Breaking News

সন্তানকে খাওয়াতে পাঁচ মিনিট ছুটিও পায় না আজকের পার্বতীয়ারা

 ১৮৬৩ সালের জুন মাসে লন্ডনের খবরের কাগজগুলোতে নামী বস্ত্র প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কুড়ি বছর বয়সি মেরি অ্যান ওয়াকলি-র মৃত্যুসংবাদ ছাপা হয়েছিল। কার্ল মার্ক্স তাঁর ‘ক্যাপিটাল’ বইতে এই মৃত্যুর বিবরণ দিতে গিয়ে লিখেছিলেন– মেরিকে দৈনিক গড়ে সাড়ে ষোলো ঘণ্টা কাজ করতে হত, বিশেষ বিশেষ সময় কোনও বিরতি ছাড়াই তিনি তিরিশ ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য হতেন, শরীরটাকে চালানোর জন্যে এক আধবার জুটত শুধু একটু কফি বা পানীয়। অভিজাত পরিবারের মহিলাদের নাচের পোশাক বানানোর জন্য এই সময় মেরি আরও ষাটজন মেয়ের সাথে টানা সাড়ে ছাব্বিশ ঘণ্টা কাজ করেছিলেন একটা ঘুপচি ঘরের মধ্যে। একটি ঘরকে পার্টিশন দিয়ে ভাগ করে করে যে দম আটকানো গর্তের মতো জায়গা করা হয়েছিল, সেখানেই মেরিদের তিরিশ জনকে ঘুমোতে হত। ডাক্তার ডাকা হলে মেরির মৃতদেহ পরীক্ষা করে তিনি রিপোর্ট দেন– ভিড়ে ঠাসা ঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা একটানা কাজ করা এবং বদ্ধ পরিবেশে ঘুমোনোই মৃত্যুর কারণ।

আমাদের ভারতে, ছাব্বিশ বছরের অ্যানা সেবাস্টিয়ান পেরাইল মারা গেলেন ২০২৪ এর জুলাইতে। অ্যানাকে মেরির মতো বদ্ধ ঘরে কাজ করতে হয়নি, ঝাঁ-চকচকে কর্পোরেট অফিসই মাস চারেকের মধ্যে অ্যানার জীবনের আলো-বাতাস কেড়ে নিয়েছে। একটি নামী কোম্পানির পুণের অফিসে কাজ পেয়ে মেধাবী ছাত্রী অ্যানা ছিলেন খুশিতে ভরপুর, ভেবেছিলেন অফিসের অতিরিক্ত কাজের চাপ পরিশ্রম আর নিষ্ঠা দিয়ে সামলে উঠতে পারবেন। কিন্তু পারলেন না। অফিসের সময়ের বাইরে যখন-তখন, এমনকি মাঝরাতেও ফোন আসতে লাগল ক্রমাগত আরও কাজ আরও বেশি কাজের চাপ দিয়ে। সর্বক্ষণ তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াতো অফিসের ডেডলাইন। ঠিক সময়ে না খাওয়া, ঘুমোতে না পারা, দিনের পর দিন মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক চাপ একটি তরতাজা মেয়ের জীবন কেড়ে নিল। অ্যানার শোকস্তব্ধ মা কোম্পানির কর্তাদের উদ্দেশে একটি চিঠিতে লিখেছেন– ওভার-ডিউটি করাটাকে খুব ভালো জিনিস দেখাতে গিয়ে কর্মচারীদের প্রাণকে কোম্পানি বিপন্ন করছে, মুনাফার জন্য তাদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ঠেলেদেওয়া হচ্ছে। এ যে একটিকোম্পানির ঘটনা বা বিশেষ কোনও ব্যক্তিমালিকের অমানবিকতার প্রশ্ন নয়, তা বোঝার জন্য খুব কষ্ট করতে হয় না। বিভিন্ন নামী কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারীও কাজের চাপে মানসিক অবসাদে ভুগছেন বা আত্মহত্যা করেছেন এমন খবর এখন অনেক শোনা যায়, যেগুলো আসলে অমানবিক পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার দ্বারা সংগঠিত এক একটি হত্যা।

মেরি অ্যান ওয়াকলি আর অ্যানা সেবাস্টিয়ান পেরাইলের মধ্যে একশো একষট্টি বছরের ব্যবধান, ব্যবধান আর্থিক অবস্থার, শিক্ষাগত যোগ্যতারও। এই দেড় শতক জুড়ে নিজেদের অধিকারের দাবি নিয়ে মেয়েরা কম লড়েননি। মেরির সময় মেয়েরা পড়াশুনার সুযোগ যেটুকু পেতেন, অ্যানারা তার চেয়ে বেশি পেয়েছেন। আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার পরেও এই সমাজ অ্যানাকে বাঁচতে দেয়নি। সেদিনের মেরি আর আজকের অ্যানার মৃত্যু চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে যায়, কারখানার শ্রমিক থেকে সাদা কলারের চাকরিজীবী– ভয়ঙ্কর শোষণের শিকার সকলেই। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে আছে সংসার-সন্তান প্রতিপালনের যাবতীয় দায়ভার, আছে যৌন হয়রানি, পুরুষের চোখরাঙানি।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘আমার বাংলা’-র চটকলের শ্রমিক পার্বতীয়া কোলের ছেলেকে দুধ খাওয়ানোর জন্য পাঁচ মিনিট ছুটিও পেত না কারখানায়, তাই ছেলের মুখে আফিঙ গুঁজে দিয়ে কাজে যেত পার্বতীয়া, ছেলে কাঁদত না, ঘুমাতো মড়ার মতো। আর বছরখানেক আগে উত্তরপ্রদেশের পুলিশ কনস্টেবল রীনা শিশুসন্তানকে বুকে বেঁধে কুম্ভমেলার ভিড়ে ঠাসা স্টেশনে সারাদিন ডিউটি করলেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীতে কর্মরত মায়ের শিশুসন্তানের দায়িত্ব তাঁর একার, পুলিশ-প্রশাসন-রাষ্ট্রের নয়। বরং এক মায়ের এই অসহায় বাধ্যতাকে ‘মাতৃত্বের মহিমা’ বলে প্রচার করতে নেমেছিল মিডিয়ার একাংশ, যাতে রাষ্ট্রের অমানবিকতা আড়াল করা যায়। আর যে মায়েরা সন্তানকে পিঠে বেঁধে ভারা বেয়ে উঠছেন, হাঁটুজলে নেমে মীন ধরছেন, যাঁরা পাথর খাদানে কাজ করছেন, কোলের বাচ্চাকে রেখে ভোরের ট্রেন ধরে শহরে আসছেন যে মাসিপিসিরা, যে আশাদিদিরা নামমাত্র ভাতায় উদয়াস্ত খেটেও মাসের পর মাস বকেয়া টাকা পাচ্ছেন না, যে মহিলারা সংসারের সমস্ত কাজ শেষ করার পর রাত জেগে বিড়ি বেঁধে ফুসফুসে টানছেন তামাক গুঁড়ো আর কেন্দুপাতার বিষাক্ত হাওয়া– তাঁদের রোজনামচা জুড়ে আরও ভয়ানক বঞ্চনা, অন্যায় আর চোখের জলের ইতিহাস তৈরি হচ্ছে প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে। এর পরে রইলেন সেই মা-বোনেরা, যাদের বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস প্রতি রাতে মিশে যায় শহর-গঞ্জের অন্ধকারময় গলিতে। রইল নির্ভয়া-অভয়া-অপরাজিতার মতো অগুন্তি অকালে বুজে যাওয়া চোখ, যাদের রক্ত লেগে আছে এই কলকাতা, কামদুনি, কাঠুয়া, দিল্লি, উন্নাও, হাথরসের পথে পথে। সমাজমাধ্যমে এবং সংবাদপত্রে চোখ রাখলে মনে হয়, এইসব হিংস্র শ্বাপদের কাছে যেন নারীশরীর মাত্রই খাদ্য, সদ্যোজাত শিশুকন্যা থেকে অশীতিপর বৃদ্ধা রেহাই নেই কারও! সমাজটা মানুষের, অথচ ঘরে, বাইরে, বাসে-ট্রামে, কর্মক্ষেত্রে কোথাও নিশ্চিন্ত নিরাপত্তার ঠিকানা নেই একটি মেয়েরও।

এই সমস্ত ব্যথা এবং না পাওয়া নিয়েই সময়ের নিয়মে আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবস আসে প্রতি বছর। আমাদের মনে পড়ে, মেরি ওয়াকলির মতো হাজার হাজার নারী শ্রমিক ১৯০৮-এর ৮ মার্চ নিউইয়র্কের রাস্তায় জমায়েত করে কাজের পরিবেশ উন্নত করা, কাজের সময় কমানোর দাবি জানাচ্ছেন। ১৯১০-এ কোপেনহেগেনে সমাজতান্ত্রিক নারী সম্মেলনে জার্মান লেবার পার্টির নেত্রী ক্লারা জেটকিন নারীর ওপর শোষণ অত্যাচারের বিরুদ্ধে ৮ মার্চ দিনটিকে নারীদিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব দিচ্ছেন। তারপর ৮ মার্চ প্রতি বছর নতুন সংগ্রামের প্রেরণা হয়ে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে, রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রূপকার লেনিন এই দিনটিকে নারীদিবসের স্বীকৃতি দিচ্ছেন, সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া গোটা বিশ্বের সামনে নারীমুক্তির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। এই দেশেও সংগ্রামী নারীসমাজের কাছে ৮ মার্চ হয়ে উঠছে ন্যায়সঙ্গত অধিকার ও মর্যাদার দাবিতে জোট বাঁধার দিন। আজ মানুষ হিসেবে মেয়েদের যতটুকু অর্জন, সমাজ যতটুকু সমতা তাকে দিতে বাধ্য হয়েছে, তার সাথে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে আছে এই দিনটির ইতিহাস। অথচ নারীদিবসের বাজারচলতি উদযাপনে এই লড়াইয়ের ইতিহাস কোথাও চোখে পড়ে কি?

মেয়েদের বঞ্চনার ইতিহাস দীর্ঘ। চাষবাস প্রচলনের মাধ্যমে স্থায়ী সম্পত্তির উদ্ভব এবং শ্রেণিবিভক্ত সমাজের পত্তনের পথেই একদিন সমাজে মেয়েদের অবদমনের শুরু। নারীকে ধীরে ধীরে সম্পত্তির মতো ঘরে বেঁধে ফেলা হল। দাসপ্রথার পর সামন্তী ব্যবস্থাকে ভেঙে বুর্জোয়া সমাজ তার ঊষালগ্নে ব্যক্তিমানুষের অধিকারের প্রশ্নের সাথে মেয়েদের সমান অধিকার, সমমর্যাদা, মুক্তির দাবিও নিয়ে এল। কিন্তু বুর্জোয়া সমাজ এল এক ধরনের শোষণের পরিবর্তে আরেক ধরনের শোষণ নিয়ে। তার উৎপাদনের লক্ষ্য হল যে কোনও মূল্যে মালিকের সর্বোচ্চ মুনাফা। ফলে সময়ের সাথে সাথে এই পুঁজিবাদ যত সংহত হল, তার প্রতিযোগিতা যত তীব্র ও একমুখী হল, আরও আরও মুনাফার জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মানুষকে সে আরও শোষণ করা শুরু করল, শুরুর দিককার গণতান্ত্রিক চেতনা থেকে ক্রমশ সরে এসে হয়ে পড়ল চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক। নারীও এই আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় মুনাফা তৈরির যন্ত্র। এই সমাজে নারী একদিকে পুঁজিবাদী শোষণের শিকার আবার একই সাথে পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়নেরও শিকার। ফলে একই সাথে দ্বিমুখী নিপীড়নে পিষ্ট আজকের নারী জীবন। এই পুঁজিবাদী সমাজের পরিচালকরা অর্জিত অধিকারের কিছু কিছু নারীকে দিতে বাধ্য হয়, গণতন্ত্রের ঠাটবাট বজায় রাখতে কিছু পুরুষতন্ত্রবিরোধী প্রগতিশীল স্লোগানও তাদের দিতে হয়, কিন্তু নারীর প্রকৃত মর্যাদা বা মুক্তি কোনওটাই সে দিতে পারে না। তাই আজ একবিংশ শতাব্দীর প্রায় তিন দশক পেরিয়ে ভারতীয় মেয়েদের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয় দেখে যখনই আমাদের উচ্ছ্বসিত হতে ইচ্ছা করে, তখনই মনে পড়ে যায় মহারাষ্ট্রের বীড় জেলার সেই আখচাষি মেয়েদের কথা, ঋতুস্রাবের দিনগুলিতে ভয়ঙ্কর জলাভাবের কষ্ট সইতে না পেরে যারা অতি অল্প বয়সেই অপারেশন করিয়ে নিজেদের জরায়ু বাদ দিতে বাধ্য হন। পড়াশুনা এবং পেশার জগতে মেয়েদের অংশগ্রহণ এবং উজ্জ্বল স্বাক্ষর দেখে যতবার আমাদের মন আনন্দে ভরে উঠতে চায়, ততবার সেই আনন্দকে আড়াল করে দাঁড়ায় শিক্ষার পরিসর থেকে হারিয়ে যাওয়া অগণিত মেয়ের ক্লান্ত মুখ। এ দেশে প্রতি ষোলো মিনিটে একটি করে ধর্ষণ ঘটে, পাশাপাশি সরকারি মদতে চলে মদ ও মাদকের রমরমা, সিনেমায় বিজ্ঞাপনে নারীদেহের অবিরাম পণ্যায়ন। এর মাঝে দাঁড়িয়ে আমরা যখন নারীদিবসের দিকে তাকাই, দেখতে পাই পুঁজি সুচতুরভাবে এই দিনটি থেকে মুছে দিয়েছে প্রতিবাদের ঘাম-রক্ত। আর পাঁচটা জিনিসের মতোই নারীদিবসও হয়ে উঠেছে বাজারের পণ্য। নারীকে শেকলে বাঁধার যে যে আয়োজনকে অন্তরে-বাইরে ছিন্ন করাই ছিল নারীদিবসের আহ্বান, প্রসাধন ও অলংকারের ডিসকাউন্টের মতো সেই জিনিসগুলোই হয়ে উঠেছে নারীত্বের উদযাপনের চিহ্ন। কন্যশ্রী, রূপশ্রী, ‘বেটি বঁচাও বেটি পড়াও’-এর বিজ্ঞাপনী জৌলুসের আড়ালে পড়ে আছে সেই অন্ধকার দেশ, লিঙ্গসাম্যের নিরিখে বিশ্বের ১৯৩টি দেশের মধ্যে যার স্থান ১০৮ নম্বরে।

ফলে, আজ আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবস আসে আরও গভীর সংগ্রামের প্রয়োজন নিয়ে। নারীদিবস মনে করিয়ে দেয়, নারীর অধিকার অর্জনের লড়াই শুধু অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া নিয়ে নয়, যে সমাজ মেয়েমানুষের মানুষ হয়ে ওঠাকে সব দিক থেকে আটকায়, লড়াই তার বিরুদ্ধেও। রামমোহন-বিদ্যাসাগর-বেগম রোকেয়া- সাবিত্রী ফুলে-রা মেয়েদের যে মনুষ্যত্বের আলোয় উদ্ভাসিত দেখতে চেয়েছিলেন, আজ নারীদিবসের উদযাপন যেন সেই চাওয়াকে মর্যাদা দিতে পারে। আজকের সচেতন মুক্তিকামী নারী-পুরুষ যেন পরিষ্কার বুঝে নিতে পারে, পুরুষতন্ত্র পুঁজিবাদী শোষণেরই একটা হাতিয়ার। পুরুষতন্তে্রর আধিপত্য সত্যিই ভাঙতে হলে, খোলা আকাশ পেতে হলে, সবাইকে লড়তে হবে এই পুঁজিতন্ত্রের বিরুদ্ধেই।

গণদাবী ৭৮ বর্ষ ৩২ সংখ্যা ২০-২৬ মার্চ ২০২৬