাতকড়া বাঁধা শত শত মানুষের বিমানযাত্রার সাক্ষী থেকে। ট্রাম্প লিখেছেন, দেশি-বিদেশি নির্বিশেষে সকলের অধিকার নিয়েই নাকি আমেরিকান গণতন্ত্র! এ দিকে প্রদেশে প্রদেশে কেন্দ্রীয় সরকারের আধাসামরিক বাহিনী ফেডারেল গার্ড নামিয়ে অভিবাসী ও পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার, বিশেষ বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার শত শত অভিবাসী মানুষের নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে সেই সব প্রদেশেই আওয়াজ উঠেছে। গণতন্তে্রর জন্য গলা ফাটানো ট্রাম্প নির্বাচনে হেরে কী ভাবে দেশের সংসদে গুণ্ডামি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, গোটা বিশ্ব তা জানে। অতি সম্প্রতি নিউইয়র্কে নিজের প্রার্থী হারলে ফেডারেল গার্ড নামিয়ে সব বানচাল করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন ট্রাম্প। হয় আমার পছন্দের প্রার্থীকে জেতাও না হলে নিউইয়র্কের আর্থিক বরাদ্দ বন্ধ করে দেব– এই হুমকি দিয়েছেন যিনি, সেই ট্রাম্প সাহেবরা হলেন গণতান্ত্রিক! এই গণতন্ত্রের ‘অবতারের’ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ‘নো কিংস’ আন্দোলনে আমেরিকার প্রায় সব শহরে লক্ষ লক্ষ মানুষের জমায়েত হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আসলে গোটা পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের কমিউনিজমের আতঙ্কের কথাকে প্রকাশ করেছেন তাঁর ‘অ্যান্টি কমিউনিজম’ ঘোষণাপত্রে। এই সময়ে বিশ্বে একের পর এক দেশে অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে যুব সমাজের আন্দোলন, গাজায় মার্কিন মদতপুষ্ট ইজরায়েলি গণহত্যার বিরুদ্ধে ইউরোপ, আমেরিকা, ল্যাটিন আমেরিকা, এশিয়ার মানুষের তীব্র বিক্ষোভ তাঁদের ভয় পাইয়েছে। এই বিক্ষোভের সাথে কমিউনিজমের যথার্থ আদর্শ যোগ হলে কী অগ্ন্যুৎপাত হতে পারে, তা যে শোষণমূলক পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকেই শেষের পথে নিয়ে যেতে পারে, সেই কথাটা শোষক বুর্জোয়া শ্রেণি খুব ভাল করে জানে। এই কারণেই ট্রাম্প সাহেবের কমিউনিজম বিরোধী হিস্টিরিয়ার প্রকাশ ঘটেছে।
তবে তাঁরা সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের বিরদ্ধে যত বিদ্বেষই ছড়ান, এটাই মানব সমাজের ইতিহাস-বিজ্ঞান নির্ধারিত রাস্তা। কোনও শাসকের সাধ্য নেই তা শেষ পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখার।