
সর্বহারার মহান নেতা, এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক, এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শিবদাস ঘোষের ৫০ তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে ৫ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির আহ্বানে কলকাতায় রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। প্রবল বর্ষণের মধ্যেও প্রায় ৩০ হাজার মনোযোগী শ্রোতার সামনে বক্তব্য রাখেন সাধারণ সম্পাদক প্রভাস ঘোষ। তাঁর ভাষণটি প্রকাশ করা হল। প্রকাশের সময় সাধারণ সম্পাদক নিজেই ভাষণটি সম্পাদনা করে দেন।
কমরেড সভাপতি, কমরেডস ও বন্ধুগণ,
৫০ বছর আগে এই দিনে আমরা হারিয়েছি মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান, আমাদের দল এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক সর্বহারার মহান নেতা মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষকে। তাঁর মৃত্যুর পর প্রতি বছরই আমরা এই দিনটিতে সমবেত হই। তাঁর বিপ্লবী জীবনের স্মৃতি স্মরণ করি, তাঁর শিক্ষা স্মরণ করি এবং তাঁর ছাত্র হিসেবে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। আবার একদিন ৫ আগস্ট আসবে যখন আমি থাকব না, আপনাদের মধ্যে যাঁরা বৃদ্ধ তাঁরাও থাকবেন না, কিন্তু ৫ আগস্ট আসবে বার বার কমরেড শিবদাস ঘোষের উদাত্ত আহ্বান নিয়ে। আমাদের বিবেকের কাছে আহ্বান জানাবে– যাতে এ দেশে যথার্থ মার্ক্সবাদী বিপ্লবী দল হিসাবে এস ইউ সি আই (সি)-কে শক্তিশালী করি, বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠিত করি, শোষণমূলক ব্যবস্থা পুঁজিবাদকে উচ্ছেদ করে সমাজতন্ত্র কায়েম করি।
জনশক্তি অপ্রতিরোধ্য, তাকে কেউ আটকাতে পারে না
কমরেড সভাপতি বলেছেন, সম্প্রতি দিল্লিতে যে আন্দোলন হয়ে গেল, সারা দেশে তার ব্যাপক প্রভাবের কথা। এই আন্দোলনের উদ্যোক্তা ককরোচ জনতা পার্টি। কোনও রাজ্যে বা কোনও জেলায় আজও এর কোনও অস্তিত্ব নেই। তার অবস্থান মূলত সমাজমাধ্যমেই। আন্দোলন শুরু হয়েছিল ডাক্তারির প্রবেশিকা নিট পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে। বার বার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে, এ বারও হয়েছে। প্রশ্ন ফাঁসের কারণে পরীক্ষা বাতিল হওয়ায় এ বছর ২০ জন ছাত্র আত্মঘাতী হয়েছেন। আগের বছরগুলোতেও বেশ কিছু ছাত্র আত্মঘাতী হয়েছেন একই কারণে। একে ভিত্তি করেই বিক্ষোভের শুরু। দিনের পর দিন সেই আন্দোলন চলতে থাকলেও সরকার কোনও আলোচনায় আসে না, কোনও যোগাযোগ করে না। এই অবস্থায় ছাত্র-যুবরা পার্লামেন্ট অভিযানের ডাক দিলেন। বাঁধ ভাঙা বন্যার মতো প্রবল জনস্রোত নেমে এল দিল্লির রাজপথে। এই জনগণ কেউ কাউকে চেনে না, কার কোন রাজ্য, কী ভাষা, কী ধর্ম কেউ জানে না। কিন্তু দাবি এক। সকলে মিলেই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে এগিয়ে এল। জীবনের নানা অসহনীয় সংকট থেকে যে বিক্ষোভের বারুদ জমা হয়েছিল, তাই আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হল। সরকার লাঠি, বেয়নেট, পেলেট গান, পেরেক গাঁথা লাঠি, ব্যারিকেডের তারে ইলেকট্রিক কারেন্ট– এই রকম অনেক কিছু দিয়ে প্রবল আক্রমণ নামিয়ে এনেছিল ছাত্রছাত্রীদের উপর, যুবক ও অভিভাবকদের উপর। মহিলাদের গোপনাঙ্গে আঘাত পর্যন্ত করেছিল। সব কিছুই করেছিল আন্দোলন দমন করার জন্য। কিন্তু জনশক্তি যখন জাগে, অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলে, কোনও শক্তিই তাকে আটকাতে পারে না। দিল্লির এই আন্দোলন আবার তা প্রমাণ করে দিল। শিক্ষামন্ত্রী বাধ্য হলেন পদত্যাগ করতে। ফ্যাসিস্ট সরকার তার মাথা নিচু করতে বাধ্য হল।

এর থেকে কেউ যদি ধরে নেন, আর দুর্নীতি হবে না, আর প্রশ্নপত্র ফাঁস হবে না, তা হলে ভুল হবে। ২০১১ সালে এ রকমই দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে। তাকে ব্যবহার করে বিজেপি ও আপ সরকারি গদি দখল করেছিল দুর্নীতি উৎখাতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। আর এখন তারা দুর্নীতিতে কংগ্রেসকেও ছাড়িয়ে গেছে। পাঁচ বছর আগে আর একটা ঐতিহাসিক আন্দোলন হয়েছিল দিল্লির বুকে– কৃষক আন্দোলন। ৭১৩ জন কৃষক এই আন্দোলনে প্রাণত্যাগ করেন। সরকার দাবি মেনে নেয়। কিন্তু যে দাবি মেনে নিয়েছিল, সেগুলিই পরে আবার নতুন করে সরকার নিয়ে আসছে। আবারও কৃষকদের আন্দোলনে যেতে হচ্ছে। ফলে আন্দোলনের চাপে আপাতত দাবি মানলেও আন্দোলন দুর্বল হলেই সরকার তার সুযোগ নেবে।
বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আকণ্ঠ দুর্নীতিগ্রস্ত
এই সমাজব্যবস্থা, যাকে আমরা বলি পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থা, এর রাজনীতি, এর রাষ্ট্র, এর সরকার, এর জুডিশিয়ারি, আমলাতন্ত্র, ল অ্যান্ড অর্ডারের কাঠামো, এই রাজনৈতিক দলগুলো, নেতারা– সবটাই আকণ্ঠ দুর্নীতিগ্রস্ত। এর রন্ধে্র রন্ধে্র দুর্নীতি। এ সমাজ হল পচাগলা সমাজ। একটা নির্বাচন আসে, বিরোধী দল সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে, নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। তারপর ভোটে নির্বাচিত হয়ে অন্য মূর্তি ধারণ করে। এই দলগুলি, নেতারা মিথ্যাবাদী, ভণ্ড, প্রতারক। পরবর্তী সরকার দুর্নীতিতে আগের সরকারকে ছাড়িয়ে যায়। নানা দলের নানা ঝান্ডার নেতারা সকলেই তাই করে।
এই প্রধানমন্ত্রীই তো বলেছিলেন, ‘না খাউঙ্গা, না খানে দুঙ্গা’! আজ তাঁর চেহারা কী? ‘হাম খায়েঙ্গে, তুমকো কুছ নেহি দেঙ্গে’– এই হচ্ছে তাঁর আজকের চেহারা। দুর্নীতি এমন স্তরে পৌঁছেছে যে, যে রামের নাম নিয়ে তারা গোটা ভারতবর্ষ তোলপাড় করেছিল, দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাধিয়েছিল, ঐতিহাসিক সৌধ বাবরি মসজিদ ধ্বংস করেছিল, কোটি কোটি টাকা দিয়ে রামচন্দ্রের মূর্তি, মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিল, আজ সেই রামচন্দ্রের নামে মানুষের দেওয়া কোটি কোটি টাকা, অলঙ্কার, সব কিছু লুঠ করা হল। মন্দিরের রক্ষকরা বিজেপি সরকার নিযুক্ত আরএসএসের লোক। সেই রামভক্তরাই রামের সম্পদ লুণ্ঠন করেছে। অন্যান্য মন্দিরেও একই রকম দুর্নীতি ঘটছে। রক্ষকরাই ভক্ষক হয়ে গেছে। মূর্তি তো নিজের সম্পদ রক্ষা করতে পারে না! দুর্নীতি কোন স্তরে পৌঁছলে এ জিনিস ঘটতে পারে!
স্বাধীনতা শুধুই পুঁজিপতিদের জন্য
আপনারা জানেন, ক’দিন বাদেই ১৫ আগস্ট আসছে। এখানে কলকাতায় রেড রোডে তার বিরাট প্রস্তুতি চলছে। দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন, রাজ্যে রাজ্যে রাজভবন, সবগুলিই আলোকমালায় সজ্জিত হবে। নেতারা দেশপ্রেমের ভাষণ দেবেন। তারপর সন্ধ্যাবেলায় বহু তারকাখচিত হোটেলে বিরাট ভুরিভোজ হবে। সে ভোজন থেকে যে উচ্ছিষ্ট ডাস্টবিনে পড়বে, অসংখ্য শিশু এই ভারতের রাজ্যে রাজ্যে শহরে শহরে সেই ডাস্টবিনে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাদের এটাই খাদ্য। এই শিশুদের ফুটপাতে জন্ম, ফুটপাতেই বাস। এই ভাবে খাদ্য সংগ্রহ করে বেঁচে থাকা লক্ষ লক্ষ শিশু ভারতের শহরে শহরে, নানা স্টেশনে বাস করে। এরা অনেকে জানে না তাদের আসল ঠিকানা কোথায়। কে তাদের বাবা-মা, তাও অনেকে খবর রাখে না। এ ভাবেই কুড়িয়ে কিছু খাদ্য সংগ্রহ করে কোনও রকমে বাঁচে। আবার ফুটপাথেই মৃত্যু হয়। দেশে প্রতিদিন কয়েক হাজার লোক অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। প্রতিদিন কয়েক হাজার নারীর ইজ্জত লুণ্ঠিত হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে। এই স্বাধীনতার জন্যই কি ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সূর্য সেন, বিনয়-বাদল-দীনেশ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, ভগৎ সিং, চন্দ্রশেখর আজাদ, আসফাকউল্লা খান, উধম সিং-এর মতো বিপ্লবীরা প্রাণ দিয়েছিলেন? এই স্বাধীনতার জন্যই কি নেতাজি সুভাষচন্দ্র আজাদ হিন্দ বাহিনী নিয়ে লড়াই করেছিলেন এবং সারা জীবন এ জন্য দিয়ে গেলেন?
তা হলে দেশের এই পরিণতি হল কেন? কাদের জন্য এই স্বাধীনতা? এই স্বাধীনতা ভারতের পুঁজিপতি শ্রেণির লুণ্ঠনের স্বাধীনতা, শোষণের স্বাধীনতা। ১৯৪৮ সালের ১৫ আগস্ট কমরেড শিবদাস ঘোষ এই বিষয়টিই দেশের সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরে বলেছিলেন, স্বাধীনতা আন্দোলনে ছিল দুটি ধারা। একটা গান্ধীজির নেতৃত্বে আবেদন-নিবেদন, আপসমুখী ধারা। তার পক্ষে ছিল ভারতের পুঁজিপতিরা। আর একটা ধারা– সংগ্রাম, লড়াই, সশস্ত্র বিপ্লবের আপসহীন ধারা। তার পক্ষে ছিল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত মানুষ। তার মূর্ত প্রতীক ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। নেতাজি সুভাষচন্দ্র প্রথম যখন কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন, সেই হরিপুরা কংগ্রেসের প্রাক্কালে তিনি বলেছিলেন, আমাদের এই স্বাধীনতার লড়াইতে শ্রমিক-কৃষককে যুক্ত করতে হবে। আমাদের শোষণের বিরুদ্ধে লড়তে হবে, জমিদার-পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। আমাদের লড়াইয়ে সহযোগী হচ্ছে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। তাঁর এই বক্তব্যে আতঙ্কিত হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, আতঙ্কিত হয়েছিল ভারতের পুঁজিপতি শ্রেণি। ফলে পরের বার সভাপতি নির্বাচনে গান্ধীবাদীরা, যাদের পক্ষে ছিল পুঁজিপতিরা, সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রার্থী দাঁড় করালেন পট্টভি সীতারামাইয়াকে। সুভাষচন্দ্র বামপন্থী ও বিপ্লবীদের সমর্থনে তাঁকে পরাস্ত করে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু সভাপতি হিসাবে গান্ধীবাদীরা তাঁকে কাজ করতে দেয়নি, পদে পদে বাধা দিয়েছে। ১৯৩৯ সালে কলকাতার ওয়েলিংটন স্কোয়ারের অধিবেশনে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে। চর্তুদিকে সুভাষচন্দ্রের পক্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ, কলকাতা লোকে লোকারণ্য, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী গান্ধীবাদী নেতারা সভা থেকে বেরোতে পারছিলেন না। সুভাষচন্দ্র জনতাকে নিরস্ত করে তাঁদের নিরাপদে বের করে নিয়ে গিয়েছিলেন। সে দিন সুভাষচন্দ্রের পরিবর্তে যিনি কংগ্রেসের সভাপতি হলেন, সেই রাজেন্দ্র প্রসাদকে তিনি নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। সুভাষচন্দ্রের সৌজন্যবোধ, তেজ ও সাহস দেখে রবীন্দ্রনাথ সে দিন তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘দেশনায়ক’ আখ্যা দিয়েছিলেন। এ সব ইতিহাস। সম্প্রতি বিজেপির এক নেতা সুভাষচন্দ্রের নাম না করে পরোক্ষ ইঙ্গিতে মন্তব্য করেছেন যে, শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মিটিংয়ে সুভাষচন্দ্রের দলবল নাকি ঢিল ছুঁড়েছিল। যে সৌজন্যবোধের পরিচয় সুভাষচন্দ্র গান্ধীবাদীদের প্রতি দেখিয়েছিলেন, তিনি তাঁর অনুগামীদের শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর মিটিংয়ে ঢিল ছুঁড়তে দেবেন– এটা সম্পূর্ণ অবিশ্বাস্য ও মিথ্যাচার।
কিন্তু এ সব কথা বিজেপি নেতাদের বলতে হচ্ছে কেন? কারণ, সুভাষচন্দ্রই সে দিন হিন্দু মহাসভার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। ভারতের মানুষকে সজাগ করেছিলেন। তাঁর হিন্দু মহাসভার বিরোধিতা ছিল নীতিগত। তিনি বলেছিলেন, কিছু প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তি হিন্দু মহাসভা গঠন করে রাজনীতি ও হিন্দু ধর্মকে কলুষিত করছে। সুভাষচন্দ্র বলেছিলেন, যারা হিন্দু-মুসলিম বিরোধ বাধায়, ব্রিটিশের সঙ্গে তাদেরও দেশের শত্রু হিসাবে গণ্য করতে হবে। হিন্দু মহাসভার বিরুদ্ধে তাঁর এই উক্তি সে দিন ভারতের জনগণ গ্রহণ করেছিল। হিন্দু মহাসভাকে তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল। আজও বিজেপি তা ভুলতে পারেনি। তাই সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে তারা মিথ্যা প্রচার করছে। এই অপপ্রচার, এই কুৎসা কি বাংলার, ভারতের জনগণ মেনে নেবে? আপনারা জানেন, এই আরএসএস-বিজেপি আগাগোড়া স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে। বলেছে, স্বাধীনতা সংগ্রামীরা দেশপ্রেমিক নন। তাঁরা দেশের শত্রু। হিন্দু মহাসভার নেতা সাভারকর ১৯৩৭ সালে দেশভাগের প্রস্তাব দেন হিন্দু আর মুসলিম আলাদা জাতি– এই ধুয়া তুলে। ১৯৪০ সালে এই প্রস্তাব লুফে নেয় মুসলিম লিগ। যার পরিণতিতে দেশ বিভক্ত হয়।
বন্ধুগণ, এই যে গান্ধীবাদীরা সুভাষচন্দ্রের নেতৃত্বকে সে দিন সরিয়ে দিতে পারল, তা তারা পারল কী করে? পারল, কারণ ভারতের জনগণের মানসিকতা ছিল, নেতারা যা-ই ঠিক করবে, আমরা সাধারণ মানুষ তা মেনে নেব, কারণ আমরা এতশত রাজনীতি বুঝি না। গান্ধীজি সন্ন্যাসীর মতো মানুষ, তিনি কি ভুল করতে পারেন! কিন্তু তাঁর পিছনে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ কাজ করছে, তা দেশের মানুষ বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারেনি বলেই সে দিন গান্ধীবাদীদের প্রত্যাখ্যান করে তারা সুভাষচন্দ্রের পক্ষে দাঁড়ায়নি। এই কথা এ দেশের অনেকেই জানে না যে, ইংরেজের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দেওয়াতে সুভাষচন্দ্রকে কংগ্রেস সাসপেন্ড করেছিল। যাকে নেতাজি বলেছিলেন, কংগ্রেসের থেকে আমাকে কার্যত বহিষ্কার করা হল। এরপর শেষ চেষ্টা হিসাবে তিনি দেশের বামপন্থীদের একত্রিত করে সংগ্রাম করতে চাইলেন। দুঃখের বিষয়, অবিভক্ত সিপিআই, কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টি তাঁর ডাকে সাড়া দিল না। নিরুপায় হয়ে সুভাষচন্দ্র দেশত্যাগ করলেন। বিদেশে গিয়ে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সুযোগ নিয়ে আজাদ হিন্দ বাহিনী গঠন করে লড়াই চালালেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। সে দিন যদি এ দেশের মানুষ রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাত, গান্ধীবাদী ও সুভাষচন্দ্রের রাজনীতির পার্থক্য ধরতে পারত, তা হলে কি আজ দেশের এই পরিণতি হত!
ভোটে সরকার বদলের দ্বারা মানুষের মূল সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়
আপনারা ভেবে দেখুন, আমাদের দেশে আজও সাধারণ মানুষ বার বার ভুল করছে। মানুষ ভোট দিয়ে বারবার সরকার পাল্টায়। রাজ্যে এক সময়ে কংগ্রেস ‘৪৭ সালের পর থেকে ‘৬৬ সাল পর্যন্ত সরকারে ছিল। তাদের শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ ভাবল– কংগ্রেসকে পরিবর্তন করতে হবে। কয়েক বছরের জন্য এল যুক্তফ্রন্ট সরকার। তারপর দিল্লিতে এল জনতা পার্টি। সেই জনতা পার্টির মধ্যে জনসংঘ, আরএসএস ছিল। তাদের সমর্থন নিয়ে পরিবর্তনের কথা বলে ‘৭৭ সালে সিপিএম রাজ্যে ক্ষমতায় এল। ৩৪ বছর শাসন করল। সিপিএম শাসনে মানুষ যখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠল, বুর্জোয়া সংবাদমাধ্যম তখন ‘অগ্নিকন্যা’ আখ্যা দিয়ে নেত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জীকে সামনে নিয়ে এল। তৃণমূল কংগ্রেস সরকার তৈরি করল। আবার একদল তৃণমূল শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে, আর এক দল হিন্দু ধর্মের নামে ভোটের প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে বিজেপিকে নিয়ে এল। এই যে পরিবর্তন বার বার হচ্ছে, এতে সাধারণ মানুষের জীবনের কোনও পরিবর্তন হচ্ছে কি? বেকার সমস্যা কমছে, নাকি দিনের পর দিন বাড়ছে? জিনিসপত্রের দাম, ছাঁটাই, নারীধর্ষণ, দুর্নীতি কমছে, না দিনের পর দিন বাড়ছে?
সাধারণ মানুষকে রাজনীতি বুঝতে হবে
এই কথাই বলেছেন কমরেড শিবদাস ঘোষ আজ থেকে ৫২ বছর আগে। আন্দোলনগুলোর ফল কী দাঁড়ায় দেখাতে গিয়ে বলেছেন, ‘আন্দোলনের যখন একটা ঢেউ আসে, আন্দোলনের যখন একটা গরম হাওয়া চলতে থাকে তখন আন্দোলনের রাস্তা বা নেতৃত্ব ঠিক কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ভাবে না। তাদের ভাবানোর কোনও চেষ্টাই হয় না। এ দেশের মানুষ অতীতে লড়েছে, ভবিষ্যতেও লড়বে। বলেছেন, বুঝতে হবে, এই সমাজব্যবস্থা কী ধরনের। একে কী ভাবে পরিবর্তন করা যায়। বুঝতে হবে, এই সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের সামনে বাধা কী, মূল শত্রু কে। জানতে হবে রাষ্ট্রের চরিত্র কী, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কী, কাকে হঠাতে হবে, গণআন্দোলনগুলিকে সমাজ পরিবর্তনের লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে তার বিপ্লবী রাজনীতি কী হবে, আন্দোলনের কলাকৌশল, তার নিয়মকানুন, তার কৌশলগত পথ কী হবে– এই জিনিসগুলো যদি আমাদের উপলব্ধিতে না আসে তা হলে আমরা বার বার লড়ব, বার বার অর্থনৈতিক ও গণতান্ত্রিক দাবি-দাওয়াকে কেন্দ্র করে লড়াইয়ের ময়দানে আসব, আত্মদান করব, কিন্তু এই লড়াইগুলোর মধ্য দিয়ে অতীতে বহু বার যা ঘটেছে, এখনও তাই ঘটবে। জনগণের অশেষ আত্মত্যাগের বিনিময়ে সরকারবিরোধী যে চেতনা জন্ম নেবে, তাকে ইলেকশন রাজনীতি দিয়ে পার্লামেন্টারি পার্টিগুলি, যারা ভোটের মাধ্যমে গদি দখল করতে চায়, তারা তার ফয়দা ওঠাবে’।
দিল্লিতে এই যে আন্দোলন হয়ে গেল– অনেক আত্মত্যাগ, লড়াই হল, কিন্তু এর পরিণতি কী হবে? আবারও হয়তো বিজেপি মানুষকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে, ইলেকশন কমিশনকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় টিকে থাকবে। ইলেকশন কমিশন এখন তো বিজেপিরই অফিস। ইলেকশন কমিশনের সদস্যদের কারা ঠিক করে– প্রধানমন্ত্রী, আর একজন মন্ত্রী আর বিরোধী দলের নেতা। অর্থাৎ তিন জনের মধ্যে দু’জনই বিজেপির লোক। ফলে এই ইলেকশন কমিশন বিজেপির হুকুমে চলে। যেমন সিবিআই-ইডি আগে কংগ্রেসের হুকুমে চলত, এখন বিজেপির হুকুমে চলে। গোটা ব্যবস্থাটাই এ ভাবে চলছে। ফলে ভোট যা হওয়ার হবে। তা ছাড়া এসআইআর আছে। তাতে বহু মানুষকে ভোট থেকে বঞ্চিত করা হবে। এ ছাড়াও ব্যালট বাক্সের কারসাজি হবে, গণনার কারসাজি হবে। তা সত্ত্বেও যদি ধরি আন্দোলনকে ব্যবহার করে কংগ্রেস ও তার সহযোগীরা জিতল– তাতেও কী হবে? কংগ্রেস তো এর আগে দীর্ঘদিন ছিল ক্ষমতায়! ২০১৪ সালে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মানুষের তীব্র ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি এসেছে। তাতে মানুষের জীবনে সংকটের কী পরিবর্তন হয়েছে?
পুঁজিবাদী শাসনে মানুষের দুর্দশা বেড়েই চলেছে
পশ্চিমবাংলাতেও কী পরিবর্তন হয়েছে? বিজেপি সোনার বাংলা করবে বলেছিল। সেই ‘সোনার বাংলা’র শুরুতেই বিজেপি কয়েক লক্ষ হকারকে এবং আরও কয়েক লক্ষ বস্তিবাসীকে বুলডোজার চালিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই গুঁড়িয়ে দিয়ে পথের ভিখারি করে দিয়ে গেল। লোকে কি শখ করে হকারি করে? চাকরি নেই, বিপুল কর্মহীনতা। মাইগ্র্যান্ট লেবার– আজ থেকে ২৫-৩০ বছর আগে এই শব্দটা কেউ জানত না। আজ হাজারে হাজারে লাখে লাখে মাইগ্র্যান্ট লেবাররা গ্রাম থেকে শহরে, বিভিন্ন রাজ্যে, রাজ্যের বাইরেও, যেখানে কাজ মেলে সেখানে চলে যাচ্ছে। হাজার হাজার শ্রমিক ভারতের বাইরে চলে যাচ্ছে। পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই যে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ চলছে, জানা গেল এই যুদ্ধে রাশিয়ার হয়ে লড়াই করিয়েছে ভারতের শ্রমিকদের। তারা রাশিয়ায় গিয়েছিল কাজের খোঁজে। যুদ্ধে তাদের ভাড়াটে সৈনিক হিসাবে কাজে লাগানো হল। বেশ কয়েক জন মারা গেল। সৌদি আরবে যান, দুবাই, কাতার, জর্ডন, আরব আমিরশাহিতে যান– ওখানে তেলের খনির মালিকদের অধীনে কাজ করে এ দেশের পুরুষ ও নারী শ্রমিকরা। আমেরিকা থেকে কিছু দিন আগে হাতকড়া বেঁধে এ দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী ভারতীয় শ্রমিকদের। অর্থাৎ ভারত থেকেও কাজের খোঁজে অন্য দেশে অনুপ্রবেশ করছে মানুষ। বিজেপি শোরগোল তোলে বাংলাদেশিরা অনুপ্রবেশ করছে বলে। অনুপ্রবেশ করছে না এ কথা আমি বলছি না। কিন্তু তারা কি সব জেহাদি? তারা পেটের দায়েই আসে। কয়েক দিন আগে জানা গেল, মরক্কো থেকে ৬০ হাজার গরিব মানুষ সমুদ্রে সাঁঁতার দিয়ে স্পেনে ঢুকছে। তাদের আটকানো হচ্ছে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে। তা করতে গিয়ে কয়েকশো লোক মারা গেল। সমস্তটাই ঘটছে পেটের জ্বালায়। এই তো ভারতের অবস্থা! মাইগ্র্যান্ট লেবার, গিগ লেবারে দেশ ভরে আছে। সরকারি দপ্তর, ব্যাঙ্ক, রেল, বেসরকারি কোম্পানি কোথাওই স্থায়ী শ্রমিক প্রায় নেই। খুব অল্প সংখ্যক স্থায়ী শ্রমিক আছে। বাকিরা সব কন্ট্র্যাক্টরের অধীনে কাজ করে। কন্ট্র্যাক্ট লেবাররাই লাখে লাখে কাজ করে। এদের কাজের কোনও নির্দিষ্ট সময় নেই, নির্দিষ্ট মজুরি নেই।
এই অবস্থায় গ্রাম থেকে মেয়েরা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে লাখে লাখে। সরকারি হিসাবেই চার লক্ষ নারী ভারতবর্ষের বাইরে চলে গেছে গত পাঁচ বছরে। আসল সংখ্যা আরও অনেক বেশি। একদল লোক গ্রামের মেয়েদের নিয়ে ব্যবসা করে। বিয়ের নাম করে বা কাজ দেবে বলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে, কয়েক দিন বাদে বিশ হাজার তিরিশ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। কাজ দেওয়ার নাম করে বিদেশে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয় মেয়েদের। নারী পাচার দেশে একটা বিরাট ব্যবসা। কারা এই ব্যবসা করে? এই সরকার, তার মন্ত্রীরা তা জানে না? পুলিশ জানে না? কোথাও কেউ বাধা দিচ্ছে! এই হচ্ছে এ দেশের স্বাধীনতা!
রাজনীতির বাইরে কেউ নেই
আজ দেশের এই চেহারা দেখলে ক্ষুদিরাম কী বলতেন? সূর্য সেন, প্রীতিলতা, উধম সিং, ভগৎ সিং, আসফাকউল্লা খানরা কী বলতেন? এই স্বাধীনতার জন্য কি এঁরা লড়াই করেছেন? কেন এই পরিণতি হল? এর কারণ হল, সাধারণ মানুষ, দেশের জনগণ রাজনীতি বুঝতে চায় না। তারা মনে করে, আমরা ও সব বুঝি না। আমরা দিন আনি দিন খাই। অথচ রাজনীতিই তাদের জীবন চালায়, এ কথা তারা জানে না। রান্নাঘরে তেলের দাম, নুনের দাম কী হবে রাজনীতি ঠিক করে। একটা হাঁড়ি কিনতে হলেও তার দাম রাজনীতি ঠিক করে। রাজনীতি ঠিক করে স্কুলে পড়াশোনার সুযোগ থাকবে কি না। রাজনীতি ঠিক করে চাকরি মিলবে কি না। রাজনীতিই জীবনকে চালায়। আবার রাজনীতিই ঠিক করে কে সরকার গড়বে, কাকে আপনারা ভোট দেবেন। রাজনীতির বাইরে কে আছে? অথচ মানুষ রাজনীতি বুঝতে চায় না। জনগণকে বুঝতে হবে এবং বোঝাতে হবে যে, এই সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত– শোষক-শোষিত, ধনী-গরিব, মালিক-শ্রমিক, অত্যাচারী এবং অত্যাচারিত। সমাজে দুটি শ্রেণি আছে। রাজনীতিও শ্রেণিবিভক্ত। ভারতবর্ষকে চালায় শোষক শ্রেণির রাজনীতি– পুঁজিপতি শ্রেণি, অত্যাচারী শ্রেণির রাজনীতি। আর সরকারগুলো হচ্ছে তাদের পলিটিক্যাল ম্যানেজার। জমিদাররা যেমন জমিদারির নায়েব রাখত, তেমনই সরকারগুলো, তার মন্ত্রীরা হচ্ছে পুঁজিপতিদের মাইনে করা পলিটিক্যাল ম্যানেজার।
কংগ্রেস, বিজেপি, সমাজবাদী পার্টি প্রভৃতি সংসদীয় পার্টিগুলি যারা ভোটে জেতে, তারা প্রতিটিই পুঁজিপতি শ্রেণির পলিটিক্যাল ম্যানেজার। পুঁজিমালিকরাই ওদের টাকা দেয় ভোটে, পুঁজিপতিরাই সংবাদপত্র-টিভি চ্যানেল চালায়, একেক বার ওদের পছন্দমতো দলের পক্ষে প্রচারের হাওয়া তোলে। বলে, এ বার একে নয় তাকে ভোট দাও, এ বার ওকে সরিয়ে তাকে আনো। প্রচারের হাওয়া মানুষের মনকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তাদের ফাঁদে পা দিয়ে মানুষ বারবার ঠকেছেন। তাঁরা আবারও ঠকবেন, যদি রাজনীতি না বুঝতে চান। জনগণকে বুঝতে হবে, শোষিত জনগণের হয়ে, অত্যাচারিত মানুষের হয়ে কারা লড়ছে, আর কারা এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখছে। পুঁজিবাদের স্বার্থেই এই সংবিধান, আইনকানুন, বিচারবিভাগ চলে, পুলিশ-মিলিটারি চলে। বুঝতে হবে এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য কারা কাজ করে, আর কোন দল বলে– ভোট দিয়ে হবে না, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করতে হবে। বলে, পুঁজিবাদ উচ্ছেদের জন্য, সমাজতন্ত্র কায়েমের জন্য বিপ্লব চাই। মানুষকে এইসব রাজনীতি বুঝতে হবে। কোন দল শোষিত, অত্যাচারিত জনগণের জন্য লড়ছে তা বুঝতে হবে। মাঠে কাজ করতে করতে বুঝতে হবে, ঘরে-অফিসে-কারখানায় কাজ করতে করতে বুঝতে হবে। তা না হলে বার বার ঠকতে হবে। সোনার বাংলার স্লোগান দিয়ে এক একটা দল সরকারে আসবে, আর মানুষ বার বার সেই ‘সোনার বাংলা’র বীভৎস চেহারা দেখবেন। তারপর পাঁচ-দশ বছর বাদে আবার ‘পরিবর্তন চাই’– এ কথা বলে আর এক দল আসবে। যেমন সিপিএম এখন তার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ভোটসর্বস্বতা নয়, আন্দোলন গড়ে তুলতে চাই সংগ্রামী বামপন্থা
আপনারা জানেন, ২০১৯ সালে সিপিএম বামপন্থাকে বিসর্জন দিয়ে ‘আগে রাম পরে বাম’ জিগির তুলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। সে বার সিপিএম ভোট না দিলে বিজেপি এই জায়গায় আসতে পারত না। বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিলে দেখবেন, কয়েকটা সিট বাদ দিয়ে এ বারও তারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। কর্মীদের বুঝিয়েছে, এখন তৃণমূল যাক, বিজেপি আসুক। তার পরেই আমাদের চান্স। সিপিএম সরকার করতে পারে, আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর চাই। সিপিএম তো ৩৪ বছর শাসন করেছে। এত দীর্ঘ শাসন কংগ্রেসও করেনি, তৃণমূলও করেনি। কিন্তু পশ্চিমবাংলার মানুষ আপনাদের বিরুদ্ধে গেল কেন? আপনারা জিতলেই যদি বামপন্থা শক্তিশালী হয়, তা হলে পশ্চিমবাংলায় আজ মানুষ দক্ষিণপন্থী বিজেপির দিকে ঝুঁকল কেন? চৌত্রিশ বছরে তো বামপন্থা অনেক শক্তিশালী হওয়ার কথা! বরং উল্টো হয়ে গেল!
বামপন্থার রূপ কী? এ দেশে স্বাধীনতা আন্দোলনে বামপন্থার কথা ভগৎ সিং-নেতাজি সুভাষচন্দ্ররা তুলেছিলেন। সেই সময়ে মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী কিছু দল বা শক্তিও ছিল। মার্ক্সবাদী বা কমিউনিস্ট নাম নিয়ে যে দলগুলি ছিল, তারা যথার্থ মার্ক্সবাদী দল হিসাবে গড়ে উঠতে না পারার কারণেই কমরেড শিবদাস ঘোষকে একটি যথার্থ কমিউনিস্ট পার্টি হিসাবে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-কে গড়ে তুলতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে এই মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যুক্ত বামপন্থী আন্দোলন গড়ে উঠেছে এবং তা ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
সিপিএম, সিপিআই এক সময় গণআন্দোলনের রাস্তায় ছিল। ১৯৫২ সালে, ‘৫৪, ‘৫৬, ‘৫৯, ‘৬৬ সালে লড়েছে। এখনও সিপিএম অফিসে একজন প্রবীণ নেতা আছেন – বিমান বসু। তাঁকে জিজ্ঞেস করলে জানতে পারবেন, সে দিন লাঠি-গুলির সামনে তিনিও ছিলেন, আমিও ছিলাম, একত্রে আমরা লড়াই করেছিলাম। সে ছিল সংগ্রামী বামপন্থা। কিন্তু ‘৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর তাঁদের চেহারা পাল্টে গেল। আমাদের দল বলেছিল, আমরা বামপন্থীরা সরকার গড়লে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন করলে লাঠি-গুলি চালাব না। এখানেই আমাদের সাথে তাদের মতপার্থক্য হয়ে গেল। আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, ‘৭৭ সালে নির্বাচনের প্রাক্কালে জ্যোতি বসু রেডিও ভাষণে বলেছিলেন– ‘এ বার সিপিএম ক্ষমতায় গেলে পশ্চিমবঙ্গে আর আন্দোলন-অশান্তি হবে না। যুক্তফ্রন্টের সময় এ সব হয়েছিল কারণ সেখানে এসইউসিআই ছিল, এখন এসইউসিআই আমাদের সাথে নেই’। এই কথা বলে জ্যোতি বসু কাকে আশ্বস্ত করেছিলেন? পশ্চিমবাংলার জনগণকে কি? না। তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন পুঁজিপতিদের। তাঁদের ৩৪ বছরের শাসনে সংগ্রামী বামপন্থার রাস্তা বিসর্জন দিয়ে পুঁজিবাদকেই সেবা করেছেন তাঁরা। তখন মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করতে হয়েছে, বাসভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। তাঁরা প্রাথমিক স্তর থেকে ইংরেজি, পাশ-ফেল তুলে দিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে বরেণ্য শিক্ষাবিদদের নিয়ে আমরা আন্দোলন করেছি। উনিশ বছর আন্দোলন করার পর প্রাথমিকে ইংরেজি আবার চালুর দাবি মানতে বাধ্য হয় সিপিএম। সিপিএম সরকারের পুলিশ নদিয়ার শান্তিপুরে আন্দোলনকারী কৃষকদের গুলি করে মেরেছিল, টিটাগড়ে চটকল শ্রমিককে গুলি করে মেরেছিল। তারা খিদিরপুরের ডকে আন্দোলনকারী শ্রমিককে গুলি করে মেরেছে, সিঙ্গুরে মেরেছে। বিদেশি সালিম কোম্পানিকে জমি দেবে বলে নন্দীগ্রামে জমি দখল করতে গিয়েছিল। সেখানে লড়াইয়ের সময় দু’বার গুলি চালিয়েছে। তারা নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের অ্যান্টি-সোশ্যালদের জড়ো করে তাদের দিয়ে মহিলাদের ধর্ষণ করিয়েছে, যে অ্যান্টি-সোশ্যালরা পরবর্তীকালে তৃণমূলের শক্তি হল। এখন হয়ত তারা দলে দলে বিজেপির ভক্ত হবে। এর পরে আমরা বলেছিলাম– ‘দিস গভর্নমেন্ট মাস্ট গো।’ কারণ, এর পরেও ক্ষমতায় থাকলে তারা আরও অত্যাচার করবে। এর আগে বিধানসভায় আমরা কখনও সিপিএম সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব সমর্থন করিনি। কিন্তু তৃণমূলকে সে বারের ভোটে আমরা সমর্থন করেছিলাম। মূলত তিনটি কারণ আমরা প্রকাশ্যে পাবলিককে জানিয়ে সমর্থন করেছিলাম। প্রথমত, আগেই বলেছি কী কারণে সিপিএম সরকারের পরাজয় চেয়েছিলাম। দ্বিতীয়ত, আমরা জানতাম, আমরা সমর্থন করি বা না-করি, সে বার তৃণমূল কংগ্রেস জিতবেই এবং মার্ক্সবাদ ও বামপন্থার বিরুদ্ধে প্রচার চালাবে। আমরা শর্ত দিয়েছিলাম– সিপিএমের বিরুদ্ধে বলতে পারো, কিন্তু মার্ক্সবাদ ও বামপন্থাকে আক্রমণ করা যাবে না। এটা তারা মেনে নিয়েছিল। তৃতীয়ত, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের আন্দোলন আমাদের দলই শুরু করেছিল। সিঙ্গুরে যখন আমাদের উদ্যোগে জমিরক্ষার জন্য পুলিশের বিরুদ্ধে চাষিরা লড়ছিল, তখন তৃণমূল নেত্রী কলকাতায় অনশনের মহড়া দিয়ে সেই আন্দোলনকে ব্যাহত করলেন যেন অনশনের দ্বারাই সব হয়ে যাবে। আর সেই সুযোগে সিপিএম সরকার জমি দখল করে নিল। নন্দীগ্রাম আন্দোলনে তৃণমূল নেত্রীর কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাই ছিল না, তৃণমূলের যে নেতার কিছু ভূমিকা ছিল, তাঁর নাম আজ বললে আপনারা চমকে উঠবেন। তুচ্ছ রাজনৈতিক স্বার্থ মানুষের কত পরিবর্তন ঘটায়! আমরা জনগণকে নিয়ে আন্দোলন করেছি, আর সংবাদপত্র প্রচার করেছে যেন তৃণমূলই সব করেছে। মিডিয়ায় আমাদের নামগন্ধও ছিল না। ফলে ভোটে যাতে তৃণমূল একতরফা সিঙ্গুর আন্দোলনের ক্রেডিট না নিতে পারে, আমরাও যে ছিলাম, এটা যাতে জনগণ জানতে পারে– এই তিনটি লক্ষ্য নিয়েই সেদিন তৃণমূলকে সমর্থন করেছিলাম। আবার একই সাথে এ কথাও বলেছিলাম, যে মুহূর্তে তৃণমূল সরকার গড়বে, জনগণের দাবিতে আমরা আন্দোলনের রাস্তায় নামব। নেমেছিও, জনগণ জানেন। তৃণমূল শাসনে আমাদের কর্মীরা মার খেয়েছে, খুনও হয়েছে। সিপিএমের যাঁরা প্রচার করেন, আমাদের দলই তৃণমূলকে জিতিয়েছে, তাঁরা জেনেশুনে অসত্য বলেন। আমাদের দল কত ভোট কন্ট্রোল করে যে আমরা একটা দলকে জেতাতে-হারাতে পারি! তৃণমূল এমনিই জিতত, আমরা উপরোক্ত তিনটি কারণে সমর্থন করেছি, মন্ত্রিত্ব-এমএলএ-এমপি-র লোভে নয়।
২০০২ সালে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সিপিএম অফিসে আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে ভোটে ঐক্যের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তাদের নেতারা। বিমান বসু সেখানে ছিলেন। আমরা রাজি হলে বেশ কিছু এমএলএ হত, হয়তো মন্ত্রিত্ব পেতাম। আমরা বলেছিলাম– না। আপনারা সংগ্রামী বামপন্থার রাস্তা থেকে সরে গেছেন, সংগ্রামী বামপন্থী রাস্তায় আসুন, তারপর ঐক্য হবে। বাস্তবে কংগ্রেস-তৃণমূল-বিজেপি শাসনের মতোই তাদের শাসনও জনস্বার্থবিরোধী হিসাবে জনমনে গেঁথে আছে।
জনগণের দেওয়া অর্থেই আমাদের দল চলে
আমরা লড়াই করি, আন্দোলন করি। আমরা ভোটের জন্য পুঁজিপতিদের কাছে টাকা ভিক্ষা করি না। এই সব দল মালিকদের টাকায় চলে। এখানে অনেক কর্মী আছেন, সমর্থকরা আছেন, সাধারণ মানুষও আছেন। এই মিটিংয়ের জন্য প্যান্ডেল, মাইক সহ যা কিছু আয়োজন দেখছেন, তার জন্য আমাদের কর্মীরা রাস্তায় রাস্তায়, স্টেশনে স্টেশনে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেছে। আমরা বাড়ি বাড়ি যাই, রাস্তায় দাঁড়াই, পাবলিকের চাঁদায় চলি। আমরা কখনও মালিকের কাছে, ব্যবসায়ীদের কাছে মাথা নিচু করিনি। এই দল গরিবের, সর্বহারা শ্রেণির, শোষিত জনগণের। তাদের সাহায্য নিয়েই আমরা দাঁড়িয়ে আছি। আজও আমি সিপিএম নেতাদের বলব, আপনারা সংগ্রামী বামপন্থার রাস্তায় আসুন। আপনাদের প্রতি আমাদের কোনও বিদ্বেষ নেই। আপনারা লড়াই-আন্দোলনে আসুন। ভোটের জন্য অমুক দলের একজন পীরকে হঠাৎ সেকুলার বানাবেন না। একজন পীর, অথচ মুসলিম ভোট পাওয়ার জন্য তাকে সেকুলার বানিয়ে দিলেন! বহু দাঙ্গার হোতা কংগ্রেসকে সেকুলার বানিয়ে দিলেন! সেকুলার কথার তো একটা অর্থ আছে। সেকুলার কথার অর্থ হচ্ছে– ধর্মের সাথে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক থাকবে না। রাজনীতিতে, সরকার-প্রশাসনের মধ্যে, শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্ম থাকবে না। ধর্ম থাকবে ব্যক্তিগত বিষয় হিসাবে। কেউ ধর্মে বিশ্বাস করবে, কেউ করবে না। সিপিএমের কর্মীদের কাছে অনুরোধ, এই ভোটসর্বস্ব রাজনীতি বাদ দিয়ে আন্দোলনের রাজনীতিতে আসুন, সংগ্রামী বামপন্থার ঝান্ডা বহন করুন। আমরা আবার একসাথে লড়ব। আপনাদের চৌত্রিশ বছরের শাসনে আমাদের দুশো নেতা-কর্মী শহিদ হয়েছেন। এখানেও একটা শহিদ বেদি আছে। সিপিএম সরকারের পুলিশের গুলিতে নিহত কমরেড মাধাই হালদারের শহিদ বেদি। তা সত্ত্বেও আমরা কোনও বিদ্বেষ নিয়ে চলি না। সিপিএমের কর্মীরা, সমর্থকরা যদি আন্দোলনে যুক্ত হন, আন্দোলনের শক্তি বাড়বে।
শিক্ষা এবং সংস্কৃতি, বিজেপি দুই-ই ধ্বংস করছে
বন্ধুগণ, আজ ভারতবর্ষে এবং এই রাজ্যে পুঁজিপতি শ্রেণির বিশ্বস্ত দল বিজেপি ক্ষমতায়। সামন্তী চিন্তায় আচ্ছন্ন অন্ধকারাচ্ছন্ন ভারতবর্ষে নবজাগরণের প্রথম মশাল যিনি জ্বালিয়েছিলেন, সেই রাজা রামমোহন রায়কে যদি আপনারা শ্রদ্ধা করেন, আপনাদের মনে রাখতে হবে, তিনি বলেছিলেন– সংস্কৃত শিক্ষা দেশকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাবে। দু’হাজার বছর ধরে এই সংস্কৃত শিক্ষা ভারতবর্ষের ক্ষতি করেছে। বলেছেন, বেদান্ত বাস্তব জগৎকে অস্বীকার করে। বেদান্ত পড়লে আধুনিক নাগরিক তৈরি হবে না। বলেছেন, কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স, ন্যাচারাল সায়েন্স, ন্যাচারাল ফিলোজফি পড়তে হবে। রামমোহনের পর এলেন বিদ্যাসাগর। যে বিদ্যাসাগর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, তাঁর চরিত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য ‘দয়া নহে, বিদ্যা নহে, অজেয় পৌরুষ আর অক্ষয় মনুষ্যত্ব’। সেই বিদ্যাসাগর বলেছেন, সাংখ্য এবং বেদান্ত ভ্রান্ত দর্শন। ইউরোপের এমন দর্শন পড়ানো উচিত, যা পড়লে ভারতবর্ষের ছাত্ররা সাংখ্য-বেদান্তের প্রভাব থেকে মুক্ত হবে। এই বিদ্যাসাগর ভগবান মানতেন না, পুজো করতেন না, কোনও দিন মন্দিরে যাননি। স্বয়ং রামকৃষ্ণ তাঁর বাড়িতে এসে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। অনুরোধ করেছিলেন দক্ষিণেশ্বরে যাওয়ার জন্য। দক্ষিণেশ্বরের মন্দির না বলে বলেছিলেন, রাসমণির বাগানে চলুন। বিদ্যাসাগর যাননি। রামমোহন-বিদ্যাসাগরের এই যে নবজাগরণের চিন্তা, জ্যোতিরাও ফুলের যে চিন্তা, পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-প্রেমচন্দ-নজরুলের যে চিন্তা, আরএসএস-বিজেপি তার সম্পূর্ণ বিরোধী। আরএসএস-বিজেপি এ দেশে সনাতন ধর্মের নামে প্রাচীন বেদ বেদান্ত, মনুসংহিতাকে সামনে আনছে। এ কি আপনারা মেনে নেবেন? এ দেশের মানুষ মানবে? এরা পাঠ্যপুস্তকে নানা আজগুবি জিনিস আনছে। দশ হাজার বছর আগে নাকি টেলিভিশন, ইন্টারনেট ছিল! দশ হাজার বছর আগে ভারতবর্ষের ঋষিরা সব এরোপ্লেনে চড়ে অন্য গ্রহে চলে যেতেন! এ সব জিনিস বিজেপি পাঠ্যপুস্তকে আনছে। গণেশের মাথা নাকি প্লাস্টিক সার্জারি করে বসানো হয়েছে, প্রাচীন ভারতে নাকি স্টেম সেল নিয়ে গবেষণা হত, গান্ধারীর একশো সন্তান হয়েছে টেস্ট টিউব বেবি প্রক্রিয়ায়–এই সব হাস্যকর প্রচার চলছে। বিদ্যাসাগর বেঁচে থাকলে আজ কী বলতেন? বলতেন, এর থেকে পড়াশুনা বন্ধ করে দেওয়া ভাল। ওরা বলছে, ডারউইন পড়ানো চলবে না। মুসলিম শাসকদের যুগ ইতিহাস থেকে বাদ দিয়েছে। কয়েকশো বছর এদের শাসন তো ছিল, ছাত্ররা তা জানবে না! যে দিল্লির লালকেল্লা থেকে নেতারা ভাষণ দিচ্ছেন, যে তাজমহল, কুতুবমিনার ইত্যাদি বিস্ময়সৃষ্টি হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে– এগুলি কারা সৃষ্টি করেছে? তপোবনের মুনি-ঋষিরা? সনাতন ধর্মের ধ্বজাধারীরা? ওঁরা হিন্দু ধর্মের কথা বলছেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখবেন, চৈতন্য, রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দরা যে হিন্দু ধর্ম প্রচার করেছেন, আরএসএস-বিজেপি তার সম্পূর্ণ বিরোধী। বিজেপি-আরএসএসের হিন্দু ধর্ম সম্পূর্ণ আলাদা। কোনটা মানবেন?
এখন অত্যন্ত মারাত্মক দুটো আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে। একটা শিক্ষার ওপর। ক্লাস টুয়েলভ পর্যন্ত কোনও পরীক্ষা নেই, সেমিস্টার আছে। শিক্ষকের গুরুত্ব কমিয়ে আনা হচ্ছে, শিক্ষকদের নাম দেওয়া হয়েছে ফেসিলিটেটর। পড়ানো হবে মূলত অনলাইনে। আমাদের দেশে এবং সব দেশেই শিশুরা প্রথম শিক্ষা পায় মা-বাবার কাছে এবং তারপর শিক্ষকের কাছে। এ ক্ষেত্রে মুখোমুখি শিক্ষাগ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষক-ছাত্রের যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সে সব থাকবে না, শিক্ষা হবে অনলাইনে। সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, অর্থনীতি এই সব বিষয় নিয়ে যে গভীরে পড়ানো হত, তার গুরুত্ব কমিয়ে বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, স্পেশালাইজেশনের কথা বলা হচ্ছে। এই স্পেশালাইজেশন সম্পর্কে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন– এর দ্বারা মানুষকে কারখানার যন্ত্রে, রোবটে পরিণত করা হবে। পরিপূর্ণ মনুষ্যত্ব বিকশিত হবে না। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা জিনিস পড়া, সাহিত্য, গল্প-উপন্যাস পড়ার মাধ্যমে চিন্তাশক্তির যে বিকাশ ঘটে, ন্যায়-অন্যায় বোধ গড়ে ওঠে, কোনটা ঠিক যুক্তি, কোনটা ভুল যুক্তি– এ সবের যে ধারণা গড়ে ওঠে, সে সব সুযোগ আর থাকবে না। শিক্ষাকে এরা এই দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। মূর্খ হয়ে থাকো, তা হলে সরকারকে, পুঁজিপতি শ্রেণিকে প্রশ্ন করবে না, অন্যায়ের বিরুদ্ধতা করবে না, অন্ধ হয়ে থাকবে। গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘শিক্ষা সম্বন্ধে আমরা বলেছিলাম মানুষ মানুষের কাছ হইতেই শিখিতে পারে, যেমন জলের দ্বারাই জলাধার পূর্ণ হয়, শিখার দ্বারাই শিখা জ্বলিয়া ওঠে, প্রাণের দ্বারাই প্রাণ সঞ্চারিত হইয়া থাকে, … গুরু-শিষ্যের পরিপূর্ণ আত্মীয়তার সম্বন্ধের ভিতর দিয়াই শিক্ষাকার্য সজীব দেহের শোণিত স্রোতের মতো চলাচল করিতে পারে।’ মনীষীদের এই সব হুঁশিয়ারি তারা সম্পূর্ণ বাতিল করে দিচ্ছে। গোটা দেশ জুড়ে একটা মূর্খের জগৎ তৈরি করতে চাইছে– যারা প্রশ্ন করবে না, জানতে চাইবে না, বিচার করবে না, যাদের ন্যায়-অন্যায় বোধ থাকবে না।
আর একটা মারাত্মক আক্রমণ হল, চরিত্র ধ্বংস করা, বিবেক নষ্ট করে দেওয়া। মদ খাও, ড্রাগ-হেরোইনের নেশা করো, নারীদেহ নিয়ে নোংরা আলোচনায়, অশ্লীল সিনেমায় মত্ত থাকো– এই মানসিকতা গড়ে তুলছে পুঁজিবাদ ও বিভিন্ন শাসক দল। ক’দিন আগে ২৯ জুলাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৩৬তম প্রয়াণদিবস গেল। কে জানে তার খবর? এত বড় একজন মানুষ ছিলেন, সংবাদপত্রে তাঁকে নিয়ে কোনও লেখা আছে? কোথাও এ নিয়ে চর্চা আছে? ক’দিন বাদে আসবে ১১ আগস্ট– ক্ষুদিরামের আত্মাহুতির দিন। ক’জন খবর রাখে এই কিশোরের আত্মদানের? সংবাদপত্রের পাতায় পাবেন ক্রিকেটারদের কাহিনি, ফিল্মস্টারদের কাহিনি– কে কাকে বিয়ে করছে, কার সাথে কার বিচ্ছেদ হচ্ছে, কার কোথায় কতগুলো বিলাসবহুল বাডি, গাড়ি। এদের সামনে রেখে দেশে কোন চরিত্র গড়ে উঠবে? যে দেশের যুবকরা রামমোহন-বিদ্যাসাগর-ফুলেকে জানে না, রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-নজরুলকে জানে না, সুভাষচন্দ্র-ভগৎ সিং-ক্ষুদিরাম-সূর্য সেন-প্রীতিলতা-চন্দ্রশেখর আজাদ-আসফাকউল্লা খানকে জানে না, সেই দেশে কী করে চরিত্র গড়ে উঠবে? এ সব নিয়ে কোথাও কোনও চর্চা আছে?
আমরা কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষায় মনীষীদের নিয়ে, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়ে চর্চা করি। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন– আগে এঁদের থেকে শেখো, এইসব চরিত্রের গুণাবলি অর্জন করো। এর পরের ধাপ কমিউনিস্ট চরিত্র। আজ এখানে যাঁরা সাধারণ মানুষ আছেন, আপনারা অনেকেই বলেন, এসইউসিআই(কমিউনিস্ট) দলের কর্মীরা, ছেলেমেয়েরা ভদ্র, নম্র, সৎ। এই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে আমাদের দলের ছেলেমেয়েরা কোথা থেকে এই চরিত্র পায়? এটা মহান মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারার শিক্ষা। বড় বড় কথা নয়, বড় চরিত্র গড়ে তোলার সাধনা করো– এই প্রচেষ্টা, এই সংগ্রাম এই দলের মধ্যে আমরা করি।
ফলে এই দুটি আক্রমণের দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এই যে দেশে এত নারীধর্ষণ হচ্ছে, দু’বছরের শিশুকন্যাকে ধর্ষণ করে খুন করছে, সত্তর-আশি বছরের ঠাকুমা-দিদিমার বয়সী মহিলাকে ধর্ষণ করছে, জন্মদাতা পিতা কন্যাকে ধর্ষণ করছে, শিক্ষক ছাত্রীকে ধর্ষণ করছে– এগুলো তো আপনারা সংবাদপত্রে দেখেন, পড়েন। এ রকম একটা দেশের কথা অতীতের মনীষীরা, স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ভাবতে পেরেছিলেন? এগুলো কেন হচ্ছে? কারণ এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আর তার রক্ষাকারী দলগুলো মনুষ্যত্ব ধবংস করছে। অসংখ্য মদের দোকান, নেশাভাঙের ব্যবস্থা। সিপিএম যখন সরকারে ছিল, বলেছিল মদের দোকান চাই, কারণ সেখান থেকে ট্যাক্স আসবে। তৃণমূলও একই যুক্তি করেছিল। বিজেপিও একই রাস্তায় চলেছে। ভারতবর্ষের সব রাজ্যে এই জিনিস চলছে। যত ধর্ষণ-হত্যা হয়, দেখবেন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুষ্কৃতীরা মদ্যপ অবস্থায় ছিল। মদ ও মাদকের নেশা এই ভাবে অমানুষ তৈরি করছে, অথচ সরকারগুলোর কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। ভাবতে পারেন, ক্লাস ফাইভ-সিক্সের ছেলেমেয়েরা সেক্স নিয়ে আলোচনা করছে, সেক্সে ইনভলভড হচ্ছে! দেশ কোথায় যাচ্ছে!
সাম্রাজ্যবাদ তাদের মুনাফার স্বার্থে দেশে দেশে যুদ্ধ বাধাচ্ছে
গোটা বিশ্বের দিকে দেখুন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ইরান আক্রমণ করছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ট হয়ে ইজরায়েল একটা ছোট্ট দেশ প্যালেস্টাইনকে দখল করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল। হাজার হাজার শিশু, নারী, যুবক, বৃদ্ধকে হত্যা করেছে, গর্ভবতী নারীদেরও হত্যা করেছে যাতে প্যালেস্টিনীয়রা জন্ম না নিতে পারে। এই হল সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদের নৃশংস অত্যাচার। ট্রাম্প হল আজকের যুগের চেঙ্গিস খান। মধ্যপ্রাচ্যে তার দখল চাই, তাই ইরান আক্রমণ করল। আগে ইরাকের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে, ভয়ানক অস্ত্র আছে এই মিথ্যা অভিযোগ তুলে প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হুসেনকে হত্যা করেছে, ইরাককে ধ্বংস করেছে। এখন ইরানকে ধবংস করার চেষ্টা করছে। ভেনেজুয়েলার তেলের খনিগুলির দখল নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টকে রাত্রিবেলা মিলিটারি পাঠিয়ে তুলে নিয়ে গেল। কোনও আইনকানুন, নিয়মনীতির তোয়াক্কা করছে না মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। ওদেরই তৈরি করা যে জাতিসংঘ (ইউএনও)– তারও কোনও নিয়ম, সনদ কিছুই মানছে না। এই হচ্ছে বিশ্ব মানবতার চরম শত্রু পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের চেহারা। আজ যদি মহান লেনিন-স্ট্যালিন প্রতিষ্ঠিত সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকত, মহান মাও সে তুং প্রতিষ্ঠিত চিনের সমাজতন্ত্র থাকত, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা থাকত, তা হলে কি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এই ভাবে ধ্বংসের তাণ্ডব চালাতে পারত?
পুঁজিবাদ পরিবেশ ধ্বংস করছে
পরিবেশের ওপরেও মারাত্মক আক্রমণ চলছে। সমুদ্র যে ভাবে স্থলভাগ গ্রাস করছে, আজ থেকে একশো-দেড়শো বছর পর এই কলকাতা শহরও হয়তো টিকে থাকবে না। কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি– কয়লা, তেল এ সব পুঁজিপতিদের কারখানা চালানোর জন্য পুড়ছে, বিকল্প ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এর ফলে উৎপন্ন কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বিশ্ব উষ্ণায়ন বাড়ছে। এর জন্যে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে। হিমবাহ গলে যাওয়ায় সমুদ্রের জলতলের উচ্চতা বাড়ছে। সমুদ্র স্থলভাগকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে। একদিন হয়তো অনেক নদীও থাকবে না। গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের ফলে নানা নতুন রোগ সৃষ্টি হচ্ছে, আবহাওয়ার পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ অত্যধিক মুনাফার লালসায় কিছুতেই ফসিল ফুয়েল ব্যবহার বন্ধ করবে না। খনি বের করবার জন্য ওরা বনাঞ্চল ধবংস করছে। আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের যে বনভূমি একটা ফুসফুসের মতো কাজ করে, যেখান থেকে আমরা অক্সিজেন পাই, সেখানেও লক্ষ লক্ষ গাছ কাটা চলছে।
এই পুঁজিবাদ হচ্ছে বিশ্বমানবতার চরম শত্রু। আমাদের দেশে এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থা কায়েম রয়েছে। একে উচ্ছেদ করার জন্য বিপ্লব চাই এবং তার জন্য চাই বিপ্লবী দল। এ দেশের মাটিতে সেই দল হচ্ছে কমরেড শিবদাস ঘোষের হাতে গড়া এসইউসিআই(কমিউনিস্ট) পার্টি।
কমরেডস, এই যে অনাহারে মৃত্যু, ঋণের দায়ে কৃষকের আত্মহত্যা, এই যে শিশুরা ফুটপাথেই জন্ম নিচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে– এ হচ্ছে সভ্যতার সংকট, এ সংকট সর্বত্র। এই সংকট এখন ঘরের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে। সেখানেও এই স্নেহ-মায়া-মমতা-হৃদয়বৃত্তির সংকট। হৃদয় থাকলে তো হৃদয়বৃত্তি থাকবে! বিবেক থাকলে তবে তো বিবেকের দংশন থাকবে! এই হৃদয়কে, বিবেককে ধবংস করে দেওয়া হচ্ছে। পারিবারিক জীবনে বৃদ্ধ বাবা-মাকে সন্তান রাস্তায় বের করে দিচ্ছে, নয়তো মেরে-ধরে সম্পত্তি লিখিয়ে নিচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকাতেও এ সব চলছে, বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিচ্ছে। কোথায় সেই স্নেহময় পারিবারিক জীবন! স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও সম্পর্ক নেই, বিশ্বাস নেই। এই ব্যক্তিবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, মনুষ্যত্বহীনতা জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রকে গ্রাস করছে। এই হচ্ছে পুঁজিবাদী আক্রমণ। এর বিরুদ্ধে লড়তে হবে। এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যেই বিপ্লবী পার্টি প্রয়োজন।
আপনাদের কাছে আমাদের আবেদন, জনগণকে রাজনীতি বুঝতে হবে। মনে রাখবেন, যে কোনও দল হয় শোষক শ্রেণির পক্ষে, না হয় শোষিত শ্রেণির পক্ষে। আজ এই প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও আপনারা যে হাজার হাজার মানুষ এখানে এসেছেন, বসে শুনছেন, কাল দেখবেন এর কোনও খবর কাগজে, মিডিয়ায় থাকবে না। থাকলেও দু-এক লাইন, সেটা কষ্ট করে খুঁজে বার করতে হবে। এই খবরের কাগজ, নানা মিডিয়া কারা চালায়? চালায় পুঁজিপতিরা। তারা এমন মার্ক্সবাদী বা বামপন্থী চায়, যারা পুঁজিবাদের কাছে বিপজ্জনক নয়, বরং সাহায্যকারী। এইসব দলেরই প্রচার তারা দেয়। এসইউসিআই(সি)-কে তারা দুশমন মনে করে। এই দলের অগ্রগতি ওদের কাছে আতঙ্কজনক। তাই কোনও প্রচার দেয় না। অথবা কেউ কেউ বাধ্য হয়ে সামান্য কিছু কখনও সখনও দেয় বা অনেক সময় বিভ্রান্তি ছড়ায়। কিন্তু এই করে কি এসউসিআই(কমিউনিস্ট)-এর অস্তিত্ব মুছতে পেরেছে? অগ্রগতি রুখতে পেরেছে? এই রাজ্যে আমাদের দলের শক্তিবৃদ্ধি হচ্ছে। দলে দলে ছাত্র, তরুণ-তরুণী যুক্ত হচ্ছে। গ্রামে কৃষকরা, শহরে শ্রমিকরা আমাদের দলের নেতৃত্বে সংগঠিত হচ্ছে। গোটা দেশেও ব্যাপক অগ্রগতি হচ্ছে। ২৬টি রাজ্যে, ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আজ ৫ আগস্ট পালিত হচ্ছে।
সংগ্রামী বামপন্থার স্বার্থে এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট)-কে আরও শক্তিশালী করুন
সত্যের শক্তি অমোঘ, কেউ তাকে আটকাতে পারে না। ফলে সেই শক্তির জোরেই মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারা প্রবল গতিতে এগিয়ে চলছে। এই দলকে আপনারা আরও শক্তিশালী করুন। আপনারা এগিয়ে চলার শপথ নিন এবং জনগণকেও রাজনীতিতে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলুন। সিপিএম কর্মীদের বলব, নির্বাচনসর্বস্ব রাজনীতির মোহ ত্যাগ করে আপনারা সংগ্রামী বামপন্থী আন্দোলনে আসুন, লড়াইতে আসুন। এই পশ্চিমবাংলা বামপন্থার ঘাঁটি ছিল। চৌত্রিশ বছর আপনাদের নেতারা যুক্তি-বিচার-বিশ্লেষণের পরিবর্তে যে ভাবে গায়ের জোরকেই একমাত্র হাতিয়ার করে চলেছিলেন, তার দ্বারা বামপন্থাকেই যে কলঙ্কিত করেছেন, এ ইতিহাস তো অস্বীকার করা যায় না। সেই সুযোগেই তৃণমূল মাথা তুলেছে, আজ বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। ‘৬৮ সালে তখনও সিপিএম একক ভাবে সরকার গঠন করেনি। যুক্তফ্রন্টের মধ্যেই তাদের কাজকর্ম দেখে কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, ‘তোমরা কমিউনিজমকে কলঙ্কিত করছ, বামপন্থার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা নষ্ট করছ। এই পরিস্থিতিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং জনসংঘের মতো ধর্মীয় রাষ্ট্রীয়তাবাদীরা ওঁৎ পেতে বসে আছে, তারা সুযোগের অপেক্ষা করছে। বামপন্থী আন্দোলনের প্রতি মানুষের যে আকর্ষণ আজও রয়েছে, তা নষ্ট হয়ে গেলেই তারা আত্মপ্রকাশ করবে।’ ঘটলও ঠিক তাই।
সিপিএমের কর্মী-সমর্থকদের কাছে, তাঁদের বিবেকের কাছে আমি আবেদন করব– নেতারা যে দিকে চলতে বলবেন, কর্মীরা কোনও বিচার না করে সে দিকেই চলবেন– এটা প্রকৃত বামপন্থা নয়, মার্ক্সবাদ তো নয়ই। এই শিক্ষা আমাদের দলে নেই। আমি যদি বলতাম বিজেপিকে ভোট দাও, এটাই ট্যাকটিক্স, কর্মীরা সেটা প্রত্যাখ্যান করতেন। তা হলে আপনারা যাঁরা সত্যিকারের বামপন্থী, আপনাদের মধ্যে যাঁদের কমিউনিজমের প্রতি আবেগ আছে, নেতারা যদি তাঁদের এমন কথা বলেনও, তাঁরা তা মানবেন কেন? ট্যাকটিক্স মানে কি সুবিধাবাদ? একটা আদর্শ তো সামনে থাকবে! সিপিএম কর্মী-সমর্থকদের এই বিষয়গুলি খেয়াল রাখার আবেদন করছি। আপনাদের দল মন্ত্রীত্বসর্বস্ব, ভোটসর্বস্ব রাজনীতি পরিহার করে সংগ্রামী বামপন্থী রাস্তায়, গণআন্দোলনের রাস্তায় যাতে আসে, সে ব্যাপারে সচেষ্ট হোন।
আমরা লড়াই করে যাব, গণআন্দোলন গড়ে তুলব, লাঠি-গুলির সামনে দাঁড়াব। কর্মীদের প্রাণ যাবে, কিন্তু আমরা বিপ্লবের ঝান্ডা বহন করে নিয়ে যাব। আমাদের পথপ্রদর্শক কমরেড শিবদাস ঘোষের শিক্ষা স্মরণ করে আসুন আজ আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই যে পুঁজিবাদ উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে আমরা লড়াই করে যাব। একদিন আমি থাকব না, এই মঞ্চে যাঁরা আছেন অনেকেই থাকবেন না, কিন্তু এই লড়াই চলতে থাকবে। ফলে আপনারা মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তাধারাকে আয়ত্ত করুন এবং বিপ্লবী চরিত্র গড়ে তোলার সাধনা করুন। নিজেরা তৈরি হোন। আজ এই কথা বলেই আমি বক্তব্য শেষ করছি। এই বৃষ্টির মধ্যেও যে আপনারা এতক্ষণ শুনেছেন, তার জন্য আপনাদের বিপ্লবী অভিনন্দন জানাই।