
পণ্য উৎপাদনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ, চারদিকের অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে সম্পর্কহীন ভাবা ঠিক নয়। পণ্য উৎপাদন পুঁজিবাদী উৎপাদন থেকে পুরনো। দাস সমাজেও পণ্য উৎপাদন ছিল, দাস সমাজকে তা সেবাও করেছে, …সামন্তী সমাজেও এর অস্তিত্ব ছিল… তা পুঁজিবাদী উৎপাদনের কোনও কোনও শর্ত সৃষ্টি করেছে, কিন্তু তা পুঁজিবাদে পরিণত হয়নি। তাহলে, কেউ জিজ্ঞাসা করতে পারে, একইভাবে পুঁজিবাদে পরিণত না হয়ে পণ্য উৎপাদন কিছুকালের জন্য আমাদের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থারও কাজে লাগবে না কেন? মনে রাখতে হবে, পুঁজিবাদের মতো আমাদের দেশে পণ্য উৎপাদন নিয়ন্ত্রণহীন সর্বব্যাপক নয়। পণ্য উৎপাদন এখানে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। এটা হতে পেরেছে উৎপাদন উপকরণের সামাজিক মালিকানা, মজুরি শ্রমের অবলুপ্তি, শোষণমূলক ব্যবস্থার অবসান ইত্যাদি অমোঘ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য।
বলা হয়ে থাকে, উৎপাদন উপকরণের উপর সামাজিক মালিকানার প্রাধান্য যেহেতু প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, মজুরি শ্রম ও শোষণের যেহেতু অবসান হয়েছে– তাই পণ্য উৎপাদন নিরর্থক এবং তার অবসান হওয়া উচিত।
এটাও সত্য নয়। আমাদের দেশে বর্তমানে মূলগতভাবে দুই ধরনের সমাজতান্ত্রিক উৎপাদন আছে। রাষ্ট্র বা জনসাধারণের মালিকানাধীন উৎপাদন এবং যৌথ খামার উৎপাদন। এই যৌথ খামার উৎপাদনকে জনগণের সম্পত্তি বলা যায় না। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে উৎপাদনের উপকরণ ও উৎপাদিত দ্রব্য সবই জাতীয় সম্পত্তি। যৌথ খামারে, উৎপাদনের উপকরণ (জমি, যন্ত্রপাতি) রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হলেও, উৎপাদিত দ্রব্য বিভিন্ন যৌথ খামারের সম্পত্তি। …
একমাত্র পণ্য হিসাবে ছাড়া যৌথ খামার তার উৎপাদিত দ্রব্য হাতছাড়া করতে চাইবে না। এই দ্রব্যের বিনিময়ে তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য তারা পেতে চায়।…
অবশ্য, রাষ্ট্রীয় ও যৌথ কৃষিখামার ক্ষেত্র এই দুই মূলগত উৎপাদন ক্ষেত্রের জায়গায় যখন একটা সর্বব্যাপক উৎপাদন ক্ষেত্র থাকবে, সাথে সাথে থাকবে দেশে উৎপাদিত সমস্ত ভোগ্যপণ্য বিক্রি করার অধিকার, তখন জাতীয় অর্থনীতিতে অপ্রয়োজনীয় বিষয় হিসাবে মুদ্রা অর্থনীতি সহ পণ্য প্রচলন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু যতক্ষণ তা না হচ্ছে, যতক্ষণ দুটো মৌলিক উৎপাদন ক্ষেত্রেরই অস্তিত্ব থাকছে, ততক্ষণ জাতীয় অর্থনীতিতে প্রয়োজনীয় ও অত্যন্ত কার্যকর উপাদান হিসাবে পণ্য উৎপাদন ও পণ্য প্রচলন কার্যকর থাকবেই। …
আমাদের পণ্য উৎপাদন সাধারণ ধরনের নয়, তা বিশেষ ধরনের। এই পণ্য উৎপাদনে পুঁজিপতি নেই। এই পণ্য সমাজতান্ত্রিক উৎপাদকদের (রাষ্ট্র, যৌথ খামার, সমবায়) উৎপাদিত দ্রব্যের সাথে যুক্ত। এই পণ্য ব্যক্তিগত ভোগের সামগ্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই পণ্য তাই কোনও মতেই পুঁজিবাদী উৎপাদনে পরিণত হতে পারে না। এবং ‘মুদ্রা অর্থনীতি’ সহ এই পণ্য সমাজতান্ত্রিক উৎপাদনকে সংহত ও বিকশিত করে।
যে সমস্ত কমরেডরা মনে করেন, যেহেতু সমাজতান্ত্রিক সমাজ পণ্য উৎপাদনকে ধ্বংস করেনি… তাঁরা ভাবছেন, যেহেতু পণ্য উৎপাদন আছে, তাই পুঁজিবাদী উৎপাদন থাকবেই। তাঁরা বুঝতে পারছেন না, আমাদের পণ্য উৎপাদন পুঁজিবাদী পণ্য উৎপাদন থেকে গুণগতভাবে আলাদা। … এখন শ্রমিক শ্রেণি উৎপাদন উপকরণ থেকে বঞ্চিত নয়। বরং, বিপরীতে, তার হাতেই রাষ্ট্রক্ষমতা, সেই উৎপাদন উপকরণ নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের ব্যবস্থায় শ্রমশক্তিকে পণ্য বা শ্রমিককে ভাড়া করার কথা বলা অর্থহীন। যেন, উৎপাদন উপকরণ নিয়ন্ত্রণ করছে যে শ্রমিক শ্রেণি, সে নিজেই নিজেকে ভাড়া করছে, নিজের কাছে নিজেই শ্রম বিক্রি করছে।
এখন ‘প্রয়োজনীয়’ ও ‘উদ্বৃত্ত’ শ্রমের কথা বলাও অর্থহীন। এ ভাবে বললে মনে হতে পারে, ক্ষমতাসীন শ্রমিক শ্রেণির কাছে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য শ্রম যতটা প্রয়োজনীয়, উৎপাদনের বিস্তৃতি, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের বিকাশ, প্রতিরক্ষা সংগঠন ইত্যাদির জন্য আমাদের ব্যবস্থায় শ্রমিকের শ্রমদান ততটা প্রয়োজনীয় নয়।
(সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক সমস্যা)