Breaking News

বিজেপি সরকারের জনদরদের নমুনা, ভোট শেষ হতেই তেলের দামবৃদ্ধি

পেট্রল-ডিজেল রান্নার গ্যাস সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে ত্রিপুরায় কর্নেল চৌমূহনি মোড়ে এসইউসিআই(কমিউনিস্ট)-এর বিক্ষোভ। ১৫ মে

এপ্রিলেই শেষ হয়েছে দেশের চার রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোট পর্ব। দিন গুজরানে হয়রান জনসাধারণ ভোট মিটতেই খবর পেলেন বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম এক ধাক্কায় নজিরবিহীন ভাবে বেড়ে গেছে ৯৯৪ টাকা। কয়েকদিন পরেই বাড়ল দুধের দাম, তেলের দাম। কলকাতায় প্রতি লিটারে পেট্রলের দাম বাড়ল ৩.২৯ টাকা, ডিজেলের ৩.০৮ টাকা। পশ্চিমবঙ্গ সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে পর্যন্ত মোদি সরকার দাবি করে আসছিল, মানুষের স্বার্থের কথা চিন্তা করেই তাঁরা পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের জের থাকলেও জ্বালানির দাম বাড়াচ্ছেন না। তা হলে ভোট মিটতেই দাম বৃদ্ধিতেই কি মানুষের স্বার্থ রক্ষা হল! কেন্দ্রীয় তেলমন্ত্রী বললেন ‘আমি বলছি না তেলের দাম বাড়বে না, তবে তার সঙ্গে ভোটের কোনও সম্পর্ক নেই।’ তিনি আসলে বুঝিয়ে দিলেন, তাঁরা ভোট বৈতরণী পার হয়ে গেছেন, আর তাঁদের দাম বাড়াতে অসুবিধা নেই।

বেশ কয়েক দিন ধরে প্রধানমন্ত্রী সহ বিজেপির অন্যান্য নেতা-মন্ত্রীরা সাধারণ মানুষকে দেশের স্বার্থে কৃচ্ছসাধন করে জ্বালানি সাশ্রয়ের উপদেশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। দাম বাড়লে মানুষ জ্বালানি ব্যবহারে সংযত হবেন, ফলে জ্বালানির সাশ্রয় ঘটবে– এমন যুক্তিও শোনা যাচ্ছিল। আসল কথা, দাম বৃদ্ধির পক্ষে সুকৌশলে একটা প্রেক্ষাপট তৈরি করা। এখন প্রশ্ন, যাঁরা কৃচ্ছসাধনের উপদেশ দিচ্ছেন তাঁরা কেন এর সব দায় শুধু জনসাধারণের উপরেই চাপিয়ে দিচ্ছেন? পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যদি জ্বালানি সংকট ঘটেই থাকে, তবে তা তো হঠাৎ একদিনে ঘটেনি। তা হলে এই সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা-মন্ত্রীরা কেমন করে দিল্লি থেকে হেলিকপ্টার নিয়ে রাজ্যে রাজ্যে প্রায় প্রতিদিন যাতায়াত করতে পারলেন? মানুষ জানেন, বাংলার মসনদ দখল করতে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সহ বিজেপির প্রথম সারির প্রায় সমস্ত নেতাই ঘনঘন উড়ে এসেছেন পশ্চিমবঙ্গে। এতে জ্বালানির অপ্রয়োজনীয় খরচ হয়নি? এ ক্ষেত্রে তাঁরা কৃচ্ছসাধনের কথা ভাবলেন না কেন? ভাবলেন না, কারণ ভোট বড় বালাই। ভোট পরবর্তী সময়ে মন্ত্রীরা তাঁদের কনভয়ে সামান্য কিছু গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে, দু-একটা সফর বাতিল করে নাকি ‘কৃচ্ছসাধনের উদাহরণ’ তৈরি করছেন। প্রশ্ন উঠছে, যদি কম গাড়ি নিয়েই মন্ত্রীদের যাতায়াত করা সম্ভব হয়, তবে এত দিন এক একজন মন্ত্রীর জন্য এতগুলো করে গাড়ি বরাদ্দ করা হয়েছে কেন? মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়কদের বিপুল ভাতা, সুবিধা, সাংসদ ক্যান্টিনে নামমাত্র দামে খাবার– এ সব কাটছাঁট হবে বলে তো শোনা যায়নি! তা হলে যে সাধারণ মানুষ জীবনযাপন করতে গিয়ে ন্যূনতম প্রয়োজনটুকুর সংস্থান করে উঠতেই হিমশিম খাচ্ছেন, তাঁদের কৃচ্ছসাধনের উপদেশ দেওয়া প্রহসন নয় কি?

পেট্রলিয়াম মন্ত্রী এবং রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর দুজনেই জানিয়েছেন, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ না থামলে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে। প্রশ্ন হল, যুদ্ধ পরিস্থিতি যখন তৈরি হয়নি, তখন কি সরকার দাম নিয়ন্ত্রণে আন্তরিক ভাবে সচেষ্ট ছিল? অভিজ্ঞতা বিপরীত সাক্ষ্য দেয়। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলে কি ভারতে তা কমে? কখনই নয়। বরং বিশ্ববাজারে দাম কমলে ভারত সরকার দেশে তেলের ওপর বাড়তি কর বসিয়ে লক্ষ কোটি টাকা কামিয়ে নেয়। সেই সময় কেন্দ্রীয় সরকার বলেছিল, এখন দাম কমানো হচ্ছে না, যাতে পরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও ভারতে দাম বাড়াতে না হয়। সেই প্রতিশ্রুতি কোথায় গেল! ২০১৪ থেকে ২০২০ পেট্রল-ডিজেলে সরকারের কর বেড়েছে ৩০০ শতাংশ (হিন্দুস্তান টাইমস, ২২ মার্চ, ২০২১)। ২০২১-এ কেন্দ্র ও রাজ্য মিলে তেলের ওপর ট্যাক্স আদায় করেছে ৬৩ শতাংশ (দ্য হিন্দু ডট কম, ৩১ মে,২০২১)। লকডাউনের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম তলানিতে নেমে গিয়েছিল। সে সময় স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভের নামে বিপুল পরিমাণ তেল ভারত কম দামে মজুত করেছিল। কিন্তু তার কোনও সুবিধাই জনসাধারণ পাননি। পরবর্তী কালে আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য দাম বাড়লে, এমনকি না বাড়লেও, হয় কথায় নয় কথায় ভারতে বেড়েছে তেলের দাম। এতে লাভবান হয়েছে কারা? আইওসি, ওএনজিসির মতো রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এবং রিলায়েন্স, নায়ারা এনার্জির মতো কর্পোরেট মালিকরা।

অতি সম্প্রতি কেন্দ্রীয় তেল মন্ত্রকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির মাসে ত্রিশ হাজার কোটি টাকা বা দিনে এক হাজার কোটি টাকার ‘কম আয়’ হচ্ছে, যা মোদি সরকারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। শব্দটা খেয়াল করা দরকার– ‘লোকসান’ নয়, ‘কম আয়ক্স। আর একটু গভীরে দেখা যাক। ভারত তেল আমদানি করে থাকে বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশ থেকে। ২০২১ সাল পর্যন্ত ভারত মূলত তেল আমদানির ক্ষেত্রে নির্ভর করত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উপর। ২০২২ থেকে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ভারতের সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস হয়ে দাঁড়ায়। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর আমেরিকা সহ পশ্চিমী দেশগুলি রাশিয়ার ওপর একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করে। বাজারের ওপর দখল রাখতে রাশিয়া তখন সস্তায় এবং বাড়তি ছাড়ে তেল বিক্রি শুরু করে। সেই সস্তা তেল আমদানিতে ভারতের অনেক সাশ্রয় হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় ব্যারেল প্রতি প্রায় ১৩ ডলার পর্যন্ত কম দামে ভারত তেল কিনেছে। পরিসংখ্যান বলছে এই সময়ে ভারতের সাশ্রয়ের পরিমাণ ১৬৩১ কোটি ডলারেরও বেশি। এই সাশ্রয়ের কী সুবিধা জনসাধারণ ভোগ করেছেন তা একবার দেখে নেওয়া যাক।

আগের থেকে অনেক কম দামে বিশ্ববাজারে তেল কিনলেও ২০২২-এর এপ্রিল থেকে ২০২৪-এর মার্চ মাস পর্যন্ত ভারতের বাজারে আগের মতোই চড়া দাম সরকার বজায় রেখেছে। লোকসভা নির্বাচনের একদম প্রাক্কালে ২০২৪-এর মার্চে পেট্রল- ডিজেলের দাম সামান্য কমানো হয়। এতে কি তেল কোম্পানিগুলির কোনও ক্ষতি হয়েছে? এই সময়ে ২০২৪-ক্স২৫ অর্থবর্ষে সরকারি সংস্থা ওএনজিসি-র মুনাফা ৪৭ হাজার ৫০০ থেকে ৪৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। আইওসিএল-এর বার্ষিক মুনাফার পরিমাণ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে। ২০২১-‘২২ সালের পর থেকে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মুনাফা ধারাবাহিক ভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-‘২৬ অর্থবছরে হয়েছে ৯৫ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। নায়ারা এনার্জির সর্বশেষ প্রতিবেদনে মুনাফা ছিল ৬০৭৯.৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ কোনও ক্ষেত্রেই লোকসানের কোনও তথ্য নেই। অথচ তেল কোম্পানির মালিকদের ব্যথায় কাতর তেলমন্ত্রীর বক্তব্য– ‘কতদিন আর তেল সংস্থাগুলি লোকসানের বোঝা নিতে পারে? একটা সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে একটা সিদ্ধান্ত তো নিতেই হবে।’ তাঁরা যে ধনকুবের মালিকদের স্বার্থ দেখার ঠিকা নিয়ে সরকারে বসেছেন, এই বক্তব্যে তা স্পষ্ট। তাই সিদ্ধান্তটা তাঁদের হয়েই নিয়েছেন।

আর একটি বিষয় তাঁরা জনসমক্ষে আনতে চাইছেন না। ২০২৬-এর ৬ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল রাশিয়ার কাছ থেকে সস্তার জ্বালানি তেল কেনা ভারত সরকারকে বন্ধ করতে হবে। আদানি, আম্বানি, টাটা, মিত্তালদের মতো ধনকুবেরদের মুনাফার স্বার্থে সাম্রাজ্যবাদের শিরোমণি আমেরিকার কাছে মাথা নত করে এই শর্ত মেনে নিয়েছে ভারত। এখন তাই আমেরিকা, পশ্চিম আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি থেকে চড়া দামে তেল আমদানি বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে সরকার। আমদানি খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই গোটা পরিস্থিতির জন্য দায়ী কে? সরকারের বিদেশনীতি। তা হলে মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে এর সমস্ত দায়ভার জনগণের উপর চাপিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কেন? তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে আনুপাতিক হারে সমস্ত জিনিসপত্রের দাম আবারও বাড়বে। ক্ষুদ্র শিল্প, ছোটখাটো ব্যবসা মার খাবে। এমনিতেই দেশে বিপুল বেকার বাহিনী। সেই সংখ্যা লাফিয়ে আরও বাড়বে। সরকার জনগণের কথা সামান্যতম চিন্তা করলেও চূড়ান্ত জনবিরোধী এ সিদ্ধান্ত নিতে পারত না।

হ্যাঁ এ কথা ঠিক, যুদ্ধ পরিস্থিতি বিদ্যমান। হরমুজ প্রণালী, বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি করিডর বন্ধ। বিশ্ব জুড়ে অপরিশোধিত তেলের দাম, পরিবহণ ও বিমার খরচ বেড়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের সরকারের তো কঠিন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকার কথা ছিল। সরকার যদি সত্যিই জনস্বার্থে কাজ করত, তবে কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিকল্প পথের সন্ধানও করতে পারত। জনসাধারণের ঘাড়েই সমস্ত আর্থিক ভার চাপিয়ে না দিয়ে বছরের পর বছর ধরে যারা সরকারি আনুকূল্যে হাজার হাজার বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে, সেই ধনকুবেরদের ওপর বাড়তি ট্যাক্স ধার্য করতে পারত। আরও নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেত। কিন্তু সে সব কিছুর মধ্যে তাঁরা গেলেনই না। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে সহজ সমাধান হল মূল্যবৃদ্ধি। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার তা হলে কাদের স্বার্থে কাজ করছে? বিজেপিকে এই মুহূর্তে পুঁজিপতি শ্রেণি সবচেয়ে ভরসাযোগ্য দল বলে মনে করছে। দেশের মানুষ ধুঁকছে তাতে বিজেপির নেতা-মন্ত্রীদের কোনও হেলদোল নেই, মালিকদের লাভ কেন আরও কিছুটা বাড়ছে না, এই হয়েছে তাদের মাথাব্যথার কারণ। তাই কেন্দ্রীয় সরকারের তেল মন্ত্রক, অর্থ মন্ত্রক, বিজেপির নেতা-মন্ত্রীরা সব এক সুরে তেলের দাম বাড়ানোর পক্ষে যুক্তি করেছেন।

এই শ্বাসরোধকারী ব্যবস্থা থেকে মুক্তির পথ কি নেই? আছে। এর বিরুদ্ধে দেশব্যাপী জনসাধারণের ঐক্য গড়ে তুলে এমন শক্তিশালী গণআন্দোলনের অভিঘাত তৈরি করা দরকার যাতে কেন্দ্রীয় সরকার কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মোকাবিলায় বিকল্প রাস্তা খুঁজতে বাধ্য হয়।