
ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা নিটে প্রশ্ন ফাঁস, কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা সিইউইটি পরীক্ষায় চূড়ান্ত অব্যবস্থা এবং সিবিএসই দ্বাদশ পরীক্ষার ফল নিয়ে সার্বিক বিশৃঙ্খলার যে চিত্র দেখা গেল তা কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারে শিক্ষা ধ্বংসকারী চরিত্রকে আবার স্পষ্ট করে দিল।
১৩ মে সিবিএসই বোর্ডের দ্বাদশ শ্রেণির ফল প্রকাশের পর দেখা যায় ধারাবাহিকভাবে ভাল ফল করে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকেই কোনও কোনও বিষয়ে শূন্য অথবা এক অঙ্কের নম্বর পেয়েছে। ফলে মূল্যায়ন ব্যবস্থা সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রী অভিভাবক শিক্ষক ও শিক্ষানুরাগী মানুষজনের ব্যাপক বিক্ষোভ সামাল দিতে সিবিএসই কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে পরীক্ষার্থীরা আবেদন জানালে ক্রমিক সংখ্যার ভিত্তিতে স্ক্যান করা উত্তরপত্র পোর্টালে আপলোড করা হবে। আর এরপর থেকেই সামনে আসতে থাকে বিরাট বিশৃঙ্খলার চিত্র। ১৯ মে পদার্থবিদ্যার খাতা দেখতে চেয়ে আবেদন জানায় দিল্লির ছাত্র বেদান্ত শ্রীবাস্তব। ২৩ মে সিবিএসই তার যে উত্তরপত্র আপলোড করে, তা দেখে বেদান্তের চক্ষু চড়কগাছ। সমাজ মাধ্যমে সে লেখে, ‘আমি বিপর্যস্ত। সিবিএসই যে উত্তরপত্র আপলোড করেছে তা আমার নয়’। এই অভিযোগ করার জন্য বিজেপি ঘনিষ্ঠরা তাকে সামাজমাধ্যমে ‘পাকিস্তানি’ পর্যন্ত বলেছে। অথচ পরে সিবিএসই স্বীকার করেছে ভুলটা তাদেরই। এ অভিযোগ বেদান্তের একার নয়, এমন আরও বহু অভিযোগই এখন সামনে আসছে। ছাত্র-ছাত্রীরা উত্তরপত্র দেখতে চেয়ে আবেদন করায় সিবিএসই বোর্ড যে উত্তরপত্র আপলোড করেছে তাতে দেখা গেছে উত্তরপত্রের স্ক্যান ঝাপসা, হাতের লেখা অস্পষ্ট। ঠিকমতো স্ক্যান না হওয়ায় উত্তরপত্রের বহু অংশই স্ক্রিনের বাইরে থেকে গেছে। বহু ক্ষেত্রে প্রশ্নে নম্বরই দেয়নি যন্ত্রব্যবস্থা। কম্পিউটারে যে উত্তর দেওয়া আছে তার থেকে সামান্য অন্য ভাবে কিছু লিখলেও শূন্য দিয়েছে তারা। ফলে প্রশ্ন উঠছে যখন সম্পূর্ণ মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি ওএসএম বা অনস্ক্রিন মার্কিং সিস্টেমে সম্পন্ন হয়েছে তখন ঠিকমতো স্ক্যান না হওয়া উত্তরপত্রের ভিত্তিতে একজন পরীক্ষার্থীর যথাযথ মূল্যায়ন কী ভাবে সম্ভব? প্রশ্ন উঠছে সদ্য শুরু হওয়া এই ওএসএম পদ্ধতিটি নিয়ে।
ঠিক কেমন এই ওএসএম পদ্ধতি? একজন ছাত্র বা ছাত্রী পরীক্ষার হলে বসে কাগজ কলম নিয়ে উত্তরপত্রে পরীক্ষা দিল। তারপর সেই উত্তরপত্রগুলি সিবিএসই বোর্ড তুলে দিল ‘কোয়েম্পট এডুটেক প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের এক সংস্থার হাতে। তারা উত্তরপত্রগুলিকে ডিজিটাল মাধ্যমে নিয়ে এল। তারপর সেই উত্তরপত্র ডিজিটালি পৌঁছে দেওয়া হল পরীক্ষকদের কাছে। তাঁরা অনস্ক্রিন নম্বর দিলেন। সিবিএসই বোর্ড তার ভিত্তিতে ফল প্রকাশ করল। প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্নের ডিজিটাল ইন্ডিয়ার জন্য নিশ্চিত এ এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু দেশ জুড়ে লক্ষ লক্ষ কিশোর-কিশোরীর স্বপ্ন, আশা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে যে মানসিক জগতের বিকাশ তা যে এক ধাক্কায় এলোমেলো হয়ে গেল, সিবিএসই কর্তৃপক্ষ এ ক্ষতি কী ভাবে পূরণ করবে? এ ক্ষেত্রে সিবিএসই কর্তৃপক্ষের কাছে প্রধান বিবেচনার বিষয় হয়েছে– কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের ডিজিটাল ইন্ডিয়ার অ্যাজেন্ডা।১৮ লক্ষ পরীক্ষার্থীর উত্তরপত্রের যথাযথ মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের তাগিদ তাদের কাছে গৌণই।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান উপায়ান্তর না দেখে দায় স্বীকার করেছেন। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস, সিবিএসই ফলাফল বিপর্যয় ইত্যাদি পরের পর ঘটনায় তাঁর দায় স্বীকার দেখে প্রশ্ন উঠছে, কেবলমাত্র দায় স্বীকারের মধ্য দিয়ে তিনি কি শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক অব্যবস্থা, বড়সড় কোনও গলদ, কোনও দুর্নীতিকে আড়াল করতে চাইছেন?
কাগজ-কলমের উত্তরপত্রকে ওএসএম পদ্ধতিতে নিয়ে আসার জন্য ‘কোয়েম্পট এডুটেক প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে যে সংস্থাটিকে বরাত দেওয়া হয়েছিল। চুক্তিবদ্ধ হওয়ার আগে অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কি কর্তৃপক্ষ খতিয়ে দেখেছিল? ২০১৯-এ ‘তেলেঙ্গানা বোর্ড অফ ইন্টারমিডিয়েট এডুকেশন’ দ্বাদশ শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষা পরিচালনায় ডেটা প্রসেসিং-এর দায়িত্ব দিয়েছিল এই সংস্থাটিকে। তখন এর নাম ছিল ‘গ্লোবারেনা টেকনোলজিস প্রাইভেট লিমিটেড’। সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ভাবে ব্যর্থ হয়েছিল সংস্থাটি। তিন লক্ষ ছাত্রছাত্রীর ব্যাপক ফলাফল বিপর্যয় ও এক সপ্তাহে ১৮ জন ছাত্রছাত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় চাপে পড়ে তেলেঙ্গানা বোর্ড বাধ্য হয় সংস্থাটির সঙ্গে সমস্ত চুক্তি বাতিল করতে। তা হলে এমন একটি অদক্ষ সংস্থার সঙ্গে কেন্দ্রীয় বোর্ড সিবিএসই কী ভাবে চুক্তিবদ্ধ হতে পারল? যে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে কোয়েম্পটকে নির্বাচন করা হয়েছে সেখানে সর্বনিম্ন দরের ডাক দিয়েছিল সংস্থাটি। উত্তরপত্র পিছু পঁচিশ টাকা ধার্য করেছিল তারা। যদিও অন্য সংস্থাগুলির উত্তরপত্র পিছু নূ্যনতম ধার্য ছিল ষাট টাকা। এই বিরাট পার্থক্যের কারণ কী? কেনই বা ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের গুণমাণের প্রশ্নে আপস করা হল? এ সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোনও দায় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী অনুভব করলেন না।
ওএসএম পদ্ধতিটি চালু করতে গেলে যতটা সময় ও নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রয়োজন ছিল সে বিষয়েও বোর্ডের কোনও পরিকল্পনা ছিল না। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা জানিয়েছেন ওএসএম পদ্ধতিতে যে এ বার উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে হবে, তা পরীক্ষা শুরুর মাত্র এক মাস আগে তাঁরা জানতে পেরেছেন। এই শিক্ষকদের মতে অন্তত ছয় মাসের প্রশিক্ষণ এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল। বাস্তবে প্রশিক্ষণ হয়েছে মাত্র ৪৫ মিনিটের। ফল বেরোনোর দিন দশেক আগেও নতুন পদ্ধতিতে খাতা দেখতে পারেননি এমন শিক্ষকদের কাছ থেকে খাতা আসা শুরু হয়– যাঁরা ইতিমধ্যেই বহু খাতা দেখার চাপে রয়েছেন– তাঁদের কাছে। কাজেই উপযুক্ত মূল্যায়ন, নম্বর বোর্ডের কাছে জমা দেওয়ার আগে স্ক্রুটিনি করা সম্ভবই হয়নি। ওএসএম পদ্ধতি চালু করার এত কিসের তাড়া ছিল কেন্দ্রীয় বোর্ডের? কী ক্ষতি হত পুরনো পদ্ধতিতেই মূল্যায়ন হলে?
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী দায় স্বীকার করলেন, কিন্তু তাড়াহুড়ো করে যে কোনও ভাবে ওএসএম পদ্ধতি চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কোনও কারণ দর্শালেন না। একবারও বললেন না, মূল্যায়ন ব্যবস্থার পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল পরিকল্পনাহীন ও অবৈজ্ঞানিক। কেবল মুখে দায় স্বীকার করলে চলবে? শুধুমাত্র ‘প্রযুক্তিগত সমস্যা’, ‘অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে’, ‘কোনও ছাত্রছাত্রী বঞ্চিত হবে না’ এমন বলতে হয় বলা কিছু কথায় তারুণ্যের প্রারম্ভে তীব্র মানসিক সংকটের মধ্যে পড়া ছাত্রছাত্রীদের সমস্যার গভীরে ঢোকা যাবে? অবশ্য তার দায়ও নেই ওই নেতা-মন্ত্রী ও তাঁদের অনুগামীদের। যারা বেদান্তকে পাকিস্তানী, দেশদ্রোহী বলেছে, সেই রাজনীতির ধারক বাহকদের হাতেই আজ দেশের শাসনভার, শিক্ষাব্যবস্থা। শুধু প্রযুক্তিগত ত্রুটিই নয়, শিক্ষাকে কর্পোরেট হাতে তুলে দেওয়ার একটা পদক্ষেপ ছিল সিবিএসই-র এই নতুন ব্যবস্থা। এটা বিজেপি সরকারের শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণেরই একটা ধাপ। তাই শিক্ষাব্যবস্থার সর্বাঙ্গীন বিকাশের জন্য জনকণ্ঠকে সোচ্চার রাখা প্রয়োজন। প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের। না হলে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার মাধ্যম শিক্ষাব্যবস্থাকে এইসব অব্যবস্থার মধ্য দিয়ে একদিন একেবারে ধূলিসাৎ করে দেবে এই শাসকেরা।
তীব্র ধিক্কার এআইডিএসও-র
এআইডিএসও-র সাধারণ সম্পাদক শিবাশিস প্রহরাজ ২৯ মে এক বিবৃতিতে দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষার ফলাফলে বিপুল কারচুপি, চূড়ান্ত হয়রানি ও পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের দ্বারা ছাত্রছাত্রীদের ভোগান্তির মুখে ফেলার জন্য সিবিএসই-কর্তৃপক্ষকে তীব্র ধিক্কার জানান। তিনি বলেন, সদ্য শুরু হওয়া ‘অন স্ক্রিন মার্কিং’ (ওএসএম) ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থার অবৈজ্ঞানিক ও বেপরোয়া ব্যবহারের কারণে আজ লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়েছে।
এটা শুধুমাত্র একটা প্রযুক্তিগত ত্রুটি নয় বরং সমগ্র ছাত্রসমাজের শিক্ষাজীবনের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ। সব মিলিয়ে সামগ্রিক কাঠামো ভেঙে পড়া ও মূল্যায়নের প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির সম্ভাবনা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। যথার্থ পরিকাঠামো না গড়ে তুলে, শিক্ষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ না দিয়ে এবং প্রয়োজনীয় ট্রায়াল না করে জোর করে ডিজিটাল মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চাপিয়ে দেওয়ার ফলে আজকে সমগ্র পরীক্ষা ব্যবস্থাটাই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়েছে।
ছাত্রছাত্রীদের কঠোর পরিশ্রমকে সিবিএসই ডিজিটাল স্বেচ্ছাচারে পর্যবসিত করেছে। সংগঠন দাবি জানিয়েছে– ১) প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্র ছাত্রীদের জন্য অবিলম্বে বিনামূল্যে হাতে-কলমে উত্তরপত্রের পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে, ২) ওএমএস ব্যবস্থা ও উত্তরপত্রের মূল্যায়নে দুর্নীতির অভিযোগের বিচারবিভাগীয় তদন্ত করতে হবে, ৩) ডিজিটাল মূল্যায়ন ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা যতদিন প্রমাণিত না হচ্ছে ততদিন তা স্থগিত রাখতে হবে, ৪) যে সকল সরকারি আধিকারিক ও বেসরকারি গোষ্ঠী এই বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী তাদের কঠোরতম শাস্তি দিতে হবে।