
পুরনো বস্তুবাদের অসঙ্গতি, অসম্পূর্ণতা ও একদেশদর্শিতা দেখে মার্ক্স নিশ্চিত ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন যে, ‘‘বস্তুবাদের ভিত্তির সঙ্গে সমাজবিজ্ঞানকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা এবং সেই অনুসারে তাকে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন’’। বস্তুবাদ সব সময়ই চেতনাকে ব্যাখ্যা করে বাস্তব বস্তুসত্তার ফলাফল হিসাবে, এবং দেখায় এর বিপরীতটা সত্য নয়। তাই মানুষের সামাজিক জীবনে বস্তুবাদ প্রয়োগ করা হলে সামাজিক চেতনাকে সামাজিক বাস্তবের ফলাফল হিসাবেই ব্যাখ্যা করতে হবে।
মার্ক্স লিখেছেন (পুঁজি, খণ্ড ১) ‘উৎপাদনের হাতিয়ার এবং তার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আদানপ্রদানের ধরন। উৎপাদনের প্রত্যক্ষ ক্রিয়ার সাহায্যে মানুষ তার জীবন বাঁচিয়ে রাখে। এর মধ্য দিয়েই জন্ম নেয় সামাজিক সম্পর্কগুলি, তার থেকেই গড়ে ওঠে মানসিক ধারণার ধাঁচাটি। মানব সমাজ ও মানব ইতিহাসের ওপর প্রয়োগ করা বস্তুবাদের মূলনীতিগুলির পূর্ণাঙ্গ সূত্র মার্ক্স তাঁর ‘অর্থশাস্ত্রের সমালোচনায় অবদান প্রসঙ্গে’ (কনট্রিবিউশন টু দি ক্রিটিক অফ পলিটিক্যাল ইকনমি) রচনার ভূমিকায় এই ভাবে দিয়েছেনঃ বেঁচে থাকার উপকরণগুলি সামাজিক ভাবে উৎপাদন করতে গিয়ে মানুষ এক অপরিহার্য এবং তার ইচ্ছা নিরপেক্ষ নির্দিষ্ট সম্পর্কে প্রবেশ করল– তা হল উৎপাদন সম্পর্ক। এই সম্পর্ক মানুষের বস্তুগত উৎপাদিকা শক্তির বিকাশের সেই নির্দিষ্ট স্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই সব উৎপাদন-সম্পর্কগুলির সমষ্টি থেকেই গড়ে ওঠে সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো, যা হল বাস্তব ভিত্তি। এর উপর ভর করে একটি আইনি ও রাজনৈতিক উপরিকাঠামো গড়ে ওঠে এবং যা সমাজচেতনার একটি নির্দিষ্ট রূপের সঙ্গে খাপ খায়। জীবনধারণের বস্তুগত উপাদানগুলির উৎপাদনের পদ্ধতিটি সাধারণ ভাবে মানবজীবনের সামাজিক, রাজনৈতিক এবং বুদ্ধিগত পদ্ধতিটিকে স্থির করে দেয়। মানুষের চেতনা তার অস্তিত্ব নির্ধারণ করে না, বরং বিপরীত ভাবে, মানুষের সামাজিক অস্তিত্বই তার চেতনা নির্ধারণ করে। বিকাশের একটা নির্দিষ্ট স্তরে এসে, সমাজের বস্তুগত উৎপাদিকা শক্তিগুলির সংঘাত বাধে বিদ্যমান উৎপাদন সম্পর্কের সঙ্গে। অথবা ওই একই কথা আইনের ভাষায় বলতে গেলে, যে সম্পত্তি-সম্পর্কের মধ্যে উৎপাদিকা শক্তিগুলি এত দিন ক্রিয়াশীল ছিল, সংঘাত বাধে তার সঙ্গে।
উৎপাদিকা-শক্তির বিকাশের একটা রূপ থেকে এই সম্পর্ক পরিণত হয়ে যায় তার শৃঙ্খলে। তখনই শুরু হয়ে যায় সামাজিক বিপ্লবের যুগ। অর্থনৈতিক ভিত্তির পরিবর্তনের সঙ্গেই বিপুলাকার উপরিকাঠামোর পুরোটাই কম-বেশি দ্রুত গতিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। এই রূপান্তরগুলি বিচার করার সময় আমাদের সর্বদাই পার্থক্য করতে হবে– উৎপাদনের অর্থনৈতিক অবস্থার বস্তুগত পরিবর্তন– প্রকৃতি বিজ্ঞানের নির্ভুলতায় যা নির্ণয় করা যায় এবং আইনগত, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, নান্দনিক বা দার্শনিক, সংক্ষেপে মতাদর্শগত রূপগুলি, যার মধ্য দিয়ে মানুষ এই সংঘর্ষ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তার নিষ্পত্তি ঘটায়– এই উভয়ের মধ্যে।
‘‘একজন মানুষ নিজের সম্পর্কে যা ভাবে, তার ওপর ভিত্তি করে যেমন আমরা তার সম্পর্কে মতামত গড়ে তুলি না, তেমনই রূপান্তরের এমন একটি সময়কালকে তার নিজস্ব চেতনা দিয়ে আমরা বিচার করতে পারি না। বিপরীতে, এই চেতনার ব্যাখ্যা হওয়া উচিত বস্তুগত জীবনের দ্বন্দ্বগুলি দিয়ে, সামাজিক উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে চলতে থাকা দ্বন্দ্ব দিয়ে। …’’ … ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণার আবিষ্কার, কিংবা আরও সঠিক ভাবে বললে, সামাজিক ঘটনাবলির ক্ষেত্রে বস্তুবাদের সুসঙ্গত ধারাবাহিকতা ও প্রসার আগেকার ঐতিহাসিক তত্ত্বগুলির দুটি প্রধান ত্রুটি দূর করেছিল। প্রথমটি হল, খুব বেশি হলে এই সব তত্ত্ব মানুষের ঐতিহাসিক কার্যকলাপের পিছনে মতাদর্শগত প্রেরণাগুলি কী, তা অনুসন্ধান করেছে, এই সব প্রেরণার উৎস কী– তা অনুসন্ধান করেনি। সামাজিক সম্পর্কের ব্যবস্থাটির বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে যে বাস্তব নিয়মগুলি– তা নির্ধারণ করেনি। বস্তুগত উৎপাদনের মাধ্যমে বিকাশের মাত্রায় পৌঁছনো এই সম্পর্কগুলির উৎসের দিকে চোখ রাখেনি।
দ্বিতীয়ত, আগেকার তত্ত্বগুলি অধিকাংশ জনগণের কার্যকলাপকে বিচারের মধ্যে আনেনি। সেখানে, ঐতিহাসিক বস্তুবাদই প্রথম জনজীবনের সামাজিক অবস্থা ও তার পরিবর্তনগুলি বিজ্ঞানসম্মত নির্ভুলতার সঙ্গে চর্চা করছে। প্রাক-মার্ক্সবাদী ‘সমাজবিদ্যা’ ও ইতিহাস-রচনা বড় জোর সামনে এনেছিল যথেচ্ছ ভাবে সংগ্রহ করা কাঁচা তথ্যের রাশি এবং ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার আলাদা আলাদা দিকগুলি। মার্ক্সবাদ পরস্পরবিরোধী সমস্ত প্রবণতার সামগ্রিকতা বিচার করল, সেগুলিকে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির জীবনযাত্রা ও উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাযোগ্য অবস্থায় দাঁড় করাল। কোনও একটি ধারণা কেন বিশেষ ভাবে প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে তার বিচার করল এবং শেষ পর্যন্ত এ সত্য দেখাল যে কোনও ব্যতিক্রম ছাড়াই সকল ধারণা ও প্রবণতার উৎস হচ্ছে বস্তুগত বিষয়গুলির উৎপাদন ব্যবস্থা।
একটি সামাজিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশ ও বিনাশের সামগ্রিক প্রক্রিয়াকে কী ভাবে বিচার করতে হয় তা মার্ক্সবাদ দেখিয়েছে। জনগণ নিজের ইতিহাস নিজেরাই সৃষ্টি করে। কিন্তু জনগণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কিসের দ্বারা নির্ধারিত হয়? অর্থাৎ, কিসের থেকে বিবাদমান ধ্যানধারণার সংঘর্ষের উদয় হয়? মানব সমাজের বিপুল অংশে এই সমস্ত সংঘাতের সামগ্রিক ফলটি কী? বস্তুগত জীবনের উৎপাদন, যা মানুষের সমস্ত ঐতিহাসিক কার্যকলাপের ভিত্তি গঠন করে, তার বাস্তব শর্তগুলি কী কী? এই সব শর্তের বিকাশের নিয়ম কী? এই সবগুলি বিষয়ের ওপর মার্ক্স মনোযোগ দেন এবং ইতিহাসের বিজ্ঞানসম্মত চর্চার পথনির্দেশ করেন, যা তার বিপুল বৈচিত্র্য ও পরস্পরবিরোধিতা সত্ত্বেও একটি একক পদ্ধতি হিসাবে নির্দিষ্ট নিয়মের দ্বারা পরিচালিত হয়।
‘মহান দার্শনিক কার্ল মার্ক্স ও তাঁর মতবাদ’ থেকে