
শাসকের দীপ জ্বালাবার ফতোয়া মেনে শাসিত যে দীপ জ্বালে তাতে আঁধার কাটে না, বরং তা ঘন হয় আরও – এ সত্য আবার দেখিয়ে দিল কেন্দ্র এবং রাজ্যে রাজ্যে বিজেপি সরকার।
পরাধীন ভারতে ব্রিটেনের যুবরাজের ভারত আগমন উপলক্ষে এমনই এক সমারোহের ফতোয়ার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নজরুল ডাক দিয়েছিলেন – ‘কার তরে জ্বালো উৎসব দীপ? দীপ নেভাও। নর নারায়ণে ক’রে আঘাত আসিছে তাদের রাজকুমার, দীপ নেভাও’। সে দিন শাসকের ফতোয়া মেনে যে দীপ জ্বলেছিল তা ছিল ঘন কালো তমসার প্রতীক। আর সুভাষচন্দ্র বসুর মতো সংগ্রামীরা তা নিভিয়ে দিয়ে কোটি কোটি মানুষের মনে জ্বালিয়েছিলেন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার মুক্তি-যজ্ঞের আগুন।
আজ স্বাধীন ভারতে আবার ১৭ সেপ্টেম্বর স্কুল, কলেজ, সরকারি অফিস, রাস্তা, সেতু সহ সর্বত্র যে দীপ জ্বালানোর ফতোয়া দিল বিজেপি সরকার– তা সংখ্যায় যত লক্ষ, যত হাজারই হোক না কেন তার আলোয় জনজীবনে নেমে আসা সংকটের নিকষ কালো অন্ধকারের ছায়াটা হালকা হওয়ার বদলে যেন আরও ঘোর হয়ে চেপে বসল। প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে দেশে যত লক্ষ দীপ জ্বলুক, তাতে যত শত মণ তেলই পুড়ে থাকুক না কেন পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার ভূতনিতে, বিহারের জেলায় জেলায় বানভাসি হাজার হাজার মানুষের ঘরে সে দীপের আলো কোথায়? সারা দিন ধরে একটু ত্রাণ জোগাড় করতে গিয়ে প্রতিবেশীর সাথে কাড়াকাড়ি করার পর সে দিন সন্ধ্যার ঘন অন্ধকারে দেহে-মনে বিধ্বস্ত বানভাসি মানুষের অন্তরে তখন হৃদয়হীন প্রশাসনের প্রতি ধিক্কার, তাদের দীর্ঘশ্বাসে ভারী গোটা ভারতের বাতাস। প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের সমারোহে ‘আশীর্বাদ কি দিয়া’ জ্বালানোর ফরমান তীব্র বিদ্রুপের মতোই শুনিয়েছিল তাদের কানে। এ দীপ জ্বলার মাত্র তিন দিন আগে এমনই এক সন্ধ্যার অন্ধকারে রাজধানী দিল্লির স্বরূপনগরে গণধর্ষিতা ও নরপশুদের হাতে নিহত কিশোরীর মৃতদেহ খুবলে খেয়েছে পথকুকুরের দল। সেই গভীর অন্ধকারে এতটুকু আলো পৌঁছনোর সাধ্য কোথায় এ দীপের! মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে প্রদীপ জ্বলার সময় যে মুখগুলো ছিল অন্ধকারে, প্রদীপ নিভে যেতে সে মুখগুলোই একটু উজ্জ্বল হল। প্রদীপের পোড়া তেল বোতলে ভরতে পারাই সে দিন তাদের জন্য ‘আশীর্বাদ’– অভাবের সংসারে রাজবাড়ির উৎসবের উচ্ছিষ্টই যে সম্বল!
নরেন্দ্র মোদির জন্মদিন পালনে ‘আশীর্বাদ কি দিয়া’ জ্বালানোর নির্দেশ মানতে যে সব স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের বাধ্যতামূলক হাজিরা দিতে হয়েছে, বিজেপির ভোটের প্রতীক ‘পদ্ম’ তৈরি করে তার ছবি সরকারি পোর্টালে আপলোড করতে হয়েছে– তাদের স্কুলবাড়ির অবস্থা কেমন, মিড ডে মিলের নামমাত্র বরাদ্দে তাদের বাস্তবে কতটুকু খাবার জোটে, তাদের স্কুলে পর্যাপ্ত সংখ্যায় শিক্ষক এবং পরিকাঠামো আছে কি না এ সবের খোঁজ কে নিল? প্রদীপ জ্বালিয়ে কোন আশীর্বাদ পেল তারা? এ জন্যই একটি ভগ্নপ্রায় স্কুলবাড়ি জন্মদিনে মোদিজিকে ‘উপহার’ দিতে চেয়েছেন ছাত্র-যুবরা! এর পর আবার ১২ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে নরেন্দ্র মোদির গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রিত্ব এবং প্রধানমন্ত্রিত্বের ২৫ বছর পূর্তির ‘সেবা সংকল্প অভিযান’। নরেন্দ্র মোদিকে মহামানব বানানোর জন্য বিজেপির অভিযান চলছে অনেক দিন ধরেই। নরেন্দ্র মোদি নিজেই নিজেকে ‘নন বায়োলজিক্যাল’– কার্যত দৈব-সিদ্ধ মহাপুরুষ হিসাবে ঘোষণা করে চরম নির্লজ্জতার প্রমাণ রেখেছেন আগেই। কিন্তু সরকারি পরিকাঠামো ব্যবহার করে জনগণের পয়সায় এই বারের জন্মদিনের সমারোহ সব দিক থেকে নির্লজ্জতার সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
নরেন্দ্র মোদির শাসনকালে কেমন ‘সেবা’র নিদর্শন রখেছেন তিনি? গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ২০০২-এ গণহত্যা তাঁর সেবার অন্যতম নিদর্শন! যার ভয়াবহ স্মৃতি জাগিয়ে দিয়ে ২০২২-এ বিলকিস বানোর ওপর গণধর্ষণ চালানো ও একাধিক মানুষের নৃশংস হত্যাকারীদের ফুলের মালা পরিয়ে বরণ করার ‘সেবা’ ঘটেছে নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বেই। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বেই সমস্ত রেকর্ডছাপিয়ে যাওয়া বেকারত্বকে চাপা দিতে মিথ্যা পরিসংখ্যানের ‘সেবা’ দেখেছে মানুষ। ভয়াবহ মূল্যবৃদ্ধি, আর্থিক বৃদ্ধির মিথ্যা পরিসংখ্যান এ সব তো আছেই। আছে বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের ক্রমাগত তলিয়ে যাওয়া। দারিদ্রের নিরিখে সাহারা মরুভূমির আশেপাশের দেশগুলোর সাথে ভারতকে এক সারিতে দাঁড় করিয়েছে নরেন্দ্র মোদির শাসনকালই।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে গণতন্ত্রকে হত্যা করার নিত্য নতুন ‘সেবা’। ভারতের সংসদ বিগত বারো বছরে কোনও আলোচনা ছাড়াই আইন পাশের রেকর্ডের শীর্ষে পৌঁছে গেছে। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা, শিক্ষাক্ষেত্রের স্বাধীনতার তালিকায় ভারত নামতে নামতে একেবারে তলার দিকে পৌঁছে গেছে। নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে সমস্ত সাংবিধানিক সংস্থাকে দলের কুক্ষিগত করার রেকর্ডে নরেন্দ্র মোদি শাসন সকলের সেরা। এই ১২ বছরে ভারত দেখেছে কেমন করে সংবিধানের নামে শপথ নেওয়া প্রধানমন্ত্রী দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষকে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে বিদ্ধ করতে পারেন! কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার জোরে দেশ জুড়ে ঘৃণাভাষণ, গো-রক্ষার অজুহাতে মানুষকে পিটিয়ে মারার পরেও কোনও শাস্তি না হওয়ার পরিবেশ তো এই প্রধানমন্ত্রীই বানিয়েছেন। কর্পোরেট মালিকদের সেবায় তিন কৃষি আইন এনে নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বেই বিজেপি সরকার চেষ্টা করেছে কৃষকের সর্বনাশ করার। এই প্রধানমন্ত্রীই দিল্লি সীমান্তে সাতশোর বেশি প্রতিবাদী কৃষককে প্রাণ বলিদান করতে বাধ্য করেছেন। দেশের খনি, জ্বালানি তেলের ভাণ্ডার, জলসম্পদ, বনজ সম্পদ, বিমান পরিবহণ ইত্যাদি সমস্ত কিছু একচেটিয়া মালিকদের হাতে বেচে দেওয়ার কাজে সবচেয়ে এগিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সময়কাল। কোভিড মহামারির সুযোগে তৈরি ‘পিএম কেয়ার’ তহবিল প্রধানমন্ত্রী কার সেবায় লগিয়েছেন সে সত্য আজ মানুষ জানতে চায়। জানতে চায় নোট বাতিল করে সাধারণ মানুষকে মেরে তাঁর বিশেষ বন্ধুদের বিশেষ সেবার পর এখন কেন নতুন করে ডিজিটাল লেনদেনে কর বসাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী?
নরেন্দ্র মোদি তথা বিজেপি শাসনের দুঃসহ সেবার থেকে মুক্তি চেয়েই গত জুলাই মাসে দিল্লি থেকে শুরু হয়ে সারা ভারতে ফেটে পড়েছে ছাত্র-যুবদের আন্দোলন। সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই আজ সারা দেশের মানুষ প্রতিবাদ করছেন। বিজেপির আইটি সেলের তৈরি নরেন্দ্র মোদির ‘বিশ্বগুরু’ ‘মহামানব’ মূর্তির ফানুস আগেই ফেটে গেছে। তাঁর ভাবমূর্তি আজ দেশ জুড়ে মানুষের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের বিষয়। নরেন্দ্র মোদির এই ধিক্কার কুড়ানো ভাবমূর্তি মেরামত করার আশাতেই কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিজেপি সরকার এখন প্রদীপ জ্বালাচ্ছে, সেবা সংকল্প করছে।