
জিএসটি-র হারে সংস্কার দেশের মানুষের জন্য কী বিরাট সুবিধা নিয়ে এসেছে, তার বিজ্ঞাপনে ছয়লাপ গোটা দেশ। টিভি-খবরের কাগজ, রাস্তাঘাট, রেল কিংবা মেট্রো স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, পেট্রল পাম্প– সর্বত্রই নরেন্দ্র মোদিজির হাসিমুখ ঝলমল করছে। বিজ্ঞাপনে দেশবাসীকে তিনি আশ্বাস দিচ্ছেন– ২২ সেপ্টেম্বর জিএসটি-২ চালু হওয়া মাত্র নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অনেকটা কমে যাবে। কারণ, আগেকার চারটি স্তরের বদলে এখন থেকে বেশিরভাগ পণ্যে ৫ কিংবা ১৮ শতাংশ হারে জিএসটি নেওয়া হবে। কেবল কয়েকটা নেশা সৃষ্টিকারী পণ্যে বসবে ৪০ শতাংশ জিএসটি। মোদিজি আশ্বাস দিয়েছেন বিজ্ঞাপনে– জিএসটি-র নতুন হারে মানুষের খরচ কমবে, সঞ্চয় করার মতো টাকা থাকবে হাতে। বিক্রিবাটা বাড়বে। ফলে অর্থনৈতিক বৃদ্ধিও ত্বরান্বিত হবে।
জিনিসপত্রের অতিরিক্ত চড়া দামে বিপর্যস্ত মানুষ বিজ্ঞাপন দেখে একটু আশ্বস্ত হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন, এতদিনে হয়তো বা সুদিন আসছে জীবনে। কিন্তু কোথায় কী! বাজারে কেনাকাটা করতে গিয়ে তো জিএসটি কমার কোনও চিহ্নই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না! এ দিকে বেশ কয়েকটি রাজ্যে ভোট আসন্ন। সে দিকে তাকিয়ে জিএসটি সংস্কারকে মোদি সরকারের বিরাট একটা জনদরদি পদক্ষেপ হিসেবে দেখিয়ে ব্যাপক প্রচারে মন দিয়েছে বিজেপি তথা কেন্দ্রীয় সরকার।
দিল্লিতে তারা গত ১৮ অক্টোবর ‘জিএসটি বচত উৎসব’ নামে একটি যৌথ সম্মেলনও করে ফেলেছে। সেখানে উপস্থিত কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী এবং রেল ও সম্প্রচার মন্ত্রী জিএসটি সংস্কার দেশের অর্থনীতির কী বিপুল অগ্রগতি ঘটাতে শুরু করেছে, তার ঢাক পিটিয়েছেন। মোদিজির সুরে সুর মিলিয়ে তাঁরাও বলেছেন, নিত্যপণ্যের দাম কমায় চাহিদা অনেকখানি বাড়বে। যার প্রতিফলন দেখা যাবে ২০২৫-২৬-এর জিডিপি অর্থাৎ মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদনে। জানিয়েছেন, ‘‘৫৪টি পণ্যের উপর কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। এমন একটি পণ্যও নেই যেখানে জিএসটি কমার সুবিধা ক্রেতার কাছে পৌঁছচ্ছে না।’’ যদিও এ প্রশ্নের উত্তর মন্ত্রীরা একবারও দিচ্ছেন না যে, মূল্যবৃদ্ধির বোঝায় ইতিমধ্যেই হাঁসফাঁস করতে থাকা সাধারণ মানুষের ঘাড়ে জিএসটি-র বিপুল বোঝা তাঁরা চাপিয়েছিলেন কেন। তা ছাড়া কবে জিডিপি বাড়বে, বাড়লেও রামা কৈবর্ত্য-রহিম শেখদের তাতে কী সুবিধা হবে, তা তাঁদের নিজেদেরও জানা নেই।
মন্ত্রীদের দাবি যদি সঠিক হয়, তা হলে দাম কমার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন না কেন? ২৭ হাজার মানুষের সঙ্গে কথা বলে সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা রিপোর্ট জানাচ্ছে, জিএসটি কমার প্রভাব পড়েছে কেবলমাত্র গাড়ি আর ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যে। বাকি সবকিছু– যেমন খাবার, ওষুধ এবং দৈনন্দিন ব্যবহারের নানা জিনিসপত্র– সমস্ত কিছুতেই সরকারের দাবির সঙ্গে বাস্তবের বহু যোজন ফারাক। সমীক্ষাটি যাঁদের নিয়ে করা হয়েছে, গ্রাম ও শহরের সেইসব মানুষের় প্রায় ৫০ শতাংশই জানিয়েছেন, জিএসটি কমায় তাঁদের ব্যবহার্য কোনও জিনিসেরই দাম কমেনি। ওষুধের ক্ষেত্রে সামান্য দাম কমার কথা জানিয়েছেন মাত্র ২৪ শতাংশ। আর ৬০ শতাংশের বেশি মানুষ জানিয়েছেন, জিএসটি কমায় ওষুধের দাম কমেনি।
আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাও সমীক্ষা রিপোর্টের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়, যেখানে খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ সহ নিত্যব্যবহার্য পণ্যে দাম কমার কোনও লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। জিএসটি সংস্কার মানুষের জন্য বিপুল সুফল বয়ে আনবে বলে মোদি সরকার যতই গলা ফাটাক, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ খেটে খাওয়া মানুষ বাজার থেকে কেজি দরে যে চাল, ডাল, আটা, ময়দা কেনেন, জিএসটি সংস্কারে সে সবের উপর কোনও প্রভাব পড়ার কথাই নয়। একমাত্র প্যাকেটবন্দি চাল, ডাল, আটার মতো খাদ্যপণ্য, ঘি-মাখন সহ দু*জাত পণ্যের দাম এর ফলে কমতে পারে। কমার কথা কিছু ওষুধের দাম এবং বিমার প্রিমিয়াম। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় যে দেশের ৮০ ভাগ মানুষের, তাঁরা কে আর কবে প্যাকেটবন্দি চালের ভাত খান! স্বাস্থ্যবিমা বা জীবনবিমার নামই বা শুনেছেন তাঁদের ক’জন! ফলে জিএসটি-র হার কমিয়ে তাঁদের দুর্দশা জর্জরিত জীবনে কোনও সুরাহা আনা যাবে না। সেই উদ্দেশ্যও মোদি সরকারের নেই। তাঁদের লক্ষ্য– ভোটের প্রচারে নজর কাড়া। পাশাপাশি, বহির্বাণিজ্যে শুল্কের ধাক্কা খেয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারকে একটু চাঙ্গা করার চেষ্টা করা।
আরও একটি বিষয় লক্ষ করা যাচ্ছে। জিএসটি-২ চালু হওয়ার পর এতগুলি দিন পার হয়ে গেলেও ব্যবসায়ীরা অনেকেই এখনও পুরনো দামেই জিনিসপত্র বেচে চলেছেন। আসলে ঠিক যেমন করে উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে না তুলেই মোদি সরকার ২০১৬ সালে জিএসটি চালু করে দিয়েছিল, এ বারেও সেই চিত্রের কোনও পরিবর্তন হল না। উৎপাদক, পরিবেশক এবং খুচরো ব্যবসায়ীদের মধ্যে উপযুক্ত সময়ে তৈরি না করেই নিজেদের জনদরদি ভাবমূর্তি প্রচারের উদগ্র বাসনায় এ বারও মোদি সরকার তড়িঘড়ি জিএসটি সংস্কার চালু করে দিল। এতে মানুষের উপকার হোক আর না-ই হোক, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, জিডিপি বৃদ্ধির ঢাক পেটানোর সুযোগ তো মিলবে! তা ছাড়া জিএসটি কমার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন কি না, তা দেখার জন্য কোনও প্রশাসনিক ব্যবস্থাও মোদি সরকার করেনি, ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছার উপরেই পুরোটা ছেড়ে রাখা আছে। একে সরকারি অপদার্থতা, না কি পুঁজিপতি-ব্যবসায়ীদের জন্য লুটের ব্যবস্থা করে দেওয়া– কী বলা যাবে?
অন্যান্য পুঁজিবাদী দেশের মতো ভারতের অর্থনীতিও চাহিদার অভাবে ধুঁকছে। ভয়াবহ বেকার সমস্যা, ব্যাপক ছাঁটাই, দফতরে দফতরে ফাঁকা পড়ে থাকা শূন্য পদ, কম মজুরি ও কাজ টিকে থাকার অনিশ্চয়তায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হাতে নিতান্ত প্রয়োজনটুকুর বাইরে কেনাকাটার টাকাই নেই। এই অবস্থায় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে জিএসটি কমিয়ে দেশের যে ছোট অংশটির হাতে খরচ করার মতো টাকা আছে, তাদের কেনাকাটা খানিকটা হলেও বাড়ানোর চেষ্টা করেছে কেন্দ্রের মোদি সরকার। সঙ্গে রয়েছে ভোটের বাজারে ‘জনদরদি’ ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার মরিয়া চেষ্টা। ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ খেটে খাওয়া মানুষের জিএসটি কমার সুফল বুঝতে জিডিপি বাড়ল কি বাড়ল না, সে দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া গতি নেই।