
৪ নভেম্বর এসআইআর-এর প্রথম দিনেই দুপুর বেলায় বাড়িতে কলিংবেলের শব্দ পেলাম। দরজা খুলে দেখি হাসি হাসি মুখ নিয়ে বিএলও মহাশয়া বিএলএদের সঙ্গে নিয়ে ‘এনুমারেশন ফর্ম’ হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। দুটি এনুমারেশান ফর্ম হাতে দিয়ে বললেন, এটা পূরণ করে দিতে হবে। ফর্ম দুটি দেখে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ২০০২-এর ভোটার লিস্ট এনেছেন কি না। তিনি জানালেন, না, ওটা অমুক দাদার কাছে পাওয়া যাবে। আমি বললাম, কোনও দাদা-দিদির কাছে তো যাব না। উনি বললেন, সাইবার ক্যাফে থেকে দেখে নিন। আমি বললাম, সাইবার ক্যাফেতে দেখতে গেলে ১০-১৫ টাকা খরচ হবে। কে দেবে, কমিশন? এ ছাড়া দুক্সকপি রঙিন স্ট্যাম্প সাইজ ফটোও লাগবে। এর খরচ কে দেবে, কমিশন? তিনি চুপ রইলেন। আমি তাঁকে জানালাম, আমার বয়স ৭০-এর বেশি। প্রায় ৫০ বছর ধরে আমি ভোটার। এত বার এপিক কার্ড হয়েছে। প্রতি বারই বুথে গিয়ে ভোটাররা কমিশনের আয়োজনে ছবি তুলে এসেছে। ব্যক্তিগত ভাবে কাউকে ছবি দিতে হয়নি বা পুরানো ভোটার লিস্ট ঘেঁটে নাম খুঁজে বার করতে হয়নি। তা হলে এ বার এই হয়রানি কেন? তিনি যথারীতি নিরুত্তর রইলেন।
বিকেল বেলায় সাইবার ক্যাফেতে দৌড়লাম। বড় লাইন। সেখান থেকে নাম খুঁজে বার করে ফটো স্টুডিওতে গেলাম। সেখানেও লাইন, ফটো তোলার জন্য। এ দুটোর জন্য পকেট থেকে ৭৫ টাকা খরচ করতে হল। স্ত্রীর ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার হল। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগছে, আমি একজন শিক্ষিত সাধারণ মধ্যবিত্ত। না হয় কোনও রকমে তৎক্ষণাৎ টাকাটা জোগাড় করতে পেরেছি। কিন্তু দেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষ যাঁরা দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে, যে মানুষগুলি ফুটপাতে কোনও রকমে দিন গুজরান করেন, অথবা জরাজীর্ণ বস্তিতে বসবাস করেন, জঙ্গলমহল এলাকায় যে সমস্ত প্রান্তিক সমাজের মানুষ এবং আদিবাসীরা থাকেন, দূর-দূরান্ত গ্রামাঞ্চলে যারা বাস করেন তাঁদের কী হবে? কী হবে যাঁরা নিজের এলাকা থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে কর্মরত গরিব পরিযায়ী শ্রমিক তাঁদের? কী ভাবে তাঁরা হাজার হাজার টাকা খরচ করে বাড়িতে সপরিবারে ছুটে আসবে এই কাজের জন্য নিজের জীবন জীবিকা অনিশ্চিত করে? তাদের চটজলদি এতগুলো টাকা জোগাড় করা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাইবার ক্যাফে থেকে নাম ও নম্বর খুঁজে বের করা কী ভাবে সম্ভব হবে? অথবা ২০০২-এর ভোটার লিস্টে তাদের বা তাদের বাবা-মা অথবা ঠাকুরদা ঠাকুমার নাম না থাকলে যে নথিগুলোর ভিত্তিতে তাদের প্রমাণ করতে হবে তারা দেশের নাগরিক, সেটা জোগাড় করা এই চালচুলো হীন মানুষগুলোর পক্ষে কতটা সম্ভব? এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি রাজ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম কাটা যাবে। তা হলে স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন জাগে এটা কি বিশেষ নিবিড় সংশোধন এসআইআর, নাকি বিশেষ নিবিড় বিয়োজন এসআইডি (স্পেশাল ইনটেনসিভ ডিলিশন)? মনে হচ্ছে সরকার ঘুরপথে এনআরসির কাজটা সেরে নিচ্ছে এসআইআর এর নাম করে।
সংসদে নতুন আইন পাস করে যে ভাবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন তৈরি করা হয়েছে তার নিরপেক্ষতা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। আগে নির্বাচন কমিশন গঠন করতেন প্রধানমন্ত্রী, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং বিরোধী পক্ষের নেতা এই তিন জনের কমিটি। বর্তমান পরিবর্তিত আইনে প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী মনোনীত একজন ক্যাবিনেট মন্ত্রী ও বিরোধী পক্ষের নেতা, এই কমিটি বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠন করেছে। ফলে বুঝতেই পারা যাচ্ছে কতটা নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে! তাই এই নির্বাচন কমিশন পূর্ববর্তী সমস্ত পরম্পরাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ভোটারদের প্রমাণ করতে বলছে যে তারা এই দেশের নাগরিক। অর্থাৎ সরকার ও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও কর্তব্যের দায়ভার তারা সাধারণ ভোটারদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। এর চেয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ আর কী হতে পারে? এর ফলে নির্দোষ সাধারণ নাগরিকদের অহেতুক অর্থদণ্ড ও অযথা হয়রানি এবং আতঙ্কের শিকার হতে হচ্ছে। এ বারের এসআইআর-এর কার্যকলাপ দেখে এটাই আমার নির্মম অভিজ্ঞতা।
বিএলও আমাদের পাড়ার একটি হাই স্কুলের শিক্ষিকা। তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনার মতো হাজার হাজার শিক্ষিকা-শিক্ষক এই যে বিএলও-র কাজ করছেন কয়েক মাস ধরে, সামনেই তো বার্ষিক পরীক্ষা, ছাত্র-ছাত্রীদের কী হবে? তারা তো পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হবে! শুনে তিনি নীরবে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন।
দেবাশিস রায়
শীলপাড়া, কলকাতা ৮