Breaking News

মিড-ডে মিলঃ সমস্যা অনেক গভীরে

ফাইল ফটো

সম্প্রতি রাজ্যের বিজেপি সরকার মিড ডে মিলের দায়িত্ব ইসকনের হাতে তুলে দিয়েছে। ফলে স্বভাবতই এ বার থেকে ডিম আর পড়বে না ছাত্র-ছাত্রীদের পাতে। বলা হয়েছে, তার বদলে সয়াবিন, পনির, রাজমা ও ডাল দেওয়া হবে। নানা প্রশ্ন উঠছে এ সব নিয়ে। সাধারণ ভাবে মানুষ খাবার খায় স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস বা রুচি অনুযায়ী। নিতান্ত সংকটে না পড়লে যে কোনও ধরনের খাদ্যে মানুষ হঠাৎ অভ্যস্ত হতে পারে না। ছোটদের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও কঠিন। আর সেই ছোটদের পাতেই এ রাজ্যের সরকার তুলে দিচ্ছে তাদের খাদ্যাভ্যাসের বাইরের খাবার। মূলত দরিদ্র নিম্নবিত্ত বাড়ির ছেলেমেয়েরা যায় সরকারি স্কুলে পড়তে। এদের অনেকেই স্কুলে দেওয়া মিড ডে মিলের খাবার খেয়েই পেট ভরায়। তথ্য বলছে দেশের ১০ কোটির উপরে শিশু প্রতিদিন রাতে না খেয়ে বা আধপেটা খেয়ে ঘুমোতে যায়। পরিবার পিছু গড় আয় দৈনিক মাত্র ১৬৭ টাকা। এই মূল্যবৃদ্ধির বাজারে এই সামান্য টাকায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ পরিবারগুলিতে শিশুদের পুষ্টির অবস্থা করুণ হতে বাধ্য।

সম্প্রতি প্রকাশিত ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের রিপোর্টে এ দেশে শিশুদের পুষ্টিমানের সেই করুণ ছবিই ফুটে উঠেছে। দেখা যাচ্ছে দেশে প্রোটিনের অভাবে মারাত্মক ভাবে পেশি ক্ষয় হয়ে যাওয়া শিশু, মোট শিশুসংখ্যার ৩৫.৫ শতাংশ। প্রথম শ্রেণির প্রোটিন এবং আয়রনের অভাবে ৬৭ শতাংশ শিশু রক্তাল্পতায় ভোগে। এর ফলে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি, পড়াশোনায় মনোযোগ ইত্যাদি ভীষণভাবে কমে যায়। সমীক্ষায় দেখা গেছে অ্যানিমিয়াজনিত কারণে শিশুরা পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে একটা বড় অংশ স্কুলছুট হয়।

এই প্রেক্ষাপটে দেশের মিড ডে মিল কর্মসূচিটির পর্যালোচনা করা দরকার। বলাই বাহুল্য কেবলমাত্র শিশুদের স্কুলের প্রতি আগ্রহ জাগানোই এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য নয়। দরিদ্র নিম্নবিত্ত মেহনতি সাধারণ ঘরের কোটি কোটি শিশুদের নূ্যনতম পুষ্টি জোগানোর মাধ্যমে তাদের অপুষ্টিজনিত রোগের হাত থেকে বাঁচানোও এই প্রকল্পের একটা বড় লক্ষ্য। শুরুতে বিশেষজ্ঞদের অভিমত ছিল শিশুদের দৈনিক যতটা প্রোটিন প্রয়োজন তার অন্তত অর্ধেক প্রোটিন এবং যতটা ক্যালরি দরকার তার অন্তত এক তৃতীয়াংশ যাতে এই মিড ডে মিল থেকে তারা পেতে পারে সরকারকে তা নিিচত করতে হবে। সরকারি অবহেলায় মিড ডে মিলের বরাদ্দ যা ছিল (চার টাকারও কম) বা বর্তমানে যা হয়েছে (মাত্র ১০ টাকা) তার দ্বারা বাজারমূল্য অনুযায়ী সেই প্রয়োজনের একাংশও পূরণ করা সম্ভব নয়। এত দিন শিশুদের খাদ্য তালিকায় প্রাণিজ প্রোটিন বলতে একটা করে ডিম দেওয়ার বন্দোবস্ত ছিল। মাঝে মাঝে আধখানা ডিম পড়ত শিশুদের পাতে, মাঝে মাঝে আবার তাও পড়ত না। এবার পাকাপাকি ভাবে ডিম না দেওয়ারই ব্যবস্থা করে ফেলল রাজ্যের বিজেপি সরকার।

মিড ডে মিলে ডিম বাদ দেওয়া নিয়ে এত আপত্তি উঠছে কেন? কেনই বা শিশুদের পুষ্টির ক্ষেত্রে ডিমের মতো প্রাণিজ প্রোটিনের উপরেই বেশি জোর দেন পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসকরা? প্রথমত প্রাণিজ প্রোটিনে সবকক্সটি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যাসিড পরিমাণমতো থাকে, যা শারীরিক বৃদ্ধি ও মানসিক গঠনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী। উদ্ভিজ্জ প্রোটিনে সব ক’টি অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে না। সয়াবিন ও পনির বাদ দিলে নটি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো অ্যসিডের অর্ধেকই অন্যান্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের মধ্যে থাকে না। একটি ডিমে সহজপাচ্য উন্নত গুণমান সম্পন্ন ৬ গ্রাম প্রোটিন রয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে প্রয়োজনীয় ফ্যাট, খনিজ লবণ ও বিভিন্ন ভিটামিন। এক কথায় ডিম পুষ্টিতে ভরপুর। আবার সাধারণ ভাবে বেশিরভাগ শিশুর কাছে ডিম অত্যন্ত প্রিয়ও বটে। ফলে মিড ডে মিলে অন্য কোনও খাবার ডিমের বিকল্প হতে পারে না। সে কারণে এ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশেও শিশুদের ডিম দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

তা সত্ত্বেও কেন ডিম বাদ দেওয়া হল? সরকারের বক্তব্য, সপ্তাহে একদিন পনির ও একদিন সয়াবিন দেওয়া হবে। শিশুদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে প্রতিদিন যে পরিমাণ প্রোটিন দরকার অর্থাৎ ১০ থেকে ১২ গ্রাম, তার অর্ধেক পেতে গেলেও যে পরিমাণ পনির বা সয়াবিন দিতে হবে তা শিশুদের পক্ষে সচরাচর একবারে খাওয়া সম্ভব নয়। একটি ডিমের বিকল্প তাই পনির বা সয়াবিন হতে পারে না। সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে যা দেওয়া হবে তাতে প্রোটিন সংবলিত খাবারের ঘাটতি থাকছেই। অন্যান্য যে সব উদ্ভিজ্জ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রয়েছে, তার মধ্যে ডাল অন্যতম। কিন্তু কোনও ডালেই চার-পাঁচটির বেশি অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে না। ডিম বাদ দিয়ে কেবলমাত্র ডাল ও অন্যান্য খাবারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রোটিনের চাহিদা যদি পূরণ করতে হয় তা হলে বেশ কয়েকটি ডাল মিশিয়ে প্রতিদিন ঘন ডাল খাওয়ার প্রয়োজন। নিয়মিত সে বন্দোবস্ত থাকছে কি? তা না থাকলে দেশের কোটি কোটি অর্ধাহারে ও অনাহারে থাকা শিশু, যাদের একটা বড় অংশই অপুষ্টিতে ভুগে নানা রোগের শিকার হয়ে পড়ছে, মস্তিষ্ক যাদের ঠিকমতো বিকশিত হতে পারছে না, মিড ডে মিল নিয়ে রাজ্যের বিজেপি সরকারের নতুন নির্দেশিকায় তারা চরম বঞ্চনার শিকার হবে।

আর একটি বিষয়ও যথেষ্ট উদ্বেগের। মিড ডে মিলের কাজে যে কয়েক লক্ষ কর্মীর রোজগারের ব্যবস্থা হত, সার্বিকভাবে এই প্রকল্পের দায়িত্ব ইসকনের হাতে তুলে দেওয়ায় সেই প্রান্তিক মানুষগুলির ভবিষ্যৎ প্রশ্নচিহ্নের সামনে পড়ল। তাদের নিয়ে সরকারের কিন্তু কোনও পরিকল্পনা নেই।

কিন্তু মিড ডে মিলের জন্য কেন ইসকনকেই বেছে নিল সরকার, তাও টেন্ডার ডাকার মতো সরকারি নিয়ম বাদ দিয়েই? সরকার সচেষ্ট হলে নিজেই তো ব্যয়বরাদ্দ বাড়িয়ে, চুরি-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করে এ রাজ্যের শিশুদের পাতে তুলে দিতে পারত বাঙালির খাদ্যাভ্যাস অনুসারী পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার! ইসকসনেরই বা কি দায় নামমাত্র সরকারি বরাদ্দে স্কুলে স্কুলে খাবার সরবরাহ করার? এর কারণ কি সামাজিক দায়বদ্ধতা? না কি অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে এর পেছনে?

এই প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে গেলে বিজেপির রাজনীতির দিকে চোখ রাখতে হবে। বিজেপি ও তার আদর্শগত অভিভাবক আরএসএস উত্তর ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির প্রভাবে নিরামিষ খাবারের পৃষ্ঠপোষক। এ বারে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ‘মাছে-ভাতে বাঙালিক্সর সংস্কৃতি অক্ষুণ্ন রাখা হবে, এই আশ্বাস দিতে বিধানসভায় বা মা ক্যান্টিনে মাছ-ভাতের ব্যবস্থা বিজেপি সরকার করেছে এবং ফলাও করে তার প্রচারও করেছে। কিন্তু তার পরেই আরএসএস অনুমোদিত সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস একেবারে বিদ্যালয় স্তর থেকেই শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা শুরু করেছে তারা। এটা তাদের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা। হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ইসকনকে তারা এই কাজে ব্যবহার করছে। শিশুদের গিনিপিগ বানিয়ে তাদের আরও অপুষ্টির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এটি একটি সামাজিক অপরাধ। এর বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে সকলের সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।