Breaking News

সমাজব্যবস্থার মূল রোগ নির্ণয় না করে শুধু লড়াই চাই বললে পথ পাওয়া যাবে না—শিবদাস ঘোষ

দেশের সামনে অনেক সমস্যা। আর্থিক সমস্যা কী ভয়ানক রূপ নিয়েছে, সাধারণ মানুষ হিসাবে আপনারা সকলেই তা জানেন। তাকে বাড়িয়ে ফেনিয়ে অনেকক্ষণ ধরে আমি বলতে চাই না। জিনিসপত্রের দাম কেমন বাড়ছে, মানুষের কত দুর্গতি, কী অবস্থা সাধারণ মানুষের, সে সব আপনারা আমার থেকে ভালই জানেন। … সমস্যা রয়েছে, সমাধান হচ্ছে না, দিনের পর দিন আরও খারাপ হচ্ছে অবস্থা। এ নিয়ে হা-হুতাশ করা বা শুধু বিক্ষোভ প্রকাশ করা, বা কখনও কখনও বিক্ষোভে মাঠে-ময়দানে ফেটে পড়া– এতে সমস্যার সমাধান হবে না, যদি না কোনও কিছু করবার আগে সমস্যা কোথায়, কোন জায়গায়, তার মূল কারণটি কী, তা আমরা ধরতে পারি এবং রাস্তা ঠিক করতে পারি। রাস্তা ভুল হলে, দিক নির্ণয় করতে ভুল হলে, কারণ নির্ধারণ করতে ভুল হলে, সমস্যার সমাধান হবে না। যেমন একজন ডাক্তার যত সততা ও নিষ্ঠার সাথে চিকিৎসা করুন, রোগীর সংকটজনক অবস্থায় রোগ নির্ণয়ে ডাক্তার যদি ভুল করেন, তাহলে যেমন রোগী বাঁচে না, রোগী অনিবার্য ভাবে মারা যায়, তেমনি সমাজজীবনে যে রোগ, অর্থনৈতিক জীবনকে কেন্দ্র করে যে রোগ দেখা দিয়েছে, তার মূল কারণ যদি আমরা ঠিক ঠিক নির্ণয় করতে না পারি, তা হলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে আমরা হাত-পা ছুঁড়তে পারি, কিছু লোক গুলি খেতে পারি, জীবন কোরবানি করতে পারি, মরতে পারি, কিন্তু সমস্যার সমাধান হবে না।

… এ দেশে লড়াই কম হয়নি। এ দেশের যুবকরা, ছাত্ররা, নওজোয়ানরা কম লড়াই করেনি। এ দেশের মজুর-চাষি কম খুন ঢালেনি। কোরবানি অনেক হয়েছে, বহুবার বহু লড়াই হয়েছে, বহু আত্মত্যাগ হয়েছে, কিন্তু দেশের মূল সমস্যা যে জায়গায় ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। বরং অবস্থা দিনের পর দিন আরও খারাপ হচ্ছে। কোনও প্রতিকার হচ্ছে না। অবস্থা এরকম চলতে থাকলে কালই আবার একটা লড়াই হবে! হবে লড়াই। আমি চাইলেও হবে, না চাইলেও হবে। বিক্ষুব্ধ মানুষগুলো নেতৃত্ব থাক না থাক, ভুল পথ হোক ঠিক পথ হোক, যখন সহ্য করতে পারবে না তখন আবার মাঠে-ময়দানে নেমে পড়বে। কিন্তু তার ফলে শুধু কোরবানি করাই সার হবে, আত্মত্যাগই সার হবে, গুলি খাওয়াই সার হবে, সমস্যার সমাধান হবে না– যদি না সেই লড়াই করবার বা ময়দানে নামবার আগে রোগ কী তা বুঝতে পেরে থাকি এবং কোন পথে, কী ভাবে, কাকে, কোথায় আঘাত হেনে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে তা ঠিক ঠিক বুঝতে পারি। এখানে ভুল করলে আবার লড়াই হবে, আবার মানুষ পর্যুদস্ত হবে, আবার হতাশা জনমনকে ছেয়ে ফেলবে।

লক্ষ করলে দেখবেন, একটা লড়াই যখন আসে, একটা আন্দোলন যখন আসে, মানুষ তখন কোনও যুক্তি শুনতে চায় না। তখন যদি লড়াইয়ের রাস্তাটা নিয়ে, লড়াইয়ের নীতি নিয়ে, লড়াইয়ের আদর্শ নিয়ে, বা লড়াই কোন পথে হবে, কী কৌশলে হবে সে ব্যাপারে কোনও আলাপ-আলোচনা তোলবার চেষ্টা হয়, প্রশ্ন তোলার চেষ্টা হয়, লড়াইটা ভুল পথে হচ্ছে বলে বলবার চেষ্টা হয়, তখন সকলে মিলে তাকে চেপে ধরার চেষ্টা করে। বলে, এখন লড়াই হচ্ছে, এখন কোনও তত্ত্ব আলোচনা নয়, এখন রাস্তা ঠিক কি বেঠিক এসব কথা নয়, লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে রাস্তা ঠিক হয়ে যাবে। এখন লড়াইয়ের সময়, অন্য কোনও কথা বলবার নেই বলে তারা এ ব্যাপারে সমস্ত যুক্তি, সমস্ত আলাপ-আলোচনা, এমনকি রাস্তা ঠিক করবার মূল গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিকেও লড়াই করার উন্মাদনায় চাপা দিতে চায়। এর ফল কী হয়? লড়াই মার খায়। … মার খাওয়ার পরে মানুষের মধ্যে আসে হতাশা। হতাশার পরে তাদের মধ্যে কী মানসিকতা আসে? তারা বলতে থাকে, ‘ও তো দেখা গেল, অনেক লড়াই হল, অনেক জেলে যাওয়া হল, অনেক কোরবানি করা হল, কত কিছু করা হল– ও কিছু হবে না। এ দেশে কিছু হবে না। ও মানুষই সব খারাপ হয়ে গেছে। …

আর এই অবস্থার সুযোগে শাসক সম্প্রদায়, যারা দেশকে শাসন করছে সেই শোষকবর্গ, বুর্জোয়া শ্রেণি ও তাদের রাজনৈতিক দলগুলি শাসনের যন্ত্রটাকে, শোষণের যন্ত্রটাকে জনমনের এই হতাশা, রাজনৈতিক এই হতাশা এবং তার ফলে জনগণের মধ্যে যে নিষ্ক্রিয়তা গড়ে ওঠে, হতে পারে তা সাময়িক, তা হলেও এ সবের সুযোগে রাষ্ট্রযন্ত্রটাকে আরও সংহত করতে সুযোগ পায় মাত্র। কিন্তু, হতাশায় ‘কিছু হবে না’– এ কথা বলে তো বসে থাকা যায় না। পেট বড় বালাই। জীবন অত্যন্ত কঠিন। ‘কিছু হবে না’ বলে বসে থাকার উপায় নেই। আবার মার খেয়ে পাগলের মতন মাঠে-ময়দানে নামতে হবে। নামতে হবেই, লড়াই আসবেই। যদি বুঝতাম, ‘কিছু হবে না’ বলে আর কোনও দিন আপনারা লড়বেন না, যেমন করে আপনাদের কুকুর-বেড়ালের মতো রাখা হয় তেমন করেই অভ্যস্ত হতে হতে পশুর মতো জীবনে নেমে যাবেন, কোনও দিন প্রতিবাদ করবেন না, তা হলে বুঝতাম, এ সব মানসিকতার মানে আছে। কিন্তু বাস্তবে তা হবে না। জীবনের অসহ্য সংকট আবার আপনাদের লড়াইয়ের ময়দানে টেনে আনবেই, লড়তে আপনারা বাধ্য হবেনই। ফলে যতবারই মার খেয়ে থাকুন, যত পরাজয় হয়ে থাকুক, রাস্তা যতবার ভুল হয়ে থাকুক, সঠিক রাস্তা কিন্তু আপনাদের আবার চিনে নিতে হবে। একজন ঠকিয়েছে, দশজন ঠকিয়েছে, পঞ্চাশজন ঠকিয়েছে বলে কোনও দিন আর কিছু হবে না– মানুষের ইতিহাস এ ভাবে শেষ হয়ে যায় না। মানুষ আবার লড়বে, আবার ভাববে, আবার চিন্তা করবে। সঠিক রাস্তা একদিন চিনে নেবে। তাই আমি বলি, লড়াই একটা প্রয়োজনীয় কথা, সংগঠনও একটা প্রয়োজনীয় কথা। এ দুটো বাদ দিয়ে শেষপর্যন্ত কিছুই হবে না। কিন্তু তার আগে আর একটা বড় কথা আছে। সে কথা হচ্ছে, আদর্শ ঠিক করা, নীতি ঠিক করা, লড়াইয়ের রাস্তা ঠিক করা, লড়াইয়ের উদ্দেশ্য ঠিক করা– সমাজজীবনে, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে মূল রোগ কী, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা।

উন্নত নৈতিক মান ও সঠিক রাস্তায় লড়াই চাই’

১৯৭৪-এর ১২ জানুয়ারি কটকে সর্বভারতীয় ছাত্র সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশে ভাষণ