Breaking News

বিপ্লবী তত্ত্ব শাস্ত্রবাক্য নয়, প্রকৃত গণসংগ্রামের মধ্য দিয়েই তা চূড়ান্ত রূপ নেয়—ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন

রাশিয়ায় নভেম্বর বিপ্লব কেন সফল হতে পেরেছিল তা দেখাতে গিয়ে লেনিন সর্বহারা শ্রেণির অগ্রণী অংশ হিসাবে তাঁর ‘লেফট উইং কমিউনিজম অ্যান ইনফ্যানটাইল ডিসঅর্ডার’ (১৯২০) রচনায় পার্টির ভূমিকা, কঠোর সর্বহারা বিপ্লবী শৃঙ্খলাপরায়ণতার প্রয়োজনীয়তা, সর্বহারা একনায়কত্বের রাজনৈতিক স্বরূপ এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর সর্বহারা একনায়কত্ব ও শ্রেণিসংগ্রাম অব্যাহত রাখার অপরিহার্যতা প্রসঙ্গে অমূল্য আলোচনা করেছেন। সংশোধনবাদী ও প্রতিবিপ্লবীরা মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদকে কালিমালিপ্ত করা ও মার্ক্সবাদের প্রাণসত্তাকে বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে সর্বহারা একনায়কত্ব, শ্রেণিসংগ্রাম এবং বিপ্লবী শৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তাকেই আজ যখন অস্বীকার করছে সেই মুহূর্তে লেনিনের এই শিক্ষা আমাদের বিশেষ ভাবে পথ দেখাবে। রচনার দ্বিতীয় অধ্যায়ের অনুবাদ আমরা প্রকাশ করলাম।

এ কথা আজ সকলেই উপলব্ধি করছেন যে, আমাদের দলে যদি অত্যন্ত কঠোর এবং প্রকৃতই লৌহদৃঢ় শৃঙ্খলা না থাকত, যদি সমগ্র শ্রমিক শ্রেণির অকুণ্ঠ ও পূর্ণ সমর্থন আমরা না পেতাম, অর্থাৎ এই শ্রেণির অভ্যন্তরে সৎ, নিষ্ঠাবান, প্রভাবশালী অগ্রণী অংশ, যারা পশ্চাদপদ অংশের শ্রমজীবী মানুষকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম, তাদের সমর্থন আমরা না পেতাম, তা হলে আড়াই বছর তো দূরের কথা আড়াই মাসও বলশেভিকরা ক্ষমতা হাতে রাখতে পারত না।

সর্বহারার একনায়কত্ব হচ্ছে, অধিকতর এক শক্তিশালী শত্রু, বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে নূতন শ্রেণি কর্তৃক পরিচালিত সর্বাপেক্ষা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও নির্মম এক সংগ্রাম। কেন না ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর (এমনকি তা একটিমাত্র দেশে হলেও) বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিরোধক্ষমতা দশগুণ বেড়ে যায় এবং তাদের এই ক্ষমতা আন্তর্জাতিক পুঁজির শক্তি, তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের স্থায়িত্ব ও শক্তির মধ্যেই শুধু নয়, অভ্যাসের শক্তি (ফোর্সেস অব হ্যাবিট) এবং ক্ষুদ্র উৎপাদনের শক্তির মধ্যে নিহিত থাকে। অনভিপ্রেত হলেও, গোটা দুনিয়াতেই ক্ষুদ্র উৎপাদন এখনও অত্যন্ত ব্যাপক আকারে চালু রয়েছে এবং এই ক্ষুদ্র উৎপাদন আপন নিয়মেই নিরবচ্ছিন্ন ভাবে, প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত, স্বতস্ফূর্তভাবে ব্যাপকাকারে পুঁজিবাদ ও বুর্জোয়ার জন্ম দেয়। এই সব কারণে সর্বহারা একনায়কত্ব অপরিহার্য ও দীর্ঘকালব্যাপী একটা অদম্য, নির্ভীক, মরণপণ সংগ্রাম– যে সংগ্রামে চাই সহিষ্ণুতা, শৃঙ্খলা, দৃঢ়তা, অটলতা, এক ও অভিন্ন আকাঙক্ষা– সে সংগ্রাম ছাড়া বুর্জোয়া শ্রেণিকে চূড়ান্ত ভাবে পরাজিত করা অসম্ভব। আমি আবারও বলি সর্বহারা শ্রেণিকে চূড়ান্ত কেন্দ্রিকতা এবং কঠোর শৃঙ্খলার ভিত্তিতে দাঁড় করানো অপরিহার্য কর্তব্য, যা না হলে বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করা কোনও মতেই সম্ভব নয়। এই সত্য যারা যুক্তিবিচারের মাধ্যমে বুঝতে পারেননি, বা এ বিষয়ে ভাবনাচিন্তার সুযোগ যাদের ঘটেনি, এমনকি তাদের সামনেও রাশিয়ায় সর্বহারা একনায়কত্বের বিজয়ের অভিজ্ঞতা তা সুষ্পষ্ট ভাবে তুলে ধরেছে।

এই কথাগুলো প্রায়শই বলা হয়। কিন্তু কথাগুলোর প্রকৃত অর্থ কী? বা কোন পরিস্থিতিতে তা করা সম্ভব হয়েছিল– সে বিষয়ে তেমন ভাবনাচিন্তা করা হয় না। বিপ্লবী সর্বহারা শ্রেণির যে ধরনের ইস্পাত-কঠিন শৃঙ্খলা প্রয়োজন, বলশেভিকরা তা গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল কেন? কী তার কারণ তা যদি আরও গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করা হত এবং সোভিয়েট ও বলশেভিকদের অভিনন্দন জানানোর সাথে সাথে এসব বিষয়গুলি একটু বেশি করে চর্চা করা হত, তা হলে ভাল হত না কি?

একটা রাজনৈতিক চিন্তাধারা ও একটা রাজনৈতিক দল হিসাবে বলশেভিক মতবাদ ১৯০৩ সাল থেকেই বিদ্যমান রয়েছে। সে দিন থেকে আজ পর্যন্ত, সমগ্র সময়টা জুড়ে বলশেভিক মতবাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই কেবল বোঝা যাবে, সর্বহারা শ্রেণির বিজয়ের জন্য যে লৌহদৃঢ় শৃঙ্খলা অবশ্য প্রয়োজন, অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও বলশেভিকরা তা গড়ে তুলতে এবং রক্ষা করতে পেরেছিল কী করে।

এ ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যে প্রশ্নগুলি দেখা দেয় তা হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণির বিপ্লবী দলের শৃঙ্খলা রক্ষা করা হয় কী করে? কী করে তার কার্যকরিতা যাচাই হয়, কী করে তা আরও লৌহদৃঢ় করে গড়ে তোলা হয়? এ জন্য চাই– প্রথমত সর্বহারা শ্রেণির অগ্রগামী বাহিনীর শ্রেণি সচেতনতা, বিপ্লবের প্রতি গভীর আনুগত্য, সহনশীলতা, আত্মত্যাগ ও বীরত্ব। দ্বিতীয়ত প্রয়োজন, ব্যাপক অংশের শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে অর্থাৎ সর্বহারা শ্রেণি তো বটেই, এমনকি তার বাইরে যে ব্যাপক শ্রমজীবী মানুষ, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা, অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা, বলতে গেলে বহুলাংশে তাদেরই একজন হিসাবে মিশে যাওয়ার ক্ষমতা। তৃতীয়ত প্রয়োজন, অগ্রগামী বাহিনীর সঠিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সঠিক রণনীতি ও রণকৌশল, যা ব্যাপক জনগণ নিজস্ব অভিজ্ঞতার নিরিখে সঠিক বলে বুঝতে পেরেছে। এই শর্তগুলি পূরণ করতে না পারলে, বুর্জোয়া শ্রেণিকে ক্ষমতাচ্যুত করে সমাজের আমূল পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রকৃতই সর্বহারা শ্রেণির দল হিসাবে গড়ে উঠতে সক্ষম এমন একটি পার্টির পক্ষেও, বিপ্লবী শৃঙ্খলা আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। এই শর্তগুলি পূরণ করতে না পারলে, দলের অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা গড়ে তোলার সকল প্রচেষ্টাই চূড়ান্ত ভাবে ব্যর্থ হতে এবং শেষ পর্যন্ত ফাঁকা বুলি ও তামাশায় পরিণত হতে বাধ্য। অন্য দিকে এই শর্তগুলি একদিনে পূরণ করা সম্ভব নয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টা এবং বহু মূল্য দিয়ে অর্জিত অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়েই তা গড়ে ওঠে। সঠিক বিপ্লবী তত্ত্ব থাকলে তা গড়ে তোলা সহজ হয়। কিন্তু এই সঠিক বিপ্লবী তত্ত্বটিও আবার শাস্ত্রবাক্য নয়, প্রকৃত গণসংগ্রাম ও বিপ্লবী সংগ্রামের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই সেই তত্ত্ব চূড়ান্ত রূপ গ্রহণ করে।

রাশিয়ার মাটিতে কতকগুলি বিশেষ ঐতিহাসিক কারণ দেখা দিয়েছিল বলেই ১৯১৭-২০ সালে বলশেভিকরা অভূতপূর্ব প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও কঠোর কেন্দ্রিকতা এবং লৌহদৃঢ় শৃঙ্খলা গড়ে তুলতে ও রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল।

একদিকে ১৯০৩ সালে মার্ক্সবাদী তত্তে্বর সুদৃঢ় বনিয়াদের উপর বলশেভিক মতবাদ গড়ে ওঠে। গোটা ঊনবিংশ শতাব্দী ধরে সমগ্র দুনিয়ার অভিজ্ঞতার নিরিখেই শুধু নয়, বিশেষত রাশিয়ার বিপ্লবী চিন্তার ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও দোদুল্যমানতা এবং ভুলভ্রান্তি হতাশার অভিজ্ঞতার নিরিখেও নিঃসন্দেহে প্রমাণ হয়ে যায় যে একমাত্র মার্ক্সবাদী তত্ত্বই হল সঠিক বিপ্লবী তত্ত্ব গত শতাব্দীর চল্লিশ থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় পঞ্চাশ বছর, চরম প্রতিক্রিয়াশীল বর্বর জারতন্তে্রর নির্মম দমন পীড়ন সত্তে্বও রাশিয়ার প্রগতিশীল সংগ্রামীরা গভীর আগ্রহ নিয়ে সঠিক বিপ্লবী তত্ত্বের সন্ধান করেছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় যে সব ভাবনাচিন্তা বিপ্লবী তত্তে্বর ‘শেষ কথা’ বলে প্রচারিত হয়েছে তার প্রত্যেকটিকে গভীরতম অধ্যাবসায় নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিচার করেছে। পঞ্চাশ বছরব্যাপী নজিরবিহীন অত্যাচার সত্ত্বেও অতুলনীয় আত্মত্যাগ, বিপ্লবী শৌর্য, অবিশ্বাস্য উদ্যম, একনিষ্ঠ অনুসন্ধান, অধ্যয়ন, হাতে কলমে কাজ, ব্যর্থতা, যাচাই, এবং ইউরোপের বিপ্লবী অভিজ্ঞতার নির্যাস গ্রহণ– অর্ধশতাব্দীর এই গভীর আকুতি ও কঠোর সাধনার মধ্য দিয়ে রাশিয়া সঠিক বিপ্লবী তত্ত্ব মার্ক্সবাদের সন্ধান পেয়েছে। জারতন্তে্রর অত্যাচারে বাধ্যতামূলক দেশান্তরগমনের কল্যাণে ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে রাশিয়ার বিপ্লবীরা যে মহামূল্যবান আন্তর্জাতিক যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছিল, সংগ্রামের রূপ ও তত্ত্বগত ক্ষেত্রে দুনিয়ার বিপ্লবী আন্দোলন থেকে যে মূল্যবান শিক্ষা রাশিয়ার বিপ্লবীরা অর্জন করেছিল আর কোনও দেশের বিপ্লবীরা তা পায়নি।

অন্য দিকে এই সুদৃঢ় তত্ত্বগত বনিয়াদের উপর গড়ে ওঠা বলশেভিকবাদ, তত্ত্বকে হাতেকলমে প্রয়োগের পনের বছরের ইতিহাসের মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতার যে অমূল্য সম্পদের অধিকারী হয়েছে, বিশ্বে তার কোনও দ্বিতীয় নজির ছিল না। কারণ এই পনের বছরে রাশিয়াকে যে বিপ্লবী অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, যে ভাবে আন্দোলনের রূপ ও কৌশল অতি দ্রুত ক্রমাগত বদলেছে কখনও আইনি কখনও বেআইনি, কখনও শান্ত কখনও উত্তাল, কখনও গোপন কখনও প্রকাশ্য, কখনও ছোট ছোট আঞ্চলিক গোষ্ঠী নিয়ে কাজ, কখনও বৃহত্তর জনগণকে নিয়ে গণআন্দোলন, কখনও সংসদীয় কখনও সশস্ত্র সংগ্রাম রাশিয়ায় যে ভাবে চলেছে– তেমন অভিজ্ঞতা এমনকি তার কাছাকাছি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও আর কোনও দেশকে যেতে হয়নি।

আধুনিক সমাজের সকল শ্রেণিকে জড়িয়ে সংগ্রামের নানা রূপ, বৈচিত্র্য ও পদ্ধতির এমন এক অপূর্ব সমাহার অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে রাশিয়ায় ঘটেছে, যা অন্য কোনও দেশে দেখা যায়নি। রাশিয়ার এই সংগ্রাম দেশের পশ্চাদপদতা ও জারশাসনের অত্যাচারের তীব্রতার ফলে অভাবিত দ্রুততায় পরিপক্কতা লাভ করেছে এবং সে আমেরিকা ও ইউরোপের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার যথার্থ ‘শেষ’কথাটি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে সফল ভাবে আত্মস্থ করতে পেরেছে।