Breaking News

ক্ষমার প্রহসন

গত ৩১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী এক ভিডিও বার্তায় আন্দোলনকারী তরুণ সমাজকে ‘ক্ষমা’ করে দেওয়ার যে আকস্মিক ঔদার্য দেখালেন, তা নিছক হাস্যকরই নয়, বরং এক চরম স্বৈরাচারী মানসিকতার নগ্ন প্রকাশ। সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে পথে নামা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের মৌলিক ও সাংবিধানিক অধিকার। সেই স্পর্ধিত অধিকারকে যখন রাষ্টে্রর সর্বোচ্চ শাসক ‘অপরাধ’ বা ‘ভুল’ হিসেবে দেগে দিয়ে ‘ক্ষমা’র মোড়কে উপস্থিত করেন, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এটি একটি ন্যায্য, কাঙিক্ষত গণতান্ত্রিক প্রতিবাদকে জনমানসে বেআইনি সাব্যস্ত করার এক সুচতুর ফ্যাসিবাদী কৌশল মাত্র।

মোদি শাসনের গত এক যুগে দেশে বেকারত্বের হার সমস্ত অতীত রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। গত দশ বছরে ৮৯টি নিয়োগ ও প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। নিয়োগ দুর্নীতি আজ এক অভাবনীয় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। দুর্নীতির প্রশ্নে এই সরকারের দ্বিচারিতা আজ মানুষের সামনে নগ্ন। আন্দোলনের চাপে, পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী যখন তাঁরই মন্ত্রিসভার অত্যন্ত বিশ্বস্ত সদস্য ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করেন, তখন জনমানসে স্বচ্ছতার এক মেকি ছবি তুলে ধরার চেষ্টা হয়েছিল। ঠিক তার পরদিনই প্রশ্ন ফাঁসে দায়ী মন্ত্রীকে সংসদে পাগড়ি ও উত্তরীয় পরিয়ে বিপুল সমাদরে বরণ করে নেওয়া হয়। একে দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে চূড়ান্ত প্রতারণা ছাড়া আর কী বলা যায়? দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর যে বুলি প্রতিনিয়ত আওড়ানো হয়, তা যে নির্জলা রাজনৈতিক ভণ্ডামি, এই ঘটনা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তরুণ সমাজ যখন এই বঞ্চনা, বেকারত্ব ও নীতিগত অসন্তোষের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে, তখন তাদের ‘ক্ষমা’ করার বার্তাটি আসলে মূল দাবিগুলো থেকে নজর ঘোরানোর এবং আন্দোলনকে লঘু করার, হেয় করার এক ধূর্ত চাল। শাসকের এই বার্তার অন্তর্নিহিত অর্থটি হল ধরে নেওয়া যে সরকার সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত, যত ভুল ওই বেকার, বঞ্চিত আন্দোলনকারীদেরই! একটি দেশের তরুণ সমাজ যখন বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামে, তখন সরকারের উচিত নিজেদের নীতি বা শাসনব্যবস্থার ত্রুটিগুলো নিয়ে আত্মবিশ্লেষণ করা। কিন্তু এই সরকারের সেই দায়বদ্ধতার লেশমাত্র নেই।

যে প্রধানমন্ত্রী আজ তরুণ সমাজকে ‘ক্ষমা’ করার ছদ্ম মহত্ত্ব দেখাচ্ছেন, তাঁর গত বারো বছরের শাসনকালের দিকে ফিরে তাকালে শিউরে উঠতে হয়। এই এক যুগে দেশবাসী পেয়েছে কেবল মিথ্যাচারের মহাকাব্য আর ‘জুমলা’র পাহাড়। তাঁর সরকারের একনায়কতান্ত্রিক ও হঠকারী নোটবন্দির সিদ্ধান্তে ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়ে, কোভিডের সময় সরকারের চরম অপদার্থতার ফলে বিনা চিকিৎসায় কত হাজার নিরপরাধ মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, দেশ তা ভোলেনি। কর্পোরেট-তোষণকারী কৃষি আইনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে সাতশোর বেশি কৃষক রাজপথে নিজেদের রক্ত ঝরিয়েছেন, তা ইতিহাসের পাতায় রক্তাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী আজ হঠাৎ কুকথার বিরুদ্ধে নীতিবাক্য শোনাচ্ছেন। তিনি শোনাতেই পারেন। কিন্তু তিনি নিজে, তাঁর দলের মন্ত্রী-নেতারা এবং মদতপুষ্ট ট্রোল বাহিনী সমাজে যে ঘৃণা ও বিদ্বেষের চাষ করে চলেছেন, তার হিসাব কে দেবে? বিরোধী নেতানেত্রী তো বটেই, রামমোহন থেকে নেতাজি– দেশের বরেণ্য মনীষীদেরও প্রতিনিয়ত অপমান করতে ছাড়েনি এই শাসকদল। সংখ্যালঘুদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী নিজে এবং তাঁর দলের বহু নেতা যে কদর্য ভাষা প্রয়োগ করেছেন, তার জন্য কি তাঁরা ক্ষমা চেয়েছেন? সামাজিক মাধ্যমে মহিলাদের উদ্দেশে লাগাতার কদর্য আক্রমণ শানানো হয়েছে। বিশ্বমঞ্চে দেশের সম্মান যারা বৃদ্ধি করেছেন, সেই মহিলা কুস্তিগীররা যখন দিনের পর দিন রাস্তায় বসে যৌন হেনস্থার বিচার চাইছিলেন, তখন আমরা দেখেছি প্রধানমন্ত্রীর বধির নীরবতা। দেখেছি নির্লজ্জের মতো যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত সাংসদকে আড়াল করার প্রচেষ্টা। ধর্ষক ও খুনিদের জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর যারা মালা পরিয়ে স্বাগত জানায়, তাদের মুখে নৈতিকতার বাণী মানায় না। দেশ জুড়ে বিদ্বেষ, বিভেদ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার যে বিষবাষ্প গত বারো বছরে ছড়ানো হয়েছে, তার দায় কি প্রধানমন্ত্রী তাঁর এই মেকি চোখের জলে ধুয়ে ফেলতে পারবেন?

এই সমস্ত রাষ্ট্রীয় অপরাধ, দুর্নীতি, বঞ্চনা ও হত্যার দায়ে যেখানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীরই করজোড়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাওয়ার কথা, সেখানে তিনি উল্টে বিচারকের আসনে বসে সবাইকে ‘ক্ষমা’ করে দেওয়ার যে প্রহসনটি রচনা করলেন, তা সমগ্র দেশবাসীর প্রতি এক বিরাট প্রতারণা।