
বিজেপি নেতারা ক্ষমতার গদিতে বসেই রাজ্যের গরিব মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। বুলডোজার হাঁকিয়ে একের পর এক রেল স্টেশনে হকার এবং বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ করা চলেছে। হকার তুলতে সাঁজোয়া গড়ি নামানো হয়েছে। গরিব মানুষ তাদের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে পরিবারের রুটি-রুজির জন্য যে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল তাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে কার উন্নয়নের এমন উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করতে চাইছে সরকার?
বাঁচার অধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার। স্বাভাবিক ভাবেই গরিব মানুষও সংঘবদ্ধ ভাবে সরকারের এই চরম অমানবিকতা ও বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তুলছে। সর্বত্রই দলমত নির্বিশেষে হকাররা জোট বেঁধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন। এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) এবং শ্রমিক সংগঠন এআইইউটিইউসি এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সরকারের এই উচ্ছেদ-ষড়যন্ত্রের সংবাদ পেয়েই দলের কর্মীরা, ট্রেড ইউনিয়নের কর্মীরা হকার ও বস্তিবাসীদের মধ্যে গিয়ে তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করে সভা, মিছিল, রাত পাহারা, অবরোধ গড়ে তুলছেন। এ ভাবেই বেশ কিছু স্টেশনে বুলডোজারের গতি রোধ করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছে উচ্ছেদ স্থগিত ঘোষণা করতে।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার জয়নগর-মজিলপুর স্টেশন এবং স্টেশন চত্বর থেকে ২০ মে রেল কর্তৃপক্ষ হকার উচ্ছেদের পরিকল্পনা করছে জানতে পেরে হকাররা এস ইউ সি আই (সি) নেতৃত্বের সাথে যোগাযোগ করেন। দলের কর্মীরা হকারদের ঐক্যবদ্ধ করে প্রতিরোধের প্রস্তুতি শুরু করেন। ২০ মে সকাল থেকে শুরু হয় হকার এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিশাল মিছিল। মিছিল প্ল্যাটফর্ম এবং সংলগ্ন এলাকা পরিক্রমা করে স্টেশন চত্বরে অবস্থান শুরু করে। আন্দোলনের তীব্রতা বুঝে স্টেশন মাস্টার ঘোষণা করতে বাধ্য হন, উচ্ছেদ আপাতত স্থগিত থাকছে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন কমরেড বিশ্বনাথ সরদার, কমরেড লক্ষ্মণ হালদার, কমরেড নুরনবী হালদার, কমরেড শেরিফ পৈলান প্রমুখ। মথুরাপুর স্টেশনে দলের কর্মী নাজিরা খাতুন, শ্যামল হালদারের নেতৃত্বে হকারদের ঐক্যবদ্ধ করে মিছিল, বিক্ষোভ, স্টেশন মাস্টারকে ডেপুটেশন প্রভৃতির মধ্যে দিয়ে উচ্ছেদ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে।
২৪ মে দক্ষিণ বারাসাতে উচ্ছেদ পরিকল্পনার কথা জানতে পেরেই কমরেড তমাল নন্দ, কমরেড দিব্যেন্দু মুখার্জী, কমরেড অরুন্ধতী প্রামাণিকের নেতৃত্বে স্টেশন চত্বরে প্রায় ১৫০ হকার এবং বস্তিবাসীর বিক্ষোভ সভা হয়। হকার ও বস্তিবাসী উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির উদ্যোগে দুশোর বেশি হকার ও বস্তিবাসী মিছিল করে আওয়াজ তোলেন, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ করা চলবে না। পরদিন আরও বড় মিছিল হয়। ২৬ মে দোকান বন্ধ রেখে হকার ও বস্তিবাসীরা আন্দোলনে যোগ দেন। স্টেশন ম্যানেজারকে ডেপুটেশন দেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষ রেল ও সাধারণ পুলিশের বিরাট বাহিনী উপস্থিত রাখলেও আন্দোলনকারীদের দৃঢ়তার সামনে পিছু হঠতে বাধ্য হয়। উচ্ছেদ স্থগিত ঘোষণা করা হয়। আন্দোলনে সওকাত লস্কর, শুভেন্দু মণ্ডল, বিপ্লব দাস, আসাদুল গাজি প্রমুখ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেন।
৩০ মে বালিগঞ্জ স্টেশনে দুপুর বারোটা নাগাদ আরপিএফ এবং জিআরপি স্টেশন মাস্টারের নেতৃত্বে হকার উচ্ছেদ করতে এলে হকার সংগঠনসহ এআইইউটিউসি এবং অন্যান্য কয়েকটি বামপন্থী হকার ইউনিয়ন প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এআইইউটিইউসি নেতা কমরেড শান্তি ঘোষের নেতৃত্বে হকাররা জানিয়ে দেন, হকারি আমাদের জীবিকা অর্জনের একমাত্র উপায়। প্রাণ থাকতে আমাদের সরানো যাবে না। প্রতিবাদের মুখে প্রশাসন হকার উচ্ছেদ স্থগিত রাখে।
উত্তর ২৪ পরগণার দমদম ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে ২৯ মে হকার উচ্ছেদ করা হবে বলে রেল দপ্তর নোটিস দেয়। প্রতিবাদে ২৬ মে সকাল থেকেই শুরু হয় হকার বিক্ষোভ। এ আই ইউ টি ইউ সি এবং ক্যান্টনমেন্ট যৌথ সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে মিছিল স্টেশন চত্বর পরিক্রমা করে। ২৮ মে রাতে এ আই ইউ টি ইউ সি সহ ক্যান্টনমেন্ট যৌথ সংগ্রাম কমিটি এবং এস ইউ সি আই (কমিউনিস্ট) এর আঞ্চলিক নেতৃত্ব হকারদের সঙ্গে নিয়ে রাত পাহারা দেয়। ২৯ মে দফায় দফায় পুলিশ বাহিনী স্টেশনে ঢুকতে থাকলে শুরু হয় হকারদের বিশাল বিক্ষোভ মিছিল। মিছিলের বিশালতা ও সংগ্রামী মেজাজ দেখে প্রশাসন পিছু হটে এবং আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। শেষ পর্যন্ত হকার উচ্ছেদ স্থগিত ঘোষণা করতে বাধ্য হয় তারা।
উত্তর ২৪ পরগণা জেলার মছলন্দপুর স্টেশনে হকারদের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন দলের জেলা কমিটির সদস্য কমরেড সুকুমার চক্রবর্তী, দলের সদস্য বিশিষ্ট শিল্পী ও দোকানদার ধীরাজ হাওলাদার প্রমুখ।
ওই জেলার বারাসাত স্টেশন ও সংলগ্ন এলাকায় হকার ও দোকান উচ্ছেদের প্রতিবাদে বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেন দলের জেলা কমিটির সদস্য কমরেড স্বপন দেবনাথ সহ অন্যান্য হকার নেতৃবৃন্দ।
শ্যামনগর স্টেশনে নাগরিক প্রতিরোধ মঞ্চের নেতৃত্বে বিক্ষোভে উপস্থিত ছিলেন ব্যারাকপুর সাংগঠনিক জেলা সম্পাদক প্রদীপ চৌধুরী, শ্যামনগর লোকাল কমিটির সম্পাদক প্রণব চৌধুরী সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
হকাররা বুঝেছেন, শাসন ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, তাঁদের উপর বারবার উচ্ছেদ-হামলা হয়েছে। শাসক শ্রেণির তাঁবেদার সরকারগুলির এমন আক্রমণ প্রতিরোধ করেই তাঁদের বাঁচতে হবে। এর জন্য গড়ে তুলতে হবে নিজেদের সংগ্রামী সংগঠন। আক্রমণের শ্রেণিচরিত্র বুঝতে হবে। চিনতে হবে প্রতিরোধের শক্তিকেও।