
শোষণ-বঞ্চনা থাকলে আন্দোলনের ঝড় বারবার উঠবেই। ইতিহাসে যোগ্য ভূমিকা পালনের জন্য আন্দোলনের সৈনিকদের পাতা ওল্টাতে হয় অতীতের। শিক্ষা নিতে হয় ইতিহাস থেকে। গত সংখ্যায় আমরা দেখিয়েছি কী ভাবে ১৯৪২-এর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে সে সময়কার রাজনৈতিক দলগুলি জনগণের আকাঙক্ষার বিরুদ্ধে গিয়ে ব্রিটিশের সহায়ক ভূমিকা নিয়েছিল। দেশের জনসাধারণ কার্যত প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বের নির্দেশের তোয়াক্কা না করেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বাস্তবে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকার কারণ খুঁজতে হলে আমাদের তাকাতে হবে এই আন্দোলনের পূর্বে প্রায় আড়াই দশক ধরে কংগ্রেসের আপসকামী ভূমিকার দিকে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারকে কংগ্রেসের সাহায্যের হাত
১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের পর ভারতীয় জনগণের উপর এক বিরাট আক্রমণ হিসাবে নেমে আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ব্রিটিশ এই যুদ্ধের সমস্ত ব্যয়ভার চাপিয়ে দেয় ভারতীয় জনগণের উপর। হাজার হাজার ভারতীয়কে সেনা বাহিনীতে নিয়োগ করে বিশ্বের বিভিন্ন অংশের যুদ্ধ ফ্রন্টগুলিতে পাঠায় ব্রিটিশ। কংগ্রেসের জাতীয় নেতারা ঘোষণা করেন, তাঁরা যুদ্ধে সর্বাত্মক ভাবে সাহায্য করবেন। তাঁরা শাসকের প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেছিলেন যে, ব্রিটিশ যুদ্ধে জয়ী হলে কৃতজ্ঞতা হিসাবে ভারতকে স্বায়ত্ত শাসন দেবে এবং এমন ধরনের শাসনব্যবস্থা কায়েম করবে যাতে ভারতবাসীর স্বরাজ লাভের পথ সুগম হবে। ভারতীয় পুঁজিবাদ তত দিনে বিশ্বের প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিবাদের অংশ হিসাবে চরিত্রগত ভাবে প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে গেছে। তাই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা কংগ্রেস নেতারা ভাবতেই পারেননি। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং ভারতীয় পুঁজিপতিদের স্বার্থের যে বিরোধ ছিল সেই বিরোধের মীমাংসার পথ তাঁরা খুঁজেছিলেন সরকারের প্রতি তাঁদের বিশ্বস্ততা দেখিয়ে। যুদ্ধের সময় গান্ধীজি ভারতীয় কৃষকদের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘ফৌজে যুক্ত হয়ে ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে এসো’ (জাতীয় আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, অযোধ্যা সিংহ। গান্ধীজির আত্মজীবনী)।
যুদ্ধ শেষে স্বরাজের পরিবর্তে ব্রিটিশ কী দিয়েছিল ভারতবাসীকে? যুদ্ধে ভারতীয় পুঁজিপতিরা অনেক মুনাফা করেছিল। টাটারা বিদেশে রেললাইন ও নানা সরঞ্জামের বিপুল অর্ডার পেয়েছিল। কিন্তু জনগণ পেল– কুখ্যাত এবং বিনা বিচারে আটকের ফরমান রাওলাট আইন এবং জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস হত্যাকাণ্ড।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর দেশ জুড়ে আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি
এই প্রতারণার বিরুদ্ধে জ্বলে ওঠে সারা দেশ। জনগণ সর্বত্র নিজস্ব সংগঠন গড়ে তুলে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমে পড়ে। শ্রমিকরা বড় বড় ধর্মঘট সংগঠিত করে। কৃষকরা পাঞ্জাবে মহন্তদের বিরুদ্ধে অকালি আন্দোলনে নামে, মালাবারে মোপালা বিদ্রোহে নামে, উত্তরপ্রদেশে জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ভারতের জনগণের মধ্যে বিরাট অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করে। কংগ্রেস নেতৃত্ব বাধ্য হন ১৯২০-২১ এর অসহযোগ আন্দোলন ঘোষণা করতে। দেশের মানুষ যখন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে, আইন অমান্য করে, খাজনা বন্ধ করে দেয়, ছাত্ররা স্কুল কলেজ ছেড়ে রাজপথে এসে জড়ো হয়, তখন হঠাৎই গোরখপুরের চৌরিচৌরায় পুলিশি অত্যাচারের প্রতিবাদে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত থানা আক্রমণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গান্ধীজি সারা দেশ থেকেই আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। এই ঘটনায় সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের বিখ্যাত উক্তি ‘‘গোটা কতক কনস্টেবল ইনফিউরেটেড মব-এর হাতে পুড়ে মরেছে, তাতে কি হয়েছে? এতেই গোটা ভারতবর্ষের আন্দোলন বন্ধ করতে হবে? এত বড় বিরাট দেশের মুক্তির সংগ্রামে রক্তপাত হবে না? হবেই তো! রক্তের গঙ্গা বয়ে যাবে চারিদিকে– সেই শোণিত প্রবাহের মধ্যেই তো ফুটবে স্বাধীনতার রক্তকমল। এতে ক্ষোভ কিসের, দুঃখ কিসের? কিসের অনুতাপ এতে? … নন-ভায়োলেন্স খুব নোবল আইডিয়া কিন্তু অ্যাচিভমেন্ট অফ ফ্রিডম ইজ নোবলার– হানড্রেড টাইমস নোবলার।’’
মাঝপথে এই ভাবে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় দেশ জুড়ে মানুষের মধ্যে চরম হতাশা নেমে আসে। এই পরিস্থিতিকে সুচতুর ভাবে কাজে লাগায় শাসক ব্রিটিশ। ব্রিটিশের ষড়যন্ত্রে দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়ে যায়। মুসলিম লিগ এবং হিন্দু মহাসভাকে এই দাঙ্গার কাজে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা হাতের পুতুলের মতো ব্যবহার করে। অথচ দেশের মানুষ সংগ্রামের জন্য সমস্ত দিক থেকে প্রস্তুত ছিল। শুধুমাত্র সঠিক নেতৃত্বের অভাবের জন্য দেশ গোলামির শৃঙ্খলেই আবদ্ধ থেকে গেল।
এ সবের প্রতিক্রিয়া কাটিয়ে কয়েক বছরের মধ্যেই মানুষ আবার আন্দোলনমুখী হয়ে ওঠে। দেশজুড়ে প্রবল শ্রমিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। ৮ এপ্রিল ১৯২৯-এ কেন্দ্রীয় বিধানসভার বৈঠকে ব্রিটিশ সরকার ট্রেড ডিসপিউট বিল ও জনসুরক্ষা সংশোধন আইন চালু করার জন্য স্পেশাল অর্ডিন্যান্স ঘোষণা করে। এর প্রতিবাদে ওই দিনই আইন সভায় হিন্দুস্থান সোসালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ভগৎ সিং এবং বটুকেশ্বর দত্ত বোমা ছোঁড়েন। এক দিকে দেশবাসীর মধ্যে স্বাধীনতার জন্য প্রবল আকাঙক্ষা, অন্য দিকে কংগ্রেসের আপসহীন নেতাদের চাপে আপসমুখী নেতারাও কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে (ডিসেম্বর ১৯২৯) পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব নিতে বাধ্য হন। কিন্তু সে জন্য শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলার কোনও পরিকল্পনা নেওয়া হল না। পরিবর্তে গান্ধীজি অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ, সংযম অভ্যাস এবং মদ্য পান এবং বিক্রি বন্ধের প্রচার চালানোর কথা বলেন। সুভাষচন্দ্র পাল্টা প্রস্তাব দেন– দেশে সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্যাপক আইন অমান্য ও খাজনা বন্ধের কর্মসূচি নিতে ও তা কার্যকর করতে শ্রমিক-কৃষক-যুবকদের সংগঠিত করতে হবে। কিন্তু আপসকামী দক্ষিণপন্থী নেতাদের তীব্র আপত্তিতে তা বাতিল হয়ে যায়।
কংগ্রেসের লক্ষ্য ছিল, গণআন্দোলনকে ব্যবহার করে ব্রিটিশের থেকে কিছু সুবিধা আদায় করা। গণআন্দোলনের লাগাম যাতে নিজেদের হাত থেকে চলে না যায় সে বিষয়ে কংগ্রেস নেতৃত্ব যথেষ্ট সতর্ক ছিল। সেই জন্য গান্ধীজি আন্দোলনকে সীমিত রাখার চেষ্টা করেন। তিনি লবণের উপর সরকারের ইজারাদারির অবসান ঘটানোর জন্য লবণ সত্যাগ্রহের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সত্যাগ্রহকে শ্রমিক কৃষক জনসাধারণের থেকে সরিয়ে রাখার এবং নিজের কিছু কট্টর অনুগামীদের মধ্যেই সীমিত রাখেন। ১২ মার্চ ১৯৩০ গান্ধীজি তাঁর বিখ্যাত ডান্ডিযাত্রায় নিজের পছন্দ মতো মাত্র ৭৮ জনকে সঙ্গে নেন।
৯ এপ্রিল গান্ধীজি বিদেশি দ্রব্য বর্জন, সরকারি চাকরি, স্কুল-কলেজ ছাড়ার নির্দেশ দেন। সঙ্গে সঙ্গে সারা দেশ জুড়ে আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। শ্রমিকরা ধর্মঘট এবং কৃষকরা খাজনা বন্ধ শুরু করে দেয়। ভারতীয় সেনারা আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে। শ্রমিক ও যুবকরা এগিয়ে এসে সমান্তরাল সরকার গড়তে নেমে পড়ে। আন্দোলনের এই ব্যাপকতা দেখে শুধু ব্রিটিশ সরকারই নয়, কংগ্রেসের বুর্জোয়া নেতৃত্বও চমকে ওঠেন।
১৮ এপ্রিল মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করে এবং সেখানে স্বাধীন সরকার ঘোষণা করে। পেশোয়ারে জনতা পুলিশের সাথে লড়াই করে শহরের দখল নেয়। এই গণবিদ্রোহ দমন করার জন্য সরকার সেনা পাঠালে গাড়ওয়াল সেনারা দেশবাসীর উপর গুলি চালাতে অস্বীকার করে। ৮ মে মহারাষ্ট্রের শোলাপুরে পুলিশের সঙ্গে জনতা ও শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। শ্রমিকরা শোলাপুর দখল করে নেয় এবং প্যারিস কমিউনের অনুকরণে শোলাপুর কমিউন ঘোষণা করে। এক সপ্তাহ পর্যন্ত শ্রমিকরা শহর দখল করে রাখে।
৩০ এপ্রিল গান্ধীজি সরকারের কাছে এগারো দফা দাবি পেশ করে সেগুলি মেনে নিলে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন। এই দাবিপত্রে স্বাধীনতা দূরের কথা, স্বায়ত্ত শাসনের কথা পর্যন্ত ছিল না।
আন্দোলনের ব্যাপকতায় ভীত বুর্জোয়া নেতৃত্ব
আন্দোলনের ব্যাপকতা ও বিপ্লবী মেজাজ দেখে ব্রিটিশ শাসকরা এবং জাতীয় আন্দোলনের বুর্জোয়া নেতৃত্ব ভয় পেয়ে যায়। উভয়ের মধ্যে সমঝোতার কথাবার্তা শুরু হয়ে যায়। ধৃত কংগ্রেস নেতাদের মুক্তি দেওয়া হয়। ৫ মার্চ ১৯৩১ গান্ধী-আরউইন চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী কংগ্রেস নেতৃত্ব সমস্ত আন্দোলন বন্ধ করে দেয়। গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের কথা ঘোষণা করেন। ৫ মার্চ এই চুক্তি হলেও ২৩ মার্চ ভগৎ সিং, সুখদেব, রাজগুরুকে ফাঁসি দেওয়া হয়। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় ধৃত অন্য বিপ্লবীদের কঠিন সাজা দেওয়া হয়। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় ধৃত শ্রমিক নেতারা জেলেই পচতে থাকেন।
বাস্তবে যখন দেশজোড়া আন্দোলন উচ্চতম শিখরে পৌঁছেছিল এবং বৈপ্লবিক রূপ নিচ্ছিল তখন স্বাধীনতা বা স্বরাজের কোনও অধিকার না পেয়েই তাকে বন্ধ করে দেওয়া ছিল দেশবাসীর স্বাধীনতার আকাঙ্খার প্রতি এক বিরাট বিশ্বাসঘাতকতা। কংগ্রেস নেতৃত্ব আন্দোলনকে সীমিত করার চেষ্টা করেও পারছিল না। ব্রিটিশ শাসকরা নির্মম দমন-পীড়ন চালিয়েও আন্দোলন বন্ধ করতে পারছিল না। কংগ্রেস নেতৃত্ব আশঙ্কিত হয়ে পড়ে– আন্দোলনের নেতৃত্ব তাঁদের হাত থেকে জনগণের হাতে চলে যাবে। যেহেতু ভারতের পুঁজিবাদ বা পুঁজিপতি শ্রেণি বিশ্বপুঁজিবাদের প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণিগোষ্ঠীরই অংশীদার, সেহেতু এ যুগে তার মধ্যে আগের সেই পুরনো বিপ্লবী চরিত্রের বৈশিষ্ট্য আর ছিল না। স্বাধীনতা বলতে তাদের প্রয়োজন ছিল ব্রিটিশের হাত থেকে শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রটা নিজেদের কব্জায় আনা। বিপ্লবের আঘাতে গোটা সমাজটাকে পাল্টে সমাজের আধুনিকীকরণ করা– এ তাদের প্রয়োজন ছিল না।
এ কাজ সম্পন্ন হতে পারত যদি শ্রমিক শ্রেণির দল আন্দোলনের মধ্যে থেকে এর নেতৃত্বের জায়গায় আসতে পারত। যে গাইড লাইন মহান নেতা স্ট্যালিন ১৯২৫-এ সিপিআই নেতাদের দিয়েছিলেন। কিন্তু, সেই সময়ে শ্রমিক শ্রেণির দল বলে যাঁরা নিজেদের প্রচার করেছেন, অর্থাৎ সিপিআই স্বাধীনতা আন্দোলনে এই ভূমিকা পালনের কথা ভাবতেই পারেনি। তাঁরা এই আন্দোলনের মধ্যে আপসহীন ধারার গুরুত্বই সঠিক ভাবে বোঝেননি। তাঁদের অজস্র ভুল নীতি অনুসরণ ও জাতীয় বুর্জোয়াদের চাটুকারী রাজনীতির চর্চা এ দেশের জাতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রতিক্রিয়াশীল আপসমুখী জাতীয় বুর্জোয়াদের নেতৃত্বকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে ও সংহত করতে সাহায্য করেছে।
এর পর আন্দোলনের রাস্তা ছেড়ে কংগ্রেসের বুর্জোয়া নেতৃত্ব গান্ধীজিকে লণ্ডনে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকে পাঠান। প্রথম গোলটেবিল বৈঠক কংগ্রেস বয়কট করলেও দ্বিতীয় বৈঠকে গান্ধীজি যোগ দেন। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকরা স্বায়ত্ত শাসনটুকুও দিতে অস্বীকার করে। গান্ধীজি খালি হাতে ফিরে আসেন। ব্রিটিশ শাসকরা স্বাধীনতা আন্দোলনের উপর পুরোদমে আক্রমণ নামিয়ে আনে। অন্য নেতাদের সাথে গান্ধীজিকেও গ্রেফতার করে।
আন্দোলনের উপর ব্রিটিশের এই দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দেশজোড়া আন্দোলনকে তীব্র করার বদলে গান্ধীজি জেলের মধ্যে অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে অনশন শুরু করেন। ১৯৩৩-এর জুলাইয়ের এক বৈঠকে এআইসিসি নেতৃত্ব গণআইন অমান্য আন্দোলন চিরদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে এবং কংগ্রেসের সমস্ত সংগঠন ভেঙে দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত কার্যত ব্রিটিশ শাসকদের কাছে আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কিছু ছিল না। ১৯৩৪-এর মে মাসে পাটনায় অনুষ্ঠিত এআইসিসি বৈঠকে কংগ্রেস আন্দোলন বন্ধ করে দিতে এবং আগামী কেন্দ্রীয় বিধানসভা নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অর্থাৎ গণআন্দোলনের রাস্তা পরিত্যাগ করে সংসদীয় রাস্তাকেই স্বরাজ তথা স্বাধীনতা লাভের উপায় হিসাবে কংগ্রেস নির্দিষ্ট করে ফেলে। কংগ্রেস নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিল, আজ হোক, দুদিন পরে হোক ব্রিটিশকে ভারত ছেড়ে যেতে হবে। সেই স্বাধীন ভারতের ক্ষমতা যদি জাতীয় পুঁজিপতি শ্রেণির জন্য নিশ্চিত করতে হয় তবে, দেশের জনগণকে সক্রিয় ভূমিকায় আনা চলবে না। অথচ কংগ্রেস গণআন্দোলন চালালে জনসাধারণ সক্রিয় ভাবেই সেই আন্দোলনে অংশ নেবে। ব্রিটিশের উপলব্ধিও একই রকম ছিল। তাই কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতার ছিটেফোঁটা তারা কংগ্রেস নেতৃত্বের দিকে ছুঁড়ে দেয়। কংগ্রেস খুশি মনে তা লুফে নেয়। সুভাষচন্দ্র সভাপতি নির্বাচিত হয়ে আসন্ন যুদ্ধের সম্ভাবনা ধরতে পেরেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন তীব্র করার ডাক দেন। পরিণতিতে কংগ্রেস নেতৃত্ব তাঁকে দ্বিতীয় বার সভাপতি পদে মনোনীত করতে রাজি হয়নি। তা সত্ত্বেও তিনি দ্বিতীয় বার কংগ্রেসের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। কিন্তু তাঁর হাত-পা কার্যত বেঁধে দিয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। কংগ্রেস রাজনীতির সে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কংগ্রেসের ভূমিকা
৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন ফ্যাসিস্ট জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর চোদ্দ ঘণ্টা পরে ভাইসরয় লিনলিথগো ভারতকেও যুদ্ধরত দেশ বলে ঘোষণা করে দেন। এর জন্য ভারতবাসীর কোনও মতামত নেওয়ার তিনি প্রয়োজন মনে করেননি। ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর এই ঔদ্ধত্যে সারা দেশে বিক্ষোভের ঢেউ ওঠে। দেশজুড়ে উত্তপ্ত আবহাওয়া এবং মানুষের বিপুল উৎসাহ ব্রিটিশ শাসকদের উচ্ছেদ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছিল। স্বাধীনতার জন্য গণসংগ্রামকে তীব্র করার আরও এক সুবর্ণ সুযোগ নেতাদের সামনে উপস্থিত হয়ে গিয়েছিল। সারা দেশ নেতাদের ডাকের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু নেতারা গণসংগ্রামের পথে নামতে ভয় পাচ্ছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল, দরকষাকষির মাধ্যমে ব্রিটিশ বুর্জোয়াদের হাত থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা ভারতের বুর্জোয়া শ্রেণির হাতে নিয়ে আসা। ১৯২০-২১ এবং ১৯৩০-৩৩-এ কংগ্রেস নেতারা দেখেছেন, আন্দোলন গণসংগ্রামের রূপ নিলে সেই আন্দোলনকে নিজেদের সুবিধা মতো সীমিত রাখা তথা নিজেদের হাতের মুঠোর মধ্যে রাখা খুবই কঠিন। এই দু’বারই আন্দোলনকে তাঁরা মাঝপথে বন্ধ করে দেন। এ বারও তাঁরা গণআন্দোলনের ঝুঁকি নিতে রাজি হলেন না।
এই অবস্থায় কংগ্রেস এক দিকে গণআন্দোলন প্রতিরোধ করার এবং অন্য দিকে ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠীর উপর চাপ তৈরি করে কিছু অধিকার আদায়ের রাস্তায় গেলেন। এই রকম পরিস্থিতিতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু যখন বলছেন, ‘ভারত সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে নিয়োগের জন্য তাহার জন ধন ও বৈষয়িক সম্পদ ব্যবহার করিতে দিবে না– যথাসম্ভব সহজতম ভাষায় এ কথা ব্রিটেনকে জানাইবার সময় আসিয়াছে।’ তখন গান্ধীজি বড়লাট লিনলিথগোর সঙ্গে দেখা করে জানালেন, এ যুদ্ধে তাঁর সহানুভূতি সম্পূর্ণ ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের দিকে। তিনি আরও বললেন, ব্রিটিশের সংকটসময়ে তার সঙ্গে সহযোগিতা করাই ভারতের কাম্য, ব্রিটেনের ধ্বংসের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ তাঁর কাম্য নয়। কিন্তু শোষিত, নিপীড়িত, অত্যাচারিত ভারতবাসী গান্ধীজি তথা কংগ্রেসের এই মনোভাবকে সমর্থন করতে পারেনি।
৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ ওয়ার্ধায় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক হয়। সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস থেকে কার্যত বহিষ্কৃত ছিলেন, তবুও তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বৈঠকে সুভাষচন্দ্র ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রস্তাব দেন। যদিও ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশের সাথে সহযোগিতা। কিন্তু কংগ্রেসের সহযোগিতার প্রস্তাবকে ব্রিটিশ সরকার কোনও গুরুত্বই দিল না। বরং কংগ্রেসের প্রস্তাবের জবাবে ব্রিটিশ সরকার প্রাদেশিক মন্ত্রিসভাগুলির সীমিত ক্ষমতাকে আরও সংকুচিত করার কথা ঘোষণা করল এবং দেশরক্ষার অজুহাতে ব্যাপক গ্রেপ্তার ও অন্যান্য দমনমূলক ব্যবস্থা নিল। কংগ্রেসের হাতে তখন ৮টি প্রদেশের সরকার ছিল। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি প্রাদেশিক মন্ত্রিসভাগুলিকে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দিল। কিন্তু সরকার বিরোধী কোনও আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হল না।
অথচ সরকারগুলির এই পদত্যাগের ফয়দা উঠিয়ে মুসলিম লিগের নেতারা এবং প্রতিক্রিয়াশীলরা ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক নিযুক্ত সরকারগুলিতে সামিল হয়ে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করে নেয়। মুসলিম লিগ আনন্দে ‘মুক্তি দিবস’ পালন করে। এই সময় হিন্দু মহাসভা বিনায়ক দামোদর সাভারকরের নেতৃত্বে মুসলিম লিগের সাথে হাত মিলিয়ে সরকার গঠন করে। সিন্ধু প্রদেশ ও বাংলায় এই দুই দলের সরকার হয়। বাংলায় তার অংশ ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী।
১৯৪০ সালের গ্রীষ্মে ফ্যাসিস্ট জার্মানি সারা উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের উপর আধিপত্য বিস্তার করে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের বিপদে পড়তে দেখে কংগ্রেসের নেতারা একে দরকষাকষির উপযুক্ত সুযোগ বলে মনে করেন। তাঁরা আবার বলেন যে, যদি ব্রিটিশ সরকার যুদ্ধের পরে ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়ার কথা ঘোষণা করে এবং কেন্দ্রের অস্থায়ী জাতীয় সরকার স্থাপিত করে তবে তাঁরা যুদ্ধে ব্রিটিশ সরকারকে সব রকমের সাহায্য করতে প্রস্তুত আছেন। যখন ব্র্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী এক পা-ও এগোতে প্রস্তুত নয়, তখন কংগ্রেসের নেতৃত্ব অক্টোবর, ১৯৪০-এ গান্ধীজির নেতৃত্বে ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ আরম্ভ করেন।
সত্যাগ্রহের তামাশা
এ ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহ ছিল গণআন্দোলনের তামাশা। কংগ্রেস নেতৃত্ব এই দিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিলেন। ভারতবর্ষের জনগণ নিজেদের স্বাধীনতার জন্য এবং সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে শেষ বোঝাপড়া করার জন্যে উন্মুখ হয়ে ওঠে। কংগ্রেসের নেতৃত্ব যদি সতিকারের গণআন্দোলন করতেন তবে আন্দোলনের নেতৃত্ব তাদের হাত থেকে বেরিয়ে যেত। ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহের মাধ্যমে তাঁরা আন্দোলনের লাগাম নিজেদের হাতে রাখতে চাইলেন। অন্য দিকে আবার এই আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁরা ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর উপর চাপ সৃষ্টি করলেন।
সত্যাগ্রহ আন্দোলনের নামে গান্ধীজির বাছাই করা লোকেরা সত্যাগ্রহ শুরু করার এক সপ্তাহ আগে স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটকে জানিয়ে দিতেন যে, কবে, কোথায় তাঁরা সত্যাগ্রহ করতে যাচ্ছেন। ফলে দ্রুত তাঁরা গ্রেফতার হয়ে যেতেন। গ্রেফতার না হলে তিন-চার জনকে সঙ্গে নিয়ে সত্যাগ্রহের স্থানে গিয়ে কংগ্রেসের ঝান্ডা নিয়ে তিন চারবার স্লোগান দিতেন এই যুদ্ধের সঙ্গে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই। এর পরে তাঁরা ফিরে আসতেন। তিন মাসের মধ্যে ব্যক্তিগত সত্যাগ্রহের এই তামাশার পরিসমাপ্তি ঘটে।
আন্দোলনে শ্রমিকরা
যে দিন যুদ্ধ ঘোষণা হয় সেই দিনই মাদ্রাজে যুদ্ধবিরোধী সভা এবং মিছিল হয়। ২ অক্টোবর, ১৯৩৯-এ বোম্বাই-এর ৯০ হাজার শ্রমিক সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে হরতাল করে। ৮-৯ অক্টোবর, ১৯৩৯-এ নাগপুরে শ্রমিক কৃষক এবং ছাত্র সংগঠন সমূহের প্রতিনিধিদের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সম্মেলন হয়। এই সম্মেলন ভারতকে সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধে সামিল হওয়ার বিরোধিতা করে এবং কংগ্রেস নেতাদের কাছে ব্র্রিটিশ শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শীঘ্র গণসংগ্রাম শুরু করার দাবি জানায়। দেশের প্রতিটি প্রান্তে সভা এবং মিছিলে গণসংগ্রাম তাড়াতাড়ি শুরু করার দাবি ওঠে।
শ্রমিকরা অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে সংগ্রাম শুরু করে। ১৯৩৯ সালের শেষ তিনটি মাসে সারা দেশে ১১০টি হরতাল হয়, আর সেই হরতালে ১ লক্ষ ৭০ হাজার শ্রমিক অংশ গ্রহণ করে। ১৯৪০-এ তারা বিশাল আন্দোলন করে। এর মধ্যে সব চেয়ে বড় আন্দোলনটি হয় বোম্বাই-এর কাপড়ের কলের শ্রমিকদের। এতে ১ লক্ষ ৭৫ হাজার শ্রমিক অংশ গ্রহণ করে। প্রায় ৪০ দিন পরে ১৩ এপ্রিল ১৯৪০-এ এই হরতাল শেষ হয়। শ্রমিকদের বেতন ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। বোম্বাই-এর এই হরতালের পর সমস্ত দেশে হরতালের জোয়ার লেগে যায়।
কৃষকদের অংশগ্রহণ
সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে তথা স্বাধীনতা সংগ্রামে কৃষকরাও সামিল হয়। অক্টোবর, ১৯৩৯-এ যুক্ত প্রদেশের কৃষক সভার ডাকে সারা প্রদেশে কৃষক দিবস পালিত হয়। ঐ দিন দু হাজারেরও বেশি সভা হয় এবং এই সভাগুলিতে ৩০ লক্ষেরও বেশি কৃষক সামিল হয়। তারা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে। খাজনা কমানো এবং ঋণ আদায় বন্ধ করার দাবি করে। মালাবার পাঞ্জাব এবং অন্ধ্রেও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। ১৯৪০ সালেও কৃষক আন্দোলন খুব জোরদার হয়।
১৯৪১-এ ডিসেম্বর মাসের শেষেই বরদোলীতে বৈঠকে কংগ্রেস ঘোষণা করে যে, তারা রাষ্ট্রপুঞ্জের মিত্র হিসাবে হাতিয়ার নিয়ে ফ্যাসিস্ট শক্তির মোকাবিলা করতে প্রস্তুত আছে এই শর্তে যে, ভারতকে এক জাতীয় সরকারের নেতৃত্বে তার আপন শক্তি সংগ্রহের সুযোগ দিতে হবে।
এই চাপ সত্ত্বেও ব্রিটিশের শাসকগোষ্ঠী কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে কোনও রকম সমঝোতায় আসতে অস্বীকার করে। কিন্তু যখন জাপান ভারতের সীমান্তে এসে যায় তখনই তারা সমঝোতার জন্যে পা বাড়ায়। ৮ মার্চ, ১৯৪২-এ রেঙ্গুনের উপর জাপানিরা আধিপত্য বিস্তার করে এবং ১১ মার্চ ব্রিটিশ সরকার ক্রিপস মিশনের ঘোষণা করে।
কিন্তু ক্রিপস মিশন যে প্রস্তাব নিয়ে আসেন, তা পুরানো প্রস্তাবেরই সমতুল্য ছিল। ব্রিটিশ শাসক এখনও পর্যন্ত ভারতবর্ষে জাতীয় সরকার গঠন করতে প্রস্তুত ছিল না। বরং এই নতুন প্রস্তাবে তারা ভারতকে বিভক্ত করার চাল শুরু করে দেয়।
এই রকম পরিস্থিতিতে কংগ্রেস ১৯৪২-এর ৮ আগস্ট এআইসিসি অধিবেশনে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের প্রস্তাব আনতে বাধ্য হয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। প্রস্তাবে আন্দোলনের কোনও পরিকল্পনা নেওয়া হয় না। বাস্তবে কংগ্রেস নেতৃত্ব কোনও গণআন্দোলন চাননি। তাঁরা গণআন্দোলনের হুমকি দিয়ে ব্রিটিশকে সমঝোতায় আনার চেষ্টা করেছিলেন মাত্র।
কিন্তু ব্রিটিশ শাসকরা সমঝোতার পরিবর্তে দমন-পীড়নের রাস্তাই বেছে নেয়। ৯ আগস্ট ভোরেই কংগ্রেসের নামকরা নেতাদের গ্রেপ্তার করে। দেশের জনগণ বারবার আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হয়েও দেখেছে যে, কংগ্রেস নেতৃত্বের আপসকামিতার জন্য তা কখনওই তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি। দেশবাসীর মধ্যে কংগ্রেস নেতৃত্ব সম্বন্ধে এই সন্দেহ দানা বাঁধছিল যে, কংগ্রেস নেতৃত্ব ব্রিটিশের বিরুদ্ধে আদৌ আন্দোলন চান না। তাই এ বার আর দেশের মানুষ আর নেতৃত্বের নির্দেশের অপেক্ষা না করেই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন বাস্তবে গণআন্দোলনের রূপ নেয়। দেশব্যাপী আইন অমান্য আন্দোলন, ট্রেন-স্টেশন, সরকারি অফিস, পোস্টঅফিস জনতা দখল করে নেয় অথবা পুড়িয়ে দেয়। রাস্তা কেটে, রেললাইন উপড়ে ফেলে, টেলিগ্রাফের তার কেটে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সর্বত্র বিরাট বিরাট শোভাযাত্রা বের হয়। ছাত্ররা স্কুল কলেজ ছেড়ে বেরিয়ে আসে। কিছু জায়গায় স্বাধীন সরকার গঠিত হয়। এক দিকে কংগ্রেস নেতৃত্বের নিষ্ক্রিয় ভূমিকা, হিন্দু মহাসভা, মুসলিম লিগ ও সিপিআইয়ের বিরোধিতা অন্য দিকে ব্রিটিশের নির্মম দমন-পীড়নে আন্দোলন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে।
স্বাধীনতার পরেও গত আট দশকের ইতিহাস দেশের মানুষের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত বুর্জোয়া এবং পেটি বুর্জোয়া দলগুলির বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। পুঁজিবাদী শোষণ-লুণ্ঠনের বিরুদ্ধে, বুর্জোয়া শাসক দলগুলির অপশাসন এবং প্রতারণা-দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষ বারে বারে বিক্ষোভে-আন্দোলনে ফেটে পড়তে চেয়েছে। কিন্তু শাসক শ্রেণির প্রতারণার স্বরূপ ধরতে পারার মতো চেতনার অভাবে এবং সঠিক নেতৃত্বের অভাবে তা বারে বারে ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্যই মার্ক্সবাদী চিন্তানায়ক কমরেড শিবদাস ঘোষ বারবার এ দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন, ‘‘সমাজে শ্রমিক-চাষি-শোষিত মানুষের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বিপ্লব বারবার গমকে গমকে আসতে চাইবে, গমকে গমকে ফেটে পড়তে চাইবে। সমাজ অভ্যন্তরের দ্বন্দ্ব ফুলে ফুলে উঠে বারবার বলতে চাইবে– এ অবস্থার আমূল পরিবর্তন চাই; মানুষের মগজের কাছে, মানুষের কাছে আবেদন করতে চাইবে– বিপ্লব আমি চাই। কিন্তু বিপ্লব তত দিন হবে না, বার বার সে ফিরে যাবে, বিপথগামী হয়ে ফিরে যাবে, বার বার তার দ্বারা প্রতিক্রিয়া লাভবান হবে, বিপ্লব হবে না, যত দিন না বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবার উপযুক্ত শক্তি নিয়ে বিপ্লবী পার্টির আবির্ভাব হবে। তাই আপনারা মনে রাখবেন, শুধু বিপ্লব চাই– এটা কোনও বিপ্লবী চেতনা নয়। তাই শ্রমিক শ্রেণি, সর্বহারার কথা আমি চিন্তা করি– এটাও কোনও সর্বহারা শ্রেণিচেতনা নয়। সঠিক বিপ্লবী চেতনা হল, সঠিক সর্বহারা শ্রেণিচেতনা, আর সঠিক সর্বহারা শ্রেণিচেতনা হল সঠিক পার্টিচেতনা– অর্থাৎ আপনারা সঠিক বিপ্লবী পার্টি চিনতে পেরেছেন কি না’’ (এক মহান বিপ্লবী চরিত্রের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য, ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ প্রদত্ত ভাষণ)।