
কলকাতাঃ ‘অভাবে ক্যাব চালাতাম বলে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল। বাবার ভিটা ছেড়েও পথে নামতে হল। দিশাহীন অবস্থা। বস্তিতে ঘুপচি ঘর ভাড়া নিয়ে দর্জির কাজ ধরি। নরক কুণ্ডে একটু একটু লড়ে ছেলেমেয়েকে বড় করছি। ওরা বড় হলে আশা করি আমাকে বুঝবে’–চোখের জলে নিজের নিত্যদিনের জীবনযুদ্ধের কাহিনী যখন জীবনে প্রথমবার মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলছিলেন দর্জি শ্রমিক হাসনু তারা শেখ, হল জুড়ে তখন পিনপড়া নিঃস্তব্ধতা। যখন শ্মশানকর্মী টুম্পা দাস বলেন, ডোম ছেলেদের পেশা বলে কেউ প্রথম প্রথম ডাকত না। সমাজে একঘরে দশা। অভাবী বিধবা মায়ের ভরসায় হাল ছাড়িনি। নিজেকে বলি, মেয়ে তো কী! পারতেই হবে। আজ সবাই আমায় ‘টুম্পা ডোম’ ডাকে। বেশ লাগে। আজ মঞ্চে আপনারা আমার পেশার লড়াই বলতে দিয়েছেন বলে গর্ব হচ্ছে– তুমুল হাততালির বন্যায় ভেসে গেল সভাঘর। শ্রোতাদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত যুদ্ধজয়ের ঝিলিক। মঞ্চে দাঁড়িয়ে অধ্যাপিকা শাশ্বতী ঘোষ বলে ওঠেন, এঁদের সম্মান জানাতে পেরে আজ নিজেদের সম্মানিত মনে হচ্ছে। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা শরিফা খাতুন তাঁর আলোচনায় যখন পাড়ার ম্যারাথনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রশ্ন তোলেন, হামেশাই পুরুষ বিভাগের চেয়ে মহিলা বিভাগে পুরষ্কার-মূল্য কম হয় কেন? দর্শকদের সাথে সভাপতির আসন থেকে অধ্যক্ষা, মঞ্চের অন্যতম আহ্বায়ক মৈত্রেয়ী বর্ধন রায়ও সায় দিয়ে বলেন, এ লড়াই তো সমাজ-জীবনে আজ প্রতিটি মহিলার অস্তিত্বের লড়াই।
‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’র উদ্যোগে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এমন এক ভিন্ন ধারার অভিজ্ঞতা ও আবেগের সাক্ষী থাকল কলকাতা। হাজরার সুজাতা দেবী সদনে আয়োজিত এই আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এ ছাড়াও বলেন উত্তরবঙ্গের চা বাগানকর্মী মাঞ্চালি ওঁরাও, ক্যাব চালক শ্যামলী হাজরা, ফিফা রেফারি ও ফুটবলার অনামিকা সেন, আশাকর্মী তাপসী মণ্ডল, ভয়েস অফ অভয়া ভয়েস অফ উইমেনের বর্ষীয়ান সদস্য কুহু দাস, মঞ্চের আহ্বায়কবৃন্দ আইনজীবী দেবযানী সেনগুপ্ত এবং সমাজকর্মী কল্পনা দত্ত প্রমুখ। উপস্থিত ছিলেন আহ্বায়কমণ্ডলীর অন্যতম ডাঃ নূপুর ব্যানার্জী, ক্রীড়াবিদ কুন্তলা ঘোষ দস্তিদার ও অনিতা রায়। ছিলেন অর্জুন পুরষ্কারপ্রাপ্ত ক্রীড়াবিদ শান্তি মল্লিক। অভ্যাগতদের সম্মাননা প্রদান, গান, নাটক, আবৃত্তির পাশাপাশি এই অনুষ্ঠানে বিগত ৯-১৫ ডিসেম্বর ২০২৫, অঙ্গীকার যাত্রার চিত্র সংকলন প্রকাশ এবং তথ্যচিত্র পরিবেশিত হয়।
আহ্বায়করা বলেন, নারীরা ঘরে বাইরে কর্মক্ষেত্রে নিপীড়িত, নির্যাতিত, অরক্ষিত। অভয়ার ন্যায়বিচার এখনও অধরা। তাই মর্যাদা রক্ষা ও সমানাধিকারের এই লড়াই চলবে। আজ বিভিন্ন পেশার নারীর কথায় আত্মমর্যাদার যে স্ফূলিঙ্গ দেখা গেল, তাতে প্রত্যয় আরও দৃঢ় হল– আমরা লড়ব, আমরা জিতব।
মেদিনীপুরঃ শান্তনী সেন। সামাজিক পরিচয়ে, তিনি পরিচারিকা। কোনও প্রলোভনে পা না দিয়ে, মাথা উঁচু করে বাঁচেন। একটি অনাথ শিশুকে মায়ের স্নেহ দিয়ে বড় করছেন। শুধু তাই নয়, কলুষমুক্ত সমাজ হোক এমনই আকাঙ্খায় এলাকায় মদবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখ। লক্ষ্মীমণি হাঁসদা। স্বামী মানসিক ভারসাম্যহীন। ৯ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে নিয়মিত শহরে স্বামীকে নিয়ে আসেন চিকিৎসার জন্য। বাড়িতে দুই মেয়ে। লক্ষ্মীমণিও এলাকার প্রতিবাদী মুখ। মাথা উঁচু করে বাঁচবার সাহস রাখেন। সুমনা মণ্ডল। এ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। অভয়া আন্দোলনে সামনের সারিতে বার বার দেখা গিয়েছে। বৃদ্ধ ঠাকুমার দেখভাল করার দায়িত্ব তুলে নিয়েছে সুমনা। নিজের পড়ার খরচ নিজে নানা পরিশ্রম করে জোগাড় করেও উচ্চশিক্ষা লাভ করে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় সে। এরকমই লক্ষ্মী সরেন, পুষ্প দাস, গীতা শীট, সবিতা গিরি, শিখা মাইতি, মনা দাস, রীতা চ্যাটার্জী– এঁদের কেউ পরিচারিকা, কেউ সবজি বিক্রেতা– যাঁরা পরিবারে, ব্যক্তিগত পরিসরে অসম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি কেউ মদবিরোধী আন্দোলনের সভানেত্রী, তো কেউ আশা দিদি, আন্দোলনে অগ্রণী।
৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’ মঞ্চ, মেদিনীপুরের পক্ষ থেকে এঁদের সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। এই কমিটির মেদিনীপুর শাখার সভানেত্রী বিশিষ্ট লেখিকা ও সমাজকর্মী রোশেনারা খান বলেন, আসলে এই নারীরা নীরবে যে মানবিক গুণাবলি ও দৃঢ়তা নিয়ে এই সমাজের অভ্যন্তরে অসম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সম্মানিত করতে পেরে আমরা নিজেরাই ধন্য হয়েছি, নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করতে পেরেছি। পদার্থবিদ্যার বিশিষ্ট অধ্যাপক, সুরেশ চন্দ্র দাস, ওই নারীদের হাতে পুষ্পস্তবক, স্মারক মেডেল ও সামান্য উপহার তুলে দিয়ে এই অশীতিপর বয়সের জন্মদিনে নিজেকে ধন্য ও সার্থক মনে করেছেন। কমিটির সম্পাদিকা অনিন্দিতা জানা ঘোষণা করেন, এভাবেই তাঁরা সারা বছর নারী-লাঞ্ছনার প্রতিবাদ-প্রতিকারের পাশাপাশি, নানা সৃজনশীল কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কমিটির যথাযথ ভূমিকা পালন করে যাবেন। এই সমাজের আগাপাশতলা না পাল্টালে অর্থনৈতিক অধিকারে, সামাজিক অবস্থানে, কিংবা রুচিতে, সংস্কৃতিতে, শিক্ষায় দীক্ষায়, সবকিছুতে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবস্থান সমান হবে কী করে? আর তা না হলে সুমনা, লক্ষ্মীমণিদের স্বপ্ন যে অধরাই থেকে যাবে।