Breaking News

এস আই আরঃ নির্বাচন কমিশনকে যা-খুশি করার বিপজ্জনক ছাড়পত্র দিল সুপ্রিম কোর্ট

এসআইআর-এর সাংবিধানিক বৈধতা আছে কি না, তা নিয়ে ২৭ মে সর্বোচ্চ আদালত রায় দিয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, এসআইআর সাংবিধানিকভাবে বৈধ। তাতে মামলা মিটলেও বিতর্ক মেটেনি। এই রায়ে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব মেলেনি। এসআইআর প্রক্রিয়ার নানা স্তরে যে সব নাম বাতিল হয়েছে, সে সম্পর্কে যা নির্দেশ এই রায়ে দেওয়া হয়েছে তা আরও বহু নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

জনগণের মনে এবং বিরোধী দলগুলির কাছে এসআইআর-এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তো ছিলই, কিন্তু তার সাথে প্রশ্ন ছিল– নির্বাচন কমিশন বহু বছর ধরে ভোটার তালিকার সংক্ষিপ্ত বা নিবিড় সংশোধন করা সত্ত্বেও এতদিন কোনও আপত্তি ওঠেনি, অথচ এবারে কেন আপত্তি এত প্রবল? প্রশ্ন ছিল, ভোটার তালিকার যে নিবিড় সংশোধন করতে দীর্ঘ সময় দরকার, সেখানে কেন এত তাড়াহুড়ো? বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এ সবচেয়ে বড় আপত্তি ছিল এর প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি নিয়ে। শুধু তাই নয়, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র মতো নতুন এক পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়েছিল যা আগে জানানো হয়নি। সেটাই বা কেন? এ সব কোনও প্রশ্নের উত্তর ও ব্যাখ্যা না দিয়েই সর্বোচ্চ আদালত এসআইআর-কে বৈধতা দিল। এর দ্বারা জনগণের মনে ওঠা প্রশ্নগুলি আইনগত ভাবে চাপা দেওয়া হলেও জনমন থেকে তা মুছে গেল কি? তা যদি না যায়, তবে বলতে হয় এর দ্বারা মহামান্য বিচারপতিরা সর্বোচ্চ আদালতের গরিমা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে সুপ্রিম কোর্টে সওয়াল করেছিলেন– এসআইআর করার এক্তিয়ার তাঁদের রয়েছে। অনুচ্ছেদ উল্লেখ করে এক্তিয়ারের কথা যখন বলা হল তখন দেখা যাক সেই অনুচ্ছেদে কী লেখা রয়েছে। লেখা রয়েছে– ‘‘The election to the House of the People and to the Legislative Assembly of every State shall be on the basis of adult suffrage; that is to say, every person who is a citizen of India and who is not less than [eighteen years] of age on such date as may be fixed in that behalf by or under any law made by the appropriate legislature and is not otherwise disqualified under this Constitution or any law made by the appropriate legislature on the ground of non-residence, unsoundness of mind, crime or corruption or illegal practice, shall be entitled to be registered as a voter at any such election.’’  অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ভোটার তালিকার এলাকায় যাঁরা বসবাস করেন না, মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ, অপরাধ বা দুর্নীতি বা অনৈতিক কার্যকলাপ করার কারণে ভোটার তালিকা থেকে বাতিল হওয়ার মতো, তাদের বাদ দিয়ে, প্রতিটি ভারতীয় নাগরিক, যাঁদের ১৮ বছর বয়স হয়েছে, তাঁরা ভোটদাতা রূপে নথিভুক্ত হওয়ার অধিকারী।

বাস্তবে কি এসআইআর-এর নাম করে নির্বাচন কমিশন এই কাজটি করেছে? সংবিধানের এই অনুচ্ছেদটি কি লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নাম করে ব্যাপক হারে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার অধিকার নির্বাচন কমিশনকে দিয়েছে? যে মহামান্য বিচারকরা রায় দিলেন, তাঁদেরই একজন তো বলেছিলেন, ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ কথাটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর! আন্ডার অ্যাডজুডিকেশনে যে ২৭ লক্ষাধিক নাম বাদ দেওয়া হল, ৩২৬ অনুচ্ছেদের উল্লেখ অনুযায়ী তাঁরা মানসিকভাবে অপ্রকৃতিস্থ, অপরাধী, দুষ্কৃতী, দুর্নীতিগ্রস্ত বা অবৈধ কারবারির কোনটি? যদি তা না হয়, তা হলে তাদের নাম বাদ দেওয়া হল কেন?

প্রশ্ন হল, এসআইআর-এর চক্করে ফেলে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের নামের ফয়সালা না করে অর্থাৎ বাস্তবে ভোটার তালিকা চূড়ান্ত না করে নির্বাচনের সূচি ঘোষণা করে দেওয়ার আইনি অধিকার নির্বাচন কমিশনকে কোথায় দেওয়া হয়েছে?

এতদিন পর্যন্ত কোনও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকেই ফলাও করে বলতে হয়নি, ‘কোনও বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকার বাইরে থাকবে না।’ কারণ ওটা সকলের জানা কথা, ওটাই নির্বাচন কমিশনের কাজ। কিন্তু বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার কাজের বেলায় উল্টো কাজটি করে খুব ঘন ঘন ওই কথাটি আউড়েছেন। আর সেটা বলতে বলতেই ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোটার তালিকা প্রকাশ করে তিনি ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ভোটারের নাম বাদ দিয়েছেন। এই নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের আপত্তি জানাতে ট্রাইবুনালে যেতে হয়েছে। দেখা গেল, ট্রাইবুনাল প্রথম দফার ভোটের আগে ১৪৭ জনের নিষ্পত্তি করেছে, তাতে ১৩৯ জন বৈধ ভোটার এবং আট জন সন্দেহজনক। দ্বিতীয় দফায় ১৪৭৪ জনের মধ্যে ১৪৬৮ জন বৈধ ভোটার, ৬ জন সন্দেহজনক। তাহলে ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার জনে কতজন বৈধ হতে পারে তা অনুমান করা যেতে পারে। নির্বাচন কমিশন এই লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম বাদ দিয়েছে, আর মুখে বলেছে ‘কোনও বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকার বাইরে থাকবে না।’ সংসদীয় গণতন্ত্রের এত বড় একটা অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে কোনও উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তা হলে যে এসআইআর লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেয়, তাকে কী করে ‘বৈধ’ বলা যায়?

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বলা হয়েছে– যাদের নাম এসআইআর-এর নানা স্তরে বাদ যাবে, চূড়ান্ত নাগরিকত্ব যাচাই করতে তাদের নামের তালিকা চার সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংস্থার কাছে পাঠাতে হবে। অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অধীন ফরেনার্স রেজিস্ট্রেশন অফিস ও ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসে তালিকা পাঠানোর পর নাম বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব যাচাই হবে। এ তো ঘুরপথে নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে এনআরসি-র কাজটি করিয়ে নেওয়া!

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে এসআইআর নিয়ে নির্বাচন কমিশন ছাড়পত্র পাওয়ায়, এই ছাড়পত্রের বলে বলীয়ান হয়ে এই নির্বাচন কমিশন ভবিষ্যতে আরও বেশি করে যা-খুশি করবে। কারণ ২০২৩ সালের বিজেপি সরকার দ্বারা সংশোধিত আইনে নির্বাচন কমিশনাররা যেহেতু প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মনোনীত আরেক জন ক্যাবিনেট মন্ত্রীর দ্বারাই নির্বাচিত, তাই প্রধানমন্ত্রীর কাছেই নির্বাচন কমিশন দায়বদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ কেন্দ্রের শাসকদলের অঙ্গুলিহেলনেই নির্বাচন কমিশন কাজ করবে। এই রায়ের সবচেয়ে বড় বিপদটা এখানেই।

এই কারণেই রায় যাই হোক না কেন, সমস্ত বৈধ ভোটারের নাম নির্বাচক তালিকায় তোলার জন্য যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ট্রাইবুনালের কাজ শেষ করার দাবি তুলেছে এস ইউ সি আই (সি)। ট্রাইবুনালে অ্যাডজুডিকেটেড ভোটারদের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়ে প্রধান বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর জন্য স্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করেছেন দলের কর্মীরা।