
অনেক কমরেডের মধ্যে ‘তত্ত্ব ও প্রয়োগের সংযোগ স্থাপন’ সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে— যদিও এই কথাটি হরদম তারা মুখে মুখে প্রতিদিন বলে বেড়াচ্ছেন। তাঁরা সবসময় ‘সংযোগ সাধনের’ কথা বলেছেন কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাঁরা ‘বিচ্ছেদ সাধন’ই করেন কারণ সংযোগ সাধনের কোনও চেষ্টাই তাঁরা করেন না। চিন বিপ্লবের বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী তত্ত্বকে কী ভাবে সংযুক্ত করা যাবে? একটা সাধারণ কথার মধ্য দিয়েই বলা চলে ‘সঠিক লক্ষ্যস্থলে তির ছুঁড়ে।’ যেমন তির যাচ্ছে সঠিক লক্ষে্যর দিকে, তেমনই মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ প্রযোজ্য হচ্ছে চিন বিপ্লবের ক্ষেত্রে। কিছু কিছু কমরেড কিন্তু ‘লক্ষ্যহীন ভাবে তির ছুঁড়ে চলেছেন,’ বেমালুম তির ছুঁড়েছেন এবং এ ধরনের লোকেরাই বিপ্লবের ক্ষতিসাধন করতে পারেন। অন্যরা শুধু মমতাভরে তিরে হাত বোলাচ্ছেন আর বলছেন, ‘বাঃ, কী সুন্দর তির! কী চমৎকার তির’! কিন্তু কোনও সময়ই তির ছুঁড়ছেন না। এই লোকেরা দুর্লভ দ্রব্যের সেই সব সমঝদারের মতো, বিপ্লবের ব্যাপারে কার্যত এদের কিছুই করণীয় নেই। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের তিরকে চিন বিপ্লবের সঠিক লক্ষ্যে নিক্ষেপ করার কাজে লাগাতে হবে। এ কথা পরিষ্কার না হলে, আমাদের পার্টির তত্ত্বগত মানের কোনও সময়ই উন্নতি সাধিত হবে না এবং চিন বিপ্লব কোনও সময়ই বিজয়ী হবে না।
আমাদের কমরেডদের এ কথা বুঝতে হবে যে আমরা লোক দেখানোর জন্য মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ অধ্যয়ন করি না, বা এতে কোনও জাদু আছে বলেও তা করি না। তা অধ্যয়ন করি শুধু এই কারণে যে তা এমন একটি বিজ্ঞান যা শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবী লক্ষ্যকে বিজয়ের পথে নিয়ে যাবে। এখনও এমন কিছু লোক রয়েছেন যাঁরা মনে করেন মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী রচনা থেকে এলোপাথাড়ি কিছু উদ্ধৃতিই সব কিছুর মুশকিল-আসানস্বরূপ দেখা দেবে এবং একবার তা আয়ত্ত করে নিলেই সকল প্রকার ব্যাধির সহজ নিরাময়ের ব্যবস্থা তাতে হয়ে যাবে। এই লোকেরা শিশুসুলভ অজ্ঞতাই প্রদর্শন করে। এদের সচেতন করে তুলতে হবে। ঠিক এ ধরনের অজ্ঞ লোকেরাই মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদকে একটি ধর্মীয় বিধান বলে মনে করে। তাদের আমরা সোজাসুজি বলে দেব, ‘তোমাদের এই শাস্ত্রবাক্য একেবারেই মূল্যহীন।’ মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন ও স্ট্যালিন বার বার বলেছেন আমাদের তত্ত্ব কোনও শাস্ত্রবাক্য নয়, তা হচ্ছে বাস্তব কর্মপথের নির্দেশ। কিন্তু ওই সব লোকেরা এই কথাটিই ভুলে থাকতে পছন্দ করে। অথচ এই কথাটাসবচেয়ে বেশি শুধু নয়, বলা যায় একেবারে চরম গুরুত্বপূর্ণ। চিনের কমিউনিস্টরা একমাত্র তখনই তত্ত্বকে প্রয়োগের সঙ্গে সংযুক্ত করছেন বলা যাবে, যখন তাঁরা মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী অবস্থান, দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতিকে এবং চিন বিপ্লব সম্পর্কে লেনিন ও স্ট্যালিনের শিক্ষাবলিকে ভাল ভাবে প্রয়োগ করতে পারবেন এবং উপরন্তু যখন তাঁরা চিনের ইতিহাস ও বিপ্লবের বাস্তবতাকে নিয়ে গভীর চর্চার মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চিনের প্রয়োজন মেটাবার মতো সৃজনশীল তত্ত্বগত কাজ করবেন, তখনই শুধু বলা যাবে যে তাঁরা তত্ত্ব ও প্রয়োগের সংযুক্তি সাধন করেছেন। বাস্তবে তা না করে শুধু তত্ত্ব ও প্রয়োগের সংযোগ সাধনের কথা বলা কোনওই কাজের নয়, তা যদি শত বছর ধরেও বলে যাওয়া হয় তবু তাতে কিছু কাজ হবে না। সমস্যার প্রতি বিষয়ীবাদীদের একদেশদর্শী দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধিতার জন্য গোঁড়া বিষয়ীবাদ এবং একদেশদর্শীতাকেই আমাদের চুরমার করে ফেলতে হবে। (পার্টির কাজের ধারা সংশোধন করুন, ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪২-এর ভাষণ)