Breaking News

শোষণকে আরও নির্মম করতে শ্রম আইন বদলে দিচ্ছে সরকারগুলি

কেন্দ্রের মোদি সরকার আগেই ৪৪টি শ্রম আইনকে বদলে দিয়ে ৪টি শ্রমকোডে পরিণত করেছে। এ বার রাজ্য সরকারগুলিও নিজেদের মতো করে শ্রম আইন বদলে নিচ্ছে। সম্প্রতি গুজরাটের বিজেপি সরকার বিধানসভায় আইন পাশ করে কলকারখানায় ১২ ঘণ্টার শ্রম দিবস চালু করে দিল। একই ভাবে ১২ ঘণ্টার শ্রম দিবস আনতে চলেছে মহারাষ্ট্র সরকার। দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ বিজেপি শাসিত রাজ্যেই হয় আইন করে, অথবা অর্ডিন্যান্স জারি করে শ্রম দিবস ১২ ঘণ্টা করা হয়েছে বা হতে চলেছে। কর্ণাটক বা তেলেঙ্গানার মতো কংগ্রেস শাসিত রাজ্যেও বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। তামিলনাড়ূতে ফ্যাক্টরি আইন সংশোধন করে ১২ ঘণ্টা করা হয়েছে। অন্য রাজ্যগুলি যেমন পশ্চিমবঙ্গে এ নিয়ে আইন পাশ না হলেও বাস্তবে মালিকরা যথেচ্ছ সময় কাজ করতে বাধ্য করছে শ্রমিক-কর্মচারীদের।

১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে হে মার্কেটে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে ঐতিহাসিক লড়াই লড়েছিলেন শ্রমিকরা। বহু শ্রমিক নিহত হয়, চার শ্রমিক নেতার ফাঁসি হয়। সেই আন্দোলন বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ৮ ঘণ্টা কাজের সময় বিশ্ব জুড়ে সরকারি স্বীকৃতি পায়। ভারতেও কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলি ৮ ঘণ্টা শ্রম সময়কে আইনি স্বীকৃতি দেয়। এর দ্বারা শ্রমিকরাও যে মানুষের মতো করে বাঁচার অধিকারী, তাদেরও যে ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম এবং আট ঘণ্টা অবসর বিনোদনের প্রয়োজন, সেটাই মেনে নেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরে এসে ৮ ঘণ্টার পরিবর্তে আবার ১২ ঘন্টা শ্রম-সময় চালু করে সরকারগুলি প্রাক-স্বাধীনতা যুগের অমানুষের জীবনে শ্রমিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চলেছে। এই পিছনে হাঁটার রাস্তায় বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিই অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে। কিন্তু কংগ্রেস শাসিত রাজ্যগুলি এবং অন্য রাজ্যগুলিও কেউই পিছিয়ে থাকতে রাজি হয়নি।

দেশের মালিক শ্রেণি দীর্ঘ দিন ধরেই শ্রম আইন সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছিল। এই সংস্কার কথাটার মানে কিন্তু শ্রমিকদের নিয়োগ এবং কাজের শর্তে যে সব অনিয়ম, অন্যায়, অমানবিক, বেআইনি বিষয়গুলি মালিকরা ইতিমধ্যেই চাপিয়ে রেখেছে, সেগুলির পরিবর্তন নয়। ঠিক তার বিপরীত। এখনও যতটুকু আইনি অধিকার শ্রমিকদের টিকে আছে, দীর্ঘদিনের লড়াই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে অধিকারগুলি শ্রমিকরা অর্জন করেছিল, যেমন স্থায়ী নিয়োগ, আট ঘণ্টা কাজের সময়, অবসরের পর প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, পেনশন নানা ধরনের সামাজিক সুরক্ষা প্রভৃতি, সেগুলিকেও বাতিল করে শ্রমিকদের ইচ্ছে মতো খাটিয়ে নেওয়ার এবং যখন খুশি ছাঁটাই করার একচ্ছত্র অধিকারই মালিকরা চেয়েছে। তারই নাম দিয়েছে তারা শ্রম আইন সংস্কার। শ্রম সংস্কারের নামে কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারগুলি সেই কাজই করে চলেছে।

১৯৯৯ সালে প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে কেন্দে্রর বিজেপি সরকার কংগ্রেস সাংসদ বিজয় ভার্মার নেতৃত্বে দ্বিতীয় জাতীয় শ্রম কমিশন গঠন করে। এই কমিশন ২০০২-এ দেশের সমস্ত শ্রম আইনগুলিকে কোডে রূপান্তরিত করার প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাবে মালিক শ্রেণির স্বার্থে শ্রমিকদের অধিকার হরণের বিষয়গুলি উল্লেখ ছিল। মোদি সরকার ২০২০ সালে করোনা অতিমারির সুযোগে পার্লামেন্টে কোনও আলোচনার সুযোগ না দিয়ে চূড়ান্ত অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শ্রম কোড পাশ করিয়ে নেয়।

নতুন শ্রম কোডে আনা হয়েছে ‘ফিক্সড টার্ম এমপ্লয়মেন্ট’ তথা চুক্তিভিত্তিক কাজ। এর ফলে এত দিন ধরে চালু থাকা স্থায়ী কাজে স্থায়ী কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা ধ্বংস করা হল এই কোডের মাধ্যমে। ফলে মালিকদের শোষণ অত্যাচারের মাত্রাও আরও বেড়েছে।

স্থায়ী কাজ উঠিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি এ বার আইন করে শ্রম সময়কেও বাড়িয়ে দিল সরকারগুলি। সরকার ও মালিকপক্ষের যুক্তি, ১২ ঘণ্টা শ্রমদিবসের ফলে উৎপাদন বাড়বে। পুঁজিপতিরা বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। আট ঘণ্টার পরিবর্তে শ্রম-সময় ১২ ঘণ্টা করলে উৎপাদন তো বাড়বেই এবং মালিকদের মুনাফাও বাড়বে। পুঁজিপতিরা বিনিয়োগে হয়তো আগ্রহীও হবেন। কিন্তু শ্রমিকরাও তো উৎপাদনে সমান অংশীদার। কারণ বিনা শ্রমে সংসারে কিছুই উৎপাদন করা যায় না এবং সে শ্রম দেয় শ্রমিকরা। তা হলে একটি গণতান্ত্রিক সরকার, জনকল্যাণকামী বলে পরিচিত সরকার উৎপাদনে শুধু মালিকদের সুবিধাই দেখবে কেন? একই রকম ভাবে শ্রমিকের সুবিধা দেখা তো সরকারের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। তা হলে সরকারগুলি কেন এমন একতরফা আইন নিয়ে এল? বলা হয়, আইন সকলের জন্য সমান। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আইন যে সকলের জন্য সমান নয়, মালিক ও শ্রমিক উভয়ের ক্ষেত্রে একেবারে বিপরীত, এই আইন সংশোধন তা স্পষ্ট করে দিল। যে আইন মালিকদের হাতে শ্রমিকদের উপর শোষণের বুলডোজার চালানোর অধিকার তুলে দিচ্ছে, মুনাফার পাহাড় গড়ে তুলতে সাহায্য করছে, সেই আইনই শ্রমিকদের দাসত্বের দিকে, অনাহারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তাদের বেঁচে থাকাটাই কঠিন করে তুলছে। যে আইন মালিককে যথেচ্ছ শ্রমিক শোষণের অধিকার দেয়, সেই আইন শ্রমিককে তা প্রতিরোধের কোনও অধিকার দেয় না। এতে প্রমাণ হয়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যত মিষ্টিমধুর কথা বলেই আইন পাশ করানো হোক, তা শেষ পর্যন্ত মালিক শ্রেণির স্বার্থকেই রক্ষা করে। এই আইন পরিবর্তন প্রমাণ করছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় দেশটার আসল মালিক পুঁজিপতি শ্রেণিই। শ্রমিকের জীবনের কোনও মূল্য এই ব্যবস্থায় নেই।

যত দিন সমাজতান্ত্রিক শিবির ছিল তত দিন এমনকি পুঁজিবাদী দেশগুলিও বাধ্য হয়েছিল রাষ্টে্রর গায়ে কল্যাণকামী মোড়ক চাপাতে। মালিকরা বাধ্য হয়েছিল শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনাগুলি কিছুটা হলেও দিতে। সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অবর্তমানে আজ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি যেমন তার কল্যাণকামী আলখাল্লা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে তেমনই মালিকরাও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কোনও আইন, কোনও নীতির তোয়াক্কা তারা করছে না।

প্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপি নেতারা কথায় কথায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানো কিংবা চতুর্থ থেকে তৃতীয় শক্তিশালী অর্থনীতিতে পৌঁছানোর কথা বলেন। দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অভাবে অভ্যন্তরীণ বাজার ধুঁকছে। হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। প্রতিদিন আরও বন্ধ হচ্ছে। দেশ বেকারে ছেয়ে গেছে। কৃষকরা দলে দলে আত্মহত্যা করছে। যুব সমাজ মদ, ড্রাগে আসক্ত হয়ে পড়ছে। সেখানে কীসের ভিত্তিতে মন্ত্রীরা এমন উন্নতির কথা বলছেন? আসলে এই জন্যই শ্রম আইন সংস্কার। শ্রমিকদের ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করে, তাঁদের উপর আরও বোঝা চাপিয়েই তারা পণ্যের উৎপাদন খরচ কমাতে চায়। এই ভাবে শোষণের মাত্র বাড়িয়েই তারা এই তথাকথিত উন্নতি ঘটাতে চায়। শোষিত অত্যাচারিত মানুষের মুক্তির দিশারি কার্ল মার্ক্স বহু আগেই এ কথা বলে গিয়েছেন, মালিকের মুনাফা আসে শ্রমিককে তার ন্যায্য প্রাপ্য থেকে, তার পরিশ্রমের ফসল থেকে বঞ্চিত করে। শ্রম সময় বাড়িয়ে তোলার এই ঘটনা মার্ক্সের কথার সত্যতাকে আবারও প্রমাণ করছে।

সরকার তথা মালিকরা যে উন্নয়নের কথা বলে, অর্থনীতির সেই উন্নয়ন শ্রমিকদের নিঃশেষে লুঠ করে নিয়েই। সেই উন্নয়নে শ্রমিকদের জন্য অতিরিক্ত শ্রমের বোঝা আর বঞ্চনা ছাড়া কিছুই পাওয়ার নেই। সেই উন্নয়ন শুধুই মালিকদের। অথচ একেই দেশের উন্নয়ন বলে মালিকরা, সরকারি নেতা-মন্ত্রীরা দেখাতে চান। যে ভাবে দল নির্বিশেষে সরকারগুলি শ্রম আইনে পরিবর্তন নিয়ে আসছে তাতে এটা বুঝতে কারও অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে, এটি কোনও বিশেষ দলের নীতি নয়, এটি আসলে দেশের মালিক শ্রেণির আকাঙক্ষা তথা দাবি যা নানা রঙের বুর্জোয়া-পেটি বুর্জোয়া দল পরিচালিত সরকারগুলি পূরণ করে নিজেদের সেবাদাস ভূমিকা পালন করছে। অনেকেই ইন্ডিয়া জোটকে বিজেপির বিকল্প মনে করেন। বাস্তবে স্পষ্ট এই তথাকথিত বিরোধী জোটের দলগুলির পরিচালিত সরকারগুলিও একই ভাবে মালিক শ্রেণির স্বার্থে শ্রমিক স্বার্থবিরোধী ভূমিকা পালন করছে। তাই দলের রঙ নয়, পতাকা নয়, আজ দেখতে হবে দলের শ্রেণিচরিত্র। কোন শ্রেণির স্বার্থ সেই দলটি রক্ষা করছে। আজ তথাকথিত বিরোধী দলগুলির আপসকামী ভূমিকার জন্যই বিজেপি সরকার এতখানি বেপরোয়া ভাবে আনতে পেরেছে চূড়ান্ত শ্রমিক স্বার্থবিরোধী শ্রম কোড। চাপিয়ে দিতে পারছে ১২ ঘণ্টা কাজের সময়।

ঐতিহাসিক মে দিবস শ্রমের সময় ৮ ঘণ্টা করার এবং শ্রমিক শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামের শপথে ভাস্বর। বর্তমানে শ্রমিক আন্দোলনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পুঁজিবাদী শাসন ও পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন মে দিবসের অর্জনকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শ্রমিক শ্রেণির কর্তব্য হল চূড়ান্ত শ্রমিক স্বার্থ বিরোধী ভূমিকা নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যে রাজ্যে যে ভাবে সরকারগুলি চলছে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলা। ইতিমধ্যেই দেশে দেশে শ্রমিক আন্দোলন ব্যাপক আকারে ফেটে পড়ছে। এ দেশেও শ্রমিকরা চুপ করে থাকবে না। তাদের বিক্ষোভ অনিবার্য ভাবে ফেটে পড়বে।