
ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজরায়েলের সংঘর্ষের অজুহাতকে সামনে রেখে নির্বাচন শেষ হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সম্প্রতি দেশে চার-চারবার পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়িয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে যুদ্ধ চলছে। পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন থাকার জন্য মোদি-শাহ জুটি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, দেশের ভাণ্ডারে যথেষ্ট পরিমাণে তেল ও গ্যাস মজুত আছে। উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই। কোনও সংকট নেই। পেট্রোপণ্যের দাম বাড়বে না। কিন্তু ভোট শেষ হতে না হতেই সে আশ্বাস মিথ্যা প্রমাণিত হল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় ভারতীয় তেল কোম্পানিগুলির প্রচুর লোকসান হচ্ছে এই অজুহাতে দাম বাড়ানো হল পেট্রল-ডিজেল, গৃহস্থ ও বাণিজ্যিক গ্যাসের। এই মূল্যবৃদ্ধি যদি বাজারের নিয়ম মেনেই হত, তা হলে নির্বাচনের আগেই তা বাড়ত। তা কিন্তু হল না। সরকার পাঁচ রাজ্যে নির্বাচন মেটা পর্যন্ত অপেক্ষা করল।
পেট্রোপণ্যের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের উপর আগে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ছিল। বৃহৎ কোম্পানিগুলির চাপে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে পেট্রল এবং ডিজেলের দামে সরকারি নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু তেলের দাম অহরহ বাড়তে থাকায় দামে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে সরকার বাধ্য হয়। কংগ্রেসের মনমোহন সিং জমানায় আবার পেট্রলের দামে সম্পূর্ণ ভাবে এবং ডিজেলের দাম থেকে আংশিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া হয়। মোদির আমলে ডিজেলের দামও পুরোপুরি বিনিয়ন্ত্রিত। আর এই বিনিয়ন্ত্রণের নামে তেল কোম্পানিগুলিকে স্বেচ্ছাচার চালানোর অধিকার দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তারা ইচ্ছেমতো দাম ঠিক করে বিপুল মুনাফা কামিয়ে নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং হ্রাস
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার সময় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ছিল ব্যারেল প্রতি ১০০ থেকে ১০৯ ডলারের আশেপাশে। এই সময় কলকাতায় প্রতি লিটার পেট্রল আর ডিজেলের গড় দাম ছিল যথাক্রমে ৭২ টাকা ও ৫৫ টাকা। ভর্তুকিযুক্ত কেরোসিন ১৫ টাকার কম আর ভর্তুকিযুক্ত এলপিজি সিলিন্ডার প্রতি ৪১৬ টাকা। এরপর থেকে অপরিশোধিত তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমাগত কমতে থাকে। ২০১৬-র জানুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি মাত্র ৩০ ডলারে এসে ঠেকেছিল। তখন কিন্তু মোদি সরকার পেট্রোপণ্যের দাম সেই অনুপাতে কমিয়ে সাধারণ মানুষকে রেহাই দেয়নি। ২০২০ সালে বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম গিয়ে দাঁড়ায় গড়ে ব্যারেল প্রতি ২০-৩০ ডলার। কলকাতায় তখন লিটার প্রতি পেট্রল ও ডিজেলের গড় মূল্য ছিল যথাক্রমে ৭৩.৩০ টাকা ও ৬৫.৬০ টাকা। ২০২৬ যুদ্ধ পরিস্থিতির আগে বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম ব্যারেল পিছু ৭০ থেকে ৭২ ডলার এ ঘুরে বেরিয়েছে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম ১৪ মে ২০২৬-এ ছিল ১০৮ ডলার প্রতি ব্যারেল। অর্থাৎ ২০১৪ সালের সমান কলকাতায় এখন এক লিটার পেট্রলের দাম ১১৩.৫১ টাকা এবং ডিজেলের দাম ৯৯.৮২ টাকা। অর্থাৎ গত ১২ বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বিন্দুমাত্র না বাড়লেও দেশের বাজারে পেট্রোপণ্যের দাম ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী।
রাশিয়ার সস্তা তেল
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করে পারা যায় না। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আগে ভারত মোট আমদানির ১ শতাংশ অশোধিত তেল রাশিয়া থেকে আমদানি করত। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়া আন্তর্জাতিক বাজারের থেকে অত্যন্ত সস্তায় ভারতকে তেল সরবরাহ করে। ফলে ভারতীয় তেল কোম্পানিগুলি বিপুল পরিমাণ তেল সস্তায় রাশিয়া থেকে আমদানি করেছে এবং শোধনের পর ভারতে এবং বিদেশে বিশেষত ইউরোপের বাজারে আন্তর্জাতিক তেলের দামে বিক্রি করেছে। রাশিয়া থেকে কম দামে তেল আমদানির কোনও সুফল জনগণকে পেতে দেয়নি আদানি আম্বানির স্বার্থরক্ষাকারী বিজেপি সরকার।
পেট্রোপণ্যে ভর্তুকি কমেছে, রাজস্ব আদায় বেড়েছে
২০১৪-১৫-র অর্থবর্ষে পেট্রোপণ্যের উপর কেন্দ্রীয় সরকারের ভর্তুকি ছিল ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যেটা ২০২৫-২৬-তে নেমে এসেছে ৪২ হাজার কোটি টাকায়। অপর দিকে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের রাজস্ব আদায় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি যখন প্রধানমন্ত্রী হন তখন কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার মিলিয়ে পেট্রোপণ্যের দামে গড় রাজস্ব ছিল ৩৭ শতাংশ আর এখন ৪৭ শতাংশ। কেন্দ্রীয় সরকারের মতো রাজ্যগুলিও পেট্রোপণ্যে করের বোঝা চাপানোকেই কোষাগার ভরার সস্তা রাস্তা হিসাবে বেছে নিয়েছে। বিপুল করের বোঝা না থাকলে পেট্রল ও ডিজেলের দাম অর্ধেক কমে যেতে পারে।
এই তথ্য থেকে স্পষ্ট যে সব সরকারই পেট্রল-ডিজেলের দামের উপর কর-সন্ত্রাস চালাচ্ছে। দেশের ২২টা রাজ্যে এখন বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকার। তাই সরকার চাইলে পারত এই কর-সন্ত্রাস বন্ধ করে জনগণকে একটু রিলিফ দিতে। দামী গাড়ি এবং ধনী কোটিপতিদের উপর কর বাড়িয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানির থেকে এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আদায় বন্ধ করতে পারত। সরকারের একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থরক্ষাকারী চরিত্রই এই কাজে বাধা হিসাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
লোকসানের আষাঢ়ে গল্প
যখনই তেলের দাম বাড়ানোর দরকার হয় তখনই দেশের মানুষ তেল কোম্পানিগুলোর প্রচুর লোকসানের গল্প শুনতে পায়। বাস্তবে লোকসান নয়, কোম্পানিরা বলে– ‘আন্ডার রিকভারি’ অর্থাৎ লক্ষ্যের চেয়ে কম মুনাফা। সত্যিই কি তাই? তিনটি আর্থিক বছরে দেশের প্রধান তেল বিপণনকারী ও অনুসন্ধানকারী সংস্থা আইওসিএল, বিপিসিএল, এইচপিসিএল ও ওএনজিসি এর মিলিত লাভ যথাক্রমে ৮১০০০ কোটি, ৩৩৬০২ কোটি, ৭৭৮২১কোটি টাকা। গত অর্থ বর্ষের মুনাফা তার আগের অর্থবছর তুলনায় ১৩০ শতাংশ বেড়েছে বলে কোম্পানিগুলিই দাবি করেছে। শুধুমাত্র এই ৩ বছরই নয় গত ১০ বছরে দেশের প্রধান তেল বিপণনকারী ও অনুসন্ধানকারী সংস্থাগুলির গড় বার্ষিক নিট লাভ এক লক্ষ কোটি টাকার কাছে।
পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলি এবং তেল কোম্পনিগুলিরই লাভ আর যাবতীয় ক্ষতি সাধারণ মানুষের। তেলের দাম বাড়ায় পরিবহণের খরচ বেড়েছে, কৃষকদের সেচের খরচও বেড়ে গেছে। রান্নার গ্যাস আর কেরোসিনের দামও বাড়ানো হয়েছে অনেকটাই। নিত্যপ্রয়োজনীয় পেট্রোপণ্যের দাম এই ভাবে বাড়ানোর ফলে সার্বিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটছে, জনগণের উপরে চাপছে বিপুল আর্থিক বোঝা।
পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ করতে তেলের দামের উপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনা দরকার। শুল্কের হার কমাতে পেট্রল ও ডিজেলকে জিএসটির অন্তর্গত করা দরকার। ভর্তুকি ছাঁটাই না করে রান্নার গ্যাস এবং কেরোসিনের দামও কমানো যেতে পারে। কিন্তু তার জন্য কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারগুলির রাজনৈতিক সদিচ্ছার স্পষ্ট অভাব। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলিকে এই কাজে বাধ্য করতে গেলে জনগণের সচেতনতা এবং তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও পথ নেই।