Breaking News

আমেরিকা প্রকাশ্যেই ইরানকে ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছে

দিল্লিতে এসইউসিআই(সি) সহ বামপন্থী দলগুলির বিক্ষোভ

পশ্চিম এশিয়ার আকাশে এখন ডানা ঝাপটাচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শকুনের দল। এবার লক্ষ্য ইরান। আজকের দিনের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মিসাইল নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সামান্য ভুলও করে না। অথচ ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইজরায়েল সাম্রাজ্যবাদী চক্র হামলা শুরু করার পরে পরেই ইরানে ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী মেয়েদের একটি স্কুল মিসাইল হানায় ধ্বংস হয়ে গেল। শেষ হয়ে গেল প্রায় ২০০টি বালিকার ফুলের মতো জীবন। এই লেখা তৈরির সময় পর্যন্ত পাওয়া রিপোর্ট অনুযায়ী আমেরিকার বর্বর হামলায় ইতিমধ্যে মারা গেছেন ইরানের প্রায় দেড় হাজার মানুষ, যার ৩০ শতাংশ শিশু। ঘরের ভিতরে মিসাইল হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় শাসক আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে। ইরানও পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আমেরিকার সেনাঘাঁটিতে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে। সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ার বাতাস এখন ভারি হয়ে আছে বারুদের তীব্র গন্ধ, বোমায় গুঁড়িয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুলের ধ্বংসস্তূপ থেকে উড়তে থাকা ধুলো, আহতদের আর্তনাদ আর মৃতের পরিজনদের বুকফাটা কান্নায়। প্রভাব পড়েছে বিশ্ব জুড়ে। ইরান সহ পশ্চিম এশিয়ার এই এলাকা খনিজ তেল ও গ্যাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম উৎস হওয়ায় এবং ইরান তেলবাহী জাহাজ চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় সংকটে পড়েছে গোটা বিশ্বের দেশগুলি। ভারত সরকারও গ্রাহকদের জ্বালানি গ্যাস সরবরাহে রাশ টেনেছে এবং যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দামও বেশ খানিকটা বাড়িয়ে দিয়েছে।

কেন ইরানের উপর এই আক্রমণ? যুদ্ধবাজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, আমেরিকার বিমানঘাঁটিগুলিতে নাকি ইরানের আক্রমণের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর সুরে সুর মিলিয়ে বলেছেন, ইরানের আক্রমণ ঠেকাতেই নাকি আগে থাকতে হামলা চালানোর এই কার্যক্রম। এঁরা দু’জনেই যে চরম অসত্য বলেছেন, প্রকাশ্যে এসে গেছে তা। মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দফতর পেন্টাগন ১ মার্চ জানিয়েছে, ইরানের দিক থেকে হামলার কোনও খবর তাদের কাছে ছিল না। বাস্তবে হামলা শুরুর আগে ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও আমেরিকার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা চলছিল। ২৭ ফেব্রুয়ারি ওমানের বিদেশমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, পরমাণু বোমা তৈরির উপকরণ মজুত না করা ও ভবিষ্যতে পরমাণু বোমা তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি সহ ইরান একটি চুক্তির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে। অথচ এই ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই আচমকা ইরানে মিসাইল হামলা শুরু করে দিল আমেরিকা। অর্থাৎ এত দিন ঠিক যে ভাবে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া সহ একের পর এক দেশে আগ্রাসন চালানোর আগে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কখনও গণবিধ্বংসী অস্ত্র মজুত করা, কখনও গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়ার মতো নানা মিথ্যা অজুহাত খাড়া করে এসেছে, এ বারের ইরান আক্রমণেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০১৫ সালে আমেরিকা, চিন, রাশিয়া সহ আরও কয়েকটি পশ্চিমী দেশের সঙ্গে ইরানের যে পরমাণু চুক্তি হয়, ২০১৮ সালে প্রথম বারের জমানায় ট্রাম্প সরকার নিজেই সেই চুক্তি থেকে সরে গিয়েছিল। ২০২৫ সালে যখন নতুন করে পরমাণু শক্তি নিয়ে আমেরিকা-ইরান আলোচনা শুরু হয়, ঠিক তখনই ইরান পরমাণু বোমা বানাচ্ছে, এই মিথ্যা অভিযোগ তুলে ২২ জুন সে দেশে হামলা শুরু করেছিল প্রথমে ইজরায়েল, তারপর আমেরিকা– যারা নিজেরাই পরমাণু শক্তিধর দেশ।

কেউ কেউ এমনও মনে করেন যে, ইরানে খামেনেইয়ের ধর্মীয় মৌলবাদী শাসনের হাত থেকে ইরানি জনগণকে রক্ষা করতে, তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতেই আমেরিকার এই হামলা। তাঁদের মনে রাখা দরকার, খামেনেইয়ের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের যে অসংখ্য অভিযোগ, তার বিরুদ্ধে ইরানের জনগণ লড়াই করছেন বহু দিন ধরে। তাঁরা কোনও দিনই এই লড়াইয়ে আমেরিকা বা ইজরায়েলের সাহায্য চাননি। তা ছাড়া যে ইজরায়েল গাজায় নৃশংস হামলা চালিয়ে কয়েক লক্ষ নিরস্ত্র প্যালেস্তিনীয়কে হত্যা করেছে, যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট অতর্কিত হামলা চালিয়ে স্বাধীন দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে সস্ত্রীক অপহরণ করেছে, অন্য দেশের গণতন্ত্র রক্ষার কথা তাদের মুখে মানায় কি? বিশ্বের মানুষ বার বার দেখেছেন, গণতন্ত্র বিপন্ন, শাসক পরিবর্তন করতে হবে– এই ধুয়ো তুলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যখনই আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়ার মতো দেশে দেশে আগ্রাসন চালিয়েছে, প্রতিটি দেশই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং শাসকের আসনে বসেছে হয় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পুতুল সরকার, নয় তো ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তি। ফলে গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী আমেরিকা ও ইজরায়েল নিজেরাই যে অন্য দেশের গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের সবচেয়ে বড় হত্যাকারী, বিশ্বের মানুষের কাছে আজ তা জলের মতো স্পষ্ট।

আসলে দীর্ঘ দিন ধরেই ইরান আক্রমণের ছক কষছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। তার লক্ষ্য তেল ও গ্যাস সমৃদ্ধ পশ্চিম এশিয়ায় একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করা। এই কাজে ওই অঞ্চলে তার অন্যতম স্যাঙাৎ হল ইজরায়েল। সৌদি আরব, ইউএই, কাতারের মতো পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি দেশের সঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের সখ্যতা রয়েছে। কিন্তু মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ট ইজরায়েলের প্যালেস্তাইনে দখলদারির বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে যে সব সশস্ত্র সংগ্রামী গোষ্ঠী, তাদের সক্রিয় সমর্থনকারী দেশগুলির মধ্যে ইরান অন্যতম। ইরানে একদিকে রয়েছে খনিজ তেলের বিপুল ভাণ্ডার। অন্য দিকে পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালী ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে ইরানের অবস্থান এমন যে এই দেশটিকে বাগে আনতে না পারলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে পশ্চিম এশিয়ায় নিজের সার্বিক আধিপত্য কায়েম করা দুষ্কর। ফলে ছলে বলে কৌশলে, আগের বার পরমাণু অস্ত্র বানানোর মিথ্যা অভিযোগ তুলে, এ বার আলোচনার টেবিলে বসে ঐকমত্যে আসার নাটক করতে করতেই ইরানে বার বার হামলা চালাচ্ছে আমেরিকার ও ইজরায়েল। ইরানকে পদানত করতে পারলে তেলের বিপুল ভাণ্ডার যেমন দখলে আসবে, তেমনই নিষ্কণ্টক হবে পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য।

আমেরিকার ইরান আক্রমণের পিছনে আরও একটি কারণও কোনও কোনও মহলের অভিমতে উঠে আসছে। তেলবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য যে হরমুজ প্রণালী অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, তা রয়েছে ইরানের দখলে। ইরানকে পদানত করতে পারলে এই প্রণালীতে কায়েম হবে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ। কেউ কেউ বলছেন, এতে চিনে তেল সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করার সুযোগ পাবে আমেরিকা। এই সুযোগ তার প্রয়োজন, কারণ দিনে দিনে বিশ্বে অর্থনৈতিক আধিপত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে আমেরিকার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে চিন। ইরানে গোঁড়া ধর্মীয় আবরণের আড়ালে কায়েম রয়েছে শোষণমূলক পুঁজিবাদী শাসন। স্বাভাবিক কারণেই বিশ্বের সমস্ত পুঁজিবাদী দেশের মতোই তার বিরুদ্ধে সেখানকার মানুষের প্রবল ক্ষোভও রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে ইরানের মানুষকে বার বার নানা দাবিতে পথে নামতে দেখা গেছে। সেইসব বিক্ষোভ বার বার প্রবল রূপ নিয়েছে এবং অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশের মতো ইরানের শাসকরাও সেই আন্দোলন নির্মম ভাবে দমন করেছে। কিন্তু এগুলি কখনওই ইরানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও ইজরায়েলের হানাদারির পক্ষে যুক্তি হতে পারে না। বাস্তবে নিজস্ব সাম্রাজ্যবাদী লুটের স্বার্থেই এই দুই দেশ ইরানে নির্লজ্জের মতো আক্রমণ শুরু করেছে। এই আক্রমণের ফলে চাঙ্গা হবে আমেরিকার ‘যুদ্ধশিল্প’। অক্সিজেন পাবে বাজারসংকটের আবর্তে ঘুরপাক খেতে থাকা আমেরিকার অর্থনীতি। এই মুমূর্ষু পুঁজিবাদের যুগে মার্কিন অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ হল তার যুদ্ধশিল্প। সে দেশের প্রতিরক্ষা বাজেটে প্রতি বছর বরাদ্দ হয় বিপুল অর্থ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অস্ত্র তৈরির সংস্থাগুলির শীর্ষে রয়েছে আমেরিকার লকহিড মার্টিন, নরথ্রপ গ্রুমান, বোয়িং-এর মতো কোম্পানি। দেশে দেশে যুদ্ধ না বাধালে এদের তৈরি অস্ত্রের জমে থাকা পাহাড় খালাস হবে কী করে? মার্কিন সংসদ আবার আলো করে বসে আছেন বড় বড় অস্ত্র কোম্পানি ও তেল কোম্পানির বড়কর্তারা। ফলে বিনা প্ররোচনায় ইরানের মতো প্রাচীন ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ইতিহাসপ্রসিদ্ধ একটি দেশের উপর হামলা চালিয়ে সভ্যতার নানা নিদর্শন সহ অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের জীবন ধ্বংস করে দেওয়ার প্রস্তাব সেখানে পাস করাতে ট্রাম্প সাহেবের অসুবিধা হয়নি। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের এটাই আসল চেহারা। সমাজ-সভ্যতা ধ্বংসকারী এই ভয়ঙ্কর সাম্রাজ্যবাদী বর্বরতার মুখে দাঁড়িয়ে আজ সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অনুপস্থিতি বিশেষ ভাবে অনুভূত হচ্ছে। বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক শিবির থাকলে সাম্রাজ্যবাদ তার এই বীভৎস রূপ দেখানোর সাহস পেত না।

কিন্তু বর্বরতা শেষ কথা বলে না। তাই ইরানের উপর আমেরিকা-ইজরায়েলের বর্বর সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে দুনিয়া জুড়ে প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে। দেশে দেশে পথে নেমেছেন শান্তিপ্রিয় গণতন্ত্রপ্রেমী হাজার হাজার মানুষ। খোদ আমেরিকাতেই শহরে শহরে প্রতিদিন ব্যাপক বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন নাগরিকরা। যে ট্রাম্প ১৩ মাসের শাসনকালে অন্তত ৭টি দেশে হামলা চালিয়েছেন, তাঁর নিজের সন্তানকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠানোর দাবি তুলেছেন বিক্ষোভকারীরা।

পথে নেমেছেন ভারতের মানুষও। সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা ভারতের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। অথচ ইরানে আমেরিকা-ইজরায়েলের সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের নিন্দা করে একটি বিবৃতিও দেননি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এমনকি ইরানের শীর্ষ নেতা খামেনেইয়ের বর্বর হত্যায় দুঃখপ্রকাশ করতেও বিজেপি সরকারের সময় লেগেছে দীর্ঘ পাঁচ দিন। শুধু তাই নয়, যখন ইরানে হামলা চালানোর ছক কষা চলছে, ঠিক সেই সময়ে ইজরায়েল সফরে গিয়ে সে দেশের সরকারের পাশে থাকার বার্তা দিয়ে এসেছেন প্রধানমন্ত্রী। বোঝা যায়, দিনে দিনে মার্কিন-ইজরায়েল সাম্রাজ্যবাদী অক্ষের দিকে আরও বেশি করে ঝুঁকছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। এর নিন্দায় সরব হয়েছেন ভারতের যুদ্ধবিরোধী গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ। অবিলম্বে মার্কিন-ইজরায়েলি হামলা বন্ধ করে ইরানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বজায় রাখার দাবিতে বিশ্ব জুড়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করাই আজ সময়ের আহ্বান।