
‘এই দলটা আন্দোলনের সামনের সারিতে সব সময় থেকেছে, সব সময় থাকবে। এই দল লাঠি-গুলির সামনে দাঁড়িয়ে লড়াই করে যাবে। আমি একদিন থাকব না, এই মঞ্চে যাঁরা বসে আছেন, নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁরাও একদিন থাকবেন না। কিন্তু মহান মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষের হাতে গড়া এস ইউ সি আই (সি)-র লড়াই চলবে। সত্যের শক্তি অমোঘ। সেই শক্তিতে বলীয়ান হয়ে এই দলের সংগ্রামী বামপন্থার রাজনীতি জনগণকে বিপ্লবের রাস্তায় দীক্ষিত করে চলবে’। ৫ আগস্ট প্রবল বর্ষণের অঝোর ধারায় ভিজতে ভিজতেও গভীর মনোযোগী ৩০ হাজারের বেশি মানুষের সমাবেশে কথাগুলি বললেন এস ইউ সি আই (সি)-এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ।
৫ আগস্ট মহান মার্ক্সবাদী দার্শনিক ও চিন্তানায়ক, দলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক কমরেড শিবদাস ঘোষের ৫১তম স্মরণ দিবসে সারা দেশের সাথে কলকাতার রানি রাসমণি অ্যাভেনিউতে সমাবেশের ডাক দিয়েছিল এস ইউ সি আই (সি)। প্রশাসনিক টালবাহানায় সমাবেশের অনুমতি পেতেই গড়িয়ে গিয়েছিল জুলাই মাসের অধিকাংশটাই। প্রস্তুতির সময় ছিল সামান্য। এর ওপর রাজ্যের নানা জেলায় একটানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সমাবেশের দিনেও কলকাতা সহ নানা জেলায় প্রবল বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিলই। তবু এই বিপুল জনসমাগম দেখিয়ে দিল মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষের নাম এবং তাঁর হাতে গড়া দল এস ইউ সি আই (সি) এ দেশের খেটে খাওয়া মানুষের অগ্রণী অংশের অন্তরে কত গভীরে স্থান করে নিয়েছে।

গাঢ় কালো আকাশের নিচে সুবিশাল লাল মঞ্চে সজ্জিত রক্ত পতাকা এবং মহান নেতার প্রতিকৃতি, উপস্থিত সকলের বুকে কমরেড শিবদাস ঘোষের ছবি সংবলিত ব্যাজ। মনে তাদের গভীর আগ্রহ– আজকের পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে নেতৃত্বের গাইডলাইন বুঝে নিয়ে তা পৌঁছে দিতে হবে জেলায় জেলায়, রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে। সমাবেশ সফল করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে দলের সমর্থক-শুভানুধ্যায়ী-সাধারণ মানুষের কাছে হাত পেতে অর্থ সংগ্রহ করেছেন তাঁরা। যেটুকু সময় পেয়েছেন, অবিরাম প্রচার চালিয়ে এই সমাবেশে যোগ দেওয়ার আহ্বান রেখেছেন প্রতিটি মানুষের কাছে। সমাবেশের ঘোষিত সভাপতি দলের প্রবীণ পলিটবুরো সদস্য কমরেড অসিত ভট্টাচার্য অসুস্থ থাকায় সভা পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড দেবাশীষ রায়। মহান নেতার প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, তাঁর স্মরণে রচিত সঙ্গীত ও কমসোমল বাহিনীর গার্ড অফ অনারের পর সভাপতি তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে তুলে ধরেন দিল্লির সাম্প্রতিক ছাত্র যুব আন্দোলনের কথা।
প্রধান বক্তা সাধারণ সম্পাদক কমরেড প্রভাস ঘোষ ভাষণের শুরুতেই বলেন, নিটের প্রশ্ন ফাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া দেশ জোড়া আন্দোলন দেখাল পুলিশের পেলেট গান, লাঠি, ইলেক্ট্রিক শক, মহিলাদের ওপর পুলিশের অশালীন আঘাত কোনও কিছুই গণবিক্ষোভকে আটকাতে পারে না। ফ্যাসিস্ট সরকারকে মাথা নত করতে হয়েছে। তিনি স্মরণ করান, পাঁচ বছর আগের কৃষক আন্দোলনে সাতশোর বেশি কৃষকের আত্মদানকে। তিনি বলেন, এই আন্দোলনের সামনে সরকার মাথা নত করলেও এতেই দুর্নীতি দূর হয়ে যাবে ভাবলে ভুল হবে। বিজেপির আমলে দুর্নীতি সীমাহীন হয়ে উঠেছে। যদিও বিজেপির বদলে কংগ্রেস বা অন্য কোনও দল এলেই এই দুর্নীতি দূর হবে তা ভাবার কোনও কারণ নেই। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। এই পচাগলা ব্যবস্থাই দুর্নীতির জন্মদাতা। আন্দোলনে যখন গতি থাকে মানুষ অনেক সময় তলিয়ে ভাবে না। কিন্তু মূল শত্রু কে, কী পরিবর্তন প্রয়োজন তা যদি আন্দোলন করতে করতেই মানুষ না বুঝে নেয়, তা হলে অশেষ আত্মত্যাগের বিনিময়ে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ফয়দা তোলে এক সরকারের বিরোধী অন্য কোনও একটা পার্লামেন্টারি দল। মানুষকে বুঝতে হবে ভোটে নয়, সমাজে বিপ্লবাত্মক পরিবর্তনের রাস্তাতেই আসে প্রকৃত পরিবর্তন। না হলে বার বার ভুল দলকে ভোট দিয়ে মানুষ পরিবর্তনের কথা ভাববে, আর বার বার ঠকবে।
তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের অপশাসন দূর করে সোনার বাংলা গড়বে বলে বিজেপি ভোট চেয়েছিল। কেমন সোনার বাংলা করেছে? ওরা নির্বাচন কমিশনকে কব্জা করে, এসআইআর-এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ভোটারকে বাদ দিয়ে জয় হাসিল করেছে। কিন্তু এসেই গরিব বস্তিবাসী ও হকারদের উচ্ছেদ করছে। গোটা দেশে বিজেপির অপশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। সমস্ত ক্ষেত্রে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বিজেপি। স্থায়ী কাজ এখন নেই বললেই চলে। লক্ষ লক্ষ পরযিায়ী শ্রমিক। ওরা অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে জিগির তুলে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। আজ দুনিয়ায় বহু দেশে পেটের দায়ে অনুপ্রবেশ করে মানুষ। ভারতীয়রাও দেশে দেশে কাজের জন্য ছুটছে। ইজরায়েলে, ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে পর্যন্ত ভারতীয় বেকার যুবকরা যোগ দিয়ে প্রাণ হারাচ্ছে।
কমরেড প্রভাস ঘোষ বলেন, বিজেপির এক নেতা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছেন তিনি নাকি ইট ছুঁড়ে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সভা ভেঙে দেওয়ায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। নেতাজি ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ তথা হিন্দু মহাসভার সাম্প্রদায়িক ও ব্রিটিশ তোষণকারী রাজনীতির বিরোধী। কিন্তু নেতাজি এমন মানুষ ছিলেন যে, কংগ্রেসের যে নেতারা তাঁকে বহিষ্কার করেছিলেন, তাঁদেরই তিনি জনরোষ থেকে বাঁচিয়ে সসম্মানে নিজের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামী সম্বন্ধে বিজেপির মিথ্যাচার মানুষ মেনে নেবে না।
দুটি ক্ষেত্রে মারাত্মক আক্রমণের কথা তুলে ধরেন, কমরেড প্রভাস ঘোষ। এক দিকে বিজেপি সরকার শিক্ষার ওপর আক্রমণ করছে। ছাত্র বয়স থেকেই বিচার বোধ, বিজ্ঞান সম্মত মনন, যুক্তি করার ক্ষমতাকে মেরে দিতে সিলেবাসে নানা পরিবর্তন করছে। পৌরাণিক গল্প, কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাসকে শিক্ষার ক্ষেত্রে আনছে। রামমোহন, বিদ্যাসাগরের শিক্ষাকে ধ্বংস করে সনাতন ধর্ম, বেদ-বেদান্ত-মনুসংহিতার যুগে ছাত্রদের ঠেলে দিতে চাইছে। আর একটি আক্রমণ হচ্ছে, ওরা ছাত্র-যুব সমাজের নৈতিকতা ও চরিত্রকে ধ্বংস করতে চাইছে। কংগ্রেস, সিপিএম, তৃণমূল নেতৃত্বাধীন সরকারগুলো যেমন মদ-মাদকের প্রসার ঘটিয়েছে, বিজেপিও তাই করছে। ধর্ষকদের ওরা মালা পরাচ্ছে। নারী পাচার, ধর্ষণ, খুন বাড়ছে। রাজনীতিতে কোনও নীতির বালাই বিজেপি রাখছে না।
কমরেড প্রভাস ঘোষ বামপন্থী মনোভাবাপন্ন মানুষের উদ্দেশে বলেন, সুদূর ১৯৬৮ সালে মহান নেতা কমরেড শিবদাস ঘোষ বলেছিলেন, বামপন্থাকে ভোটসর্বস্ব রাজনীতিতে পরিণত করলে, গায়ের জোর, সুবিধাবাদ ও যুক্তিহীনতাকে বামপন্থীরা প্রশ্রয় দিলে জনসংঘ, আরএসএস ওঁৎ পেতে আছে, সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে। আজ সেই পরিস্থিতি আমরা দেখছি। সিপিএম ৩৪ বছর সরকার চালালেও তাদের অপশাসনে বামপন্থার প্রতি মানুষ শ্রদ্ধা হারিয়েছেন। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে তাদের কর্মীদের সংগ্রামী মনোভাব ছিল। কিন্তু ১৯৬৭-র পর সরকারি গদির স্বাদ পেয়ে নেতারা ক্রমাগত বুর্জোয়া সংসদীয় রাজনীতির রাস্তাতেই চলে গেছেন। ১৯৭৭-এর পর তাঁরা অন্য বুর্জোয়া শাসকদের মতোই জনবিরোধী শাসন চালিয়েছেন। শ্রমিক, কৃষকের ওপর পুলিশি অত্যাচার চালিয়েছেন। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রামে ভয়াবহ অত্যাচার দেখে মানুষ তাদের সরকারের অবসান চেয়েছে। আমরা সে সময় সিপিএম-এর বিরুদ্ধে যেমন আন্দোলন করেছি, পরবর্তীকালে তৃণমূল সরকারে এলে তাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক আন্দোলন করে গেছি। কিন্তু আন্দোলনের পরিবর্তে সিপিএম নেতারা ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচন থেকে ‘আগে রাম পরে বাম’ স্লোগান তুলে তৃণমূলকে হারানোর জন্য বিজেপিকে ভোট দিতে বলেছেন। না হলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এতটা জায়গা করে নিতে পারত না। এবারের বিধানসভা ভোটেও তারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। তিনি বলেন, সিপিএম-এর ওপর আমাদের কোনও বিদ্বেষ নেই। তারা বামপন্থার পথে ফিরে এলে আমরা একসাথেই লড়তে চাই। বামপন্থী কর্মীদের বামপন্থার আদর্শ চর্চার ওপর তিনি জোর দেন। সিপিএম যে ভাবে পীরজাদা কিংবা কংগ্রেসকে সেকুলার বলে তুলে ধরছে, তা সঠিক কি না, সে দলের কর্মীদের কাছে তা ভেবে দেখার অনুরোধ জানান তিনি। বামপন্থী মনোভাবাপন্ন মানুষের কাছে তিনি আহ্বান জানান, নিছক ভোটের স্বার্থে নয়, সমাজ পরিবর্তনের স্বার্থে আন্দোলনের রাস্তায় আসুন।
কমরেড প্রভাস ঘোষ বলেন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আজকের দিনের ‘চেঙ্গিস খান’ হয়ে উঠছেন। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের দ্বন্দ্বে গোটা মধ্যপ্রাচ্য ছারখার হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক যুদ্ধ চলছে। ট্রাম্প সার্বভৌম রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করার মতো জঘন্য কাজ করেছে। পুঁজিবাদ পরিবেশ ধ্বংস করে মানব সভ্যতাকে বিপন্ন করছে।
কমরেড প্রভাস ঘোষ আহ্বান জানান– সভ্যতার এই সংকটের দিনে এগিয়ে আসুন। সংগ্রামী বামপন্থার প্রতিনিধি এস ইউ সি আই (সি)-কে শক্তিশালী করে গড়ে তুলুন। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ-শিবদাস ঘোষের চিন্তার ভিত্তিতে ব্যক্তিবাদ, স্বার্থপরতা, মানুষকে অমানুষ করে দেওয়ার চক্রান্তের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এ ছাড়া কোনও হাতিয়ার নেই।
তাঁর ভাষণ শেষে আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে সভা শেষ হয়।