
জ্ঞান কী? শ্রেণি-সমাজের উদ্ভবের পর থেকে পৃথিবীতে মাত্র দুই ধরনের জ্ঞান রয়েছে, উৎপাদনের জন্য সংগ্রামের জ্ঞান এবং শ্রেণি-সংগ্রামের জ্ঞান। প্রাকৃতিক বিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে এই দুধরনের জ্ঞানের নির্যাসস্বরূপ এবং দর্শন হচ্ছে প্রকৃতি সম্পর্কিত জ্ঞান এবং সমাজ সম্পর্কিত জ্ঞানের সামান্যীকরণ ও সারসংক্ষেপন। অন্য কোনও ধরনের জ্ঞান আছে কি? না, নেই। এখন সমাজের বাস্তব কার্যকলাপ থেকে সম্পূর্ণ ভাবে বিচ্ছিন্ন এমন স্কুলে শিক্ষা-লাভ করে এসেছে সে রকম কিছু ছাত্রদের দিকে লক্ষ করা যাক। তাদের ক্ষেত্রে আমরা কী দেখছি? এ ধরনের একটি প্রাথমিক স্কুল থেকে একই রকমের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত গিয়ে গ্র্যাজুয়েট হয়ে যখন একজন লোক বেরিয়ে আসেন, তাঁকে তখন বেশ খানিকটা জ্ঞানের অধিকারী বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু তাঁর যা আছে তা নিছক পুঁথিগত বিদ্যামাত্র। তিনি এখনও কোনও বাস্তব কাজকর্মে অংশগ্রহণ করেননি অথবা যা শিখেছেন জীবনের কোনও ক্ষেত্রে তাকে প্রয়োগ করেননি। এ রকম একজন ব্যক্তিকে কি যথার্থ বিকশিত বুদ্ধিজীবী বলে গণ্য করা চলে? আমার তো মনে হয় তা গণ্য করা যায় না, কারণ তাঁর জ্ঞান তখনও অসম্পূর্ণ। আপেক্ষিক বিচারে সম্পূর্ণ জ্ঞান তা হলে কোনটি? আপেক্ষিক ভাবে সকল সম্পূর্ণ জ্ঞানই দুটো স্তরে বিকাশলাভ করে। প্রথম স্তরটা হচ্ছে প্রত্যক্ষলব্ধ জ্ঞান এবং দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রথমটিরই উচ্চতর স্তরের বিকশিত রূপ। ছাত্রদের পুঁথিগত জ্ঞান তা হলে কোন ধরনের জ্ঞান? যদি ধরেও নেওয়া হয় যে তাদের সকল জ্ঞানই যথার্থ জ্ঞান, তা কিন্তু তাদের নিজেদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অর্জিত জ্ঞান নয়, বরং তা হচ্ছে পূর্বসুরীদের কাজ থেকে উৎপাদনের জন্য সংগ্রাম ও শ্রেণি-সংগ্রামের অভিজ্ঞতার যে-সারসংক্ষেপ সন্নিবদ্ধ তত্ত্ব হিসেবে তাদের কাছে এসেছে সেইটুকু মাত্র। এটা একান্ত ভাবে প্রয়োজন যে ছাত্ররা এ ধরনের জ্ঞান যথেষ্ট আয়ত্ত করবে ঠিকই কিন্তু এটাও বুঝতে হবে যে একটা অর্থে তাদের ক্ষেত্রে এই জ্ঞান একপেশে, তা হচ্ছে এমন একটা বিষয় যা অন্যরা প্রয়োগ করেছে কিন্তু তারা নিজেরা এখনও তা প্রয়োগ করেনি। সবচেয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হচ্ছে এই জ্ঞানকে জীবনে ও বাস্তবে প্রয়োগের ক্ষেত্রে দক্ষ হতে হবে। সুতরাং, যাঁদের শুধু পুঁথিগত বিদ্যা রয়েছে কিন্তু যারা এখনও বাস্তবতার সংস্পর্শে আসেননি এবং যাঁদের অতি অল্প বাস্তব অভিজ্ঞতাই রয়েছে তাঁদের আমি এই পরামর্শই দিচ্ছি যে, তাঁরা তাঁদের নিজেদের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবহিত হোন এবং আরও একটু বিনয়-নম্র হোন।
যাঁদের শুধু পুঁথিগত বিদ্যা আছে তাঁদের কী ভাবে যথার্থ অর্থেই বুদ্ধিজীবীতে পরিণত করা যায়? তার একমাত্র পথ হচ্ছে তাঁদের বাস্তব কাজকর্মে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের কর্মী করে তোলা, যাঁরা তত্ত্বগত কাজকর্মে লিপ্ত আছেন তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব সমস্যাসমূহের অধ্যয়নে নিযুক্ত করা। এ ভাবে আমাদের লক্ষ্যে উপনীত হওয়া সম্ভব।
আমি যা বললাম তাতে অনেকেই সম্ভবত ক্রুদ্ধ হয়ে উঠবেন। তাঁরা বলবেন, ‘আপনার ব্যাখ্যা অনুসারে এমনকি মার্ক্সকেও তো বুদ্ধিজীবী বলে গণ্য করা যাবে না।’ আমি বলছি, তাঁদের কথা ঠিক নয়। মার্ক্স বাস্তব বৈপ্লবিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং বৈপ্লবিক তত্ত্বও সৃষ্টি করেছিলেন। পুঁজিবাদের সরলতম উপাদান থেকে শুরু করে তিনি পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামোর সুগভীর অধ্যয়ন করেছিলেন। মানুষ প্রতিদিন পণ্যাদি দেখেছেন ও ব্যবহার করেছেন এবং তা তাঁদের এত কাছের জিনিস ছিল যে তাকে তাঁরা লক্ষই করেননি। একমাত্র মার্ক্সই পণ্যকে বৈজ্ঞানিক ভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। তাদের প্রকৃত বিকাশের ক্ষেত্রে তিনি বিপুল গবেষণা পরিচালনা করেন এবং সর্বত্র বিরাজমান সেই বাস্তবতা থেকে যথার্থ বৈজ্ঞানিক তত্ত্বে উপনীত হয়েছিলেন। তিনি প্রকৃতি, ইতিহাস ও প্রলেতারীয় বিপ্লবকে অধ্যয়ন করেছেন এবং দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও প্রলেতারীয় বিপ্লবের তত্ত্ব সৃষ্টি করেছেন। এভাবে মার্ক্স মানুষের জ্ঞানের চরম উৎকর্ষের প্রতিভূস্থানীয় সবচেয়ে পরিপূর্ণ বিকশিত একজন বুদ্ধিজীবী হয়ে উঠেছিলেন। যাদের শুধুমাত্র পুঁথিগত বিদ্যা রয়েছে তাদের থেকে তিনি ছিলেন মূলত ভিন্ন রকমের। বাস্তব সংগ্রামের সূত্র ধরে মার্ক্স আনুপূর্বিক তথ্যানুসন্ধান ও অধ্যয়ন করেছিলেন, সাধারণ সূত্র নিরূপণ করেছিলেন এবং তারপর তাঁর সিদ্ধান্তগুলিকে বাস্তব সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচাই করেছিলেন– একেই আমরা বলেছি তত্ত্বগত কার্যকলাপ। কী ভাবে এ ধরনের কাজ করতে হয় তা শিখেছেন এমন বিরাট সংখ্যক কমরেডের প্রয়োজন আমাদের পার্টির রয়েছে। আমাদের পার্টিতে এমন বহু কমরেড রয়েছেন যাঁরা এ ধরনের তত্ত্বগত গবেষণার কাজ করতে শিখতে পারেন। তাঁদের অধিকাংশই বুদ্ধিমান ও প্রতিশ্রুতিসম্পন্ন এবং তাঁদের আমাদের মর্যাদা দেওয়া কর্তব্য। কিন্তু তাঁদের সঠিক নীতি অনুসরণ করা চাই এবং অতীতের ভুলভ্রান্তির পুনরাবৃত্তি করা তাঁদের চলবে না। গোঁড়ামি তাঁদের বর্জন করতে হবে এবং পুস্তকের তৈরি করা বাক্যজালের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখা তাঁদের চলবে না।
(পার্টির কাজের ধারা সংশোধন করুন,১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪২-এর ভাষণ)