
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর যথার্থতা এবং সফলতার কথা প্রচার করতে সরকার এবং বিরোধী দলগুলির সাংসদরা একসঙ্গে বিশ্বের ৩২টি দেশে ঘুরে এলেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলি এই প্রশ্নে যতই সরকারের সঙ্গে গলা মেলান, যুদ্ধ সংক্রান্ত তথ্যগুলি সংসদকে জানানোর জন্য বিশেষ অধিবেশন ডাকার জন্য তাঁদের দাবিতে কানই দিলেন না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তাঁর দল।
এই যে ৩২টি দেশে হাওয়াই গাড়িতে চড়ে গিয়ে বড় বড় হোটেলে থেকে জনগণের টাকায় খানাপিনা করে প্রচার চালালেন এই সব সাংসদরা, তাঁরা ঠিক কী বললেন সেখানে? তার আগে এই প্রতিনিধিরা যে দেশে দেশে গিয়ে অপারেশন সিঁদুরের পক্ষে প্রচার চালাবেন, এটা কী ভাবে ঠিক হল? সেটা কি সর্বদলীয় সিদ্ধান্ত ছিল, নাকি সরকারই ঠিক করে দিয়েছিল? কংগ্রেস, তৃণমূল জানিয়েছে, তাঁদের সাথে কোনও রকম আলোচনা না করেই সরকার তাঁদের দলের প্রতিনিধিদের নাম ঠিক করে দিয়েছিল। আচ্ছা, বিদেশে গিয়ে এই প্রতিনিধিরা কী বলবেন তা কী ভাবে ঠিক হয়েছিল? প্রতিনিধিরা কি তাঁদের দলের বা নিজেদের উপলব্ধি মতো বক্তব্য রেখে এসেছেন? এ ব্যাপারে কি আগে কোনও মতৈক্য হয়েছিল, নাকি বিজেপি সরকারের তৈরি করা ভাষ্যই তাঁদের মুখস্থ করে আওড়াতে হয়েছে? বিজেপি সরকার কি যুদ্ধ সংক্রান্ত সব তথ্য এই সব প্রতিনিধি দলের সদস্যদের হাতে তুলে দিয়েছিল? প্রশ্নগুলির উত্তর জানার অধিকার দেশের মানুষের রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, বিদেশে প্রতিনিধি দল পাঠানোর আগে কোনও সর্বদলীয় বৈঠক বা মতৈক্য হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিনিধি দলগুলির হাতে নির্দিষ্ট লিখিত বক্তব্য তুলে দেওয়া হয়েছিল এবং তার বাইরে কেউ কোনও বক্তব্য রাখতে পারবেন না বলে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছিল। সেই লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছিলঃ কোনও রাষ্ট্র মধ্যস্থতা করায়নি। ভারতীয় সেনার শৌর্যে পরাস্ত হয়ে পাকিস্তানের ডিজিএমও ফোন করে সংঘাত বিরতি চেয়েছিলেন। সব দিক বিবেচনা করে তাতে সাড়া দিয়েছে নয়া দিল্লি। ভারতের লড়াই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে, তারা নির্মূল করেছে পাক মদতপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটি। কিন্তু পাকিস্তান সরকার জঙ্গিদের হয়ে বদলা নিতে ভারতের উপর হামলা করলে তার প্রত্যাঘাত করা হয়েছে। আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসে পাকিস্তানের ভূমিকা সম্পর্কে সবার অবগত হওয়া প্রয়োজন (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২১ মে)।
‘কোনও রাষ্ট্র মধ্যস্থতা করায়নি’– বিজেপি সরকারের এই বক্তব্যের সঙ্গে কি বিরোধী দলগুলি এবং তাদের সাংসদরা একমত? যদি একমত হন তবে তাঁরা সরকারকে আবার বিশেষ অধিবেশন ডেকে এ সম্পর্কে সরকারি বক্তব্য স্পষ্ট করার দাবি করছেন কেন? আর যদি একমত না হন, তবে সেই দলগুলির সাংসদরা দলের মতপার্থক্য সত্ত্বেও তা বিশ্ব জুড়ে প্রচার করে এলেন কী করে?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট এখনও প্রায় নিয়ম করে প্রতিদিন বলে চলেছেন যে তিনিই দুই দেশকে যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করেছেন এবং তা বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দিয়ে। যদি এ কথা সত্য না হয়, তবে প্রধানমন্ত্রী কেন স্পষ্ট করে বলছেন না যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারত সম্পর্কে মিথ্যা প্রচার করছেন? এক দিকে সংসদীয় প্রতিনিধি দল ভারতীয় সেনার শৌর্য প্রচার করছেন, আর এক দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সেনার সেই শৌর্যকে খাটো করে দেখাচ্ছেন, দুটো একসঙ্গে কী করে চলতে পারে! বিরোধী দলগুলিকেও কিন্তু দেশের মানুষের সামনে এই প্রশ্নগুলির উত্তর স্পষ্ট করে দিতে হবে। যদি তারা তা না দেয় তবে বুঝতে হবে, বিরোধী দলগুলির আলাদা কোনও বক্তব্য নেই, বিজেপি সরকারের বক্তব্যই তাদের বক্তব্য। আর তা-ই যদি হয় তবে সরকারের কাছে বিশেষ অধিবেশন ডেকে কীসের ব্যাখ্যাই বা তাদের নেতারা চাইছেন?
ভারত সরকার কোন বিশেষ পরিস্থিতিতে বিদেশে প্রতিনিধি দল পাঠানোর কথা ভাবল? পহেলগামে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণে ২৬ জন পর্যটকের মৃত্যুর পর দেশ জুড়ে যখন সরকারের গোয়েন্দা এবং নিরাপত্তা ব্যর্থতা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী যখন কোনও ভাবেই সন্ত্রাসবাদীদের হদিশ করতে পারছে না, সরকারি ব্যর্থতার বিরুদ্ধে যখন জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে, তখন ভারত সরকার পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিগুলিতে বিমান আক্রমণ চালিয়ে সেগুলি গুঁড়িয়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করে। পাল্টা পাকিস্তান ভারতীয় বায়ুসেনা ঘাঁটিগুলি লক্ষ্য করে বিমান হানা চালালে ভারতও পাকিস্তানের বায়ুসেনা ঘাঁটিগুলিতে আক্রমণ চালায়। এ দিকে বিজেপি-আরএসএস বাহিনী এবং তাদের আইটি সেল নেমে পড়ে ঘটনাটিকে হিন্দুদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের আক্রমণ হিসাবে দেখিয়ে দেশ জুড়ে মুসলিম বিরোধী জিগির তুলতে। শুরু হয় কাশ্মীরী ছাত্র এবং সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণ। সামাজিক মাধ্যমগুলিতে এই জিগির তুঙ্গে ওঠে। সঙ্গে নামে সরকার এবং একচেটিয়া পুঁজি নিয়ন্ত্রিত টিভি চ্যানেলগুলি। এই রকম পরিস্থিতিতে যখন আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ তুঙ্গে ওঠার উপক্রম, সংঘর্ষ শুরুর চার দিন পর হঠাৎ ১০ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করে দেন যে, ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে তিনি যুদ্ধবিরতি করিয়ে দিয়েছেন এবং তা করেছেন উভয় দেশকে বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দিয়ে। ট্রাম্পের এমন ঘোষণার আধ ঘণ্টা পরে ভারত এবং পাকিস্তান পরস্পর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে।
ভারত সরকার সংবাদসূত্র মাধ্যমে ট্রাম্পের এই মধ্যস্থতার কথা অস্বীকার করে। কিন্তু তাতে প্রশ্ন ওঠে, তা হলে ভারত বা পাকিস্তান ঘোষণার আগেই ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা করলেন কী করে? তাঁর যদি কোনও ভূমিকাই না থাকে তবে এই বিরতির কথা তিনি আগাম জানলেন কী করে? আরও প্রশ্ন ওঠে, সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলায় ভারতের পাকিস্তান আক্রমণ সন্ত্রাসবাদ দমনের শর্ত বাদ দিয়ে বাণিজ্যের শর্তে বন্ধ হল কী করে? ফলে এতক্ষণ পর্যন্ত অনুগামীরা মোদির দৃঢ়তা এবং বীরত্বের যে বেলুনকে ফুলিয়ে বিরাট করে তুলেছিলেন ট্রাম্পের এই ঘোষণায় তা মুহূর্তে চুপসে যায়। দেখা যায়, মোদির বীরত্ব আসলে অনুগামীদের প্রচারমাত্র। এই রকম সময়ে যখন দেশের সাধারণ মানুষ এবং বিরোধীদের কড়া প্রশ্নের মুখে পড়ছে সরকার, ঠিক তখনই সরকার তার অস্বস্তি কাটাতে এবং ড্যামেজ কন্টে্রাল করতে দেশে দেশে এই সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল পাঠানোর ফিকির বের করে। বিরোধী দলগুলিরও কারও এই সাহস হয় না যে, তাতে অংশ নিতে অস্বীকার করে বা এ কথা বলে যে আগে সরকার যুদ্ধ সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য দিক এবং আমরা এ ব্যাপারে ঐক্যমত হই, তারপরে প্রতিনিধি পাঠানোর কথা ভাবা যাবে। বাস্তবে বিরোধী দলগুলি আশঙ্কা করে যে, এই রকম একটা সময়ে সরকারের সুরে সুর না মেলালে যদি দেশের মানুষ তাদের ‘দেশবিরোধী’ তথা ‘হিন্দুবিরোধী’ ঠাওরায়! এতে যদি ভোটে ক্ষতি হয়!
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী মুখে অনেক কথা বললেও তাঁদের দলের সাংসদরাও তাই দেশে দেশে এই সরকারি ভাষ্যই প্রচার করে এসেছেন। সিপিএমের রাজ্যসভার যে সাংসদকে এই প্রতিনিধি দলে নেওয়া হয়েছিল তিনি তো সরকারের কাজের প্রশংসায় এমনই পঞ্চমুখ যে বিজেপির সাম্প্রদায়িক চরিত্রটি ভুলে গিয়ে বলতে থাকলেন, ভারতে হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টান সহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা শান্তিপূর্ণ ভাবে সহাবস্থান করে। তিনি সরকারের শান্তি প্রচেষ্টার এবং গণতান্ত্রিক চেতনারও প্রশংসায় গদগদ হয়েছেন (গণশক্তি, ১ জুন)। অথচ সরকার বা বিরোধী দলগুলি যত সাফল্যের কথাই বলুক না কেন, এ কথা তো স্পষ্ট যে, সন্ত্রাসবাদীদের খুঁজে বের করা বা সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করার প্রশ্নটিই এঁদের সব আলোচনা এবং প্রচারে ধামাচাপাই থেকে গেল।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তথা বিজেপি সরকারের অনেক ঢক্কানিনাদ সত্তে্বও পাকিস্তান প্রশ্নে ভারত যে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড় করতে পারেনি তা প্রমাণ হয়ে যায় যখন ভারতের তীব্র আপত্তি সত্তে্বও আইএমএফ পাকিস্তানকে ১০০ কোটি ডলারের প্যাকেজ অনুমোদন করে (৯ মে)। এই অর্থ পাকিস্তান সন্ত্রাসে মদত দিতে ব্যবহার করবে, এ কথা বলেও কোনও লাভ হয়নি। সরকার এবং বিরোধী দলগুলির সাংসদরা যখন প্রবল গতিতে বিশ্বভ্রমণ চালাচ্ছেন তার মধ্যেই এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক ভারতের তীব্র আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানকে ৮০ কোটি ডলারের আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করল। শুধু কি তাই? ‘বিশ্বগুরু’র সমস্ত কূটনীতিকে ব্যর্থ করে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের ‘তালিবান নিষেধাজ্ঞা কমিটি’র চেয়ারম্যান করা হচ্ছে পাকিস্তানকেই। পাশাপাশি পরিষদের ‘সন্ত্রাস বিরোধী কমিটি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবেও কাজ করবে পাকিস্তান।
ফলে প্রধানমন্ত্রী দেশের অভ্যন্তরে নিজেকে যতই সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসাবে তুলে ধরার চেষ্টা করুন, বাস্তবে তিনি যে একজন ব্যর্থ রাষ্ট্রনায়ক তা আর দেশের মানুষের সামনে আড়াল করে রাখা যাচ্ছে না। এই অবস্থায় বিরোধী দলগুলির দরকার ছিল, যুদ্ধবিরতি কোন শর্তে হয়েছে, পাকিস্তান সন্ত্রাস বন্ধের কোনও লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কি না, কেন এখনও পর্যন্ত পহেলগামের হত্যাকারীদের কোনও হদিশ গোয়েন্দা দফতর এবং নিরাপত্তা বাহিনী করতে পারল না, সরকার কেন পাকিস্তানকে আগাম খবর দিয়ে বিমান আক্রমণ চালাল, যুদ্ধে ভারতের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হল তার জবাবদিহি চেয়ে সরকারকে চেপে ধরা এবং বিজেপির যুদ্ধবাজ চরিত্রটিকে সামনে এনে কী ভাবে এর পিছনে অস্ত্র উৎপাদক এবং ব্যবসায়ী একচেটিয়া পুঁজির স্বার্থ কাজ করছে তা উদঘাটিত করা, জনগণকে যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং মারাত্মক ক্ষতির দিকগুলি তুলে ধরে সচেতন করা এবং যুদ্ধ বিরোধিতায় সংগঠিত করা। তা না করে সব বিরোধী দলগুলি, যার মধ্যে বাম নামধারী একটি দলও আছে, শাসক দলের চালে মাত হয়ে গিয়ে বিশ্বজুড়ে ‘মোদিজি কি জয়’, ‘নরেন্দ্র মোদি যা করেছেন ঠিক করেছেন’ স্লোগানে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে শাসক দলের তৈরি করা বয়ান প্রচার করে এলেন। দেশের মানুষ অবাক হয়ে দেখল কী ভাবে শাসক দলের রাজনীতির সঙ্গে বিরোধী রাজনীতি একাকার হয়ে গেল, যা আসলে বিরোধীদের নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কিছু নয়। দেশপ্রেম কথাটির প্রতি সাধারণ মানুষের যে আবেগ তার সুযোগ নিয়েছে শাসকদল। কিন্তু দেশের প্রতি ভালবাসা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে যা, তার সাথে শাসকের দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য অনেক। এই সত্যটা কোনও বিরোধী দলই শাসক দলকে বলতে পারেনি। কারণ এরা সকলেই একই শ্রেণির প্রতিভূ। দেশের বড় দুর্দিন যে বামপন্থী দলও এই কর্তব্য ভুলে গেল! এমন একটি গুরুতর বিষয় নিয়ে সরকার বিরোধী দলগুলির সঙ্গে বা পার্লামেন্টে কোনও আলোচনাই করল না। বিরোধী দলগুলিও সরকারকে যুদ্ধের প্রশ্নে ব্ল্যাঙ্ক চেক দিয়ে দিল। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তা হলে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিরোধী দলের ভূমিকাটি ঠিক কী? নাকি শাসক এবং বিরোধী দলগুলির রাজনীতিতে বাস্তবেই কোনও নীতিগত বিরোধ নেই, বিরোধ যেটুকু তা আসলে সংসদীয় বিরোধিতা, অর্থাৎ ভোটের জন্য বিরোধিতা, গদির লোভের বিরোধিতা? এই রাজনীতি দিয়ে কি আদৌ সন্ত্রাসবাদকে মোকাবিলা করা সম্ভব? দেশের মানুষকে এই প্রশ্নগুলি গভীর ভাবে ভেবে দেখতে হবে।
এই লেখাটি গণদাবী ৭৭ বর্ষ ৪৪ সংখ্যা ১৩ – ১৯ জুন ২০২৫ এ প্রকাশিত