
অসীম সাহস আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তোলা বিদ্রোহী স্পর্ধার অনবদ্য উদাহরণ হয়ে থাকল দিল্লির যন্তরমন্তর। ‘এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে’– কবির এই আকুতিকে যেন মূর্ত রূপ দিয়ে গেল নিট পরীক্ষায় বার বার প্রশ্ন ফাঁসের দুর্নীতির হেস্তনেস্ত চেয়ে যন্তর মন্তরে সমবেত হওয়া দুর্বার ছাত্র-যুবরা।
আকাশ ছুঁয়েছিল স্বৈরাচারী শাসকের দম্ভ। অতলস্পর্শী দারিদ্র্য, ভয়াবহ বেকারত্ব আর মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় ক্রমাগত ঠোক্কর খেতে থাকা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যেন হারিয়ে ফেলছিল সুদিনের আশা। নেতা-মন্ত্রীদের ‘আচ্ছে দিন’ আর ‘বিকশিত ভারত’-এর গগনভেদী স্লোগান শুনতে শুনতেই পরিকল্পনাহীন সরকারি নিদানে তাদের পেরিয়ে আসতে হয়েছে নোটবন্দি ও লকডাউনের দুঃসহ সময়কাল। সংসদে শুধু সংখ্যার জোরে সমস্ত গণতান্ত্রিক নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শাসকরা কায়েম করেছে একের পর এক জনস্বার্থবিরোধী আইন। গরিব খেটে-খাওয়া মানুষের ছেঁড়াফাটা জীবনটুকুকেও প্রতিনিয়ত তছনছ করে দিচ্ছে বুলডোজারের দাপট। আতঙ্কে কুঁকড়ে যাওয়া হতাশ মানুষ ভাল কিছুর আশা জলাঞ্জলি দিয়ে ভেবে নিয়েছিল– কোনও রকমে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটিয়ে দিতে পারলেই অনেক!
দমবন্ধ এই পরিবেশের গুমোট ভাবটা যেন দমকা বাতাসে উড়িয়ে দিল দিল্লির যন্তরমন্তরের তরুণ প্রাণগুলো। আর মেনে নেওয়া নয় শাসকের অন্যায়। আসুক দুর্যোগ, আসুক ঝড়– মাথা নোয়াতে আর রাজি নয় এ দেশের তরুণদল। দিনের পর দিন শাসকের অজস্র অন্যায় সহ্য করতে করতে দেশের অযুত মানুষের বুকে জমে উঠেছিল ক্ষোভের দুর্ভার বোঝা। তাই নিট কেলেঙ্কারির ফয়সালা চেয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্তর্জালে রাতারাতি গড়ে ওঠা সিজেপি-র ডাকে দিল্লি ও তার আশপাশের রাজ্যগুলি থেকে কাতারে কাতারে ছাত্র ও তরুণরা যখন শামিল হল যন্তরমন্তরের অবস্থান বিক্ষোভে, তখন চারপাশ থেকে অসংখ্য সাধারণ মানুষ এসে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের পাশে। বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সাহায্যের হাত। কে না এসেছেন সেদিন যন্তরমন্তরে! আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের বাবা-মায়েরাই শুধু নন, এসেছেন কৃষক, শ্রমিক, ছোট দোকানদার, রাস্তার হকার থেকে শুরু করে সন্তানকে কাঁধে চাপিয়ে বেসরকারি কোম্পানির ছোট চাকুরেরা পর্যন্ত। অকাতরে বিলি হয়েছে খাবার, জল, ওষুধ। দূর দূরান্তের মানুষ ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন প্রয়োজনীয় সামগ্রী। ফুটপাতের হকার সারা শরীরে চিপসের প্যাকেটের মালা জড়িয়ে ডাক দিয়েছেন আন্দোলনকারীদের– যার যত খুশি খাও। ডাক্তাররা দিনের পর দিন ক্যাম্প করে চিকিৎসা পরিষেবা দিয়েছেন অক্লান্ত ভাবে। প্রৌঢ় মানুষ রাত জেগে শ্রান্তিহীন হাতপাখার বাতাস দিয়ে গেছেন ঘুমন্ত ছেলেমেয়েদের মাথায়-গায়ে।
এই ভাবেই দেশের মানুষ কোনও না কোনও ভাবে নিজেদের জড়িয়ে রাখতে চেয়েছেন ছাত্রদের এই লড়াইয়ের সঙ্গে। আসলে বুকের গভীরে জমে ওঠা প্রতিকারহীন যন্ত্রণার বাষ্প অযুত মানুষকে যেন ঠেলে পাঠিয়েছে যন্তরমন্তরে, দাঁড় করিয়ে দিয়েছে পুলিশ-র্যাফের নির্মমতার সামনে। বিহারের বেগুসরাই থেকে এসেছিলেন বছর আটত্রিশের রাজেশ সাউ। পুলিশের লাঠি অগ্রাহ্য করে দিনের পর দিন থেকে গেছেন যন্তরমন্তরে। পুরনো দিল্লির বাসিন্দা একত্রিশ বছরের নৃত্যশিল্পী শশাঙ্ক ছাত্রদের সংসদ অভিযানে বর্বর পুলিশি হামলা দেখে থাকতে পারেননি, ছুটে গেছেন যন্তরমন্তরে– ‘এর পরেও যদি না আসি, তা হলে আর কবে’!
এই ‘আর কবে’ প্রশ্নটি যেন অসহ্য আঘাত হেনে চলেছিল দেশের ছাত্র-তরুণদের বুকে। আর কবে হবে শাসক-শোষকদের অগাধ অন্যায়ের প্রতিকার! কবে ফুটবে ভোরের আলো অন্ধকার আকাশ জুড়ে! – এই আকুতি, এই গভীর যন্ত্রণাবোধ যন্তরমন্তরে টেনে এনেছে হাজারো ছাত্র-যুব, সাধারণ মানুষকে। দাঁড় করিয়ে দিয়েছে পুলিশ-র্যাফের নির্মম লাঠি-কাঁদানে গ্যাস-জলকামান-পেলেট গান এমনকি এ কে ৪৭-এর গুলির সামনে। অপরিসীম তেজে হাসিমুখে লড়েছে তারা। মার খেয়ে বুক চিতিয়ে দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে এগিয়ে গেছে পেরেক-লাগানো ডান্ডাধারী পুলিশের দিকে। চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে– আরও মারো, দেখি কত শক্তি আছে রাষ্টে্রর ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর হাতে! পুলিশি নিপীড়নের দিকে হাসিমুখে তাচ্ছিল্য ছুঁড়ে দিয়েছে অদম্য তরুণ প্রাণগুলো। তারা ডাফলি বাজিয়ে গান গেয়েছে, জলকামানের মুখে দাঁড়িয়ে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে মেতে উঠেছে, পোস্টার লিখেছে, ভিডিও তুলে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছে, ব্যঙ্গাত্মক হাস্যরস পরিবেশন করে গোটা পরিবেশকে আনন্দময় করে তুলেছে। রাষ্টে্রর নির্মমতায় ভয় পেয়ে পিছু হঠা নয়, পেলেট গান আর রাইফেলের গুলির উত্তাপ শরীর পেতে নিতে নিতে সহযোদ্ধার পায়ে পা মিলিয়ে তারা এগিয়ে গেছে দাবি আদায়ের লড়াইয়ে।
অমিততেজ এই ছাত্র-তরুণদল একটি অমোঘ সত্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেল। প্রমাণ করে দিয়ে গেল– মানুষের প্রতিবাদী চেতনা অবিনশ্বর। শাসক-শোষকের জুলুম কখনই শেষ কথা বলে না। আন্দোলনই পারে তাদের মুখের মতো জবাব দিয়ে দাবি আদায় করতে। যে তরুণ প্রাণগুলি আজ গোটা দেশকে জাগিয়ে দিয়ে গেল, সাহসে-তেজে-প্রতিবাদী স্পর্ধায় উজ্জীবিত করে গেল, অভিযোগ– তারা আত্মকেন্দ্রিক ও মোবাইলনির্ভর। কিন্তু শাসকের অন্যায় জুলুম যখন সীমা ছাড়াল, দেওয়ালে যখন পিঠ ঠেকে গেল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠের, তখনই বন্যার স্রোতের মতো সমস্ত বাধা ঠেলে রুখে দাঁড়াল অযুত নিযুত তাজা প্রাণগুলিই। আন্দোলনের স্রোতে কোথায় ভেসে গেল আত্মসর্বস্বতা! সহযোদ্ধা সঙ্গীদের রক্ষা করতে পুলিশি বর্বরতার সামনে বুক পেতে দিতে মুহূর্ত দ্বিধা করল না তারা। আরও একটা বিষয়ও উল্লেখের দাবি রাখে। যন্তরমন্তরের এই আন্দোলনে তরুণদলের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমান সাহসিকতায় লড়েছে ছাত্রী ও তরুণীরাও। কিন্তু এতগুলি দিনের মধ্যে একটিবারের জন্যও তরুণদের কাছ থেকে কোনও রকম আপত্তিকর আচরণের শিকার হতে হয়নি তাদের। আন্দোলন তো এই নৈতিকতারই জন্ম দেয়, ইতিহাস বার বার তার সাক্ষ্য দিয়েছে। সংগ্রামের ময়দান মর্যাদাময়। সেখানে নারী-পুরুষ সকলেই সকলের সহযোদ্ধা সাথী।
তারুণ্যের এই জয়যাত্রাকে হাজারো কুর্নিশ। দেশ জুড়ে মন্দ্রিত হোক আঠারোর জয়ধ্বনি।